
শুধুমাত্র বাংলা বলার অপরাধে নৃশংস গণপিটুনিতে মৃত্যু হল ১৯ বছরের পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল শেখের, ২৪ ডিসেম্বর।
‘আমাদের সংসারে ও একমাত্র রোজগেরে ছিল। দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে ২০ ডিসেম্বর থেকে ওড়িশার সম্বলপুরে কাজ শুরু করেছিল। এখন আমরা বাঁচব কী করে? আমরা দুষ্কৃতীদের কঠোর শাস্তি চাই।’ জুয়েল শেখের মৃতদেহ মুর্শিদাবাদের সুতিতে পৌঁছলে কাঁদতে কাঁদতে বললেন তাঁর মা নাগিনা বিবি।
অভাবের সংসারে বাবা-মা আর ছোট দুটি বোনের খরচ চালাতে জুয়েলকে এই অল্প বয়সেই রাজ্য ছেড়ে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে যেতে হয়েছিল সম্বলপুরে। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে জুয়েলের সহকর্মী পল্টু শেখ বলেন, কাজ থেকে ফেরার সময় জুয়েল সহ আট পরিযায়ী শ্রমিকের রাস্তা আটকে আধার কার্ড দেখতে চায় কয়েক জন। তারপর বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে বাঁশ, রড দিয়ে মারধর শুরু করে ওই দুষ্কৃতীরা। গণপিটুনিতে বাকিরা আহত হয়, পুলিশ জুয়েলের নিথর দেহ উদ্ধার করে। দু’জন সম্বলপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিজেপি শাসিত ওড়িশার পুলিশ অবশ্য ঘটনাকে লঘু করে দেখাতেই বেশি সক্রিয়।
ঘটনাক্রম বলছে, তামিলনাড়ূর চেন্নাইয়ে ওয়ি শেখ নামে এক পরিয়ায়ী শ্রমিককে কয়েক মাস ধরে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর নৃশংস গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে ছত্তিশগড়ের এক যুবকের। ৩১ বছর বয়সী যুবক রূপনারায়ণ কাজের সন্ধানে কেরালার পালাকাড জেলায় পৌঁছতেই কয়েক জন তাকে আটক করে। তারপর বাংলায় কথা বলতে শুনে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে পিটিয়ে মারে। ঘটনায় অভিযুক্ত যে পাঁচ জন গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই আরএসএস-বিজেপির সদস্য।
আতঙ্ক সৃষ্টি, একটা অংশের খেটেখাওয়া মানুষের বিরুদ্ধে আর একটা অংশের মানুষকে খেপিয়ে তোলা, এক অংশকে অন্যদের সমস্যার জন্য দায়ী করা– এটাই আজকের দিনে বিশ্ব জুড়ে দক্ষিণপন্থী শাসক দলগুলির কৌশল। বিজেপি প্রথমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে জিগির তুলেছে। তারপর সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখিয়েছে। এখন ঘুসপেটিয়া বা অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে এমন প্রচার করছে যেন সকলের পাশের ঘরেই শত শত অনুপ্রবেশকারী লুকিয়ে আছে! রাজ্যে রাজ্যে বাংলাদেশি বলে বাংলাভাষীদের উপর হামলা বিজেপি-আরএসএসের পরিকল্পিত নীতি। তারা দেখাতে চায় বাংলাদেশিরা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনুপ্রবেশ নিয়ে তাদের বক্তব্য কতখানি সত্য! অথচ এসআইআর করে কত জন অনুপ্রবেশকারী তারা ধরল তা-ও বলতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। এই পরিস্থিতিতে বাংলাভাষী মানুষ বিজেপির সহজ শিকারের লক্ষ্য। আর তাঁরা মুসলমান হলে তো কথাই নেই!
বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় বসার পর থেকে এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। পূর্বের শাসক কংগ্রেসের ছেড়ে যাওয়া জুতোয় পা গলিয়ে বিদ্বেষের-ঘৃণার-বিভেদের বীজ রোপণ করেছে বিজেপি। বর্তমানে তা ব্যাপক আকার নিয়েছে। নিজেদের হীন স্বার্থ পূরণ করতে তারা এ সবে উস্কানি দিচ্ছে। কারণ শাসক দল হিসেবে তারা সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন শিক্ষা, চিকিৎসা, কাজের প্রাপ্য অধিকার তো দিচ্ছেই না, উল্টে যতটুকু ছিল তা-ও কেড়ে নিচ্ছে। ফলে জনসাধারণের ক্ষোভ যাতে তাদের বিরুদ্ধে না যায়, জনসাধারণ যাতে বিভেদের পাঁকেই ডুবে থেকে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষকে, এক জাত-বর্ণের মানুষ অন্য জাত-বর্ণের মানুষকে শত্রু বলে মনে করে, তার জন্যই হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ হুজুগ তোলা।
আর পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস যতই বিজেপির বাংলা-বিদ্বেষী প্রচারকে এই সব নৃশংস ঘটনার কারণ বলে হইচই ফেলে দিক, তাদের নেতাদেরও জবাব দিতে হবে আজ কী জন্য সদ্য সাবালক বা নাবালকরা পর্যন্ত কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছে? তারা তাদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করেননি কেন? এখানকার অতি লাভজনক চা-শিল্প, পাট-শিল্পের মতো শিল্প-কারখানাতে লালবাতি জ্বলছে কেন? পুঁজিবাদের মৃতপ্রায় দশায় নতুন করে হাজারে-হাজারে শিল্পকারখানা না হতে পারে, কিন্তু লাভজনক শিল্পগুলি মরে-হেজে যাচ্ছে কেন? তাদের কি তাতে কোনও দায় নেই? তারা এক একবার কোনও পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করছেন, পরিবারের পাশে থাকার কথা বলছেন কিংবা বিজেপিকে দায়ী করছেন। সেটুকুই কি যথেষ্ট? পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তার দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বা সংসদে তাদের কি আরও অনেক বেশি সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজন ছিল না?
এ রাজ্যের বাংলাভাষী মানুষ ভারতেরই নাগরিক। দেশের যে কোনও প্রান্তে তাদের অবাধ যাতায়াত, নিশ্চিন্তে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি রাজ্য সরকারেরও দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। সত্যিই যদি তারা পরিযায়ী শ্রমিকদের দুদর্শার কথা ভাবতেন, শুধু নির্বাচনের আগে তাদের ভোটার হিসেবে না ভেবে তাদের মানুষ ভাবতেন, তা হলে রাজ্যে সারা বছর তাদের বেঁচে থাকার মতো কাজের ব্যবস্থা এবং সারা দেশে তাদের নিশ্চিত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হতেন।