Breaking News

পুঁজিপতিদের ঋণ মকুব করতে ব্যাঙ্কে সুদের হার কমানো হচ্ছে

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি মোট যত ঋণ দিয়েছে, তার মধ্যে অনুৎপাদক সম্পদ বা এনপিএ-তে পরিণত হয়েছে ৬,১৫,৬৪৭ কোটি টাকা। এই বিপুল টাকা ব্যাঙ্ক তাদের হিসাবের খাতা থেকে মুছে দিয়েছে বলে সংসদে জানাল কেন্দ্র। গত ৮ ডিসেম্বর লোকসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধরি জানান। তিনি বলেন, এর জন্য ব্যাঙ্কের আর্থিক স্বার্থে কোনও প্রভাব পড়বে না। যদিও তাঁর দাবি, মুছে ফেলার অর্থ এই নয় যে, এই টাকা আদায়ের চেষ্টা হবে না। টাকা পুনরুদ্ধারের জন্য দেউলিয়া আইন ও বকেয়া পুনরুদ্ধার ট্রাইবুনাল মামলা করা সহ সমস্ত পন্থাই অবলম্বন করবে ব্যাঙ্কগুলি। সেই সঙ্গে তিনি বলেন, গত সাড়ে চার বছরে দেশে ৫,৮৩,২৯১টি ব্যাঙ্ক প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে এবং এর সঙ্গে জড়িত ৩৫৮৮.২২ কোটি টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

মন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে কিছু জরুরি প্রশ্ন উঠছে। হিসাবের খাতা থেকে বিশাল পরিমাণ ঋণ মুছে দেওয়ার পরও ব্যাঙ্কের আর্থিক স্বার্থে যদি কোনও প্রভাব না পড়ে তবে প্রভাবটা পড়ছে কোথায়? কোনও ঋণগ্রহীতা যদি মোটা টাকার ঋণ নিয়ে তা শোধ না করেন বা তাঁকে শোধ করতে না হয় তবে তাঁর যে বিশাল লাভ বা সুবিধা হয় তা অন্য কারও় ক্ষতি বা অসুবিধা ছাড়া হতে পারে কি? লাভ-ক্ষতির তত্ত্ব তো এ কথাই বলে। কোথাও গ্রহণ হলে অন্য কোথাও বর্জন তো প্রকৃতিরই নিয়ম। দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশের মানুষের এক শ্রেণির অর্থের প্রাচুর্য যত বাড়ছে অপর শ্রেণি ততই নিঃস্বে পরিণত হচ্ছে। ফলে কমছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। এটাই নিয়ম। এই নিয়মকে রাজনৈতিক চালাকি বা কথার মারপ্যাঁচে হয়ত অস্বীকার করা যায়, কিন্তু নিয়মের বা নিয়ম উদ্ভূত ফলের কোনও পরিবর্তন করা যায় না।

ঋণ আদায় না হলেও যদি ব্যাঙ্কের ক্ষতি না হয় তা হলে বুঝতে হবে, ব্যাঙ্ক এই ঋণ মুছে দিয়ে যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তা তাকে সামাল দিতে হয়েছে গ্রাহকদের এবং তার কর্মচারীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে এবং সেই সঙ্গে তার সরকারি শেয়ার বিক্রি করে ও ঋণপত্র ছেড়ে, যা তাকে ধীরে ধীরে বেসরকারিকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যাঙ্কের আপাত ক্ষতি যদি না হয় তবে এগুলোই হল রাস্তা। বাস্তবে ব্যাঙ্ক সেই রাস্তায় হাঁটছে এবং সেখানে রয়েছে কেন্দ্রের বর্তমান বিজেপি সরকারের পূর্ণ অনুমোদন।

এ ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কের স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে গ্রাহক তথা দেশবাসীর স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে। এ সবও দেশের আর্থিক বৈষম্য ক্রমাগত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ নিয়ে কেন্দ্রের বা তার অর্থ প্রতিমন্ত্রীর কোনও উদ্বেগ নেই। ব্যাঙ্কের স্বাস্থ্যের কোনও অবনতি হচ্ছে না বলে তিনি নিশ্চিন্ত। বস্তুত কোথায় অবনতি হচ্ছে তা তিনি বিলক্ষণ জানেন। কিন্তু তা নিয়ে তিনি বিচলিত নন, কারণ এতে আমজনতার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলেও পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে। বলা বাহুল্য, এই ধনকুবেররাই বিভিন্ন নির্বাচনী ফান্ডে শাসক রাজনৈতিক দলগুলিকে মোটা টাকার জোগানদার।

এ সব কারণেই ব্যাঙ্কে জমা টাকার উপর সুদের হার কমছে। এক সময় সুদের হার ছিল ১৩-১৪ শতাংশ। আজ তা নেমে এসেছে তার অর্ধেক বা তারও কমে। দিনে দিনে গ্রাহক পরিষেবার মান অবনত হলেও পরিষেবা শুল্ক ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে পরিষেবার নতুন নতুন ক্ষেত্রও। এখানে ন্যূনতম ব্যালেন্সের বিষয়টি আনা হয়েছে এবং তা না রাখতে পারলে জরিমানা ধার্য করা হচ্ছে। গরিব সাধারণ গ্রাহকদের থেকে এই খাতে ভাল পরিমাণ আয় করছে ব্যাঙ্কগুলি। বেশি টাকা ব্যাঙ্কে জমা করতে গেলে তা যে হেতু তার ক্যাশিয়ারকে গুনে নিতে হয় তাই সেখানেও আদায় হচ্ছে পরিষেবা শুল্ক। তারপর মেসেজ পাঠাক-না পাঠাক, সেখানে গুনতে হবে পরিষেবা শুল্ক। চেক নিলে, এটিএম থেকে বেশি বার টাকা তুললে বা এ ধরনের বহু ক্ষেত্রে পরিষেবা শুল্ক আরোপিত হয়েছে। শুল্কের হারও বছরে বছরে বাড়ছে। এর পর আছে কর্মী সংকোচন।

এক সময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কসমূহের কর্মী সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ লক্ষ, তা আজ কমতে কমতে ২০২৪ সালের মার্চের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেই সংখ্যা ৭ লক্ষ ৬৪ হাজার ৬৭৯-তে নেমে এসেছে। বলা বাহুল্য, ব্যাঙ্ক ব্যবসার পরিধি ক্রমাগত বেড়ে চলার পরও চলেছে কর্মী সংকোচন। পরিস্থিতি সামাল দিতে এর সঙ্গে ক্রমাগত পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত অস্থায়ী কর্মী তথা কন্ট্রাক্ট বা ক্যাজুয়াল কর্মীর সংখ্যা। এ ক্ষেত্রে স্থায়ী কাজে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করা যাবে না বলে সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশ, তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। স্থায়ী কাজে নিযুক্ত হচ্ছে অস্থায়ী কর্মী। মানা হচ্ছে না, সম কাজে সম বেতনের নীতিও। অধিক থেকে অধিকতর মুনাফার লক্ষে্য শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের কম পারিশ্রমিক দিয়ে চাপ দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে ব্যাঙ্কগুলোর মধ্যে। ব্যাঙ্কগুলো সরাসরি এদের নিয়োগ করে না, করে ঠিকাদার বা ভেন্ডারের মাধ্যমে। মূল নিয়োগকর্তা থাকে দূরে। মূল নিয়োগকর্তার প্রকৃত নজরদারি সর্বত্র না থাকার বা না রাখার ফলে ভেন্ডাররা তাদের খেয়ালখুশি মতো চলে। হাজার অনিয়মের উপর ভর করে তারাও তাদের লাভের অঙ্ক বাড়াতে চায়। কর্মীরা তাদের প্রাপ্য পায় না সব সময়। প্রতিবাদ করলেই হাজার বাহানায় নেমে আসে ছাঁটাইয়ের খড়গ।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির এই লাগাতার বকেয়া ঋণ মুছে দেওয়া খুবই বিপজ্জনক। কাদের বকেয়া ঋণ মুছে দেওয়া হচ্ছে? এর সিংহভাগ এ দেশের ধনকুবের গোষ্ঠী। এই টাকা আসলে সাধারণ মানুষের, যাঁদের কষ্টার্জিত অর্থে তিল তিল করে গড়ে ওঠে ব্যাঙ্কের আমানত। আর সেই আমানত থেকে যাবতীয় ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা জন্মে ব্যাঙ্কগুলির। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে জমা টাকার পরিমাণ প্রায় ২৩১.৯০ লক্ষ কোটি টাকা যার ৮০ শতাংশেরও বেশি সাধারণ মানুষের। সেই আমানতের এই বেহাল দশা। এ দিকে যিনি ঋণ শোধ করলেন না, যিনি বা যাঁরা সঠিক বিবেচনা না করে তাঁদের ঋণ দিলেন, তাঁর বা তাঁদের শাস্তির কী ব্যবস্থা রয়েছে? এগুলোকে ফৌজদারি ব্যবস্থার অন্তর্গত করে সেই মতো তাদের শাস্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত। তা কিন্তু নেই। এ না থাকার ফলে ঋণ খলাপির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কঠোর না হয়ে, ঋণগ্রহীতা এবং অথবা ঋণদাতাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিধি প্রয়োগ না করে হিসাবের খাতা থেকে বকেয়ার যাবতীয় তথ্য উধাও করে দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাঙ্কের স্বার্থের বিনিময়ে কাদের স্বার্থ দেখছে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ তথা কেন্দ্রীয় সরকার?

এ ভাবে ব্যাঙ্কের অনুৎপাদক সম্পদ (এনপিএ) কমিয়ে হিসাবের খাতাকে আপাত পরিষ্কার দেখানোর পিছনে কোন হিসাব কাজ করছে? অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন যে মুছে দেওয়া অর্থও আদায়ের চেষ্টা চলে। চলে, কিন্তু সাধারণ মানুষ না জানলেও ব্যাঙ্ককর্মীরা জানেন যে তার পরিমাণ নামমাত্র, বড় অংশের টাকা অনাদায়ীই থেকে যায়। মুছে দেওয়া কেন বা আদায়ের ক্ষেত্রে ঢিলেমি কেন? আসলে মুছে দিয়ে তারা এক শ্রেণির ঋণগ্রাহক ধনকুবেরের আরও বেশি আস্থাভাজন হতে চায়। কেন চায় তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আবার আর একটা উদ্দেশ্য হল, ব্যাঙ্কের খাতা পরিষ্কার রাখলে সেই ব্যাঙ্ক কিনতে আগ্রহী হবে ক্রেতারা। ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের লক্ষ্যে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করতে এ হেন পদক্ষেপ। দেখা যাবে যারা ঋণ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ করছে না, তারাই এ সব ব্যাঙ্কের সরকারি শেয়ার কিনে ব্যাঙ্কের মালিক হবে। ব্যাঙ্কে গচ্ছিত সাধারণ মানুষের বিপুল অর্থ-লগ্নির নিয়ন্ত্রক হবে এই পুঁজিপতিরাই। সে কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির এ জাতীয় পদক্ষেপে ধনকুবেরদের স্বার্থরক্ষাকারী সরকারের পূর্ণ সম্মতি।

বেসরকারি ব্যাঙ্কের ইতিহাস দেখায় ব্যাঙ্ক যখন-তখন তাদের ব্যবসা গুটিয়ে বহু মানুষকে বিপদে ফেলেছে। এ নিয়ে বেশ কিছু গল্প-উপন্যাস এবং তা নিয়ে সিনেমাও হয়েছে। ১৯১৩ থেকে ১৯৬৯ সালে ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্তকরণের আগে পর্যন্ত এ দেশের ২ হাজার ১৩২টি বেসরকারি ব্যাঙ্কে লালবাতি জ্বলেছিল, যার পরিণামে গ্রাহকরা যেমন সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন, তেমনই কর্মচারীরাও তাঁদের কাজ হারিয়েছিলেন। বর্তমানের বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলিতেও দেখা যাচ্ছে কর্মী ছাঁটাই চলছে অবাধে। আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের মতো একটি লব্ধপ্রতিষ্ঠ বেসরকারি ব্যাঙ্ককে দেখা যাচ্ছে, অন্যায় এবং বেআইনিভাবে দেশ জুড়ে তাদের বিশাল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করেছে। সে কারণেই ব্যাঙ্কের মধ্যে কোনও ইউনিয়ন তারা রাখতে চায় না। ব্যাঙ্ক হল দেশের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড। সেখানে সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষকে শেষ পর্যন্ত আরও গভীর সমস্যায় ফেলবে। এর প্রতিবাদে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সমস্ত স্তরের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের।