Breaking News

পাঠকের মতামতঃ ভারতে মুসলমান অনুপ্রবেশ কতটা বাস্তব কতটা রাজনীতি

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে মুসলিম জনসংখ্যা ২৪.৬ শতাংশ বেড়েছে এবং হিন্দু জনসংখ্যা ৪.৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। তাঁর মতে মুসলমান জনসংখ্যার বৃদ্ধি জন্মহারের কারণে নয়, অনুপ্রবেশের কারণেই এই বৃদ্ধি হয়েছে (আনন্দবাজার ১১.১০.২০২৫)। মুসলিম বিরোধিতা বিজেপির ভোট-রাজনীতির অন্যতম ইস্যু। কিন্তু, মজার ব্যাপার হল, বিজেপির এতদিনকার যুক্তি ছিল, একাধিক বিবাহ করার সুযোগ থাকার কারণে মুসলিম পরিবারে সন্তান সংখ্যা হিন্দু পরিবারের তুলনায় অনেক বেশি এবং এই ধারাতেই নাকি এক দিন ভারতে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে এবং এর ফলে ভারতকে ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে। এটাই নাকি প্যান ইসলামিকদের ষড়যন্ত্র। বিজেপির যুক্তি, এই ষড়যন্ত্র আরও দ্রুত বাস্তবায়িত করার জন্য তারা ‘লাভ জেহাদি’ মুসলিম যুবকদের দ্বারা পরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে পড়া হিন্দু মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের ধর্মান্তরিতও করছে। কিন্তু ইদানীং ভোটার তালিকার এসআইআর করতে গিয়ে তারা আবার অনুপ্রবেশ তত্ত্বও খাড়া করেছে এবং অমিত শাহ সরাসরি ডিগবাজি খেয়ে বলে বসেছেন যে, মুসলিমদের জন্মহার বাড়ছে না। বিদেশ থেকে মুসলমানরা দলে দলে অনুপ্রবেশ করার ফলেই নাকি তাদের সংখ্যা বাড়ছে।

এ দাবির বাস্তবতা কতটুকু? স্বাধীনতার পরে ১৯৫১ সালের প্রথম জনগণনার হিসেব অনুযায়ী দেশে সে সময়ে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৮৪.১ শতাংশ বা ৩০ কোটি ৩৬ লক্ষ ৭৫ হাজার ৮৪ জন এবং মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৯.৮ শতাংশ বা ৩ কোটি ৫৩ লক্ষ ৮৬ হাজার ৬৩৩ জন। ২০১১ সালের সর্বশেষ জনগণনা অনুযায়ী দেশে হিন্দুর সংখ্যা ৭৯.৮ শতাংশ বা ৯৬ কোটি ৬২ লক্ষ ৫৭ হাজার ৩৫৩ জন এবং মুসলিমদের সংখ্যা ১৪.২ শতাংশ বা ১৭ কোটি ২২ লক্ষ ৪৫ হাজার ১৫৮ জন। অর্থাৎ ৬০ বছরে হিন্দুর সংখ্যা বেড়েছে ৬৬ কোটি ও মুসলিমের সংখ্যা বেড়েছে ১৪ কোটি। এই তথ্য দেখাচ্ছে, ‘ভারতে মুসলমান জনসংখ্যা হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে এবং হিন্দু দ্রুত সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে’– উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ছড়ানো এই আতঙ্ক কতখানি ভিত্তিহীন।

এ কথা সত্য যে, ঐতিহাসিক কারণেই সামগ্রিকভাবে ধরলে এ দেশে হিন্দুদের তুলনায় দীর্ঘদিন ধরেই মুসলমানদের একটা অংশ অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চাদপদ এবং সেই জন্যই আধুনিক জীবনবোধেও অনগ্রসর। এই কারণেই তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন জন্মহার সামান্য হলেও বেশি ছিল কিন্তু সেটা এমন কোনও মতেই নয় যাতে অচিরে মুসলমানরা এ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানসম্মত বিচারে আধুনিক দুনিয়ায় কোনও দেশেই এই ভাবে জনসংখ্যার ধর্মীয় বিন্যাসের সর্বাত্মক পরিবর্তন আর সম্ভব নয়। যদিও বাস্তব এটাই যে, হিন্দুদের মধ্যেও গ্রামীণ কৃষিজীবী এবং শহরাঞ্চলের অনগ্রসর শ্রমিক পরিবারেও সন্তানসংখ্যা খুব একটা কম নয়।

অবশ্য সম্প্রতি ভারতে হিন্দু-মুসলমান উভয় পরিবারেই জন্মহার কমছে। কারণ, উভয় সম্প্রদায়েরই অনগ্রসর পরিবারের মধ্যেও শিক্ষা এবং আধুনিকতার প্রসার ঘটছে, সন্তান উৎপাদন ও জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি সম্পর্কে পুরনো মানসিকতা দ্রুত কেটে যাচ্ছে। গুগল নলেজ গ্রাফের এ আই নির্ভর একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, এই জন্মহার বজায় থাকলেও আগামী ২০৫০ সালে ভারতে হিন্দু জনসংখ্যা হতে চলেছে ১৩৮ কোটি এবং মুসলিম জনসংখ্যা হতে চলেছে ৩১ কোটি অর্থাৎ শতাংশে ১৯ হলেও সংখ্যার বিচারে নিতান্ত সংখ্যালঘুই। এখন, অমিত শাহের সাম্প্রতিকতম দাবি অনুযায়ী মুসলমান জনসংখ্যার বৃদ্ধি যদি অনুপ্রবেশের কারণেই হয়ে থাকে, তা হলে ধরে নিতে হবে এই অনুপ্রবেশ বাংলাদেশ থেকেই ঘটেছে। কেন না, পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে বর্তমানে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর। তারাও নিশ্চয়ই বিরোধী দল পরিচালিত সরকারের মতো বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তান থেকেও ভারতে ‘লোক ঢোকাচ্ছে’ না। এ ছাড়া সম্প্রতি পশ্চিম ও উত্তর ভারতে তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধরা এবং তাদের বিনা বিচারে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ঘটনাগুলো ঘটছে সবই বাংলাভাষী মুসলমানদের উপর। অথচ, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল মোটামুটি ৭ কোটি এবং বর্তমান ২০২৫ সালে সে দেশের প্রত্যাশিত জনসংখ্যা ১৭.৫ কোটি যার মধ্যে প্রায় ১৬ কোটিই মুসলমান। সে জায়গায় ১৯৭১-এর জনগণনা অনুযায়ী ভারতের জনসংখ্যা ছিল ৫৫ কোটি এবং তার মধ্যে মুসলমান ছিলেন ৯.৮ শতাংশ অর্থাৎ ৫ কোটি ৪০ লক্ষ। এখন অমিত শাহের দাবি অনুযায়ী ২০১১-র মধ্যে ১২ কোটি মুসলমান বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ করেছেন। তাই ভারতে তাঁদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি। আরএসএসের চিন্তাসমৃদ্ধ নাগপুরীয় পাটিগণিতের এই সূত্র অনুযায়ী তা হলে বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় মুসলমান শূন্য হয়ে কেবল মাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি হিন্দু অধ্যুষিত একটি জনবিরল দেশে পরিণত হওয়ার কথা! স্পষ্টতই সমস্তটাই অমিত শাহের আজগুবি গল্প। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের আগে হিন্দুদের মধ্যে একটা অলীক আতঙ্ক এবং মুসলিমবিদ্বেষ ছড়িয়ে অন্তত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রগুলোতে হিন্দু ভোটকে বিজেপির ঝুলিতে আনা নিশ্চিত করতে এই সুচতুর পরিকল্পনা।

পার্থ ভট্টাচার্য

ভাটপাড়া, উত্তর ২৪ পরগণা