
পশ্চিমবঙ্গে যখন মাধ্যমিক পাশ থেকে শুরু করে পিএইচডি ডিগ্রিধারী যুব সমাজ ‘যুব সাথী’ প্রকল্পের লাইনে মাসে ১৫০০ টাকা ভাতার জন্য ফর্ম জমা দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে তামিলনাড়ূ সরকারের সকলের জন্য বিনা পয়সায় বিদ্যুৎদেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ প্রশ্ন তুলেছে– ঠিক ভোটের আগে কেন এই সিদ্ধান্ত?
এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ১৯ ফেব্রুয়ারি সমস্ত রাজ্য সরকারের উদ্দেশে মন্তব্য করেছে– আপনারা যদি সকাল থেকে বিনা পয়সায় খাবার, সন্ধ্যায় সাইকেল দিতে শুরু করেন আবার বিনা পয়সায় বিদ্যুৎও দেন, তা হলে কে আর কাজ করবে? অনুদান দিতে গিয়ে রাজ্য সরকারের রাজকোষ ঘাটতি ও ঋণ বৃদ্ধির সমস্যার কথাও তুলেছে আদালত। একই সাথে পরামর্শ দিয়েছে– রাজ্যগুলির উচিত কর্মসংস্থান তৈরির ওপর জোর দেওয়া। বিচারপতিরা বিদ্যালয়, রাস্তাঘাট, পরিকাঠামো, হাসপাতাল ইত্যাদি তৈরিতে সরকারকে খরচ বাড়াতে বলেছেন।
আপাত অর্থে এই কথাগুলির বিরোধিতা বেশিরভাগ মানুষই করবেন না। কিন্তু আরও একটু তলিয়ে ভাবা দরকার, ৭৯ বছরের পুরনো ‘গণতান্ত্রিক’ ভারতে সংসদীয় গণতন্তে্রর ক্ষয়টা কোন স্তরে পৌঁছলে অনুদান বিলিই নির্বাচনে প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে! আরও ভাবা দরকার কেন মানুষের সমর্থনকে সামান্য অনুদানে কিনে নেওয়া সম্ভব হতে পারছে?
ভোটের আগেই এমন নানা প্রকল্প ঘোষণা এখন ভারত জুড়ে খুব স্বাভাবিক ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধি ও সদ্য চালু হওয়া ‘যুব সাথী’ প্রকল্প যে ভোটকে সামনে রেখেই, তা মানুষের কাছে স্পষ্ট। কিছুদিন আগে বিহারে ভোটের ঠিক আগে ঘোষণা হয়েছিল মহিলাদের জন্য ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা। ভারতের সমস্ত রাজ্যের শাসক এবং তাদের বিরোধীরাও আজ এই কাজে জড়িয়ে। ভোটের সময় এলেই যেন নিলাম ডাকার মতো নানা দলের নেতারা প্রতিশ্রুতির পারদ চড়াতে থাকেন। কিছুদিন আগেই মহারাষ্ট্র এবং দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের সময় এমন প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা দেখেছে ভারতবাসী। দিল্লির আপ সরকারের অনুদানকে ব্যঙ্গ করে ‘রেউড়ি সংস্কৃতি’ বলা প্রধানমন্ত্রীর দল দিল্লিতে অনুদান বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রদেশে ‘লাডলি বহেন যোজনা’, মহারাষ্টে্র ‘মাঝি লেড়কি বহেন যোজনা’ ইত্যাদি নামে মহিলাদের অনুদান চালাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার সারা দেশে ৮১ কোটির বেশি মানুষের জন্য ‘খাদ্য সুরক্ষা’ প্রকল্পে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়ার কথা ফলাও করে প্রচার করে। এ দিকে তৃণমূলের অনুদান নিয়ে নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতে বিরোধী দলনেতা বলেছেন, বিজেপি জিতলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার হবে মাসে ৩০০০ টাকা! বিজেপির রাজ্য ইস্তাহারে বলা হচ্ছে বেকারদের দেওয়া হবে মাসে ২৫ হাজার টাকা। সিপিএম বলেছে তারাও ক্ষমতায় এলে মহিলাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প চালু রাখবে এবং অনুদান বাড়াবে।
ভর্তুকি ও সরকারি অনুদান কি নিছক রাজনৈতিক অনুগ্রহ
এ কথা ঠিক, নানা রাজ্যে এবং কেন্দ্রীয় সরকারে আসীন দলগুলি অনুদানকে মানুষের প্রতি দলের রাজনৈতিক অনুগ্রহ বলে দেখিয়ে ভোট চায়। তামিলনাডুতে ছাত্রদের সকালের টিফিন থেকে শুরু করে সস্তায় দুপুরের খাবার, নানা রাজ্যে মহিলাদের বাসে ফ্রি যাতায়াত, প্রায় সব রাজ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ট্যাব-ল্যাপটপ ইত্যাদি বিতরণ এখন খুবই স্বাভাবিক বিষয়। পশ্চিমবঙ্গে কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী ইত্যাদি ছাড়াও রাজ্যের প্রায় ৯৫টি প্রকল্পের মধ্যে আছে ক্লাব অনুদান, পুজো অনুদান, পুরোহিত-মোয়াজ্জেম ভাতার মতো প্রকল্পও। এই শেষোক্ত প্রকল্পগুলি নিশ্চিতরূপেই সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে জনমোহিনী অনুদান। ভোট কেনার জন্য কিছুটা যেন ভিক্ষার মতো ছুঁড়ে দেওয়া এই টাকার বান্ডিল পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে শহরে শাসকদলের ভোট ম্যানেজার তৈরির কাজে লাগে নিঃসন্দেহে। একদল মানুষকে ক্রমাগত অনৈতিক রাস্তায় ঠেলে দিতে এই অনুদান কতটা কার্যকরী তাও সকলেই জানে।
কিন্তু বিদ্যুতে, কৃষিতে ভর্তুকি, নিখরচায় বা সস্তায় খাদ্য, ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার সামগ্রী প্রদান, মহিলাদের জন্য ভাতা, বেকারদের ভাতা, বিনামূল্যে চিকিৎসা, দরিদ্র মানুষদের জন্য নানা প্রকল্পও কি শুধুই রাজনৈতিক অনুগ্রহ বিতরণ? সরকারি কোষাগারের টাকা সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে খরচ করলে তা অনুগ্রহ কেন হবে? মানুষের অধিকারের প্রশ্নটাকে কি এ ভাবে অস্বীকার করা যায়! সংবাদমাধ্যম বলে অনুদানের ধাক্কায় রাজকোষে বিপুল চাপ পড়ছে, সরকার ঋণের জালে জড়াচ্ছে। আদালতও তাই বলেছে। তাঁরা বলেন, এর বদলে শিল্প গড়ার জন্য, পরিকাঠামো গড়ার জন্য এই টাকা উদ্যোগপতিদের দিলে সরকারের ঋণ বাড়লেও দেশের সম্পদ বাড়ত। তাতে উন্নয়ন হত। যুক্তিটা একটু খতিয়ে দেখা দরকার।
বিশ্বে যতদিন সমাজতান্ত্রিক শিবির ছিল ততদিন পুঁজিবাদী রাষ্টে্রর চালকরাও কল্যাণকামী রাষ্ট্র বা ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’-এর কথা বলতেন। পুঁজিপতিদের কল্যাণটাই তাঁদের মূল লক্ষ্য হলেও সাধারণ মানুষের জন্যও কিছু অধিকারের কথা, মানুষের হকের পাওনার কথা তাদেরও কিছু কিছু বলতে হত। ১৯৯০-এর পর এই শিবিরের অনুপস্থিতির কালে রাষ্ট্রের কর্তাদের এখন সে দায় আর নেই। এখন সাধারণ মানুষকে সরকার কিছু দিলে তা যেন নিতান্তই দয়ার দান! ১৯৯১ থেকে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের অনুসারী উদার অর্থনীতির প্রবক্তারা সমস্ত ধরনের ভর্তুকি, সরকারি অনুদান বন্ধ করে দিয়ে সব কিছু বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে সওয়াল করে চলেছেন। সাধারণ মানুষের করের টাকায় গড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, খাদ্য সরবরাহ, পানীয় জল, রাস্তাঘাট, সেতু, পরিবহণ সব কিছুকে করে তোলা হচ্ছে পুঁজিপতিদের সম্পত্তি। জনগণের পরিষেবা থেকে ক্রমাগত ভর্তুকির বিলোপ ঘটাচ্ছে। কিন্তু দেখা যায় এতে বাজারের সংকট বেড়ে গিয়ে টান পড়ে পুঁজিপতিদের মুনাফায়। ফলে সাধারণ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে, তাদের কিছুটা ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে কিছু ভর্তুকি ও অনুদান দিতে হয় সরকারকে।
অবশ্য সরকারের দায়িত্বে পরিষেবা, নাকি বাজারই সব, এই বিতর্ক পুঁজিবাদী সমাজে চলেছে বহুকাল। ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার সময় পুঁজিবাদী বাজারের ভয়াবহ সংকট মোকাবিলায় বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস বলেছিলেন, সরকার দরকার হলে এক দলকে দিয়ে গর্ত খোঁড়াক, আর এক দলকে দিয়ে গর্ত বোজাক। এর ফলে মানুষের কিছু ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, তাতেই কাটবে মন্দা। মন্দা কাটেনি বরং তা দিনে দিনে আরও চেপে বসেছে। ১৯৭০ দশকে মার্কিন অর্থশাস্ত্রবিদ জন রলসের দাওয়াই ছিল, রাষ্ট্র কিছু যুক্তিগ্রাহ্য বন্টন নীতি গ্রহণ করুক, তাতেই এক হাতে বেশি সম্পদ জমা হওয়ার সমস্যা কেটে সংকটমুক্ত হবে পুঁজিবাদ। আর এক মার্কিন অর্থশাস্ত্রবিদ রবার্ট নজিক বলেছিলেন, ‘মিনিমাম গভর্নমেন্ট’ অর্থাৎ চুক্তি রূপায়নের আইনকানুনের ব্যাপারটা ছাড়া আর বাকি সব কিছু ছেড়ে দিতে হবে বাজারের হাতে। যদিও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার মারণ রোগটি সারাতে এই সব প্রেসক্রিপশন কাজে লাগার কথা নয়, তা লাগেওনি। এখন আবার মানুষের হাতে কিছু টাকা তুলে দিয়ে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সওয়াল করছেন টমাস পিকেটি থেকে শুরু করে অমর্ত্য সেন, অভিজিত বিনায়ক বন্দে্যাপাধ্যায়রা। পুঁজিবাদী শোষণে জর্জরিত সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সামান্য হলেও ধরে রেখে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে পুরোপুরি ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই তাঁদের এই আকুতি। যে কারণে পশ্চিমবঙ্গের কন্যাÀ নিয়ে উৎসাহ দেখিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ।
সবচেয়ে বেশি অনুদান প্রাপক কারা
অনুদানের জন্যই রাজকোষ ঘাটতি, বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী গত বাজেটে বলেছেন রাজ্যগুলো সব মিলিয়ে ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকার অনুদান দেয়। কেন্দ্রীয় নানা ওয়েলফেয়ার স্কিম ধরে তা মোট ৭ লক্ষ কোটি টাকার কাছে। কিন্তু দেশে সবচেয়ে বেশি অনুদান প্রাপক কারা? কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার বৃহৎ পুঁজি মালিকদের কর্পোরেট কর কমাচ্ছে প্রতি বছর। এর পরেও গত বছর ৪ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি কর্পোরেট কর সরকার মকুব করেছে। এসইজেড, আর্ন্তজাতিক আর্থিক লেনদেনের জন্য (আইএফএসসি) কোম্পানিদের ১০০ শতাংশ পর্যন্ত কর ছাড় দিয়েছে। গত ৫ বছরে ৬ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ ব্যাঙ্কের খাতা থেকে ‘রাইট অফ’ করে মুছে দিয়েছে। এর বেশিরভাগটাই নিয়েছিল দেশের ধনকুবেররা। একেবারে বিনা পয়সায় বা এক টাকায় হাজার হাজার একর জমি, বিদ্যুৎ, জল, কয়লা, খনিজ সম্পদ সরকার কর্পোরেট পুঁজিমালিকদের হাতে তুলে দিচ্ছে। মানুষকে অনুদান দিতে কোষাগার ঘাটতি বেড়ে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে, নাকি কর্পোরেটদের জন্য দান খয়রাতিতেই তা ঘটছে? এটা নাকি ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ (ব্যবসার উপযোগী পরিবেশ)! এগুলি নাকি কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন! টাটাদের মুনাফা গত অর্থ বছরে ১ লক্ষ ১৩ হাজার কোটি, আম্বানিদের ৮১ হাজার ৩০৯ কোটি, আদানিদের ৪০ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। মালিকদের এত সুবিধা দেওয়া সত্তে্বও কি কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি বেড়েছে? সারা দেশে ২ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি কারখানা গত পাঁচ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে। ৩৫ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে লালবাতি জ্বেলেছে। এর মধ্যে প্রথম স্থানে মহারাষ্ট্র (৮৪৭২টি শিল্প বন্ধ), নরেন্দ্র মোদির গুজরাটে বন্ধ ৩১৪৮টি শিল্প। গত ১০ বছরে আরও ৫০ হাজার কারখানা বন্ধের মধ্য দিয়ে ৩ লক্ষ শ্রমিকের কাজ হারানোর কথা সংসদে স্বীকার করেছেন মন্ত্রী জিতনরাম মাঝি (দ্য ওয়্যার ১৯.০৩.২০২৫)। দায়টা তবু সাধারণ মানুষেরই!
কর্মসংস্থান!
সুপ্রিম কোর্ট বলেছে অনুদান না দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করতে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ সন্দেহ নেই। সাধারণ মানুষ তো বটেই এমনকি নানা দলের নেতা-মন্ত্রীরা যাঁরা মানুষকে অনুদান দিয়ে ‘কেনা ভোটার’ বানাতে চান তাঁরাও কথাটা অস্বীকার করবেন না। কিন্তু করবে কে? কর্মক্ষম মানুষের মাত্র ৫৬.৭ শতাংশ কোনও কাজ করে। কর্মক্ষম মহিলাদের মাত্র ১৬.৭ শতাংশ কাজ করে (প্রেস ইনফরমেশন বুরো ৪.১১.২০২৫)। যারা কাজ করে সেই শ্রমজীবী মানুষের ৯০ শতাংশই অসংগঠিত বা ‘ইনফরমাল’ কাজ করে। সংখ্যায় তা প্রায় ৪০কোটি। গিগ শ্রমিক অর্থাৎ অনির্দিষ্ট শর্তে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যার সঠিক হিসাব না থাকলেও তা ১৫ থেকে ২০ কোটির কম নয় (ইন্ডিয়াডাটা ম্যাপ.কম, ০২.০৯.২০২৫)। কর্মসংস্থানের হাল তো এই! কেন্দ্রীয় সরকার নিজে স্থায়ী চাকরি প্রায় তুলে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও সিভিক পুলিশ, পার্শ্বশিক্ষক, চুক্তিভিত্তিক নানা কর্মীরাই এখন সরকারের ভরসা। সিএমআই-এরসমীক্ষা বলছে ভারতে বড় অংশের শ্রমজীবী মানুষের গড় পারিবারিক আয় মাসে মাত্র ৫৬৯৩ টাকা। একেবারে নিচের আয়ের মানুষ মাথাপিছু মাসে মাত্র ৮৪৯ টাকা খরচ করতে সক্ষম। ফলে কে ভোগ্যপণ্য কিনবে? কী করে কলে-কারখানায় উৎপাদন হবে? কী করে কর্মসংস্থান হবে?
অনুদান নয় মানুষ কাজই চায়
বিজেপি সরকার পুঁজিপতিদের চাপে সাধারণ মানুষের জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ, তেল, সার, বীজ ইত্যাদি থেকে ভর্তুকি ছাঁটাই করে সেই টাকা পুঁজিপতিদের দেয় তাদের ব্যবসার মুনাফার জন্য। ক্রমাগত তারা এই কাজ করছে। অন্য দিকে যত তারা মানুষের প্রাপ্য কমায় তত বাড়ে বাজার সংকট। কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে। তখন আবার মানুষকে অনুদান দিয়ে বাঁচাতে হয়। এটা পুঁজিবাদের এক অদ্ভুত বিষচক্র, যা থেকে তার মুক্তি নেই।
ফলে, পুঁজিপতিদের সেবাদাস দলগুলো নির্বাচনের মুখে কী নিয়ে মানুষের কাছে যাবে? কাজ দিতে পারে না, জিনিসের দাম কমাতে পারে না, তাই অনুদান ছাড়া তাদের বলার কিছু নেই। মহিলাদের দেওয়া অনুদান নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে এখন। রাজ্যে রাজ্যে তাঁরাই নাকি অনুদান পেয়ে সরকারি দলের ভোট ব্যাঙ্কে পরিণত হচ্ছেন বলে প্রচার! তাঁদের এই পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে কে? পরিবারের সংকটের বোঝা সবচেয়ে বেশি সামলাতে হয় তাঁদেরই। আর্থিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মহিলাদের হাতে সামান্য কিছু টাকা পৌঁছলেও তা ভোগ্যপণ্য কেনার কাজে লাগতে পারে। কিন্তু বিহারে ‘জীবিকা’ প্রকল্পে মহিলাদের অনুদান দেওয়ার নাম করে আসলে বেসরকারি সংস্থার থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। এখন ঋণ শোধ করতে না পেরে বহু মহিলা ঘরবাড়ি ছাড়ছেন (স্বাতী ভট্টাচার্যের প্রতিবেদন, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮. ১২. ২০২৫)। অনুদানের বদলে মহিলাদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির চেষ্টা সরকার করেনি। নিয়মিত বেতন পান মাত্র ৯ শতাংশ মহিলা কর্মী। টেলারিং, জরি, পাট, বিড়ি, তাঁতের কাজ সর্বত্রই মহিলাদের মজুরি ঘণ্টায় ১০থেকে ২৫ টাকা (ওই)।
সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের প্রশ্ন ছিল অনুদান দিলে কাজের ইচ্ছে কি আর থাকবে? মানুষ কিন্তু বলে– কাজ তো খুঁজে মরছি, দেবে কে? মহিলা থেকে যুব– সকলেরই বলা দরকার, আমরা ভাতাজীবী নয়, শ্রমজীবীই থাকতে চাই। সরকার হয় কাজ দাও, না হলে তার সমান উপযুক্ত ভাতা দাও। এ আমাদের হকের পাওনা। কারও দয়ার দান নয়। জোর গলায় বলতে হবে ভাতা শাসকরা দিচ্ছে তাদের কাজ দিতে না পারার অপদার্থতায়। কিন্তু এর বিনিময়ে বিবেক কেনার চেষ্টা হলে, তাকে রুখতে হবে। না হলে ক্ষতি খেটে খাওয়া মানুষেরই।
(এই লেখাটি গণদাবী ৭৮ বর্ষ ২৯ সংখ্যা ২৭ ফেব্রুয়ারি – ৫ মার্চ ২০২৬ এ প্রকাশিত)