
নরেন্দ্র মোদির পরম মিত্র (!) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাহেব ভারত থেকে আমেরিকায় রপ্তানি হওয়া পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন।২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং বাকি ২৫ শতাংশ রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য জরিমানা। এর আগে ট্রাম্প সাহেব চিনের ওপর প্রথমে ১৪৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েও চিনের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে আবার ৩০ শতাংশে ফিরে গেছেন। এ দিকে যে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করার শাস্তি হিসাবে ভারতের ওপর জরিমানা চেপেছে, সেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আলাস্কায় বৈঠকে বসেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেই বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান নিয়ে আসলে কী হল, তা বিশ্ববাসীর বোধগম্য হয়নি। কিন্তু রাশিয়া যে যুদ্ধ থামাতে এখনই আগ্রহী নয়, সেটা অন্তত পরিষ্কার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মাথা ঘামাচ্ছে, আগামী দিনে ভারতের সাথে মার্কিন শুল্ক চুক্তি কী দাঁড়াবে, কী করে কোন ফাঁক গলে ভারত এই শুল্কের ফাঁস থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারে এই সব নিয়ে। তাঁদের আশঙ্কা– পোশাক, ওষুধ, দামী পাথর, গয়না, রাসায়নিক, শোধিত পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভারতের রপ্তানি কমবে। এতে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার কমবে কি কমবে না, তাই নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রচুর মাথা ঘামাচ্ছেন। যদিও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলে এই আর্থিক বৃদ্ধির হার (জিডিপি বৃদ্ধি) তাদের জীবনের সমস্যা সমাধানে বিশেষ কোনও কাজে আসে না।
রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল আমদানি যে ভারত বন্ধ করবে না, তা ইতিমধ্যেই সরকারি ভাষ্যে উঠে এসেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীরা মুখে যতই বলুন না কেন, দেশের স্বার্থে যেখানে সস্তায় তেল পাওয়া যাবে ভারত কিনবে– বাস্তবে ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়ামের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলি জুলাই মাস পর্যন্ত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি প্রায় বন্ধ রেখেছিল। এখনও তা কমই রেখেছে। কিন্তু রিলায়েন্স, এসার গোষ্ঠীর নায়ারা-র মতো বেসরকারি কোম্পানিগুলি রাশিয়ার তেল আমদানি বাড়িয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি তার জায়গায় আমেরিকা থেকে চড়া দামের তেল বেশি কিনছে (২০২৫-এর প্রথম চার মাসে ভারতে মার্কিন তেল আমদানি ২৭০ শতাংশ বেড়েছে)। রহস্যটা হল, রিলায়েন্স, এসার কোম্পানি সস্তায় রাশিয়ার তেল কিনে তার অধিকাংশটাই নিজেদের শোধনাগারে শোধনের পর সেই তেল ও নানা পেট্রোপণ্য বেচে ইউরোপে এবং আমেরিকায়। স্বাভাবিক ভাবেই এগুলি অন্য জায়গার থেকে সস্তা। ফলে ইউরোপ এবং আমেরিকা এই পেট্রোপণ্য কিনবেই। এটা বুঝেই ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি ইউরোপ এবং আমেরিকাকে উদ্দেশ করে বলেছেন, তোমরা এগুলো না কিনতে চাইলে কিনো না, আমরা অন্য দেশে বেচব। সরকারের কাছে ‘দেশের স্বার্থ’ আসলে রিলায়েন্সদের স্বার্থ। রাশিয়ান তেল সস্তা হলেও তা সস্তায় দেশের বাজারে বিক্রি হয় না। তাই তেল কোম্পানির মুনাফা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও দেশে তেলের দাম কমে না। বিজেপি সরকারের নেতারা এখন প্রবল মার্কিন চাপেও মাথা নত না করার কথা বলে যে বীরত্বপূর্ণ গলাবাজি চালাচ্ছেন, তা আসলে রিলায়েন্সদের মতো ধনকুবেরদের স্বার্থ রক্ষার তাগিদেই।
আসলে ভারতীয় ধনকুবেররা এবং তাদের সেবাদাস সরকারি কর্তারা ভালই জানেন, আমেরিকা কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কেউই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে খুব বেশি উৎসাহী নয়। রাশিয়াকে দেখিয়ে ভারত কিংবা চিনের উদ্দেশে এই শুল্ক হুমকি আসলে বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক দরকষাকষি মাত্র। ইউরোপ এবং আমেরিকা নিজেরা রাশিয়া থেকে কত পণ্য আমদানি করে, এই বিতর্কের সময় সে তথ্যও উঠে এসেছে। একা আমেরিকাই ইউরেনিয়াম, প্যালাডিয়ামের মতো ধাতু, ইলেকট্রনিক্স শিল্পে অপরিহার্য রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট, সার, রাসায়নিক ইত্যাদি মিলিয়ে রাশিয়া থেকে ৫.২ বিলিয়ন ডলারের জিনিস আমদানি করে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন গত বছর ১৬.৫ মিলিয়ন টন প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করেছে রাশিয়া থেকে। এ বছরেও তা কমেনি। ফলে আমেরিকা এবং ইউরোপের এই সব শাসকরা ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েরাশিয়ার বিরুদ্ধে যাই বলুক, সেটা যে ফাঁকা আওয়াজ তা বিশ্বের মানুষ বোঝে। ফলে ভারতীয় কর্তারাও নিশ্চিন্ত।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পরেই আওয়াজ তুলেছিলেন বিশ্বে আমেরিকাই অন্যায়ের শিকার। এর প্রতিকার চেয়ে তিনি সমস্ত দেশের সাথে পারস্পরিক শুল্ক পরিবর্তন শুরু করেন। তাঁর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের স্লোগানই ছিল ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। অন্যায় বাণিজ্য থেকে আমেরিকাকে বাঁচাতে অন্য দেশের পণ্যের ওপর শুল্কের প্রাচীর খাড়া করে মার্কিন পণ্যকে অবাধে সব দেশের বাজারে ঢুকতে দিতে হবে। তাতে মার্কিন বাজারে বিদেশি পণ্যের চাহিদা কমবে। মার্কিন পণ্যের উৎপাদন বাড়বে। কলকারখানা খুলবে, কৃষিতে জোয়ার আসবে। বেকাররা কাজ পাবে। গত ফেব্রুয়ারিতে বিপুল শুল্কের বোঝা চাপে কানাডা, মেক্সিকো, চিনের ওপর। ২ এপ্রিল বিশ্বের সমস্ত বাণিজ্যিক অন্যায় থেকে আমেরিকার মুক্তির দিন হিসাবে ‘লিবারেশন ডে’ পালিত হয়। সে দিন থেকেই সমস্ত বর্ধিত শুল্ক চালু হওয়ার কথা থাকলেও তারপর থেকে দুই দফায় ৯০ দিন করে শুল্ক চুক্তি করার সময়কাল বর্ধিত হয়েছে। সমাধানের রাস্তা বেরোয়নি। ৭ আগস্ট ট্রাম্প ঘোষিত প্রথম দফার সময়কালে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সাথে ইন্দোনেশিয়া এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়া কোনও দেশের খুব উল্লেখযোগ্য কোনও বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। পরে আরও ৯০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষিত হয়েছে।
তা হলে? কোথায় গেল বিশ্বায়ন? কোথায় গেল উদার অর্থনীতি? কোথায় চলে গেল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ডব্লুটিও-র ‘বাণিজ্য সাম্য’, সমস্ত সদস্যকে ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ হিসাবে দেখার নীতি? এই বিশ্বায়নের প্রবক্তা ছিল মার্কিন পুঁজির কর্ণধাররাই! অন্য দেশের বাজারে মার্কিন পণ্যকে অবাধে ঢেলে দিতে ডব্লুটিও-কে মার্কিন পুঁজির কর্তারাই তো সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন! ১৯৯১-‘৯২ থেকে মার্কিন নেতৃত্বে বিশ্ব পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের নেতারা এনেছিলেন বিশ্বায়ন, উদারিকরণের ছক। ১৯৪৮-এর ‘গ্যাট’-কে পরিবর্তন করে ১৯৯৪-তে নতুন আঙ্গিকে তারা এনেছিল গ্যাট চুক্তি। সমাজতান্ত্রিক শিবির ভেঙে যাওয়ায় তখন আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ার একচেটিয়া মালিকরা খুব উল্লসিত। তাদের আশা ছিল তথাকথিত ‘অবাধ বাণিজ্য’ হলে তারা পুঁজিবাদী বাজারের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটকে কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারবে। যে কারণে ১৯৯৪- তে মরক্কোতে নতুন গ্যাট চুক্তি এবং ১৯৯৫-এর জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত ডব্লুটিও দেশে দেশে ‘অবাধ’ বাণিজ্যের লক্ষ্যে নানা নিয়মকানুন, চুক্তি আনে। এর মধ্য দিয়ে আমেরিকা ইউরোপের শক্তিশালী পুঁজির মালিকরা অবাধ বাণিজ্যের নামে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোর বাজার অবাধে দখল করার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু মার্ক্সবাদী বিজ্ঞান দেখিয়েছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সর্বদাই তার সংকটের কালো ছায়া অনুসরণ করে চলে। এই ব্যবস্থার সংকট কখনও মেটার নয়। উপরন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের নিজেদের মধ্যে গলাকাটা প্রতিযোগিতা ‘অবাধ বাণিজ্য’-কে এক অলীক স্বপ্নে পরিণত করতে বাধ্য। এ দিকে রাশিয়া এবং চিন সমাজতন্ত্র ত্যাগ করে সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র অর্জনের পর সাম্রাজ্যবাদী বাজারের বৃহৎ প্রতিযোগী বেড়েছে। একই সাথে গ্যাট চুক্তিতে ‘উন্নয়নশীল’ হিসাবে বর্ণিত ভারতের মতো দেশ পুঁজিতে ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে সাম্রাজ্যবাদী বাজারের অংশীদারিত্বে যথেষ্ট থাবা বসাচ্ছে। বাজার সংকট থেকে বাঁচার আশায়বিশ্বায়নের ফরমুলা মেনে আর্থিক সংস্কারের নামে সমস্ত দেশেই জনগণের সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ কমিয়ে সরকারি তহবিল ঢালা হয়েছে বৃহৎ মালিকদের সেবায়। কৃষি থেকে ডেয়ারি, বৃহৎ শিল্প, ভারী শিল্প, খনি, শক্তি উৎপাদন সব ক্ষেত্রেই দেশি এবং বিদেশি পুঁজির গাঁটছড়ায় মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন উৎপাদনের ক্ষেত্রগুলি দখল করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, থেকে শুরু করে সমস্ত পরিষেবা ক্ষেত্রেই একচেটিয়া মালিকদের মুনাফার ব্যবস্থা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে বাজার সংকট বেড়েছে। খোলা বাজার এবং সরকারি ভর্তুকি বিলোপের পক্ষে বিশ্বজুড়ে সওয়াল করলেও মার্কিন এবং ইউরোপীয় শাসকরা কৃষি, ডেয়ারি ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রচুর ভর্তুকি দিয়ে তাদের দেশের বৃহৎ পুঁজিকে তা দখল করতে সাহায্য করছে। যদিও, ভারতের মতো দেশে চেষ্টা করেও সরকার কৃষিক্ষেত্রকে পুরোপুরি বৃহৎ একচেটিয়া পুঁজিমালিকদের হাতে তুলে দিতে পারেনি। কিন্তু এই চেষ্টা তারা সর্বদাই চালিয়ে যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন, পুঁজিমালিকদের সেবায় নিয়োজিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে বিশ্বায়িত খোলা বাজারের বদলে নিজেদের বাজারে দেওয়াল তুলতে শুল্ক-হুমকি দিচ্ছেন কেন? এটা আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের শক্তি, নাকি তার দুর্বলতার লক্ষণ! এ বিষয়ে খোদ মার্কিন মুলুকের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভ হঙ্কে বলছেন, এই শুল্ক নীতিটা পুরোপুরি বালির ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যে কোনও সময় তলা থেকে তা সরে যাবে (এনডি টিভি, ৯.০৮.২৫)। বাস্তবেই, শুল্ক নিয়ে ট্রাম্প সাহেবের সাম্প্রতিক হুমকি-ঝড় একদিকে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্যদিকে মার্কিন আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে যুক্ত।
মার্কিন আর্থিক পরিস্থিতি কেমন? সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ‘বিগ বিউটিফুল বিলে’ খাদ্য ও পুষ্টি সুরক্ষার প্রকল্প ‘সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিসটেন্স প্রোগ্রাম’-এর বরাদ্দ আগামী ২৩০ বিলিয়ন ডলার ছাঁটাই করেছেন। কাজের বয়স বাড়িয়ে ৬৪ বছরের আগে পেনশন নিষিদ্ধ হয়েছে। মাতৃত্ব-পিতৃত্বের ছুটি, কর্মচারীদের সুযোগ সুবিধায় কোপ পড়েছে। সে দেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ১৫.৬ শতাংশ সরকারি খাদ্য-সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। ফিলাডেলফিয়ার মতো কিছু প্রদেশে সরকারি খাদ্য-লঙ্গরে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা এক মাসে বেড়েছে ১২০ শতাংশ। চার বছরে আমেরিকায় লঙ্গরে বা ফুড কুপনে নির্ভর করে বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে চার গুণ (আরটি.কম, ৭ জুলাই ২০২৫)। বেকারত্বের হার সরকারি হিসাবে ৪.২ শতাংশ (সংখ্যায় ৭০ লক্ষ ২০ হাজার)। আরও ৬০ লক্ষ কর্মহীন মানুষ চাকরি চাইলেও তা তালিকায় নেই। ১৭ লক্ষের বেশি মানুষ গত ২৭ মাস ধরে বেকার। ২৬ লক্ষ কর্মসংস্থান কমেছে। কৃষiরাঙ্গ এবং হিস্পানিকদের মধ্যে বেকারত্বের হার আরও অনেক বেশি (ট্রেডিং ইকনমিক্স, ১.০৮.২৫)। অর্থনীতির গতি ধীর হচ্ছে, কাজ সৃষ্টি হচ্ছে কম, তাতে সঠিক মজুরিও মিলছে না।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকারের সামনে একটাই রাস্তা খোলা– স্বদেশি অস্মিতাতে হাওয়া দিয়ে মানুষকে আচ্ছে দিনের খোয়াব দেখানো। এই জন্যই ট্রাম্প সাহেব মার্কিন জনগণের সমস্ত সমস্যার জন্য অন্য দেশকে দায়ী করছেন। মার্কিন পুঁজি এখন বিশ্বায়ন জারি রাখছে বাইরের জন্য, আর নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করতে চাইছে। সে দেশে ইতিমধ্যে চিনা, ভারতীয় ইউরোপীয়, জাপানি যে সব পণ্য ছেয়ে গেছে সেগুলিকে হঠানো তার লক্ষ্য। ভুলে গেলে চলবে না, এই ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান মার্কিন শাসকরা দিতে শুরু করেছে সেই ১৯৮০-র দশকে রোনাল্ড রেগনের সময় থেকে। সে দিনও মার্কিন জনগণের সামনে অভিবাসী এবং অন্য দেশের পুঁজিকে শত্রু বানানো শাসকদের দরকার ছিল। বিশ্বায়নের স্লোগানের সময়েও সব প্রেসিডেন্ট এটা জারি রেখেছেন। বাইডেন আমলেই শুল্ক প্রাচীর তোলার পরিকল্পনা শুরু। এখন ট্রাম্পের কালে সেটা একেবারে প্রতি মুহূর্তের দরকারে পরিণত হয়েছে। এ দিকে চিন, রাশিয়া, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশের গোষ্ঠী ব্রিকস, রাশিয়া এবং চিনের মদতে যেভাবে ডলারের বিকল্প মুদ্রা বিশ্ব বাণিজ্যে আনার চেষ্টা করছে তা মার্কিন শাসকদের কাছে মাথ্যব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপেও মার্কিন পুঁজি শক্ত চ্যালেঞ্জের সামনে পড়ছে। ইরান-ইজরায়েল-মার্কিন সংঘর্ষে মার্কিন আধিপত্যের ফানুসটা অনেকটাই টাল খেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে আভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অন্যদিকে বিশ্ব জুড়ে এই সমস্ত চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতে দরকষাকষির শক্তি অর্জন করতে মার্কিন শাসকরা শুল্ক হুমকিকে হাতিয়ার করেছে। এই শুল্ক যুদ্ধ আসলে সাম্রাজ্যবাদের হয়ে একটা যুদ্ধই। কোনও দিন সেটা অগ্নিবর্ষী কামানের সাহায্যে হতে পারে, কোনও দিন শুল্ক, পাল্টা শুল্ক, হুমকি ইত্যাদির মাধ্যমে চলতে থাকবে।
বিশ্ব পুঁজিবাদের ভয়াবহ সংকটের রূপ আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক হিস্টিরিয়াতে ফুটে বেরোচ্ছে। এ তার ব্যক্তিগত হিস্টিরিয়া নয় এটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চরম সংকট ও তার বাঁচার জন্য আর্তনাদ থেকে সৃষ্ট হিস্টিরিয়া। এর থেকে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের মুক্তি নেই।