
যে কোনও মুহূর্তে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে জেনেও ওঁদের ছুটে চলতে হয়। এই অনন্ত ছুটে চলার মাঝে সাময়িক বিরতিরও অবকাশ মেলে না। ওঁরা অনলাইন সংস্থার কর্মী বা গিগ-কর্মী।
একটা অর্ডার ফোনে ভেসে উঠলেই জীবনের পরোয়া না করে বাইক বা সাইকেলে পড়ি কি মরি করে ছুটে দোরে দোরে পণ্য পৌঁছে দেন ওঁরা। মাত্র ১০ মিনিটে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছনোর প্রতিযোগিতায় ইতিমধ্যেই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন বহু গিগকর্মী। অনেক সময়ে পথচারীরাও আহত হন। জোম্যাটো, সুইগি, অ্যামাজন, ফ্লিপকার্টের মতো অনলাইন নির্ভর বিপণন সংস্থা বা ওলা, উবেরের মতো পরিবহণ সংস্থাগুলির কর্মীদের হাল এ রকমই। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৯-৩০ তে ভারতে এই ধরনের কর্মী সংখ্যা পৌঁছবে ২৩ কোটি ৫০ লক্ষে।
জীবনের পরোয়া না করা কি এতই সহজ! আসলে দুর্ঘটনা হতে পারে, মৃত্যু হতে পারে জেনেও ওঁদের এমন বেপরোয়া ছুটে চলার সিদ্ধান্ত নিতে হয় বাধ্য হয়েই। আর্থিক অনিশ্চয়তা, সরকারি-বেসরকারি চাকরির অভাব, ছাঁটাই এবং চটজলদি কাজে ঢোকার সুযোগ, উচ্চ ডিগ্রি বাধ্যতামূলক না হওয়াই এই কাজে বেকারদের ভিড় বাড়িয়ে তুলছে। আবার গিগ সংস্থাগুলি নিজেদের প্রতিযোগিতার কারণে, কত কম সময়ে অর্ডার জোগান দেওয়া যায় তার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। তার শিকার হন কর্মীরা।
গতিময় আধুনিক জীবনে অনেকেই অনলাইনে অ্যাপনির্ভর নানা সংস্থায় অর্ডার দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করেন। অ্যাপভিত্তিক এই পরিষেবার চাহিদার অনেকটাই যেহেতু সন্ধ্যে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বেশি থাকে, সে জন্য অনেক ছাত্র, বেকার যুবক এবং অন্যত্র সামান্য পারিশ্রমিকে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ এই কাজ করে কিছুটা বাড়তি আয়ের চেষ্টা করেন।
একমাত্র উপার্জনকারী বাবার মৃত্যুর পর বেহালার রাহুল সংসারের হাল ধরতে উচ্চশিক্ষার আশা ছেড়ে দিয়ে এই কাজে ঢুকেছেন। কোনও রকমে দিন চলে। চাঁদনি চকের বছর তিরিশের গিগ শ্রমিক নাদিম বলেন, ‘দশ মাস আগে এক পথদুর্ঘটনায় তিন মাস কোমায় থাকার সময়েও কোম্পানি থেকে কোনও সাহায্য পাইনি।’ পরে কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। ‘সাত ঘণ্টা কাজ করে ১১টি অর্ডার সাপ্লাই দিয়ে হাতে পাই মাত্র ২৬৩ টাকা। কখনও কখনও একটানা ১২ ঘণ্টা কাজ করে হয়ত হাজার খানেক টাকা আয় হয়। সংসার চালানো কষ্টকর।’ বলেন ডেলিভারি পার্টনার আমন।
‘গিগ’ শ্রমিক শব্দটিতে বোঝায় সাময়িক ভাবে নিযুক্ত শ্রমিক। এঁরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। শ্রমিকের কোনও নিয়ম-বিধি এঁদের ক্ষেত্রে মানা হয় না। তা সত্তে্বও প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ওঁরা কোম্পানি মালিকদের লাভ নিশ্চিত করেন। নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে না পৌঁছতে পারলে এক দিকে কোম্পানি-মালিক টাকা কেটে নেয়, অন্য দিকে রাস্তায় ট্রাফিক নিয়মবিধি লঙ্ঘনের দায়ে পুলিশি জরিমানার ভয়ে ত্রস্ত থাকতে হয় এঁদের।
গত ২৫ ও ৩১ ডিসেম্বর গিগ শ্রমিকরা দেশজোড়া ধর্মঘটে সামিল হন। এঁরা ধর্মঘটের পথে যেতে বাধ্য হলেন কেন? কেন্দ্রীয় সরকার প্রবর্তিত নয়া শ্রমকোডের মাধ্যমে এঁদের ন্যূনতম অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বেতন নেই, সামাজিক সুযোগ-সুবিধা নেই, সুরক্ষা নেই, অতিরিক্ত পরিশ্রমে অসুস্থ হলে বা পথদুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসার জন্য কোম্পানি কোনও সাহায্য করে না। অথচ ওঁরাই নাকি বিজনেস পার্টনার! পরিচালকমণ্ডলীতেও ওঁদের কোনও প্রতিনিধি রাখা হয় না। ব্যবসার কোনও লভ্যাংশ ওঁরা পান না, তা হলে ওঁরা কী ভাবে বিজনেস পার্টনার হতে পারেন? আসলে ব্যবসায় অংশীদারিত্বের কথা বলে ওঁদের শ্রমিকের সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখার এ এক আধুনিক কৌশল। কারণ ‘পার্টনার’ না বলে ‘কর্মচারী’ বললে নিয়ম অনুযায়ী এঁদের ন্যূনতম মজুরি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, স্বাস্থ্যবিমা, পেনশনের সুবিধা দিতে হবে। দিতে হবে ন্যায্য ছুটিও। সে জন্যই এই ফাঁক রাখা। দেশে শপস অ্যান্ড এস্টাবলিশমেন্ট রেজিস্টে্রশন সংস্থা আছে। মালিকী বঞ্চনার এই কৌশলে প্রচলিত শ্রম আইন বা শ্রমিক সুরক্ষা বিধির কোনও কিছুই এদের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। নতুন শ্রমকোড হওয়ার পর ২০২৫-এর শেষ দিকে অসংগঠিত শ্রমিকরা (এর মধ্যে রয়েছেন গিগ শ্রমিকরা), সামাজিক নিরাপত্তার (সোসাল সিকিউরিটি) আইনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই প্রথম অসংগঠিত শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ, স্বাস্থ্য বিমা ইত্যাদি আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। সবই শুকনো ঘোষণা– সেগুলি কার্যকর হয়নি। শ্রমবিধিতে যে বেতন কাঠামোর কথা বলা হয়েছে তা-ও মানা হচ্ছে না। কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় সরকারেরই এঁদের নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। সাম্প্রতিক রাজ্য বাজেটে এঁদের নিরাপত্তা নিয়ে একটি কথাও নেই।
চরম বঞ্চনার শিকার গিগ শ্রমিকদের সমর্থনে শ্রমিক সংগঠন এআইইউটিইউসি গিগ কর্মীদের স্বচ্ছ, উপযুক্ত ও সুনির্দিষ্ট মজুরি এবং যুক্তিসঙ্গত ইনসেনটিভ চালু করা, যুক্তিসঙ্গত কাজের সময় ও আবশ্যিক বিশ্রামের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। দাবি তুলেছে, যখন তখন আইডি ব্লক এবং জরিমানা করা বন্ধ করতে হবে। গিগ কর্মচারীদের সম্পূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বিমা, পেনশন, কাজের স্থায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রে যথাযথ সম্মান দিতে হবে। গিগ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলির মান্যতা দিয়ে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলিকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থায় তীব্র বাজার সংকটের সময়েও দ্রুত প্রসার বাড়ছে এই সব ক্ষেত্রের। উৎসবের সময় যখন চাহিদা তুঙ্গে থাকে তখন তো বটেই, অন্যান্য সময়েও ব্যাপক হারে লাভ করছে এই কোম্পানিগুলি। অ্যামাজনে ২০২৫-এ মোট লাভ হয়েছে ৭৭.৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪ থেকে ‘২৫ সালে মোট মুনাফা বেড়েছে ৩১ শতাংশ। জোম্যাটো গত অক্টোবর-ডিসেম্বরে মোট লাভ করেছে ১২০ কোটি টাকা।
তা হলে উদয়াস্ত খেটে যে শ্রমিকরা লাভের কড়ি মালিকের ঘরে তুলছে, জীবন বিপন্ন করে মালিকের লাভ বাড়িয়ে তুলছে, তাদের প্রতি এত অবহেলা কেন? কারণ সরকারি আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি এমন করেই তৈরি করা যাতে কোম্পানি-মালিকরা যতই শ্রমিক-শোষণ করুক, তাদের শাস্তির মুখে পড়তে না হয়, গোটা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা এবং সবচেয়ে নিষ্পেষিত গিগ শ্রমিকরা ইউনিয়ন করে মালিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার সুযোগ না পান। গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র– পুলিশ-প্রশাসন, এমনকি বিচারবিভাগ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ভাবে বা পরোক্ষে মালিকদের পক্ষ নেয়। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি গৃহপরিচারিকা সম্পর্কিত এক রায়ে বলেছেন, ঝাণ্ডাধারীদের জন্যই বেশ কিছু শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। ওই বিচারপতির এই বক্তব্য আদৌ সত্য নয়। সরকারগুলিও শ্রমিক অধিকার রক্ষার বিরুদ্ধে এক সুরে কথা বলে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি শ্রমিক স্বার্থবিরোধী শ্রমকোড বাতিলের দাবিতে ১০টি বামপন্থী কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের আহ্বানে ধর্মঘটে শ্রমিকরা যখন একজোট, তখন দেখা গেল ধর্মঘটের বিরুদ্ধে কেন্দ্র-রাজ্যের এক সুর। মুখে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা করা রাজ্য সরকার কর্মচারীদের উদ্দেশে ‘ধর্মঘটে যোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার’ নোটিস জারি করল। আশাকর্মী ও পৌর স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘটের বিরুদ্ধেও কেন্দ্র-রাজ্যের এই ঐক্য দেখা গিয়েছিল। আসলে সরকারগুলি খোলাখুলি মালিক শ্রেণির সেবাকরছে, তারা কেউই শ্রমিকের স্বার্থ দেখে না। বহু হইচই হওয়ার পরে সম্প্রতি ই-কমার্স সংস্থা ব্লিঙ্ককিটকে দশ মিনিটের মধ্যে ডেলিভারি দেওয়ার ফতোয়া প্রত্যাহার করে নিতে বললেও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। ফলে দ্রুত পরিষেবা দিতে গিয়ে কত গিগ-শ্রমিকের মৃত্যু হল, কত পরিবার পথে বসল, বেপরোয়া বাইক চালানোয় কত পথচারী বিপদগ্রস্ত হল, তার খোঁজ কোম্পানি বা সরকার রাখে না, রাখতে চায় না।
এটাই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার নিয়ম। এই অর্থব্যবস্থায় এটাই শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ। অসহনীয় এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি কোন পথে শ্রমিকদের আজ তা খুঁজে বের করতেই হবে।