
সে দিন হঠাৎ দেখি চার যুবক বাড়ির দরজায় হাজির। হাতে গেরুয়া পতাকার ছবি দেওয়া দামি কাগজের রঙিন ফোল্ডার। কী ব্যাপার? না, কাকু আমরা শক্তিশালী ভারত গড়ার ব্যাপারে এসেছি, আপনারও সাহায্য দরকার। বললাম, শক্তিশালী ভারত গড়বে, ভাল কথা। কিন্তু তোমরা কারা? তোমাদের তো আগে কখনও দেখিনি। বললে, আমরা পাশের পাড়ায় থাকি। বললাম, তা তোমাদের হঠাৎ শক্তিশালী ভারত গড়ার এত আগ্রহ হল কেন? একটু কাঁচুমাচু মুখ করে বললে, আসলে, বুঝতেই তো পারছেন, ভোট এসে গেছে। কাজকর্ম তো কিছু নেই। দলের নেতারা বললেন, তোরা দৈনিক হিসেবে একটা পরিমাণ টাকা পেতে পারিস। প্রচারের কাজে লেগে যা। তাই আর কি। কয়েকটা মাস কিছু তো রোজগার হবে।
আর এক দিন দেখলাম পাড়ার চৌরাস্তার মোড়ে বেশ কয়েকটা বেঞ্চ পেতে কয়েকটা ছেলে বসে আড্ডা দিচ্ছে। মাথার উপর প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছবির ফ্লেক্স টাঙানো। পরিচিত একজনকে দেখে বললাম, কী আড্ডা চলছে? সে বললে, দাদা, এখন এইটাই কাজ। সামনে ভোট আসছে না! তা তুমি কী করে এখানে ভিড়লে? বললে, দুবেলা এখানে বসে থাকলেই কিছু টাকা পাওয়া যাবে। কিন্তু ওই ছেলেটি তো রাজ্যের শাসক দলের সমর্থক, ও এখানে কী করছে? বলল, ওকে আমিই ডেকে এনেছি। আসলে ওর-ও কোনও কাজ নেই। তাই আর কি! বোঝা গেল ভোটটাও এখন এমপ্লয়মেন্ট জেনারেটিং ইভেন্ট।
মনে মনে ভাবলাম, ভারত গড়া, দেশসেবা, রাজনীতি এ সব কিছুকে দলগুলি আর কত নিচে নামাবে! স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দেশসেবা, দেশগঠন ইত্যাদি সম্পর্কে যে উচ্চ ধারণা তৈরি করেছিলেন স্বাধীন দেশের শাসকরা তাকে কোথায় নামিয়ে এনেছে! এই ছেলেগুলো তো দলের কর্মী নয়। রাজনীতির র-ও বোঝে না, শুধুমাত্র ওদের বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে ভোটের ময়দানে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে এখন ভোট রাজনীতির নামে এই জিনিসই চলছে।
শাসক দলগুলির বিরাট খরচ আসে কোথা থেকে
কিন্তু শাসক দলগুলি এত টাকা খরচ করছে কী করে? সেই উত্তর পেতে ঢুকতে হবে আরও একটু গভীরে– রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, পুঁজিপতিদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে। ছোট কিংবা মাঝারি ব্যবসায়ীদের শাসক দলগুলিকে চাঁদা দেওয়ার কথা কারও অজানা নয়। আর বড় পুঁজিপতিরা যে এত দিন বিপুল অঙ্কের চাঁদা দিত তা-ও ছিল অনেকটাই গোপনে। এই গোপন লেনদেনকে আইনসিদ্ধ করতে বিজেপি এনেছিল ‘নির্বাচনী বন্ড’ ব্যবস্থা। গত লোকসভা নির্বাচনের আগে নির্বাচনী বন্ডে টাকা দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে এলে দেখা যায়, বন্ডের টাকা সব চেয়ে বেশি পেয়েছে শাসক বিজেপি। তা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। দেশ জুড়ে প্রতিবাদের মুখে পড়ে গত বছর সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনী বন্ডকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। কিন্তু তারপরেও বিজেপির তহবিলে কর্পোরেট সংস্থাগুলির টাকা দেওয়া বন্ধ হয়নি। এখন তারা পাচ্ছে নির্বাচনী ট্রাস্টের নামে। এই ট্রাস্টও শাসক দলগুলিকে ‘চাঁদা’ দেওয়ার জন্য পুঁজিপতিদেরই তৈরি করা সংস্থা।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দেশের রাজনৈতিক দলগুলি ৯টি নির্বাচনী ট্রাস্টের মাধ্যমে ৩৮১১ কোটি টাকা চাঁদা পেয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি একাই পেয়েছে ৩১১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৮২ শতাংশ। কংগ্রেস পেয়েছে ২০০ কোটি, বাকি বিরোধী দলগুলি মিলিত ভাবে পেয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তৃণমূল পেয়েছে ১০২ কোটি টাকা। যদিও এটি সম্পূর্ণ হিসেব নয়।
কিন্তু, এরা কারা, যারা এই বিপুল পরিমাণ টাকা দলগুলির তহবিলে দিচ্ছে?
প্রকাশিত হিসেব অনুযায়ী, বিজেপিকে সব চেয়ে বেশি অনুদান দিয়েছে প্রুডেন্ট নির্বাচনী ট্রাস্ট। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই ট্রাস্ট বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার থেকে অনুদান হিসেবে পেয়েছে ২৬৬৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে ২১৮০ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা তারা দিয়েছে নরেন্দ্র মোদী অমিত শাহের দলকে। এই ট্রাস্টকে অনুদান দিয়েছে জিন্দাল স্টিল অ্যান্ড পাওয়ার, মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং, ভারতী এয়ারটেল, অরবিন্দ ফার্মা, টরেন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো কর্পোরেট সংস্থা। প্রুডেন্ট নির্বাচনী ট্রাস্ট থেকে কংগ্রেস পেয়েছে ২১ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকা।
তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রোগ্রেসিভ নির্বাচনী ট্রাস্ট অনুদান হিসেবে পেয়েছে ৯১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলিকে ৯১৪ কোটি ৯৭ লক্ষ টাকা দিয়েছে তারা। সেই অর্থের প্রায় ৮১ শতাংশ অর্থাৎ ৭৫৭ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা গিয়েছে বিজেপির পকেটে। এই ট্রাস্টে মূলত অনুদান দিয়েছে টাটা গ্রুপের সংস্থাগুলি।
মাহিন্দ্রা কোম্পানির বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে নিউ ডেমোক্রেটিক নির্বাচনী ট্রাস্ট যে ১৬০ কোটি টাকা পেয়েছে, তার মধ্যে ১৫০ কোটি টাকাই তারা দিয়েছে বিজেপিকে। হারমনি নির্বাচনী ট্রাস্টের পাওয়া ৩৫ কোটি ৬৫ লক্ষের মধ্যে ৩০ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা গিয়েছে বিজেপির খাতায়। একই ভাবে ট্রায়াম্প নির্বাচনী ট্রাস্টও তাদের পাওয়া ২৫ কোটির মধ্যে ২১ কোটি টাকাই দিয়েছে বিজেপিকে।
পুঁজিপতিরা শাসক দলকে ‘চাঁদা’ দেয় কেন
এই সমস্ত বৃহৎ পুঁজিপতিরা বিজেপি কিংবা অন্যান্য শাসক দলগুলিকে বিপুল পরিমাণ টাকা চাঁদা হিসেবে দেয় তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই। দেশের শাসন ক্ষমতায় যখন যে দল থাকে তাদের কাছ থেকে পুঁজিপতিরা বিপুল পরিমাণে সুবিধা পেয়ে থাকে। আবার যে দলগুলি ক্ষমতায় নেই তাদেরও এরা বাঁচিয়ে রাখে ভবিষ্যতের স্বার্থে।
বিজেপি শাসন কার্যত দেশকে একচেটিয়া পুঁজির অবাধ লুটের ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রায় সব সংস্থা– রেল তেল গ্যাস ব্যাঙ্ক বিমান বন্দর পাহাড় জঙ্গল খনি যা কিছু দেশের সম্পদ, জনগণের সম্পদ, বিজেপি সরকার সব কিছুকে একচেটিয়া পুঁজির হাতে তুলে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে এই সব পুঁজিপতিদের বিপুল পরিমাণ টাকা কখনও অনুদান, কখনও প্যাকেজ, কখনও ঋণমকুব, কখনও করছাড় হিসাবেও দিয়ে চলেছে। আর এই যে অবাধ লুঠ, জলের দামে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাৎ, এর বিনিময়েই শাসক দলের তহবিলে এরই কিছুটা অংশ উপহার দেয় পুঁজিপতিরা। আর, ক্ষমতায় বসে সরকারি তহবিল তথা জনগণের সম্পদ নয়ছয় করা, বিলাস-ব্যসনে জীবন-যাপন করা, জনগণের উপর ছড়ি ঘোরানোর ব্যবস্থা করে দেয়। আবার এই শাসক দলগুলিই পুঁজিপতি শ্রেণির পলিটিক্যাল ম্যানেজার হিসাবে জনগণের সব ধরনের বিক্ষোভ-প্রতিবাদকে দমন করে গণবিক্ষোভ থেকে শোষণমূলক এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আড়াল করে রাখে। অর্থাৎ পুঁজিপতি শ্রেণি এবং শাসক দলের পারস্পরিক স্বার্থের বোঝাপড়াতেই জনগণের সম্পদের লুঠ চলে। উভয়ের এই স্বার্থকেন্দ্রিক বোঝাপড়াকে স্যাঙাৎতন্ত্র বলা হয়। বাস্তবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিপতি এবং তাদের সেবক শাসক দলগুলির চরিত্র নীতিহীন লেনদেনের।
সম্প্রতি টাটা গোষ্ঠী বিজেপি শাসিত গুজরাট ও আসামে দুটি সেমিকন্ডাক্টর কারখানা তৈরির বরাত পেয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এই কারখানাগুলির মূলধন বাবদ খরচের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৪৪,২০৩ কোটি টাকা বহন করার কথা ঘোষণা করেছে। আর তার কয়েক দিনের মধ্যেই টাটা গোষ্ঠীর ১৫টি সংস্থা প্রোগ্রেসিভ ইলেক্টোরাল ট্রাস্টকে ৯১৫ কোটি টাকা দেয়। ট্রাস্ট ১০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে তা ভাগ করে দেয়। তার মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ৭৫৮ কোটি টাকার সব চেয়ে বড় চেকটি। তা হলে ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে কোম্পানির ব্যাগে পুরে, যা আসলে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের করের টাকা, তা থেকে সাড়ে সাতশো কোটি টাকা টাটা ছুড়ে দিয়েছে বিজেপির তহবিলে। সম্প্রতি ইন্ডিগো বিমান বিভ্রাটের পর জানা গেল, ওই সংস্থা বিজেপিকে ৩১ কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছে। বিনিময়ে বিমানমন্ত্রক যাত্রী সুরক্ষার স্বার্থে পাইলট-বিমানকর্মীদের বিশ্রাম, কাজের পরিসীমা সংক্রান্ত যে নির্দেশিকা জারি করেছিল, ইন্ডিগোর জন্য সেই বিধি শিথিল করা হয়েছিল। অর্থাৎ এর কুফল বর্তাচ্ছে জনগণের উপর। গণদাবীর পাতায় আমরা আগে দেখিয়েছি, কী ভাবে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি শাসক দলকে ‘চাঁদা’ দিয়ে ভেজাল ওষুধের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, শোষিত মানুষের স্বার্থ এবং শোষক তথা পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ সম্পূর্ণ বিপরীত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়, যাকে পুঁজিবাদের অনুসারীরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলে, সেখানে সব দলই নিজেদের গণতান্ত্রিক দল বলে পরিচয় দেয়। বাস্তবে ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের বর্তমান প্রতিক্রিয়াশীল যুগে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক-কৃষক সহ সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক দাবিগুলি তুলে ধরে এবং তা রক্ষার জন্য লড়াই করে একমাত্র শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী দল। তাই শ্রমিক শ্রেণির দলটি যে শোষিত মানুষের স্বার্থ রক্ষাকারী দল তা প্রকাশ্যে বলতে তার দ্বিধা হয় না। অন্য দিকে শোষক পুঁজিপতি শ্রেণির দল কখনও প্রকাশ্যে স্বীকার করে না যে এটি তাদেরই দল।
নির্বাচনকে এই ‘চাঁদা’ কী ভাবে প্রভাবিত করে
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেণির দল এবং পুঁজিপতি শ্রেণির দল সবাইকেই একই শর্ত এবং একই নিয়ম-নীতি মেনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। এই রকম পরিস্থিতিতে পুঁজিপতি শ্রেণির মদতপুষ্ট শাসক দলগুলি নির্বাচনে নামে পুঁজিপতিদের দেওয়া বিপুল পরিমাণ টাকার ভাণ্ডার নিয়ে। সেই টাকা অবাধে খরচ করেই তারা বড় বড় সভা করে, প্রচার মাধ্যমগুলিতে বিজ্ঞাপন দেয় এবং তাদের বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতির কথা, যার অধিকাংশ মিথ্যায় ভরা, সেগুলি ভাড়াটে কর্মীদের দিয়ে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেয়। পুঁজিপতিদের পরিচালিত সংবাদমাধ্যমও তাদের তাঁবেদার দলগুলির ব্যাপক প্রচার দিয়ে সামনে নিয়ে চলে আসে। আবার এই টাকা খরচ করেই শাসক দলগুলি আমলাম্ভ্রতন্ত্র, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন প্রভৃতি সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করে।
শোষিত মানুষের তথা গরিব নিম্নবিত্ত শ্রমিক কৃষকের স্বার্থে যে দল লড়াই করে, শোষিত, দরিদ্র মানুষের থেকে তিল তিল পরিমাণে অর্থ সংগ্রহ করে তার গণআন্দোলন কিংবা নির্বাচনী খরচের তহবিল জোগাড় করতে হয়। শাসক শ্রেণি, শোষক শ্রেণি, পুঁজিপতিরা কখনও শোষিত শ্রেণির দল, শ্রমিক শ্রেণির দলকে অর্থ সাহায্য করতে পারে না। পুঁজিপতি শ্রেণি সেই দলকেই অর্থ সাহায্য করে যে দল তাদের স্বার্থ রক্ষা করে।
এর ফলে শ্রমিক শ্রেণির দল এক অসম লড়াইয়ের সম্মুখীন হয়। পুঁজিপতি শ্রেণির নীতিহীন রাজনীতি অর্থের জোরে, প্রচারের জোরে, ভাড়াটে কর্মী এবং দুষ্কৃতী বাহিনীর জোরে বহু সময়ই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়। এই অসম প্রতিযোগিতার মধ্যেও একটি যথার্থ শ্রমিক শ্রেণির দল শ্রেণিসংগ্রামের পতাকাকে উঁচুতে তুলে রেখে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিপতি শ্রেণির একনায়কত্বের বিষয়টি, গণতন্ত্রের নামে আসলে এই ব্যবস্থাটি কী ভাবে পুঁজিপতি শ্রেণিরই পক্ষে কাজ করে তা শোষিত মানুষের সামনে তুলে ধরে তাদের শ্রেণি সংগ্রামে শিক্ষিত করে তোলে।
গণতন্ত্রের নামে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নির্বাচনকে কার্যত পুঁজিপতি শ্রেণি তথা তাদের সেবাদাস দলগুলির একচ্ছত্র আধিপত্যের স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই অবস্থায় গণতন্ত্রে যে-কারও নির্বাচিত হওয়ার অধিকার বাস্তবে অন্তঃসারশূন্য শ্রুতিমধুর কথা মাত্র। শাসক দলগুলি নির্বাচনী খরচকে যে অস্বাভাবিক অঙ্কে পৌঁছে দিয়েছে কোনও সাধারণ মানুষ বা শ্রমিক শ্রেণির দলের পক্ষে সেই খরচ বাস্তবে সম্ভব নয় বা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। শুধু জামানতের খরচই লোকসভায় ২৫ হাজার এবং বিধানসভায় ১০ হাজার টাকা। নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনেই কোনও প্রার্থী লোকসভা নির্বাচনে ৯৫ লক্ষ টাকা এবং বিধানসভা নির্বাচনে ৪০ লক্ষ টাকা খরচ করতে পারে। বাস্তবে শাসক দলগুলি হিসাব বর্হিভূত ভাবে এর বহু গুণ খরচ করে এবং তা করে পুঁজিপতিদের দেওয়া টাকাতেই। স্বাভাবিক ভাবেই এই পরিমাণ অর্থ কোনও সৎ সাধারণ মানুষ বা শ্রমিক শ্রেণির দলের পক্ষে খরচ করা কার্যত অসম্ভব। তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ধনীরা ছাড়া সাধারণ মানুষের নির্বাচিত হওয়ার কোনও সুযোগই কার্যত নেই। এখানে গণতন্ত্রের প্রাণভোমরাটি লুকিয়ে থাকে পুঁজিপতিদের টাকার থলিতে।
বিকল্প নির্বাচন ব্যবস্থা
কিন্তু নির্বাচন মানেই কি এই? এর বিকল্প কোনও নির্বাচন ব্যবস্থা কি নেই যেখানে সাধারণ মানুষ চাইলে অংশ নিতে এবং নির্বাচিত হতে পারে? হ্যাঁ, রয়েছে বিকল্প নির্বাচন ব্যবস্থা। তা রয়েছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এক জন সাধারণ শ্রমিকও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারত। খরচ সেখানে কোনও প্রতিবন্ধক হতে পারত না। কারণ, অর্থনৈতিক অবস্থান নয়, সামাজিক দায়িত্বশীলতাই সেখানে নির্বাচিত হওয়ার প্রধান শর্ত ছিল। এমনকি প্রতিশ্রুতি মতো কাজ না করলে যে কোনও নির্বাচিত সদস্যকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচকদের ছিল।
পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যত একমাত্র ধনীদেরই নির্বাচিত হওয়ার অধিকার দিয়েছে। তাই লোকসভা এবং বিধানসভাগুলিতে এখন শ্রমিক, কৃষক কিংবা সাধারণ মানুষের কোনও প্রতিনিধির অস্তিত্ব প্রায় নেই। ৯০-৯৫ ভাগ প্রতিনিধিই কোটিপতি কিংবা বহু কোটিপতি। স্বাভাবিক ভাবেই সংসদ-বিধানসভাগুলিতে যে সব আইন বা নীতি পাশ হয় তা সাধারণ মানুষের পরিবর্তে পুঁজিপতিদের স্বার্থই রক্ষা করে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনী বন্ড বা নির্বাচনী ট্রাস্ট, শুধুমাত্র পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী দলগুলিকে সুবিধা দিতেই।