
বিজেপির সর্বোচ্চ নেতা, আরএসএসের একনিষ্ঠ স্বয়ংসেবক, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে দেখলেন দেশের মানুষ! অবশ্য এ রকম আবেগপ্রবণ হতে তাঁকে ভারতবাসী বেশ কয়েক বারই দেখে থাকবেন। ৭ নভেম্বর ‘বন্দে মাতরম’-এর সার্ধশতবর্ষ পূর্তির এক অনুষ্ঠান মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী রীতিমতো ভাব-বিহ্বল গলায় বলেছেন, ১৯৩৭ সালে গানটির প্রথম দুটি স্তবক রেখে বাকি স্তবকগুলিকে যাঁরা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁরাই সেই সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে দেশভাগের বীজ বপন করেছিলেন। একদিকে রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গান পরিবেশনের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা এবং আগামী নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এলে এ গান বন্ধ করে দেওয়ার আস্ফালন, সঙ্গে শিক্ষার সিলেবাস থেকে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিচ্ছে বিজেপি, তাঁদের রাজ্য সভাপতি প্রশ্ন করছেন, বাঙালিরা রবীন্দ্রনাথ ধুয়ে আর কত দিন জল খাবে? অপর দিকে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে ভক্তিবিহ্বল হয়ে পড়া– এই দ্বিচারিতা কেন? এক সময়ে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইতে বাধা দিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামিক মৌলবাদীরা। আজও বাংলাদেশের ইসলামিক মৌলবাদীরা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে এই গানটি বাতিল করার দাবি তুলছেন। আর তার বিরোধিতা করছে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সেখানকার সাধারণ মানুষ। বিজেপি নেতাদের দাবি ইসলামিক মৌলবাদীদের সঙ্গেই মিলে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে প্রায় ৯০ বছর পর হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর এমন বোধোদয় কেন? এত দিন কি তাঁরা এটা খেয়াল করেননি? কেন তবে এখনই খেয়াল হল? তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর দলের নেতা-মন্ত্রীরা ‘বন্দে মাতরম’-এর ভক্তই বা কবে হয়ে পড়লেন? তবে কি প্রধানমন্ত্রী, তাঁর দল, দলের আদর্শগত পরিচালক আরএসএসের ভারতের স্বাধীনতা, স্বাধীনতা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি সম্পর্কে দীর্ঘলালিত মনোভাব বদলে গেল! তেমন কোনও সিদ্ধান্ত বা ঘোষণার কথা তো শোনা যায়নি। তা হলে?
স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রভাব
১৮৭৫ সালে লেখা ‘বন্দে মাতরম’ গানটি বঙ্কিমচন্দ্র পরে তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে যুক্ত করেন। ১৮৯৬ সালে গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় কংগ্রেস অধিবেশনে গেয়ে শোনান। ‘বন্দে মাতরম’ শব্দবন্ধটি স্লোগান হিসাবে এবং গানটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্যাপক অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলে। ১৯০৫-এর ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার দিন কলকাতার পথঘাট ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। আন্দোলনের এই আবহে রাতারাতি ‘বন্দে মাতরম’ বাংলার জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয় এবং দ্রুত ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি সর্বভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের মূল স্লোগানে পরিণত হয়। ব্রিটিশ প্রকাশ্যে ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দলে দলে সাধারণ মানুষ এই ধ্বনি দিতে দিতেই জেলে যায়, পুলিশের অত্যাচার সহ্য করে। বিপ্লবীরা ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি দিতে দিতেই ফাঁসির দড়ি গলায় পরেন। ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকায় ব্রিটিশ বিরোধী লেখার জন্য সম্পাদক বিপিন চন্দ্র পালের মতো নেতাদের জেলে যেতে হয়।
আরএসএস স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি
‘বন্দে মাতরম’-এর সাথে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং তার ইতিহাস সম্পৃক্ত। অথচ ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ দূরের কথা, যে আদর্শের ধারাবাহিকতায় বিজেপির উদ্ভব সেই আরএসএস স্বাধীনতা আন্দোলনেই অংশ নেয়নি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে তারা স্বাধীনতা আন্দোলন বলতেই রাজি হয়নি। শুধু তাই নয়, আরএসএস সমস্ত দিক থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল, ব্রিটিশকে সহায়তা করেছিল। সেই আরএসএস এবং তার দ্বারা পরিচালিত বিজেপি নেতাদের হঠাৎ এই বন্দে মাতরম প্রীতি উছলে ওঠা স্বাভাবিক ভাবেই দেশের মানুষের মনে সংশয় জাগিয়ে তুলেছে।
আসলে ক্ষমতালোভী, ভোটসর্বস্ব, পুঁজিপতি শ্রেণির সেবাদাস এই সব দলগুলির কাছে ভোট বড় বালাই। আগামী বছর পশ্চিমবাংলায় বিধানসভা নির্বাচন। অথচ এক দশকের বেশি শাসন ক্ষমতায় থেকেও মানুষের কল্যাণে এমন কোনও কাজের কৃতিত্ব নরেন্দ্র মোদি তথা তাঁর দল বিজেপির ঝুলিতে নেই যা দেখিয়ে তাঁরা দেশের কিংবা এ রাজ্যের মানুষের সমর্থন তথা ভোট চাইতে পারেন। যতই প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দল দেশের মানুষকে পাঁচ ট্রিলিয়ন অর্থনীতির খোয়াব দেখান, কিংবা বিশ্বে তৃতীয় শক্তিধর অর্থনীতির অধিকারী হওয়ার গল্প শোনান, প্রধানমন্ত্রীরা জানেন, তাতে দেশের ধনকুবেররা খুশি হতে পারেন, নিরানব্বই ভাগ সাধারণ মানুষকে তা স্পর্শও করবে না। কারণ তাঁদের অশেষ দুঃখময় জীবনের কঠোর বাস্তবতায় এ সবের সামান্যতম ছোঁয়াও তাঁরা দেখতে পান না। তাই নির্বাচনী বক্তৃতায় এ সব আর্থিক উন্নয়নের গল্পের ধারকাছ দিয়েও যান না নরেন্দ্র মোদি কিংবা আরএসএস-বিজেপির নেতারা। তখন তাঁদের কোথাও যেমন মানুষকে ঘুসপেটিয়া সমস্যা তথা ব্যাপক অনুপ্রবেশের গল্প শোনাতে হয়, তেমনই কোথাও জনসভায় ভাঙা গলায় উচ্চারণ করতে হয়– আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। বাংলার নির্বাচনের আগে তাই বাঙালি আবেগ উস্কে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য। তাই হঠাৎ এক শতকের ঘুম ভেঙে জেগে উঠে তাঁরা দেখছেন বন্দে মাতরমের পরের স্তবকগুলো নেই। তাই এমনকি দেশনায়কদের বিরুদ্ধে দেশভাগের বীজ বপনের অভিযোগ– এ সবই যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা বুঝতে কারও বাকি থাকে না।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বন্দে মাতরম
ইতিহাস হল, ১৮৯৬ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে বন্দে মাতরম পুরো গানটি গাওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুতে হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটলেও পরবর্তী তিন দশকে জাতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের অনুপ্রবেশের ফলে শুরুতে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের যে সুরটি আন্দোলনের মধ্যে ছিল তা অনেকখানিই নষ্ট হয়ে যায়। যথার্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চার অভাবের কারণে কংগ্রেসের এক অংশের নেতার বক্তৃতা, রচনা ও আচরণে হিন্দু ধর্মীয় প্রভাব লক্ষ করা যায়। প্রাচীন ভারতের গৌরবের দোহাই দিয়ে তাঁরা গোটা মধ্য যুগ ধরে বহু জাতিসত্তার মিলনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠার বাস্তব ইতিহাসকে অস্বীকার করতে থাকেন। বাল গঙ্গাধর তিলকের গণপতি ও শিবাজী উৎসব কিংবা অরবিন্দ ঘোষের পৌরাণিক ধাঁচে ভারতকে মাতৃরূপে চিন্তা এবং জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের অভিন্নতার ধারণা, বিপ্লবী সংগঠনগুলির কালীমূর্তির সামনে শপথ নেওয়ার ঘটনা মুসলমান সম্প্রদায়ের অনুমোদন বা সমর্থন লাভ করেনি।
আরও নানা কারণে সংখ্যালঘু অংশ কংগ্রেসকে হিন্দুদের সংগঠন মনে করতে থাকে। একই সঙ্গে ব্রিটিশের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা ভারতের ইতিহাসকে বিকৃত ভাবে উপস্থিত করে হিন্দু ও মুসলমানের সংস্কৃতির ধারাকে সম্পূর্ণ বিপরীত হিসাবে দেখাতে থাকেন। চতুর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে হিন্দুধর্মীয় প্রভাবের ফলাও প্রচার করে মুসলমানদের মনে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সন্দেহ ও বিতৃষ্ণা তৈরির সুযোগ পায়। এর ফলে শিক্ষিত মুসলমানদের একটা অংশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে সরে যান, কেউ কেউ বিরুদ্ধাচরণও করেন। এই পরিস্থিতিতে ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা হয়। অন্য দিকে তুরস্কের খলিফার সমর্থনে এ দেশে মুসলিমরা খিলাফত আন্দোলন শুরু করলে এবং কংগ্রেস সেই আন্দোলনকে সমর্থন করলে পাল্টা হিন্দু ঐক্যের ডাক দিয়ে আরএসএস প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৫ সালে। অবশ্য তার আগেই ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’ উত্থাপন করেন– বিজেপি-আরএসএস যাঁকে ‘বীর’ বলে অভিহিত করেন– সেই সাভারকর। অন্য দিকে বড়লাট লর্ড মেয়োর প্ররোচনায় মুসলিম লিগ পৃথক নির্বাচনের দাবি তুলে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের অধিকার পায়। এই রকম পরিস্থিতিতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে।
এ যুগের অন্যতম মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক, এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর প্রতিষ্ঠাতা শিবদাস ঘোষ এ দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের দুর্বলতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, ‘‘অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্বার্থবোধই গোটা ভারতবর্ষে একটা জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে সমস্ত উপজাতিগুলিকে (ন্যাশনালিটিজ) একসূত্রে বেঁধে ফেলল। … ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতের সমস্ত উপজাতিগুলি মিলে একটি আধুনিক জাতি গড়ে ওঠার যে প্রক্রিয়া শুরু হল, গোড়া থেকেই তার মধ্যে কতকগুলো দুর্বলতা থেকে গেল। … জাতীয় আন্দোলনকে আমরা ধর্মীয় ভাবনা-ধারণা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করতে সমর্থ হইনি। … রিলিজিয়নকে আমরা ফাইট করিনি। রিলিজিয়ন থেকে মুক্ত করে আমরা জাতীয়তা এবং জাতীয়তাবোধের নতুন ভাবধারাগুলিকে সামনে নিয়ে আসতে পারলাম না। ফলে জাতীয়তাবাদ মূলত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ হয়ে পড়ল এবং এ রূপ অবস্থায় অতি স্বাভাবিক ভাবেই এই আন্দোলনে হিন্দুধর্মের প্রাধান্য থেকে গেল। …’’
রবীন্দ্রনাথ নিজে গানের প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার কথা বলেছিলেন
এই রকম পরিস্থিতিতে কংগ্রেস অধিবেশনে বন্দে মাতরম গাওয়া নিয়ে বিতর্ক ওঠে। কংগ্রেস থেকে বলা হয়, অধিবেশনে বন্দে মাতরম গাইতে হবে সকলকেই। আপত্তি তোলেন মুসলিম নেতারা। জওহরলাল নেহেরু সুভাষচন্দ্র বসুকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শ নেওয়ার জন্য বলেন। ইতিমধ্যেই বেড়ে ওঠা হিন্দু-মুসলমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক দূরত্ব যে ভাবে বেড়ে উঠছিল তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, এই গান সেই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। গানের ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী’ অংশ স্বভাবতই সব ধর্মের মানুষের অসুবিধাজনক মনে হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ নেহেরুকে চিঠিতে জানান, ‘‘গানটির শুরুতে দেশ-মায়ের যে বন্দনা করা হয়েছে, তার মধ্যে একটা বিশেষ আর্তি আছে। … ফলে আমি এই অংশটিকে বাকি কবিতা ও বই (আনন্দমঠ) থেকে আলাদা করে দেখতে রাজি আছি। তিনি বলেন, বন্দে মাতরমকে যদি তার সম্পূর্ণ কনটেক্সটে দেখা হয় তা হলে তা হয়তো মুসলিমদের মতাদর্শকে আঘাত করতে পারে। … তবে সব সময়ে তো গানটি গাওয়ার সময়ে তার সম্পূর্ণতা দিয়ে বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। … প্রথম দুটি স্তবক নিজেই তার আলাদা তাৎপর্য তৈরি করেছে।’’ ১৯৩৭-এ এই অংশটিকে জাতীয় গান হিসাবে গ্রহণ করা হয়।
অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ নিজেই গানের শুধু প্রথম অংশটিই গাওয়ার কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি রবীন্দ্রনাথকে দেশভাগের জন্য দায়ী বলতে চান? তাঁর আসল উদ্দেশ্য একে মুসলিম দাবির কাছে তৎকালীন নেতৃত্বের নতিস্বীকার বলে দাগিয়ে দিয়ে হিন্দু আবেগকে উস্কে দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী তথা বিজেপি-সংঘ পরিবারের রাজনীতির একমাত্র পুঁজি হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক গড়ে তোলা। সে দিন রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্রদের উদ্দেশ্য ছিল প্রধানমন্ত্রীর আজকের রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁরা সে দিন স্বাধীনতা আন্দোলনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত ভারতবাসীর ঐক্য চেয়েছিলেন। কারণ তাঁরা জানতেন, ধর্ম যা-ই হোক, প্রতিটি ভারতবাসীর স্বার্থ নিহিত রয়েছে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির মধ্যে। স্বাধীনতার আন্দোলন দুর্বল হবে যদি ভারতবাসী ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের বিভক্ত করে ফেলে। তাই তাঁরা ভারতবাসীর ঐক্যের স্বার্থেই সে দিন মুসলিম ভাবাবেগকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার মধ্যে কোনও নতিস্বীকার ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর দলের সে ঐক্য রাখার দায় নেই। বরং ঐক্য ভাঙলেই তাঁদের লাভ।
গণপরিষদের সিদ্ধান্ত
উল্লেখ করা যেতে পারে, সংবিধান প্রণয়নের সময় জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণপরিষদের সদস্যরা বলেন, জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে এমন কোনও গানকে মর্যাদা দেওয়া উচিত যা ধর্ম জাতি ও আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে ভারতের অখণ্ডতাকে তুলে ধরবে। বন্দে মাতরম কথাটি এবং তার প্রথম দুই পংক্তির মধ্যেও হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসের ইঙ্গিত থাকায় তার বদলে রবীন্দ্রনাথের জনগণমন-কে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই গানেরও শেষ তিন পংক্তিতে হিন্দু ধর্মীয় ভাবাবেগের উপস্থিতি থাকায় নির্ধারিত জাতীয় সঙ্গীতের থেকে তা বাদ দেওয়া হয়। অন্য দিকে বন্দে মাতরমের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদানের কথা মনে রেখে গণপরিষদ এই দুই পংক্তিকে জাতীয় গানের মর্যাদা দেয়। জনসংঘ তথা হিন্দুত্ববাদী নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও গণপরিষদের এই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি এ ইতিহাস অস্বীকার করতে পারেন? এর পরও কি ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ প্রকাশ যে পরিকল্পিত ভাবে হিন্দু ভাবাবেগকে উস্কে তুলতেই তা বুঝতে কি কারও অসুবিধা থাকে!