Breaking News

পরিবেশ আরও দূষিত হওয়ার আশঙ্কা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প

কম্পিউটার, স্মার্ট ফোন সহ নানা ধরনের ইলেক্ট্রনিক্স দ্রব্য আজকাল প্রায় সকলকেই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে হচ্ছে। সকলেই জানেন, ইলেক্ট্রনিক্স দ্রব্যের ভিতরে থাকে নানা ধরনের মাইক্রোচিপ। এই মাইক্রোচিপগুলো তৈরি হয় সেমিকন্ডাক্টর নামে এক ধরনের পদার্থ দিয়ে। সেমিকন্ডাকটর তৈরির উপকরণ প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না, কারখানায় তৈরি করতে হয়।

এতদিন পর্যন্ত সেমিকন্ডাকটর তৈরিতে বিশ্বে এক নম্বরে ছিল তাইওয়ান। এই তাইওয়ান ছিল সাবেক চিনের অন্তর্গত একটি দ্বীপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠনের নামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাইওয়ানকে চিনের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে প্রভাব বিস্তার করে ও ডলার ঢেলে সেখানে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত কলকারখানা গড়ে তুলতে থাকে। বর্তমানে দক্ষিণ চিন সাগর এলাকায় আমেরিকা ও চিন উভয়েরই শক্তি প্রদর্শনের ফলে বেশ কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ উত্তেজনা চলছে। কিন্তু নিজস্ব আভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ এ কথা ভালই বোঝে যে, চিন যদি তাইওয়ানে সেনা নামিয়ে সত্যিই তা দখল করে নেয়, তখন ভূ-রাজনৈতিক সুবিধের দিক থেকে তাকে এঁটে ওঠা আমেরিকার পক্ষে মুশকিল হবে। এই জন্য তাইওয়ানের সর্বাধিক বিখ্যাত সেমিকন্ডাকটর শিল্প আমেরিকা সরিয়ে আনতে চাইছে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে এমন জায়গায়। এ ক্ষেত্রে তাদের আশ্বাস দিয়েছে ভারত সরকার। ইতিমধ্যেই অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, পাঞ্জাব প্রভৃতি প্রদেশে বিশ্বের অগ্রগণ্য সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদক কোম্পানিগুলো মোট ১.৬ লক্ষ কোটি টাকা লগ্নি করবে বলে ঘোষিত হয়েছে। এর মধ্যে তাইওয়ানের পিএসএমসি কোম্পানির সঙ্গে টাটা ইলেকট্রনিক্সই ৯১০০০ কোটি টাকা লগ্নি করতে চলেছে। বিদেশি শিল্প ভারতে লগ্নি করছে শুনলেই ‘শিল্পায়ন’, ‘উন্নয়ন’ বলে যাঁরা উদ্বাহু নৃত্য শুরু করে দেন তাঁরা এই খবরে যথেষ্টই খুশি এবং এই খবর তাঁরা ইতিমধ্যে ব্যর্থ বিদেশনীতির জন্য বুর্জোয়া মহলেই তীব্র সমালোচিত মোদি সরকারের সাফল্য বলে তুলে ধরবেন সন্দেহ নেই। কিন্তু যে বিষয়টা সম্ভবত অনুচ্চারিত থেকে যাবে তা হল এই সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়তে গিয়ে ইতিমধ্যেই পরিবেশ দূষণে শীর্ষস্থানে থাকা ভারত দেশটিকে আরও মারাত্মক পরিবেশ দূষণের খপ্পরে পড়তে হবে।

সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে অপরিহার্য হল ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস’(সংক্ষেপে আরইই) নামক এক শ্রেণির মৌলিক পদার্থ। এদের মধ্যে সর্বপ্রধান হল সিলিকন এবং এ ছাড়া রয়েছে গ্যালিয়াম, জার্মানিয়াম, ডিস্প্রোসিয়াম, টারবিয়াম প্রভৃতি। ‘রেয়ার আর্থ’ নামেই বোঝা যায় যে, এই পদার্থগুলো প্রকৃতিতে খুবই বিরল। শুধু বিরলই নয়, এগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে আহরণ করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং পরিবেশের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এখনও পর্যন্ত বিশ্ববাজারে ‘আরইই’ উৎপাদক এবং রপ্তানিকারকের একচেটিয়া ব্যবসাটি রয়েছে চিনের দখলে। ভারতেও এখনই, সেমিকন্ডাকটর শিল্প স্থাপিত হওয়ার আগেই, যতটুকু ‘আরইই’ আমদানি করতে হয়েছে তার ৬৫ শতাংশই এসেছে চিন থেকে। এখন, স্বাভাবিকভাবেই ভারতের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পপতিদের যদি ঈপ্সিত মুনাফা ওঠাতে হয় তা হলে ‘আরইই’ চিন থেকে আমদানি করলে পোষাবে না। কাজেই ভারতেই তাদের ‘আরইই’ উৎপাদন করতে হবে। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে পরিবেশে নতুন আরও এক ধরনের মারাত্মক দূষণের অশনি সংকেত।

‘আরইই’ ভূপৃষ্ঠের শিলাস্তর থেকে আলাদা করা হয় মূলত দু’ভাবে। প্রথম পদ্ধতিতে ভূপৃষ্ঠের ওপরের স্তরটা তুলে ফেলে বিশাল আকৃতির পুকুর তৈরি করা হয়। এরপর সেইসব পুকুরে প্রচণ্ড শক্তিশালী বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ঢেলে এই মূল্যবান পদার্থগুলোকে ভূপৃষ্ঠ থেকে আলাদা করে তুলে আনা হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে ভূগর্ভে বড় বড় পিভিসি পাইপ বসিয়ে তার মাধ্যমে রাসায়নিকগুলো ভূগর্ভে ঢুকিয়ে ‘আরইই’ পদার্থগুলোকে পাম্প করে তুলে আনা হয়। এই দুই পদ্ধতিতেই পরিবেশে মারাত্মক রকম দূষণ ঘটে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় জানা গেছে যে, প্রতি এক টন ‘আরইই’ তুলে আনতে ১৩ কিলোগ্রাম রাসায়নিক ধুলো এবং ১২০০০ ঘন মিটার বিষাক্ত গ্যাস, ৭৫ কিউবিক মিটার দূষিত বর্জ্য জল এবং এক টন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নির্গত হয়। আরও ভয়ের কথা হল, এই সব পদার্থের মধ্যে থোরিয়াম এবং ইউরেনিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় খনিজও মিশে থাকে। যার ফলে মোট বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০০০ টন।

‘আরইই’র বাজারে নিজের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখতে চিন তার নিজের দেশে পরিবেশের এইরকম মারাত্মক দূষণ ঘটিয়েই পদার্থগুলো উৎপাদন করে চলেছে। চিনের ‘বায়ান ওবো’ খনি এলাকা পৃথিবীর বৃহত্তম ‘আরইই’ উৎপাদন ক্ষেত্র। বিপুল পরিমাণ ‘আরইই’ উৎপাদনের ফলে এই খনিতে ৭০ হাজার টন তেজস্ক্রিয় থোরিয়ামের একটি পুকুর তৈরি হয়েছে এবং এই থোরিয়াম বছরে ২০ -৩০ মিটার চুঁইয়ে গিয়ে সেখানকার ভূগর্ভের জলে মিশছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, চিনের বিখ্যাত হোয়াং হো নদী বা ইয়েলো রিভারের জলও এর ফলে দূষিত হচ্ছে। কাজেই ইতিমধ্যেই পরিবেশ দূষণে বিশ্বে ওপরের দিকে থাকা ভারত যদি এই ‘আরইই’ নিজের দেশেই উৎপাদন করার চেষ্টা করে তা হলে পরিণাম কী হতে পারে সহজেই অনুমেয়। হয়তো, এই কারণেই জনবিরল অরণ্য অঞ্চল থেকে আদিবাসীদের বিতাড়ন করার উদ্দেশ্যেই মাওবাদী দমনের নামে সে সব জায়গায় নির্বিচার গণহত্যা চালানো হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে, তা হলে উপায় কী? যে কোনও ধরনের কলকারখানা তৈরি বা খনিজ পদার্থ উত্তোলন করতে গেলেই তো পরিবেশের কিছু না কিছু ক্ষতি হবেই। তাই বলে কি আধুনিক শিল্প তৈরি হবে না? অবশ্যই হবে। কিন্তু পরিবেশের জন্য যে সব শিল্প ভয়ঙ্কর রকম ক্ষতিকর অথচ আধুনিক জীবনের পক্ষে অপরিহার্য, প্রথমত, সেই সব সামগ্রীর ব্যবহার কমানো বা উৎপাদনের পরিবেশবান্ধব বিকল্প উদ্ভাবনের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে। কিন্তু, বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থের কথা মাথায় রেখে এই ধরনের পরিকল্পিত শিল্প ও বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন কোনও পুঁজিশাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা, সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনই একচেটিয়া পুঁজির একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। তারা শুধু দেশের অভ্যন্তরে ন্যূনতম প্রয়োজনের জন্যই নয় বা বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্যও নয়, যে কোনও পণ্যই তারা উৎপাদন করে বিশ্ববাজারে ব্যবসা করে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে। তার জন্য পরিবেশ দূষণ তো অনেক দূরের কথা, কোনও রকম মানবিক মূল্যবোধ বা সামাজিক, নৈতিক ন্যায় অন্যায়ের তোয়াক্কাই তারা করতে রাজি নয়। এমনকি, পরিবেশ রক্ষার জন্য বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের তৈরি আইন ও নিয়মকানুনও তারা অহরহ দু’পায়ে মাড়িয়ে যায় আর মাঝে মধ্যে অপরিমিত অর্থ অপব্যয় করে পরিবেশ রক্ষার সম্মেলন করে। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই শিল্প নির্মিত হয় সামাজিক প্রয়োজন এবং সমাজের সার্বিক কল্যাণসাধনের কথা বিবেচনা করে।