ক্লাবকে ১ লাখ ১০ হাজার, মিড ডে মিলে ৬.৭৮ টাকা

এ বছর পুজোয় ক্লাবগুলির জন্য সরকারি বরাদ্দ ৮৫ হাজার থেকে এক লাফে বেড়ে হল ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। ৩১ জুলাই নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে পুজো কমিটিগুলির সাথে এক মিটিংয়ে রাজ্যের ৪৫ হাজারের বেশি কমিটির জন্য এই অনুদান ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। এর জন্য কোষাগার থেকে ৪৯৫ কোটি টাকা খরচ হবে, যা গত বছরের থেকে ২০০ কোটি টাকারও বেশি। এ ছাড়া বিদ্যুতে ৮০ শতাংশ ছাড়, অগ্নি সুরক্ষা সহ নানা ক্ষেত্রে ছাড় ঘোষিত হয়েছে।

তিনি ওই দিন নিলাম হাঁকার মতো বলেছেন, ‘কত বাড়াব– ৯০ হাজার, ৯৫ হাজার, না এক লাখ! তা হলে ১ লাখ ১০ হাজার করে দিলাম।’ যেন তিনি নিজের টাকা ক্লাবগুলিকে দিচ্ছেন! আসলে জনগণের বহু কষ্টে অর্জিত টাকার একটা অংশ, যা ট্যাক্স হিসাবে কেটে নেওয়া হয় নানা ভাবে, তা থেকেই সরকারি কোষাগার, সেখান থেকেই টাকা দিচ্ছে সরকার। পুজোর জন্য সরকারি টাকা দেওয়া হবে কেন এটাই মূল প্রশ্ন। সেটা উহ্য রেখে মুখ্যমন্ত্রী জনগণের টাকায় দানবীর সাজছেন!

মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘পুজোতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়।’ পাড়ায় পাড়ায় পুজো, তাকে কেন্দ্র করে উৎসবে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ মেতে ওঠেন। এই উপলক্ষে ছোটখাটো ব্যবসা করে বেশ কিছু মানুষ কিছু রোজগারও করেন। কিন্তু তার সাথে ক্লাবে টাকা বাড়ানোর সম্পর্ক কী? টাকা বাড়ালে এদের ব্যবসার কলেবর কি বাড়বে, না পুজোর উদ্যোক্তা ক্লাবগুলি তাদের সাহায্যের জন্য আলাদা কোনও ব্যবস্থা করবে? তার ব্যাখ্যা অবশ্য দেননি তৃণমূল নেত্রী। তৃণমূল কংগ্রেসের আর এক নেতা বলেছেন, পুজোর উপকরণ সহ সব জিনিসের দাম বেড়েছে, ফলে অনুদানবৃদ্ধি অসঙ্গত নয়। এই যুক্তিরও কোনও সারবত্তা নেই। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় যাওয়ার আগেও মূল্যবৃদ্ধি হত, তখনও ক্লাবগুলি জনগণের চাঁদায় পুজোর আয়োজন করত। সরকারি বরাদ্দের প্রয়োজন হয়নি। কেউ আশাও করত না যে, সরকার পুজোর জন্য টাকা দেবে। আর তা ছাড়া মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারে সত্যিই মাথাব্যথা থাকলে শিশুপুষ্টির জন্য মিড ডে মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধিতে এত কার্পণ্য কেন সরকারের? মিড ডে মিলের জিনিস যে বাজারদরে কেনা হয়, পুজো-উপকরণও তো সেই একই দরে কেনা হয়। তা হলে মিড ডে মিলে নামমাত্র বরাদ্দ প্রাথমিকে ছাত্রপিছু ৬ টাকা ৭৮ পয়সা এবং উচ্চ প্রাথমিকে ১০ টাকা ১৭ পয়সা তারা করতে পারলেন কী করে?

ক্লাবগুলির জন্য বরাদ্দ বাড়ছে হাজার হাজার-লক্ষ টাকায়, আর মিড ডে মিলে ‘ভিক্ষার দান’ সামান্য পয়সায়। নামমাত্র ভাতার বিনিময়ে যে মিড ডে মিল কর্মীরা নানা প্রতিবন্ধকতা সত্তে্বও শিশুদের পুষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করেন, তারা ভাতা বাড়ানোর দাবি করলে সরকার তখন বধির হয়ে যায়। বঞ্চিত আশা ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা বিপদকে তুচ্ছ করে নারী-শিশুদের পুষ্টি ও চিকিৎসা পরিষেবা দিয়েও, সরকারি কর্মীর স্বীকৃতি সহ নানা দাবিতে আন্দোলন করলে পুলিশ দিয়ে তার মোকাবিলা করে তৃণমূল সরকার। সরকার টাকার অজুহাত দিয়ে বছরের পর বছর লক্ষ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ না করায় শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারী এবং পরিকাঠামোর অভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা বিপন্ন, শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে।

সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা সাধারণ মানুষের প্রায় নাগালের বাইরে। ফাইলের ভিড়ে সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধা পান না বহু মানুষ। রাজ্যে ট্রমা কেয়ার সেন্টার কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। জীবনদায়ী ওষুধ নেই। কেমোথেরাপি, ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, স্টে্রাকের ইঞ্জেকশন, জলাতঙ্কের প্রতিষেধক, হিমোফিলিয়ার ইঞ্জেকশনের মতো জরুরি ওষুধ নেই। সারা রাজ্যে মাত্র ২০০টি লড়ঝড়ে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্স। কারণ সরকারের কোষাগার খালি! অথচ অনুদানে অর্থের ঘাটতি নেই। শুধু কি পুজো-ভাতা, তালিকায় রয়েছে ইমাম-ভাতা, মোয়াজ্জেম ভাতা।

আগে প্রায় সব পুজো কমিটি বা ক্লাবের সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ড এলাকার মানুষকে আনন্দে ভরিয়ে তুলত। এখন মুষ্টিমেয় কিছু ক্লাবের প্রগতিশীল নানা ভূমিকা থাকলেও সামাজিক অবক্ষয়ের সাথে সাথে অনেক ক্লাবই অনুদানের আশায় শাসক দলের লেজুড়ে পরিণত। তোলাবাজি, কাটমানি আদায়, দুর্নীতি এবং যে কোনও অসামাজিক কাজেও এই সব ক্লাব সদস্যদের বোড়ে হিসাবে কাজে লাগায় নেতারা। নেতা-পুলিশের সাথে এদের একটা অশুভ চক্র গড়ে উঠেছে পাড়ায় পাড়ায়। এদের কথামতো না চললে শাসানি, জরিমানা আদায়, এলাকা থেকে বাস উঠিয়ে দেওয়া, দাদাগিরি অবাধে চলতে থাকে। এদের খুশি রাখতেই মোচ্ছব করার অনুদান যোগালেন মুখ্যমন্ত্রী!

তা হলে পুজো অনুদানের আসল অঙ্কটি কী? আসল হল ভোট। তার জন্য চাই ভোটলুটের একদল ভাড়াটে বাহিনী, যারা তৃণমূল নেতাদের নির্দেশ মতো কাজ করবে। সামনেই ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন। তাকে পাখির চোখ করে একদিকে বাঙালি অস্মিতার আবেগকে আশ্রয় করে, অন্য দিকে পুজো-অনুদান বাড়িয়ে বিশাল সংখ্যক যুবককে খাও-জিও-পিও-র কুরুচিকর সংস্কৃতিতে ভাসিয়ে দিয়ে নিজেদের তাঁবে রাখার কৌশল নিয়েছে সরকার। কারণ পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি আর অন্যায়ের পাঁকে ডুবতে ডুবতে শাসক দলের এখন ‘ঠগ বাছতে গা উজাড়’ অবস্থা।

তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ বাড়ছে। জনপ্রিয়তার হাওয়ায় ভোটবাক্স পূরণের দিন তাদের শেষ। সে জন্য যে কোনও ধরনের দুর্নীতি থেকে পার পেতে এবং ভোটে জিততে এই ভাড়াটে-বাহিনীই ভরসা, যারা নেতাদের নির্দেশ মতো নরমে-গরমে যে কোনও উপায়ে সরকারের পক্ষে ভোট করাবে। সেই লক্ষে্যই পুজো-অনুদান বৃদ্ধি–পুজোর অর্থনীতি, ব্যবসা বৃদ্ধি নিছক অজুহাত মাত্র।