
সম্প্রতি জি-২০ রাষ্ট্রগোষ্ঠী তাদের রিপোর্টে বিশ্বজোড়া আর্থিক বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০২০ থেকে ‘২৪ -এর মধ্যে নতুন সৃষ্ট সম্পদের ৪১ শতাংশই বিশ্বের ধনীতম এক শতাংশ মানুষের ভাণ্ডারে জমা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী আর্থিক বৈষম্যের সাথে পাল্লা দিয়ে, ২০২০ থেকে ‘২৩ সালে মধ্যে ভারতের ধনীতম ১ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছে ৬২ শতাংশ।
২০২০ থেকে ‘২৩ কোভিড মহামারীতে যখন দেশের অসংখ্য মানুষ কাজ হারিয়েছে, একের পর এক শ্রমিক মহল্লায় কান্নার রোল উঠেছে, হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক সহায় সম্বলহীন অবস্থায় মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে নিজ ভূমে ফিরতে বাধ্য হয়েছে, দেশের সাধারণ জনগণের যখন কাজ হারিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা তখন দেশের ধনীতম এক শতাংশ মানুষের রেকর্ড হারে সম্পদ বৃদ্ধি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রকৃত ছবিটাই তুলে ধরে।
এক দিকে কোটি কোটি অসহায়, নিরন্ন, ক্ষুধার্ত মানুষ যারা উন্নত শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত, নূ্যনতম গ্রাসাচ্ছাদনের জোগাড় করতে যারা উদয়-অস্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে চলেছে, যাদের পরিশ্রম, ঘাম, রক্তে সম্পদ ও সভ্যতার নিরন্তর বিকাশ হয়ে চলেছে, অথচ এর কোনও কিছুতেই তাদের অধিকার নেই। আর একদিকে মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণি যারা গরিব মানুষের ঘাম, রক্তে গড়ে ওঠা সম্পদকে কুক্ষিগত করে ক্রমশ পুঁজির পাহাড় তৈরি করে চলেছে। আসমুদ্রহিমাচল বৈষম্যের এই একই চিত্র।
ভারত নাকি এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি, তার বহর নাকি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। শেষ কয়েক বছরে দেশের গরিব মানুষের সংখ্যা নাকি কমেছে কয়েক কোটি, বেকারত্বের হারও নাকি কমেছে উল্লেখযোগ্য রকম। দেশের কর্তাব্যক্তিরা এই নিয়ে প্রবল উচ্ছ্বসিত। অথচ ২০২৫ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২৩টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০২তম। অক্সফ্যাম-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২১ সালে দেশের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষ দেশের সম্পদের ৪০.৫ শতাংশের মালিক, আর নিচের ৫০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশের মালিক। এনসিআরবি-র রিপোর্ট বলছে, ২০২৩ সালে দেশে কৃষিক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত মোট ১০,৭৮৬ জন আত্মহত্যা করেছেন, যার মধ্যে ৪,৬৯০ জন কৃষক এবং ৬,০৯৬ জন কৃষিশ্রমিক। ইউনিসেফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে– বিশ্বব্যাপী চরম অপুষ্টিতে আক্রান্ত ১৮১ মিলিয়ন শিশুর ৬৫ শতাংশই রয়েছে ভারতে। ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন-এর ২০২০-২১ সালের সমীক্ষা থেকে জানা যায়, এই সময়সীমার মধ্যে নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি মধ্যশিক্ষা পর্যায়ে স্কুলছুটের হার ১৪.৬ শতাংশ। দারিদ্রই যে স্কুলছুটের প্রধান কারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই এক দিকে যেমন দেশের অর্থনীতি আকারে আয়তনে বেড়েছে, তার সাথে সঙ্গত রেখে বৈষম্যও বেড়েছে। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে যৎসামান্য। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পর শতাংশের হিসেবে গরিবি, বেকারত্ব, শিশুমৃত্যুর হারে নামমাত্র উন্নতি কি উন্নয়নের যথার্থ মাপকাঠি?
গরিবি, বেকারত্বের পরিসংখ্যানের সাথে আবার বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। পাড়ার হরিহর কাকার মুদির দোকান আগের মতো আর চলে না, মিনি পিসির কাপড়ের দোকানটা বন্ধ হয়েছে, অর্থের অভাবে রহিম চাচার হার্টের চিকিৎসা মাঝ পথে বন্ধ, ঋণগ্রস্ত ফতেমা বিবি পাওনাদারের চাপে কয়েক দিন আগে আত্মহত্যা করেছে, কারখানা বন্ধ হওয়ায় সুশোভনের সংসারে টানাটানি, ছেলের উচ্চশিক্ষা মাঝ পথেই বন্ধ হওয়ার উপক্রম, এমন ঘটনার সাক্ষী কম-বেশি আমরা সকলেই। দেশের অর্থনীতি ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হওয়ার কোনও সুফল কি হরিহর কাকা, মিনি পিসি, রহিম চাচা, ফতেমা বিবি, সুশোভন পেলেন? পেলেন না। এটাই ভারত, এটাই পুঁজিবাদী উন্নয়নের মডেল!
শুধুমাত্র ভারতবর্ষ নয়, দেশে দেশে পুঁজিবাদী উন্নয়নের মডেল আসলে এমনই। পুঁজিবাদ তার নিজের নিয়মেই বৈষম্য তৈরি করে। তাই বিশ্বের তাবড় অর্থনীতিবিদরা জি-২০ গোষ্ঠীর রিপোর্টে যতই বলুন যে চরম এই বৈষম্য অবশ্যম্ভাবী হতে পারে না। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে নাকি অবস্থা বদলানো সম্ভব! বাস্তবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কায়েম রেখে আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ শুধুই কথার কথা, ফাঁকা আওয়াজ। ভাবখানা এমন যেন সরকার ও প্রশাসন সদিচ্ছা দেখালেই বৈষম্য দূর করা সম্ভব, অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থাটা পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিমালিকানা এবং শোষণ-বঞ্চনা যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি, বৈষম্য সেখানে চূড়ান্ত পরিণতি। বৈষম্য এখানে নিয়তি না, নিয়ম। এ কথা ঐতিহাসিক ও বিজ্ঞানসম্মত ভাবে প্রমাণিত যে একমাত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে তবেই সব ধরনের বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে।