Home / খবর / বন্দে ভারত! ন্যূনতম ভাড়া ১৭০০ টাকা, এ কোন ভারতের বন্দনা!

বন্দে ভারত! ন্যূনতম ভাড়া ১৭০০ টাকা, এ কোন ভারতের বন্দনা!

প্রধানমন্ত্রী অনলাইনে। অকুস্থলে হাজির তাঁর মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সহ একগাদা সিপাই-সান্ত্রী, লোক-লস্কর। ৩০ ডিসেম্বর হাওড়া স্টেশন থেকে নিউ জলপাইগুড়ির উদ্দেশে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু হচ্ছে। এই যাত্রা নিয়ে বিজেপি নেতা-কর্মীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল দেখার মতো। স্টেশনে স্টেশনে তাঁরা জমায়েত করেছিলেন এই ট্রেনকে স্বাগত জানাতে। সব মিলিয়ে এক হইহই রইরই ব্যাপার! সংবাদমাধ্যম থেকে সমাজমাধ্যম সরগরম। পরিবেশিত হচ্ছে হাতে-গরম সব খবর, কত জোরে ছুটবে এই ট্রেন, সিট কত ডিগ্রি ঘোরানো যাবে, কী কী মেনু রসনা-তৃপ্তি ঘটাবে– এমন কত কী।

ঠিক তার পরদিনই চোখে পড়ল ৫ ঘন্টার বেশি দেরিতে চলা দিল্লি থেকে পুরীগামী পুরুষোত্তম এক্সপ্রেসের এক অসহায় যাত্রী ভারতীয় রেলের টুইটার হ্যান্ডেলে কাতর আবেদন জানিয়েছেন, সময়ে ট্রেন চালানোর ব্যাপারে এই অবহেলা শেষ হবে কবে? দেখা গেল একই দিনে বাঙ্গালোরের যশবন্তপুর থেকে ছাড়া আর এক ট্রেনের যাত্রী প্রতিদিন দেরির অভিযোগ জানিয়ে লিখেছেন, নতুন ট্রেন চালুর চমক না দিয়ে সিগনাল ব্যবস্থাটা একটু উন্নত করা যায় না? যথারীতি রেল দপ্তর উত্তর দিয়েছে আপনাদের টিকিটের পিএনআর নম্বর জানিয়ে মেল পাঠান, আমরা উচ্চপর্যায়ে অসুবিধার খবর জানিয়ে দিচ্ছি। কী আশ্চর্য, ওই ট্রেনগুলো যে দেরিতে চলছে তা রেল দপ্তর জানে না! যাত্রীকে টিকিটের নম্বর দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে! দেশের দুই প্রান্তের দুই ট্রেনের দুই যাত্রীর অভিজ্ঞতা জানিয়ে দিল, এটাই আসলে ভারতীয় রেলের যাত্রীদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা।

তবে যে প্রধানমন্ত্রী বললেন, তাঁরা ভারতের রেল যোগাযোগকে এক নতুন যুগে নিয়ে গেছেন, সাত দশকে যা হয়নি, এক দশকে বিজেপি সরকার তা করে দেখিয়েছে! কী দেখিয়েছে? প্রধানমন্ত্রী ফিরিস্তি দিয়েছেন, কত ডবল লাইন, কত লাইনের বৈদ্যুতিকরণ তাঁরা করেছেন। আর শুনিয়েছেন আধুনিক বন্দে ভারত, তেজস এক্সপ্রেসের কথা। রেলমন্ত্রী রেলের উন্নতির নামে ওয়াইফাই ব্যবস্থা, ইন্টারনেট যোগাযোগের ব্যবস্থা নিয়ে এতটাই মশগুল যে সারা দেশে মাত্র ছ’টি ক্ষেত্রে একযোগে নতুন ইন্টারলকিং ব্যবস্থার কথা বলেই তাঁকে ক্ষান্ত হতে হয়েছে। সরকারের সুবিধা হল, প্রতিদিনের রেলযাত্রার অভিজ্ঞতা আছে এমন বেশিরভাগ যাত্রীই টুইটার ইত্যাদি ব্যবহারের কথা ভাবতেই পারেন না। আর এখন অনলাইনে অভিযোগের নামে এগুলিই একমাত্র মাধ্যম দাঁড় করিয়েছে রেল। ফলে লক্ষ লক্ষ নিত্যযাত্রীর কথা রেলের কর্তা আর মন্ত্রীদের শোনবারই দরকার হয় না। একেবারে দিন আনা-দিন খাওয়া এই অধিকাংশ যাত্রীর কথা শুনতে পেলে সরকার এবং রেলের কর্তারা জানতে পারতেন নিত্যযাত্রীদের নিত্য-যন্ত্রণার কথা। কেমন করে প্রাণ হাতে নিয়ে যাত্রীদের রেল ভ্রমণ করতে হয়, তার একটু চিত্র হয়ত কর্তারা দেখতেও পেতেন! ট্রেন লেট, বড় স্টেশনের সিগন্যালে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা, যখন তখন লোকাল, প্যাসেঞ্জার ট্রেন, এমনকি কমদামি মেল-এক্সপ্রেস পর্যন্ত বাতিল হওয়া প্রায় নিত্যদিনের ঘটনায় পর্যবসিত। দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য সামান্য জলও অমিল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সামান্য কিছু ট্রেন ছাড়া বাকি হাজার হাজার কামরায় পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। সাধারণ যাত্রীরা চড়েন এমন স্লিপার কামরা থেকে শুরু করে দ্বিতীয় শ্রেণির সব কামরাতেই রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাপারটাই রেল প্রায় ভুলে গেছে মনে হয়। এর ওপর কোভিড মহামারির সময় রেলের ক্ষতির অজুহাতে সাধারণ প্যাসেঞ্জার ট্রেনের গায়ে এক্সপ্রেস কিংবা স্পেশাল তকমা সেঁটে দিয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ ভাড়া আদায় চলছে। উত্তরবঙ্গের জন্য দামী আধুনিক ট্রেনের উদ্বোধন করতে গিয়ে রেলমন্ত্রীর মনে পড়েছিল কিনা জানা নেই, মাত্র কিছুদিন আগেই ময়নাগুড়ির কাছে ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ভেঙে একটি এক্সপ্রেস ট্রেনের দুর্ঘটনায় পড়ার কথা!

বিজেপি সরকার রেলের উন্নতি বলতে কী বুঝিয়েছে? তাদের প্রচারে যা উঠে আসে, তা মূলত বেসরকারি তেজস এক্সপ্রেস, যাতে বিমান সেবিকার মতো রেল সেবিকারা খাবার পরিবেশন করেন। এ ছাড়া আছে বন্দে ভারতের মতো বিলাসবহুল ট্রেন, বিমান বন্দরের ধাঁচে কিছু স্টেশনকে সাজিয়ে তা থেকে বাড়তি আয়, শিয়ালদহ, হাওড়ার মতো বড় স্টেশনগুলিকে কার্যত শপিং মলে পরিণত করা। এতে যাত্রী স্বাচ্ছন্দে্র ভাবনাটা কতটা অনুপস্থিত তা শিয়ালদহ স্টেশনের নর্থ সেকশন দিয়ে যাতায়াত করা লক্ষ লক্ষ যাত্রী প্রতিদিন হাড়ে হাড়ে বুঝছেন। সৌন্দার্যায়নের ঠেলায় বিশাল অংশ ঘেরা, ফলে সরু রাস্তা দিয়ে একসাথে হাজার হাজার মানুষ বেরোতে গিয়ে প্রতিদিন অফিস টাইমে প্রায় পদপিষ্ট হওয়ার দশা হচ্ছে যাত্রীদের। রেলের কর্তারা কিন্তু ‘উন্নয়নে’ অটল! রেল পরিকাঠামোর এমনই অবস্থা যে, বেসরকারি তেজস এক্সপ্রেস সরকারের দ্বারা বিশেষ প্রচারিত টাইমটেবল মেনে চালাতে তারআগে পরে বেশ কিছুক্ষণ অন্য ট্রেন বন্ধ রাখার ফতোয়া দিতে হয়েছে।

যে ট্রেন নিয়ে এত হইচই, সেই বন্দে ভারত এক্সপ্রেস নাকি সেমি হাইস্পিড! মোটামুটি ৫৬০ কিলোমিটার যেতে সময় নেবে সাড়ে সাত থেকে আট ঘন্টা। অর্থাৎ গড়ে গতিবেগ থাকবে ঘন্টায় ৭০ থেকে ৭২ কিলোমিটার। রেলকর্তারাই জানিয়ে দিয়েছেন রেল ট্রাকের যা অবস্থা তাতে বেশি জোরে ট্রেন ছোটালে আর একটা ময়নাগুড়ির মতো দুর্ঘটনা হবে। স্বয়ংক্রিয় দরজা ইত্যাদি এখনকার দিনে কোনও বিরাট উন্নত প্রযুক্তি নয়। আসল প্রযুক্তির ক্ষেত্র ছিল নিরাপদ এবং দ্রুত ট্রেনে যাত্রার ব্যবস্থা। তাতে রেলের নজর কম।

‘বন্দে ভারত’ ট্রেনের ভাড়া শুরু ১৭০০ টাকা থেকে। ‘একজিকিউটিভ ক্লাসে’ চড়তে হলে দিতে হবে ২৮০০ টাকা। কারা চড়বেন এই ট্রেনে? ইতিমধ্যেই একটি শতাব্দী এক্সপ্রেস এই রুটে যাতায়াত করে। সে ট্রেনেও সময় প্রায় একই লাগে। সে ট্রেনের ভাড়াও সাধারণের সাধ্যের বাইরে। তবু বিশেষ কিছু যাত্রীর প্রয়োজনের কথা ভেবে এ ধরনের একটি ট্রেন চালানো যেতেই পারে। কিন্তু তা নিয়ে এত হইচইয়ের কারণ কী? বিশেষত এ দেশে বন্দে ভারত কিংবা শতাব্দী এক্সপ্রেসের মতো বিলাসবহুল ট্রেনগুলিতে উচ্চ শ্রেণিতে যাতায়াতের ক্ষমতা যাদের আছে তাঁরা শখ করে মাঝে মাঝে ট্রেনে চড়লেও প্রধানত যাতায়াত করেন বিমানেই। ফলে বিমান যোগাযোগ আছে এমন ট্রেনরুটে উচ্চ শ্রেণির আসন খালি যায় বহু সময়। অথচ এই ধরনের ট্রেন এবং বিলাসবহুল কামরার জন্য বিশেষ কর্মী নিয়োগ, মুখরোচক খাবার-দাবার সহ ক্যাটারিংয়ের ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদির বোঝা যা বইতে হয় তার তুলনায় আয় বাড়ে না।

মন্ত্রীরা মাঝে মাঝে মাঝে রেলের ভর্তুকি নিয়ে আক্ষেপ করেন। তাঁরা উচ্চ শ্রেণির ভর্তুকির কথা চেপে গিয়ে সে দায় চাপিয়ে দেন লোকাল ট্রেন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রীদের ওপর। কিন্তু রেলের নিজের হিসাব কী বলছে? এই চলতি আর্থিক বছরে এপ্রিল থেকে অক্টোবরে সাত মাসে রেলের অসংরক্ষিত কামরার যাত্রী বেড়েছে ১৯৭ শতাংশ। তার জন্য এই ক’মাসে অসংরক্ষিত টিকিট থেকে রেলের আয় গত বছরের এই সময়ের তুলনায় ৫০০ শতাংশ বেড়েছে। আর সংরক্ষিত সমস্ত শ্রেণি মিলে একই সময়ে যাত্রী বেড়েছে ২৪ শতাংশ। আয় বেড়েছে ৬৫ শতাংশ (লাইভ মিন্ট, ১১ অক্টোবর, ‘২২)।

অর্থাৎ ভর্তুকি বেশি যায় উচ্চশ্রেণির জন্য। অথচ যাত্রীদের অভিজ্ঞতা হল রেল কর্তৃপক্ষ দূরপাল্লা বা মাঝারি পাল্লার ট্রেনে ক্রমাগত সাধারণ দ্বিতীয় শ্রেণির কামরা কমিয়ে উচ্চ শ্রেণির কামরা বাড়াচ্ছে। সাধারণ গরিব মানুষ অসংরক্ষিত দ্বিতীয় শ্রেণির কামরায় বাদুড়ঝোলা হয়েও যাতায়াত করতে বাধ্য হন। শালিমার কিংবা হাওড়া থেকে দক্ষিণ ভারতগামী ট্রেনগুলিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভয়াবহ যাত্রার দৃশ্য যাঁরা দেখেছেন, বিশেষ বিশেষ সময়ে উত্তর ভারতের ট্রেনগুলির ভিড়ের সঙ্গে যাঁদের একবার পরিচয় ঘটেছে সে আতঙ্ক তাঁদের সহজে যায় না। কিন্তু রেলকে যদি ভারতের লাইফলাইন বলতে হয় তাহলে মালগাড়ি ছাড়া লোকাল এবং নানা ট্রেনের এই সব সাধারণ কামরাগুলোর জন্যই বলতে হবে। এতে চড়েই বাদুড়ঝোলা হয়ে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের কাজের জায়গায় পৌঁছন। তাঁরা সব কষ্ট সয়ে এভাবে পৌঁছন বলেই উৎপাদনের চাকা ঘোরে। এমনকি নির্মাণ শ্রমিক, পরিচারিকা, অসংগঠিত ঠিকা কর্মী ইত্যাদি যাঁদের কম পয়সায় মান্থলি টিকিট দেওয়াকে বিজেপি নেতারা অপচয় বলে দেখান–তাঁরা কর্মস্থলে না পৌঁছলে উৎপাদনের চাকাটা স্তব্ধ হয়ে যাবে। রেল এঁদের বদান্যতা দেখায়, এমন ভাবার কারণ নেই–এঁদের শ্রমে দেশটা চললে তবেই কিন্তু রেল চলবে। এই শ্রমজীবী মানুষেরাই আসল ভারত। অথচ বন্দে ভারতে এঁদেরই স্থান নেই। এ তাহলে কোন ভারতের বন্দনা?

আসলে রেল যে দেশের মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা, এ কথাটাই পুঁজিপতি শ্রেণির সেবাদাস কংগ্রেস থেকে বিজেপি সহ ক্ষমতালোভী দলগুলি ভুলিয়ে দিতে চায়। পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থে উদারিকরণ, বিশ্বায়নের পথ ধরেই রেলের বেসরকারিকরণের শুরু করেছে কংগ্রেস। তারপর যে দলই গদিতে এসেছে একই কাজ করেছে। মানুষের ভুলে যাওয়ার কথা নয় ‘গরিব রথ’ এক্সপ্রেসের নামে আদ্যোপান্ত এসি কামরার দামি ট্রেন চালু করে গেছেন ‘গরিব কা মসিহা’ উপাধিতে ভূষিত লালুপ্রসাদ যাদব। বিজেপি সেই বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণকে চরম জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। রেলের কর্মী ছাঁটাই চলছে, বেসরকারি ঠিকাদারের হাতে একে একে গুরুত্বপূর্ণ বহু কাজ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ‘নিরাপদ’ রেল চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পোস্টেও অভিজ্ঞ কর্মীদের বিদায় দিয়ে ঠিকাদার আনা হচ্ছে। সাড়ে তিন লক্ষের বেশি অভিজ্ঞ রেলকর্মীকে স্বেচ্ছাবসর দেওয়া হয়েছে। ড্রাইভার, গার্ড, কেবিনম্যান, মেকানিক, ইয়ার্ড মাস্টার, ইঞ্জিন ও কামরা তদারকির টেকনিসিয়ান, ইঞ্জিনিয়ার, স্টেশন মাস্টারের মতো দায়িত্বশীল বহু পদ শূন্য। পরিস্থিতি এমন যে, সম্প্রতি রেল বোর্ডের অধীনে উচ্চপদে কর্মরত শতাধিক রেল অফিসার কর্মী সংকটে চাপ সামলাতে না পারার কারণে চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নিতে চেয়েছেন।

তা হলে বিজেপি নেতারা স্টেশনে স্টেশনে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের পিছনে দৌড়ের ব্যবস্থা করে আসলে কী করতে চেয়েছিলেন? তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল সর্ব ক্ষেত্রে ব্যর্থ বিজেপি সরকারের মুখ বাঁচাতে একটা চমক সৃষ্টি করা। সে জন্যই একটা ট্রেন উদ্বোধনকে একেবারে জাতীয় প্রচারের আলোয় আনার চেষ্টা। বন্দে ভারতের মতো ট্রেনে যে উচ্চবিত্তরা চড়বেন তাঁদের মনোরঞ্জন করে দেশের বড় বড় পুঁজিমালিকদের বন্দনাগানই বন্দে ভারতের আসল সুর।