Breaking News

নেপালঃ কাঙিক্ষত পরিবর্তন সম্ভব কোন পথে

নেপালের যুবসমাজ হঠাৎ দাবানলের মতো জ্বলে উঠল কেন? কী করে তাদের মধ্যে এত ক্ষোভের বারুদ জমা হল যে, তারা পার্লামেন্ট ভবনে আগুন লাগিয়ে দিল? আগুন লাগানো হল সুপ্রিম কোর্টেও। জনরোষ এমন আছড়ে পড়ল যে, ভস্মীভূত হয়ে গেল শাসকদলের নেতা, মন্ত্রীদের বাড়ি। যুব সমাজের ক্ষোভের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি সহ গোটা মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। হিমালয়ের কোলে এই ছোট্ট দেশটিতে আপাত শান্ত মানুষের বুকের ভেতরে এত ক্ষোভ যে জমা হয়েছিল, বহির্জগত কি আদৌ বুঝতে পেরেছিল? লাভা উদগীরণ না হলে বাইরে থেকে যেমন বোঝা যায় না আগ্নেয়গিরির ভেতরে কী প্রবল আলোড়ন চলছে, নেপালের যুব বিক্ষোভ অনেকটা সেই রকম।

এই ক্ষোভের কারণ কী? ওলি সরকার ২৬টি সামাজিক মাধ্যমের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর বিরুদ্ধে ‘জেগে ওঠো নেপাল’ স্লোগান তুলে ৮ সেপ্টেম্বর পথে নামে যুবসমাজ। বিক্ষোভ প্রবল আকার নেয়। সরকার যুব সমাজের দাবি শোনার পরিবর্তে স্বৈরশাসকের মতো নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১৯ জন যুবককে হত্যা করে। এই হত্যা যুবকদের প্রতিবাদী সত্তাকে আরও তীব্র করে। পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর আবার পথে নামে যুবসমাজ, আরও বেশি সংখ্যায়, আরও বিক্রমে। সরকার আবারও গুলি চালায়। মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪। আহত শত শত। সরকারের এই দমননীতি যুব সমাজের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। তার লেলিহান শিখা গ্রাস করতে থাকে বিভিন্ন সরকারি ভবন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে মন্ত্রীরা একে একে পদত্যাগ করতে শুরু করেন। ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কায় এ ভাবেই গণবিক্ষোভ আছড়ে পড়েছিল। গত বছর বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকার ভেঙে পড়েছিল। তারই পুনরাবৃত্তি দেখা গেল নেপালে। নেপালে আপাতত অন্তবর্তী প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হলেও সে দেশ কার্যত সেনা শাসনের আওতায়।

ক্ষোভের প্রত্যক্ষ কারণ সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করে দেওয়া হলেও এটাই সব নয়। যুব মন দীর্ঘদিন ধরে বারুদের মতো হয়ে না থাকলে, এই একটি নিষেধাজ্ঞা এই ভাবে তাদের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নামাতে পারত না। তা হলে কী সেই কারণ, যা যুব সমাজকে বারুদের স্তূপে পরিণত করেছিল? সেটা বুঝতে গেলে তাকাতে হবে দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উপর। দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নেপাল ২০০৮ সালে রাজার শাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়েছে।প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রের শাসন। আসলে যা আদ্যোপান্ত একটি পুঁজিতান্ত্রিক শাসন। ১৭ বছরে সেখানে ১৩ বার সরকার বদল হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলগুলির মধ্যে গদি দখলের লড়াইয়ে বারবার সরকার বদল হয়েছে। কিন্তু বামপন্থী-দক্ষিণপন্থী যখন যে নামেই এই সংসদীয় দলগুলি গদিতে বসুক না কেন, তাদের ভূমিকা ছিল একই রকম দুর্নীতিগ্রস্ত ও জনবিরোধী। পুঁজিবাদী শাসন অন্যান্য দেশে যে ভাবে বৈষম্য বাড়িয়েছে, দুর্নীতির জন্ম দিয়েছে, বেকারত্ব দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে, নেপালেও ঠিক তাই ঘটেছে।

১৭ বছরের পুঁজিবাদী শাসনে নেপালে ধনী-গরিব বৈষম্য তীব্র আকার নিয়েছে। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে বেকারত্বের হার ১২.৫ শতাংশ। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবকদের বেকারত্ব সর্বাধিক– ২২.৭ শতাংশ। গ্রামে বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের বেশি। বাস্তবে যুবকদের একটা বিরাট অংশ দেশে কাজের আশাই ছেড়ে দিয়েছে। তারা চলে যাচ্ছে বিদেশে। নেপালে প্রতি ৪ জন পুরুষের মধ্যে ১ জন বিদেশে গেছে কাজের সন্ধানে। পুরুষের অবর্তমানে নারীরাই বাড়ির কর্ত্রী, এমন পরিবারের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ১৯৯৫-৯৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৩.৬ শতাংশ, ২০২২-২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭.১ শতাংশ। নেপালের শ্রমশক্তির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এ ভাবে পরিযায়ী হিসেবে বিদেশে যেতে বাধ্য হয়েছে (দি হিন্দু, ১১ সেপ্টেম্বর)।

গ্রামের যুবকদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার হার খুব বেশি। গ্রামের শ্রমশক্তির ২০ শতাংশ বাড়ির বাইরে। কাঠমাণ্ডু উপত্যকায় এই হার ৮.৭ শতাংশ। ২৫-২৯ বছর বয়সী ৫৬ শতাংশ পুরুষ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বাড়ি ছেড়েছে। বাস্তবে এদের পাঠানো টাকাতেই সংসার চলছে। নেপাল থেকে যারা বিদেশে কাজ করতে গেছে তাদের টাকাতে শুধু পরিবার নয়, দেশ চলছে। বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো পরিবার ১৯৯৫-৯৬ সালে ছিল ২৩.৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬.৮ শতাংশ। নেপালের মোট আয়ে বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোর পরিমাণ ৩৩ শতাংশ। তথ্য দেখাচ্ছে, কাতার, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী প্রভৃতিদেশ কর্মসংস্থানের জন্য নেপালি যুবকদের পছন্দের গন্তব্য।

এই অবস্থায় প্রশ্ন তো উঠবেই, দেশের সরকার কাজ দিতে পারছে না কেন? সুস্থ ভাবে বাঁচার আকাঙক্ষাই মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তুলবে, এ কেমন অর্থনীতি বেঁচে থাকার জন্য একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে না, বরং ক্রমাগত বৈষম্য বাড়ায়? এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনের নিচু থেকে উঁচুতলা পর্যন্ত প্রবল দুর্নীতি, ঘুষ না দিয়ে কাজ করানোটাই অর্থাৎ সরকারি পরিষেবা পাওয়াটাই হয়ে উঠেছে দুষ্কর। এই অপশাসন স্বাভাবিকভাবেই মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল।

রাজার দীর্ঘ অপশাসন এবং তারপরে ১৭ বছরের পুঁজিবাদী শাসনে মানুষের অবস্থা ক্রমাগত দুঃসহ হয়ে উঠেছে। মানুষ এর থেকে মুক্তি চাইছে। এই ক্ষোভের মধ্যে রয়েছে বৈষম্য থেকে মুক্তির আকাঙক্ষা। বছর তিনেক আগে শ্রীলঙ্কাতে সরকার উচ্ছেদের যে গণজাগরণ ঘটল, তারও মূল আকাঙক্ষা ছিল তীব্র অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি। এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির লক্ষ্যে গণবিক্ষোভ চলছে ফ্রান্সে। গণবিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ইন্দোনেশিয়া। ২০১০-এ আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল টিউনিশিয়ার বিদ্রোহের আগুন থেকে, ছড়িয়েছিল অনেক দেশে। খোদ আমেরিকাতে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন হল। সমস্ত পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশেই এই চিত্র। এগুলি থেকে একটি সত্যই বেরিয়ে আসে, তা হল পুঁজিবাদ আর মানুষের জীবনের সংকট সমাধান করতে পারছে না। বরং প্রতি মুহূর্তে সংকটের জন্ম দিয়ে চলেছে। অবশ্য শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, নৈতিক সংকটকেও তা ক্রমাগত গভীরতর করে তুলছে।

বিকল্প কী? বিশ্বের সর্বত্র চলছে এই বিকল্পের সন্ধান। পুঁজিবাদের বিকল্প উন্নততর পুঁজিবাদ, এ সব অন্তঃসারশূন্য ফাঁপা কথা আর মানুষকে ভোলাতে পারছে না। পেট বড় বালাই। সে পরিবর্তন চাইছে। এই পরিবর্তন আসবে কী করে? বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, সমাজে শ্রমিক-চাষি-শোষিত মানুষের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিপ্লব বারবার গমকে গমকে আসতে চাইবে, গমকে গমকে ফেটে পড়তে চাইবে, সমাজ অভ্যন্তরের দ্বন্দ্ব ফুলে উঠে বারবার বলতে চাইবে– এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন চাই। মানুষের মগজের কাছে, মানুষের কাছে আবেদন করতে চাইবে– বিপ্লব আমি চাই। কিন্তু, বিপ্লব ততদিন হবে না, বারবার সে ফিরে যাবে, বিপথগামী হয়ে ফিরে যাবে, বারবার তার দ্বারা প্রতিক্রিয়া লাভবান হবে– বিপ্লব হবে না, যতদিন না বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবার উপযুক্ত শক্তি নিয়ে বিপ্লবী পার্টির আবির্ভাব হবে।’

নেপালের সংগ্রামী জনগণ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাদের হাঁটতে হবে আরও পথ। সে পথ পুঁজিবাদ বিরোধিতার পথ। পরাজিত রাজতন্ত্র মাথা তোলার চেষ্টা করবে। বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নানা প্রভাব খাটিয়ে এই আন্দোলনকে বিপথগামী করার চেষ্টা করবে। সে সম্পর্কেও সজাগ থাকতে হবে জনগণকে।

নেপালের এই ঐতিহাসিক ছাত্র-যুব উত্থান দেশের সর্বস্তরের শোষিত মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছে। ওলি সরকারের অন্যতম শরিক মাওবাদী কেন্দ্র এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্প্রতি প্রতিবাদে মুখর হলেও এবং এই দল রাজার শাসনবিরোধী সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে জেনেও এই দলের প্রতি মানুষের আস্থার অভাব ঘটেছে। কারণ এই দল রাজাকে উচ্ছেদের বিপ্লবের পর পুঁজিবাদী সরকারের অন্যতম শরিক হয়ে পুঁজিবাদী শাসনের সব সংকটের বোঝা জনগণের উপর চাপিয়েছে। যে সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে নেপালের মানুষ লড়েছে, তার সবই পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও তার পরিপূরক রাজনীতি থেকে উদ্ভূত। চড়া মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, কিছু লোকের হাতে বিপুল পুঁজি কেন্দ্রীভূত হওয়া, বৈষম্য বৃদ্ধি, সীমাহীন দুর্নীতি ইত্যাদি সমস্যা পুঁজিবাদী মুনাফাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সৃষ্টি। এর বিরুদ্ধেই নেপালি জনতার জেহাদ। কিন্তু জেহাদ বা আন্দোলন যতই তীব্র হোক, যত রক্তক্ষয়ী লড়াই হোক, যত কোরবানিই হোক, তা যদি এই মূল সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে চালিত না হয়, তা হলে তা কাঙ্খিত গণমুক্তি আনতে পারবে না। নেপালে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হতে যাচ্ছে, তার তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হবে, কোনও না কোনও শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বসবে। সেও পুঁজিবাদী সংবিধান মেনে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করবে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির সব আবিলতা ঘুরে ফিরে আসবে। আবার মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে পথে নামবে। সরকারের পর সরকার বদল হবে। কিন্তু মুক্তি আসবে না। পরিবর্তনের নামে এই চক্রাকার আবর্তনই কি শুধু ঘটবে? নেপালের মুক্তিকামী মানুষের সামনে এই ভাবনা না এসে পারে না।

এই গণঅভ্যুত্থান পুঁজিবাদী রাষ্ট্রশক্তির উপর প্রবল আঘাত হেনেছে। দরকার এর ভিত্তি উপড়ে ফেলা। সেই জরুরি কাজটি করার প্রয়োজনীয়তা মানুষের কাছে নানা দিক থেকে তুলে ধরার জন্য জরুরি দরকার একটি প্রকৃত বিপ্লবী দলের। নেপালের সংগ্রামী ছাত্র-যুব শক্তির কাছে মুক্তিকামী মানুষের এটাই প্রত্যাশা।