
‘পুঁজিপতিদের ঋণ মকুব করতে ব্যাঙ্কে সুদের হার কমানো হচ্ছে’ শীর্ষক নিবন্ধ (গণদাবী, ৭৮ বর্ষ, ২২ সংখ্যা, ৯-১৫ জানুয়ারি ২০২৬) প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা।
প্রথম কথা, নিবন্ধের বিষয়বস্তুর সঙ্গে শিরোনাম ঠিক সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে আমার মনে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘পুঁজিপতিদের ঋণ মকুব করতে ব্যাঙ্কের গ্রাহক এবং কর্মচারীদের উপর আঘাত হানা হচ্ছে’ কিংবা ‘ব্যাঙ্ক গ্রাহক এবং কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে ধনকুবেরদের ঋণ মকুব করা হচ্ছে’– এই জাতীয় কোনও শিরোনাম হলে সঠিক হত বলে মনে হয়।
দ্বিতীয়ত বিষয়বস্তু নিয়েও কিছু স্বচ্ছতা প্রয়োজন। ঋণ মকুব করার প্রশ্নে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের দুটো দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। ধনকুবেরদের থেকে ঋণ আদায়ে যে মনোভাব কাজ করে গরিব-মধ্যবিত্তদের থেকে সেই ব্যাপারে দেখা যায় অনেকটা বিপরীত মনোভাব। ধনকুবেরদের মোটা অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী থাকতে থাকতে এক সময় যে ভাবে সহজে মকুব হয়ে যায়, গরিব মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে তা হয় না। মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ নিয়ে যিনি শোধ করতে পারছেন না, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির বিনিময়ে তিনি ঋণ পেয়েছিলেন তা বিক্রি করেও যখন ঋণ পরিশোধ হওয়া সম্ভব নয়, তখন তো ওই ঋণগ্রহীতার শাস্তি হওয়া উচিত। ওই ঋণ যিনি অনুমোদন করেছিলেন তাঁর সব কিছু খতিয়ে দেখে শাস্তি হওয়া উচিত। সে রকম কিন্তু হয় না। উল্টে গরিব-মধ্যবিত্তদের ঋণ আদায়ে চলে নানা রকম উৎপীড়ন।
অনাদায়ী ঋণ অনুৎপাদক সম্পদে পরিণত হওয়ার পরও চলে এই উৎপীড়ন। তাতেও কাজ না হলে খবরের কাগজে বড় বড় বিজ্ঞাপন দিয়ে এই সব মানুষের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ঋণ শোধ হয়। এমন বিজ্ঞাপন মাঝে মাঝে বিভিন্ন পত্রিকায় আমাদের চোখে পড়ে। যে কারণে খাতা থেকে মুছে দেওয়া অনুৎপাদক সম্পদও কিছু কিছু উদ্ধার হয়। সে কথাই শুনিয়েছেন মাননীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু, যে সমস্ত ধনকুবের ব্যাঙ্ক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করলেও তাদের ঋণ মকুব হয়ে যায়, ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ হলে তাঁরাই হবেন ব্যাঙ্কের মালিক, বিশাল পরিমাণ ব্যাঙ্ক আমানতের নিয়ন্ত্রক। সরকারি ব্যাঙ্কেই গরিব-মধ্যবিত্তরা যদি অবহেলিত হন তবে বেসরকারি ব্যাঙ্কে তাঁদের অবস্থা কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। অথচ ব্যাঙ্কের আমানতের সিংহভাগই হল গরিব, মধ্যবিত্তদের। বেসরকারি ব্যাঙ্ক ডুবে গেলে তার পরিণতি কী হয়েছে বা কী হতে পারে তা নিবন্ধেই উল্লেখ আছে।
ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণের মধ্য দিয়ে এখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা ১২। এটাকে ৩-৪টি ব্যাঙ্কে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে পুনরায় সংযুক্তিকরণের মধ্য দিয়ে। যে সংযুক্তি হয়েছে তাতে কার উপকার হয়েছে? তবে সংযুক্তিকরণের পর ৭ হাজার ১০১টি শাখা বন্ধ হয়ে গিয়েছে যার ফলে প্রান্তিক চাষি, ছোট ব্যবসায়ী, গরিব আমানতকারীদের মতো গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত সংযুক্তিকরণের সুবাদে কর্মী সংখ্যা ৮.৫৭ লক্ষ থেকে কমে ৬.৯৪ লক্ষে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অনুৎপাদক সম্পদ বা এনপিএ-র পরিমাণও কমার পরিবর্তে বেড়েছে। এসবিআই-তে ১৬ শতাংশ, ব্যাঙ্ক অব বরোদায় ২৩ শতাংশ এবং পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে ৩৫ শতাংশ এনপিএ বেড়েছে সংযুক্তিকরণের পর। সংযুক্তির পর প্রতি শাখায় গড়ে গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০০০ এরও বেশি। অথচ চিনে এই সংখ্যা ৩৫০০ এবং সারা বিশ্বে এই সংখ্যার গড় হল ৪২০০।
সুদের হার কমানোর যে কথা এখানে বলা হয়েছে সেখানে সব ক্ষেত্রে কিন্তু সুদের হার কমানো হয় না। আমানতের ক্ষেত্রে সুদ কমানো হলেও ঋণের ক্ষেত্রে সেই অনুযায়ী কমানো হয় না। আবার যে সব ক্ষেত্রে কমানো হয় সেখানে এমন ভাবে কমানো হয় তার সুফলও পায় মূলত ধনকুবেররা।
এখানে ব্যাঙ্ক জালিয়াতির কথা উঠেছে। অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত সাড়ে চার বছরে দেশে ৫,৮৩,২৯১টি ব্যাঙ্ক প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে এবং এর সঙ্গে জড়িত ৩৫৮৮.২২ কোটি টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কত টাকা উদ্ধার হয়নি তাও যেমন মন্ত্রী মশাইয়ের তথ্য থেকে জানা যায়নি, তেমনই কত জালিয়াত ধরা পড়ল, কারাই বা সেই জালিয়াত, জালিয়াতরা দেশান্তরিত হয়েছে কি না, তারও কোনও তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ইতিমধ্যে বিজয় মাল্য, নীরব মোদি, মেহুল চোক্সিদের মতো ব্যাঙ্ক জালিয়াতদের অবস্থাই বা কী? অথবা তাঁদের থেকে জালিয়াতির কোনও টাকা উদ্ধার সম্ভব হয়েছে কি না সে ব্যাপারেও সরকার কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আনেনি। এ সব ঘটনা থেকে আমাদের বুঝতে হবে ব্যাঙ্ক শিল্প বর্তমানে কাদের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কাদের স্বার্থে পরিচালিত হতে যাচ্ছে।
গৌরীশঙ্কর দাস, খড়গপুর