
সাতাত্তরতম প্রজাতন্ত্র দিবসের ভোরে রেড রোডে কুচকাওয়াজ চলছে। রাজ্যপাল, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে ‘গণতান্ত্রিক’ দেশের সংবিধান কার্যকর হওয়ার বর্ণাঢ্য উদযাপন। সেই সময় কয়েক কিলোমিটার দূরে শহরের আর এক প্রান্তে তালাবন্ধ গুদামঘরে বাঁচার জন্য আর্তনাদ করতে করতে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া দেহ থেকে তখনও ধোঁয়া উঠছে, তারা প্রজা হলেও সরকারের চোখে বোধ হয় ঠিক মানুষ নয়, নিছক ঠিকা ‘শ্রমিক’। দিন ভর খাটনির পর জিনিসপত্রে বোঝাই যে গুদামঘরে তারা শুতে পান, সেখানকার পরিবেশ বা সুরক্ষা কেমন, সেখানে মানুষ শুতে পারে কি না, শ্বাস নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বাতাস আছে কি না, আগুন লাগলে দ্রুত নেভানো যাবে কি না, এ সব কথা মালিক বা মালিকদের পয়সায় চলা সরকার, কারওরই ভাবার দরকার পড়ে না। তাই আনন্দপুরের নাজিরাবাদ অঞ্চলের দুটি গোডাউনে যখন বিধ্বংসী আগুন লাগল, শ্রমিকরা নিিশ্চত মৃত্যুর সামনে আগুন আর ধোঁয়ার মাঝে ছটফট করলেন, কেউ প্রিয়জনকে শেষবার ফোন করে বললেন ‘খুব কষ্ট পেয়ে মরছি, আর পাঁচ মিনিটের বেশি বাঁচব না’, কেউ ভাইকে ফোন করে নিজের স্ত্রী ছেলেমেয়েকে দেখার অনুরোধ করে গেলেন। আর সেই মানুষগুলোর আত্মীয়-পরিজন অপরিসীম আতঙ্ক আর যন্ত্রণা নিয়ে ছুটে গিয়ে দেখলেন, তাদের স্বামী, ভাই, বাবা, ছেলে বন্ধ গুদামের ওপারে জীবন্ত পুড়ছে। গুদামের দরজা তালা বন্ধ, আর এক দরজার মুখ প্রচুর কাঠ-বাঁশ ইত্যাদিতে আটকানো। ফলে দমকলের বারোটি ইঞ্জিন প্রায় ছত্রিশ ঘণ্টা পর যখন আগুন নেভাতে পারল, তখন স্বভাবতই ভস্মীভূত গুদামে পড়ে আছে ছাইয়ের সাথে মিশে থাকা শ্রমিকের হাড, গলে যাওয়া দেহাংশ যা থেকে মানুষটাকে চিনতে পারা তো দূরের কথা, ডিএনএ পরীক্ষা করে শনাক্ত করাও দুষ্কর। এ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে ২৭ জনের মৃত্যুর খবর এলেও নিখোঁজ বাকিরাও যে নিিশ্চতভাবে মৃত, এ কথা বোঝা কঠিন নয়। প্রিয়জনের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তার মরদেহ বা দেহাংশ নিতে এসেও চূড়ান্ত হয়রানি আর দুর্ভোগ সইতে হল বাড়ির লোকদের। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অসহায়ের মতো ছোটাছুটি করতে করতে শোকার্ত মানুষগুলোকে জেরবার হতে হল শুধু খাতায় কলমে স্বজনের মৃত্যু সুনিশ্চিত করার জন্য, যে মৃত্যুর জন্য একমাত্র দায়ী মালিকপক্ষ-সরকার-প্রশাসনের চূড়ান্ত গাফিলতি এবং অপদার্থতা।
একটি গুদামে যাদের কারখানা চলত, ঘটনার প্রায় তিনদিন পরে সেই ‘ওয়াও মোমো’ কোম্পানি একটা দায়সারা বিবৃতি দিল, যেখানে তাদের মাত্র তিনজন মৃত কর্মচারীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা আছে। বাজারে এই ওয়াও মোমোর সম্পত্তির পরিমাণ ২৮০০ কোটি টাকা, কিন্তু যে শ্রমিককে নিংড়ে এই লাভের অঙ্ক বেড়ে চলে এবং মালিকেরই অবহেলায় যাকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হয়, সেই শ্রমিকের লাশের দাম তারা ধার্য করেছে মাত্র দশ লক্ষ টাকা। এবং এ প্রতিশ্রুতি হাওয়ায় ভেসে গেলেও মালিকের পক্ষে থাকা আইন যে সরব হবে না, এ দেশে শ্রমিকের পরিবার-পরিজন তা জীবন দিয়ে জানেন। তাই দুটি গুদামের মালিক গ্রেপ্তার হলেও মোমো কোম্পানির দু’জন সাধারণ আধিকারিককে ধরা হল। তাও অনেক দেরিতে প্রবল বিক্ষোভের চাপে। মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে দমকলমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রী কারও গলায় এতটুকু অনুতাপ বা শোকের চিহ্ন পাওয়া গেল না। দমকলমন্ত্রী ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন ছত্রিশ ঘণ্টা পরে এবং নির্লজ্জের মতো বললেন, এখন আর গিয়ে লাভ কী, শুধু শুধু দমকলের কাজের বিঘ্ন ঘটানো হবে।
মুখ্যমন্ত্রী কথায় কথায় নিজের সরকারকে মা-মাটি-মানুষের সরকার বলে থাকেন, এতগুলো মানুষের মৃত্যু, এতজন মা-বোনের বুক খালি হওয়ার পর তিনি একটিবারও ঘটনাস্থলে গেলেন না এবং শোকপ্রকাশ করে বিবৃতি পর্যন্ত দিলেন না! ক্ষমতার দম্ভে নেতা-মন্ত্রীরা সাধারণ মানুষকে বোকা ভাবতে পারেন, কিন্তু ওয়াও মোমো এবং এই পুষ্পাঞ্জলি ডেকরেটার্সের মতো অসংখ্য ব্যবসায়ী সংস্থার সাথে সরকারের যে অঘোষিত লেনদেন চলে, এদের পয়সাতেই যে ভোটের আগে বড় বড় দলগুলো পেশিশক্তি প্রদর্শন করে বেড়ায় এবং যুবসমাজের একটা বিরাট অংশকে টাকার থলি দেখিয়ে অসামাজিক কাজে ভিড়িয়ে দেয়, এদের আশীর্বাদের হাত মাথায় আছে বলেই আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়েও ভোটবাজ দলগুলো পার পেয়ে যায়– মানুষ তা বিলক্ষণ জানে। তাই সরকার-প্রশাসনের এই নীরবতা এবং তার তাঁবেদার পুলিশগোষ্ঠীর গা-ছাড়া ভাবভঙ্গির কারণ তাদের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। অগ্নিকাণ্ডে এতগুলো মানুষের মৃত্যুর পর জানা গেল, এরকম গুদাম চালাতে গেলে যে অগ্নিসুরক্ষা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা ও অনুমতি (ফায়ার লাইসেন্স) লাগে তা ছিল না, বছরের পর বছর সেখানে কোনও ফায়ার অডিট হয়নি। এই গুদাম দুটি যেখানে তৈরি হয়েছে, সেই পূর্ব কলকাতার জলাভূমি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটি ‘রামসার অঞ্চল’, যেখানে জলাভূমি বুজিয়ে এই ধরনের নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। যে খেয়াদহ-২ পঞ্চায়েতের অধীনে এই এলাকা, তারা জানিয়েছে পঞ্চায়েত থেকে গুদাম তৈরির কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং বছরের পর বছর পঞ্চায়েতকে বকেয়া কর না দিয়েই এদের ব্যবসা চলছিল। সরকারের চোখের সামনে এতগুলো বেআইনি কাজ এত বছর ধরে চলতে পারল কী করে, পুলিশ-প্রশাসন কেন কোনও পদক্ষেপ নিল না, আইনভঙ্গকারীরা কীভাবে অপরাধ করেও ছাড়া পেয়ে গেল– এ সব প্রশ্ন এ রকম প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কিছুদিন কাগজপত্রে আসে, তারপর আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, যতদিন না অন্য কোনও জতুগৃহে, ম্যানহোলের বিষাক্ত গ্যাসে, উঁচু ভারা থেকে পড়ে গরিবগুরবো শ্রমিকরা মরে গিয়ে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে।
যে নাজিরাবাদে এই ঘটনা ঘটল, সেই অঞ্চল বাস্তুতন্ত্রগত ভাবে সংবেদনশীল পূর্ব কলকাতা জলাভূমির অংশ, যা গোটা শহরের বর্জ্য এবং নিকাশির সাথে যুক্ত। অথচ এই ঘটনা নতুন করে জানান দিল, এমন আরও অসংখ্য বেআইনি নির্মাণ সেখানে চলছে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। ‘ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’-র তথ্য বলছে, ২০০৭-এর জুলাই থেকে ২০২১-এর ফেব্রুয়ারির মধ্যে এরকম ৩৫৮টি বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ বিভিন্ন থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে এর নথিভুক্ত সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৫০০। যে বিজেপি আজ ২০২৬-এর ভোটের তাড়নায় বিরাট শ্রমিকদরদি সাজছে, সেই বিজেপি শাসিত ডবল ইঞ্জিন রাজ্য গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ সহ নানা রাজ্যে সাম্প্রতিক অসংখ্য দুর্ঘটনায় শ্রমিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেয়, ৭৮ বছরের স্বাধীন দেশে শ্রমিকের প্রাণ বড় সস্তা জিনিস। সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর অন্তত ১১০০ থেকে ১৩০০ শ্রমিক এ দেশে মারা যান শুধু কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায়। সাম্প্রতিক শ্রম-আইনে নানা ভাল ভাল কথার আড়ালে ভযঙ্কর ভাবে খর্ব করা হয়েছে শ্রমিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। শ্রমিক সুরক্ষার কোনও বালাই না রেখেই যাতে কোম্পানিগুলো মুনাফার পাহাড়ে উঠতে পারে এবং শ্রমিকরা প্রতিবাদও না করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা আরও পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যেই আনা হয়েছে নতুন শ্রম কোড।
কাজেই ক্ষমতায় যেই আসুক, বেলাগাম শ্রমিক শোষণ এবং সর্বোচ্চ মুনাফার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যবস্থার সেবাদাস সব সরকারই। ভোটের আগে জনসেবার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং ক্ষমতায় জিতে এসে পরের ভোট পর্যন্ত মানুষের ওপর শোষণ অত্যাচার চালিয়ে পুঁজিকে খুশি করা– এটাই আজকের ‘গণতন্ত্রের’ সবচেয়ে বড় বাস্তব। আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে মহান মার্ক্সবাদী দার্শনিক ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ‘ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা’ এই বইতে লিখেছিলেন– ‘একজন যখন আরেক জনকে শারীরিকভাবে আহত করে এবং তার মৃত্যু হয়, আমরা সেটাকে বলি নরহত্যা। … অথচ একটা সমাজ যখন শত শত সর্বহারাকে এমন অবস্থায় এনে দাঁড় করায়, যখন সমাজ হাজার হাজার মানুষকে জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো থেকে বঞ্চিত করে, … মানুষগুলো নিশ্চিতভাবেই মারা যাবে জেনেও সেই অবস্থাকেই দিনের পর দিন চলতে দেয়, তখন সেটাও হত্যা, একজনের আরেকজনকে খুন করার মতোই’। নাজিরাবাদে শ্রমিকের বীভৎস মৃত্যু এবং সরকার-রাষ্ট্রের চূড়ান্ত অসংবেদনশীলতা প্রমাণ করল, শ্রমিকের ঘাম-রক্তে গড়ে ওঠা এই মুনাফাসর্বস্ব সমাজই শ্রমিকের হন্তারক। একে ভাঙতে না পারলে শ্রমিকের মুক্তি নেই।