Breaking News

নেপালে বিধ্বংসী বন্যাঃ পরিকল্পনাহীন নগরায়ন এবং উষ্ণায়নের দায় কম নয়

নেপালের বিধ্বংসী বন্যায় অগণিত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিপুল পরিমাণে ঘরবাডি, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, নদীবাঁধ ধ্বংস হয়ে গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা একটি হিমবাহের সামনের দিকের একটি বিরাট অংশ ভেঙে গিয়ে নুড়ি-পাথর সহ প্রায় ১২০০ মিটার নিচে নদীখাতে আছড়ে পড়ার ফলেই এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এই ধরনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যদিও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মনুষ্যসৃষ্ট বিশ্ব-উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহের গলন ত্বরান্বিত হওয়া ও ক্রমাগত ক্ষয় পাওয়া হিমবাহের ভাঙনের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করে।

বন্যাকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও এর ফলে যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়, তার পিছনে মনুষ্যসৃষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, অনেক জায়গাতে নদীর একেবারে ধারে, এমনকি নদীখাতের ওপরেই ব্যাপক ভাবে বাড়িঘর, হোটেল ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। মানুষের বাসস্থান যদি নদীখাতের অনেক ওপরে উপযুক্ত জায়গায় বানানো হত, তা হলে বন্যা হলেও এত বাড়িঘর ধ্বংস হত না। এত মানুষের মৃত্যুও হত না। অপরিকল্পিত নগরায়ন জমিঢালের স্থায়িত্ব নষ্ট করে ভূমিধসের প্রবণতা বাড়াচ্ছে ও নানা ভাবে পরিবেশের ক্ষতি করছে। দ্বিতীয়ত, যে ভাবে পরিবেশের তোয়াক্কা না করে, পাহাড় কেটে নতুন নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে, টানেল খোঁড়া হচ্ছে তাতে জমিঢালের স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে প্রায়শই ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। ভূমিধসের ফলে পাথর, কাদা, মাটি নদীতে নিক্ষিপ্ত হয়ে নদীর জলপ্রবাহকে বিঘ্নিত করছে ও বন্যার সময় জলের সঙ্গে মিশে স্রোতকে বিধ্বংসী রূপ দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবিদ্যুতের জন্য যথেচ্ছ ভাবে নদীতে বাঁধ দেওয়া। পরিবেশের প্রভূত ক্ষতির কথা বাদ দিলেও অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় বাঁধ ভেঙে বন্যা সৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা থাকে বা উপরের দিকে বন্যা হলে তার সঙ্গে বাঁধভাঙা জল মিশে জলস্রোত ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

ইদানীং পাহাড়ি নদীর গা-ঘেঁষে, কোথাও কোথাও এমনকি নদীখাতের ওপরেও যে ভাবে হোটেল, রিসর্ট, হোমস্টে ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে এবং পর্যটন-ব্যবসার বিকাশের নাম করে প্রশাসনও যেভাবে বৈজ্ঞানিক নিয়মনীতি ও ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে সেসব তৈরির অনুমতি দিচ্ছে, তা-ও অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ রাজ্যের উত্তরবঙ্গে পাহাড়ি নদীগুলির গায়ে এই ধরনের অসংখ্য পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে যেগুলি যে কোনও সময়ে অতিবৃষ্টি বা হড়পা বানের কবলে পড়ে বিপর্যয়ের শিকার হতে পারে। এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে নেপালের বন্যা হিমালয়ের প্রথম দুর্যোগ নয়। এর আগে আমরা কেদারনাথে, উত্তরাখণ্ডে, কাশ্মীরে, সিকিমে হড়পা বানের তাণ্ডব দেখেছি। বিজ্ঞানীরা অনেকেই মনে করেন, ঘন ঘন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির জন্য বিশ্ব-উষ্ণায়ন মূলত দায়ী। ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন প্রশমনের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ভাবে ভারত সরকারকে বিভিন্ন দিক থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ যুদ্ধকালীন তৎপরতার সঙ্গে নিতে হবে। প্রকৃতিতে বিপর্যয় ডেকে আনে, এমন ধরনের প্রকল্প নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো যেতে পারে যদি দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণের ব্যবস্থাটি পোক্ত থাকে। এর জন্য প্রয়োজন উপগ্রহ চিত্রের চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় জমির সূক্ষ্ম নড়াচড়াকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে স্বয়ংক্রিয় ভাবে মাপা ও নথিভুক্ত করার জন্য উপযুক্ত যন্ত্র স্থাপন করা। এ বিষয়ে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি পাহাড়ি নদীর গা-ঘেঁষে অবৈজ্ঞানিক ভাবে যাতে কোনও নির্মাণ না হয়, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখার দায়িত্ব নিতে হবে প্রশাসনকে। বন্যা হয়তো বন্ধ করা যাবে না, কিন্তু তার তীব্রতা এবং ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই অনেকটা কমানো যেতে পারে, যদি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উদ্যোগ থাকে।