Breaking News

পাঠকের মতামতঃ ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ বিপন্ন

আরাবল্লী ধ্বংসের ফরমানের প্রতিবাদে রাজস্থানের জয়পুরে এসইউসিআই(সি)-র বিক্ষোভ। ২৮ ডিসেম্বর

কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের প্রস্তাবিত সংজ্ঞার উপরেই রাবার স্ট্যাম্প লাগিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট, কলমের এক খোঁচায়। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন পর্বতমালার একটি ‘আরাবল্লী’, যা ভারতবর্ষে ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ নামে পরিচিত, আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। রাজস্থান, গুজরাট, হরিয়ানা, দিল্লির প্রায় ৭০০ কিমি জুড়ে বিস্তৃত। এই পর্বতমালা উত্তর-পশ্চিম ভারতের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, থর মরুভুমির বিস্তার রোধ করে, মৌসুমী বায়ুর প্রবাহকে প্রভাবিত করে দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়াতে সাহায্য করে, মধ্য এশিয়া থেকে আসা ঠাণ্ডা পশ্চিমা বাতাসের প্রভাব থেকে উত্তর ভারতকে রক্ষা করে এবং উত্তর ভারতের জলবায়ুকে স্থিতিশীল রাখে। কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনও ভূখণ্ডকে পাহাড় হিসেবে গণ্য করতে হলে আশেপাশের ভূমির তুলনায় তার উচ্চতা অন্তত ১০০ মিটার হতে হবে। উল্লেখ্য, কোনও ভূখণ্ডের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতার ভিত্তিতেই মাপার নীতি। একে পরিবর্তন করে আশপাশের ভূমি থেকে উচ্চতাকে মাপকাঠি ধরা হয়েছে, যা কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। সুপ্রিম কোর্টের বকলমে এই নির্দেশ কার্যকর হলে আরাবল্লী পর্বতমালার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ এলাকা আর পাহাড় হিসাবে গণ্য হবে না। ১২ হাজারেরও বেশি পাহাড়ের মধ্যে মাত্র হাজার খানেক আদালতের শর্ত পূরণ করতে পারবে। যার অর্থ এই বিশাল অংশ আর পরিবেশগত সুরক্ষার আওতায় থাকবে না। এর ফলে উত্তর ভারতের একটা বিরাট অংশের শুধু জলবায়ুর পরিবর্তন হবে তাই নয়, ভূগর্ভস্থ জল, দিল্লি সহ উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির প্রাকৃতিক অক্সিজেনের ভাণ্ডারে ঘাটতি হবে, বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মুখে পড়বে।

এই পর্বতমালার একটা বিরাট অংশ ইতিমধ্যেই খনন, নির্মাণ ও অবৈধ দখলের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত। নতুন সংজ্ঞার ফলে খনি, পাথর খাদান, রিয়েল এস্টেট ও বড় নির্মাণ প্রকল্পের অবাধ রাস্তা খুলে যাবে। এখানেই আসল অর্থনৈতিক স্বার্থের দৃষ্টি নিবদ্ধ ধনকুবেরদের। এর ফলশ্রুতিতে পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে আমরা আরও অসংখ্য প্রাণের বলি দেখতে পাব, যেমন দেখা গেছে ২০২৩-এ উত্তরাখণ্ডে উত্তরকাশীর সিল্কিয়ারা টানেলে ধস, যেখানে ৪১ জন অসহায় শ্রমিক আটকে পড়েছিলেন সুড়ঙ্গের মধ্যে, ২০২৫ সালে উত্তরকাশী ও চামোলী জেলার ধরলি এলাকার মেঘভাঙা বৃষ্টি ও ভূমিধস যা অসংখ্য প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। ২০২৪-এ কেরালার ওয়েনাড়ে ভূমিধস যার ফলে দুটি গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে ২৫০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

এই সমস্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণগুলি পর্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায়, সমস্ত ক্ষেত্রেই বনভূমি ধ্বংস করে পাহাড়ের ঢালে অবৈধ নির্মাণ, অতিরিক্ত খনি, পাথর ও বালি খাদানের কারণেই মাটির বাঁধন দুর্বল হয়েছে এবং চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছেন এলাকার অসহায় মানুষ। যখনই সরকার এই ধরনের বন সুরক্ষা আইন, পাহাড় সুরক্ষা আইন নিয়ে এসেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই এলাকার মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। এই সমস্ত আইনগুলি আসলে তৈরি হয়েছে ধনকুবেরদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে।

সর্বোচ্চ আদালতের এই রায় নিছক কোনও পাহাড়ের শেষ ঘোষণা নয়, এ আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। এই প্রশ্নচিহ্নের সামনে আমরা কি চুপ করে থাকব, নাকি এই সমাজের একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে উত্তর ভারতের ফুসফুস, ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’কে রক্ষা করতে সম্মিলিত প্রতিবাদে শামিল হব?

 টুম্পা গোস্বামী

পশ্চিম মেদিনীপুর