Breaking News

ধর্মের মোড়কে ‘শ্রম শক্তি নীতি-২০২৫’

‘শ্রমশক্তি নীতি ২০২৫’ সম্পর্কে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ত্রিপুরা হিতসাধনী হলে, এআইইউটিইউসি-র উদ্যোগে। কেন্দ্রীয় সরকার শ্রমিক স্বার্থবিরোধী শ্রমকোডের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের সমস্ত অর্জিত অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের অবাধ শোষণের পথকেই সুগম করছে। শ্রম ও শ্রমিকদের অধিকারকে গণতান্ত্রিক চেতনায় বিচার না করে ধর্মীয় দৃষ্টিতে বিচার করার মানসিকতা ও প্রক্রিয়া তৈরি করার জন্যই কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার এনেছে শ্রমশক্তি নীতি ২০২৫। শ্রমকোড সম্পর্কে বিভিন্ন স্তরে নানা আলোচনা হলেও এই শ্রমশক্তি নীতি নিয়ে আলোচনা খুব কম হয়েছে। এই আলোচনা সভার আয়োজন তাই শ্রমশক্তি নীতি ২০২৫ সম্পর্কে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও তার শ্রেণিচরিত্র উন্মোচন করতে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

মূল আলোচক ছিলেন শ্রম দপ্তরের প্রাক্তন আধিকারিক ডঃ কিংশুক সরকার। তিনি দেখান, বর্তমানে সংগঠিত শ্রমিক সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। শ্রমশক্তির অধিকাংশই আজ অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিযুক্ত। শ্রমশক্তিকে কার্যত শ্রমিক-মালিক প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বহির্ভূত করার প্রচেষ্টায় রত মালিক শ্রেণি। এই ব্যবস্থাকে আইনি স্বীকৃতি দিতেই কেন্দ্রীয় সরকার শ্রমকোড ও শ্রমশক্তি নীতি ২০২৫ এনেছে। তিনি বলেন, কারখানায় কাজ না পেয়ে আজ শ্রমিক কারখানার বাইরে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমিক বাজারে হাজির হচ্ছেন কাজের আশায়। অনেক শ্রমিক তাঁর শ্রমের ক্রেতা না পেয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন। সংগঠিত ক্ষেত্রের বেশিরভাগ কারখানায় আজ উৎপাদন হয় খুবই সামান্য। বিভিন্ন ছোট ছোট উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে তৈরি করে এনে এখানে অ্যাসেম্বলিং তথা জোড়া লাগানো হয় মাত্র। আগে ঠিকাদারদের মাধ্যমে পরিযায়ী শ্রমিকরা অন্য রাজ্যে কাজে যেত। আজ শ্রমিকরা নিজেরাই অন্য জেলা বা রাজ্যে গিয়ে কাজ খুঁজে নেয়। স্বল্প মজুরিতেই শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হয়। কৃষিতে প্রায় ৬৫ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োজিত থাকলেও দেশে জিডিপির মাত্র ১৪ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। এর থেকে বোঝা যায় কৃষি শ্রমিকদের মজুরি কত কম। চা বাগানে একজন শ্রমিককে দৈনিক প্রায় ২৪ কেজি পাতা তুলতে হয়। বিনিময়ে মজুরি সর্বাধিক ২৫০ টাকা পেতে পারে। কিন্তু বাগানে গাছের পরিচর্যা যথাযথ না হলে পাতা কোথা থেকে আসবে? বেশিরভাগ বাগানে শ্রমিকদের এই ২৫০ টাকা বেতন থেকেও কম উৎপাদনের জন্য অর্থ কেটে নেওয়া হয়। চা বাগান সংগঠিত শিল্প হওয়া সত্তে্বও এই তার অবস্থা। এ ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা আশানুরূপ নয়। শ্রমিক বাজারে নতুন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে অ্যাপ বেসড গিগ ওয়ার্কার। আগামী দিনে এই প্রথার মাধ্যমেই দেশে প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক নিয়োজিত হবে। এই শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ কোনও মালিক থাকবে না অর্থাৎ প্রচলিত ধারণায় যে শ্রমিক মালিক সম্পর্ক যাকে ভিত্তি করে শ্রম আইন বা শ্রমবিধি এর সবগুলোই কার্যত অকার্যকরী হয়ে যাবে। তিনি এই গিগ ওয়ার্কার ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিক এবং স্বনিযুক্ত প্রকল্পের শ্রমিকদের সংগঠিত করবার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি থেকে বঞ্চিত করলে তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্য না দিলে কার্যত তীব্র বাজার সংকট সৃষ্টি করা হবে। বাজারের উৎপাদিত পণ্য শ্রমজীবী মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে বেশি ভোগ করে। ফলে কম মজুরি দেওয়ার জন্য, যে ব্যবস্থার দিকে আমরা এগিয়ে চলেছি সেই ব্যবস্থা কার্যত বাজারে আরও তীব্র সংকট সৃষ্টি করবে। এআইইউটিইউসি-র রাজ্য সম্পাদক অশোক দাস বলেন, মালিকরা শত চেষ্টা করেও এবং বিভিন্ন কৌশল করেও শ্রমিক আন্দোলন দমন করতে পারবে না। সব দেশেই তারা এই চেষ্টা করেছে। কিন্তু সফল হয়নি। ভারতবর্ষের শ্রমিকরা মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন গড়ে তুলবে এবং শেষ পর্যন্ত মালিকি রাজ ধ্বংস করে শ্রমিক রাজ প্রতিষ্ঠা করবেই– এটাই বিজ্ঞান ও ইতিহাস নির্দিষ্ট পথ। তিনি আরও বলেন, শ্রমশক্তি নীতি ভারতের সামন্ত যুগের মনু স্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি, নারদ স্মৃতি, শুক্র নীতি ও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রকে ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তাই তারা বলেছেন, ‘শ্রমধর্ম’। এই ‘শ্রম শক্তি নীতি-২০২৫’ চতুঃর্বণের বৈষম্যমূলক নীতির ভিত্তিতে বিচার করা হয়েছে।

আধুনিক সমাজে মালিক-মজুর সম্পর্কের ভিত্তিতে উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। মালিকদের অবাধ শোষণকে আরও ভয়ঙ্কর করার জন্য ধর্মের মোড়ক লাগানো হচ্ছে। ওরা চাইছে যাতে এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন না ওঠে। মানুষ বিনা প্রশ্নে মেনে নেয় উৎপাদন পরিচালনা। ধর্মীয় মোড়কে তৈরি শ্রমশক্তি নীতির বিরুদ্ধে আদর্শগত ও শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলে একে প্রত্যাহার করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। বক্তব্য রাখেন সংগঠনের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড অনিন্দ্য রায়চৌধুরী।

(এই লেখাটি গণদাবী ৭৮ বর্ষ ২৯ সংখ্যা ২৭ ফেব্রুয়ারি – ৫ মার্চ ২০২৬ এ প্রকাশিত)