
শীত জাঁকিয়ে নেমেছে। এই সময় এসআইআরের শুনানি শুরু হয়েছে এই বঙ্গে। শুনানিতে ছুটছেন কেউ চাষ ফেলে, কেউ বা অসুস্থ শরীরে, প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে। বয়সের ভারে ন্যূব্জদেরও রেহাই নেই। রেহাই নেই যারা দিন আনে দিন খায়, দিনমজুরিতে সংসার চালায়। প্রবল ঠাণ্ডায় অসুস্থ নবতিপর বৃদ্ধকে অ্যাম্বুলেন্সে যেতে হচ্ছে শুনানি কেন্দ্রে, পক্ষাঘাতগ্রস্তকে সন্তানের কাঁধে ভর দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীকে টেনে আনতে হচ্ছে, ক্যাথিটার লাগানো অবস্থায় হাজির হতে হচ্ছে শুনানি কেন্দ্রে। নাতির কোলে শুনানিতে ৯১ বছরের বৃদ্ধাও। পরিযায়ী শ্রমিকরা, দূরে কর্মরতরা বুঝতে পারছেন না কী করে শুনানির ডাকে তাঁরা সাড়া দেবেন।
যেখানে শুনানি চলছে সেখানকার পরিবেশও উপস্থিত সবার পক্ষে অনুকূল নয়। বসার জায়গা, ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার, পানীয় জলের ব্যবস্থা সর্বত্র সবার জন্য নেই বলে সংবাদে প্রকাশ। শুনানির নামে এই হয়রানি তীব্র অত্যাচারের রূপ নিয়েছে।
এনুমারেশন ফর্ম নিয়ে বিএলও-রা বাড়ি বাড়ি গেলেন। অথচ শুনানিতে সংখ্যাটা অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও কাউকে বা কোনও টিমকে নিয়োগ করা হ’ল না কেন যিনি এঁদের কাছে গিয়ে সঠিক তথ্য যাচাই করবেন? তা ছাড়া সশরীরে উপস্থিতিকেই বা কেন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে? প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে অন্য কেউও তো শুনানিতে যেতে পারেন। নাগরিকত্ব চলে যাওয়ার বিষময় পরিণাম অল্পবিস্তর সবাই জানেন বিগত দিনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে। সেই আবহের গর্ভে এখানে বস্তুত সবাইকে সন্ত্রস্ত করা হচ্ছে তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য। বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে বাস্তবে তাঁদের শাখা সংগঠন হিসাবে ব্যবহার করছেন। তাঁদের আস্ফালন মতুয়া সম্প্রদায় সহ সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বহু গুণ বৃদ্ধি করেছে। যেটা প্রমাণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সেটা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে নাগরিকদের উপর। যিনি ইতিমধ্যে ভোট দিয়েছেন, ভোটার কার্ড বা এপিকের মালিক হয়েছেন, তাঁকেই বলা হচ্ছে তুমি প্রমাণ কর তুমি এ দেশের নাগরিক! ভেবে দেখা হচ্ছে না, প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না, নাগরিক ছাড়া তিনি বা তাঁরা ভোটার হলেন কী করে?
বিষয়টার আরও একটু গভীরে যাওয়া যাক। ‘দি রিপ্রেজেন্টেটিভ অফ দি পিপল অ্যাক্ট, ১৯৫০’-এর ১৬ ধারায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি যদি ভারতের নাগরিক না হন তা হলে তার নাম ভোটার লিস্টে উঠবে না। অথচ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, সব ভোটারদের নাগরিক হিসাবে গণ্য করা যাবে না। তাঁর মতে, ‘পকেটে ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড যাই থাকুক তা প্রমাণ করবে না আপনি আমি এ দেশের নাগরিক’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮-১২-২০১৯)।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা যদি সঠিক হয়, তাহলে এটা তো নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, নাগরিক এবং অনাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত এই সরকার। সে কারণে এ সরকার অবৈধ সরকার। সেই সরকার কি নাগরিকত্ব, ভোটার হওয়ার আইন সহ যে কোনও আইন প্রণয়ন করতে পারে? সংবিধান অনুযায়ী, নাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত সরকারই দেশ চালাবে, আইন প্রণয়ন করবে। এখানে কিন্তু তা হচ্ছে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সাধারণ বিচারবোধও হারিয়ে ফেলেছেন নেতা-মন্ত্রীরা। এখন পরিষ্কার যে এই বিচারবোধ হারিয়েই তাঁরা বীরভূমের অন্তঃসত্ত্বা সুনালি খাতুনকে অনাগরিকের তকমা দিয়ে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অসীম দুর্ভোগ সয়ে ৬ মাস কাটিয়ে অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দেশের মাটিতে পা রাখতে পেরেছেন তিনি। সরকার তার পরাজয় আড়াল করতে বলেছে, মানবিকতার কারণে সুনালিদের ফিরিয়ে আনা হবে। প্রশ্ন রইল– সুপ্রিম কোর্ট বলার আগে কোথায় ছিল এই মানবিকতা?
গৌরীশঙ্কর দাস, সাঁজোয়াল, খড়গপুর