Breaking News

কোম্পানি দাবি না করলেও কেন্দ্রীয় সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ব্যবস্থা করেছে

ফাইল ফটো

বর্তমানে বিদ্যুৎ একটা অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বিদ্যুৎ এক সময় পরিষেবা হিসেবে ছিল। সরকারি উদ্যোগে ন্যায্য দামে তা গ্রাহকদের দেওয়া হত। এখন তা বিপুল লাভের জায়গা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ডব্লিউবিপিডিসিএল নিট মুনাফা করেছে ৩২৪ কোটি টাকা। তা থেকে রাজ্য সরকারের কাছে জমা পড়েছে ১০৪ কোটি টাকা। সংবাদে প্রকাশ, বিদ্যুৎ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে ২০৭ কোটি ৯৯ হাজার টাকার চেক তুলে দিয়েছেন। এই তথ্য দেখাচ্ছে, বিদ্যুৎ মোটেই লোকসানের ক্ষেত্র নয়। বিদ্যুৎ সংস্থাগুলি দাম বাড়ানোর আগে লোকসানের যে কথা ভাসিয়ে দেয়, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। লোকসানের কথা তারা বলে দাম বৃদ্ধিকে যুক্তিসঙ্গত দেখানোর জন্য, যাতে জনগণ তা মেনে নেয়।

অন্য রাজ্যের একটি চিত্র দেওয়া যাক। মহারাষ্ট্রে বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি টাটা পাওয়ার ২০২৪ -২৫ অর্থবর্ষের জন্য ১২ শতাংশ দাম বৃদ্ধির আবেদন জানিয়েছিল কমিশনের কাছে। কিন্তু মহারাষ্ট্র বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশন নিজেই ২৪ শতাংশ দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এ তো মেঘ না চাইতেই জল! সরকার না কল্পতরু! সরকার জনগণের এমন ক’টা দাবি মেনেছে? মালিকরা যা চায় সরকার বহু ক্ষেত্রে তার অনেক বেশিই দেয়। কিন্তু জনগণ যা চায়, তার ছিটেফোঁটাও দেয় না। সরকার কার স্বার্থে– এ নিয়ে আলাদা করে আলোচনার আর প্রয়োজন পড়ে না।

বিদ্যুতে লোকসানের কোনও বাস্তব অবস্থা নেই, উপায়ও নেই। কারণ বিদ্যুৎ আইন ২০০৩-এ বণ্টন কোম্পানিগুলোকে ১৬.৫ শতাংশ মুনাফা যুক্ত করেই দাম ঠিক করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ হল অন্ন-বস্তে্রর মতো একটি অত্যাবশ্যকীয় জিনিস। এর চাহিদার কোনও ঘাটতি নেই। বাজার সংকট নেই। রয়েছে নিশ্চিত মুনাফা এবং স্থিতিশীল বাজার। ক্রমবর্ধমান বাজার। এই বাজারে পুঁজিপতিদের ব্যবসা করার বড়ই আশা। সেটা পূরণ করতেই বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে পুরোপুরি বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।

এ জন্য নিয়ে এসেছে বিদ্যুৎ সংশোধনী বিল ২০২৫। বেসরকারি মালিকরা যাতে সহজে বিদ্যুৎ বিল আদায় করতে পারে, সে জন্য প্রতিটি গ্রাহকের বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসিয়ে দিতে চাইছে সরকার। গ্রাহক আন্দোলনের চাপে স্মার্ট মিটার বসানো স্থগিত থাকলেও সরকারের লক্ষ্য যাতে দ্রুত বসিয়ে দেওয়া যায়। মালিকপক্ষ স্মার্ট মিটার চাইছে অন্য একটি কারণেও। তা হল এআই চালিত এই মিটারিং ব্যবস্থায় নানা কারচুপি ঘটিয়ে অনেক বেশি টাকা গ্রাহকদের থেকে আদায় করা যায়।

এই বিলে বলা হয়েছে, গত বিদ্যুৎ আইন ২০০৩-এর উদ্দেশ্য ছিল, লোডশেডিং-এর হাত থেকে মুক্ত করে ভারতবর্ষে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদাকে সামনে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা। আর এই বিদ্যুৎ বিল ২০২৫-এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, বণ্টন কোম্পানিগুলোর অর্থ বিনিয়োগকে উৎসাহব্যঞ্জক ও সারা বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য স্বাধীন নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠন গড়ে তোলা। এ ভাবেই নাকি ১৯৪৭-এ বিকশিত ভারত গড়ে উঠবে। বিলে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ আইন ২০০৩-এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বেসরকারিকরণ করা হয়েছে, যার ফলে বর্তমানে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫৫ শতাংশের বেশি করছে প্রাইভেট কোম্পানিগুলো, যেমন টাটা, গোয়েঙ্কা, আদানি, আম্বানি, এসার, টোরন্টো, জিন্দালের মতো দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিরা।

এই বিলে এমনও বলা হয়েছে যে, যদি কোনও বছর কোনও বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি তাদের সে বছরের বিদ্যুতের মাশুল নির্ধারণ করার জন্য বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছে কোনও আবেদন না করে, তা হলেও কমিশন নিজেই সে বছরের ট্যারিফ নির্ধারণ করে দেবে। অর্থাৎ কোম্পানি দাম বাড়াতে না চাইলেও কমিশন নিজেই তাদের দাম বাড়িয়ে তাদের মুনাফা অতিবৃদ্ধির ব্যবস্থা করবে। পুঁজিপতিদের সেবায় এমন কল্পতরু সরকার কটা আছে! জনগণের জন্য এমন কল্পতরু সাজতে কখনও কোনও সরকারকেই কিন্তু দেখা যায় না।