Breaking News

কেওনঝড়ে পুঁজিমালিকদের কৃষিজমি দখল রুখতে বীরত্বের সঙ্গে লড়ছেন কৃষকরা

গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলছেন সংযুক্ত কিসান মোর্চার অন্যতম নেতা, এআইকেকেএমএস-এর সর্বভারতীয় সভাপতি কমরেড সত্যবান

ওড়িশার বিজেপি সরকার কেওনঝড় জেলার পাটানা ব্লকের আঠারোটি গ্রামের প্রায় এগারো হাজার একর উর্বর কৃষিজমি জোর করে দখল করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ঘোষণা হয়েছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে। জিন্দাল কোম্পানির সাথে রাজ্য সরকারের ওই সময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনা সরকার গোপন রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু কয়েকটি স্থানীয় সংবাদপত্রে সেই খবর প্রকাশ হয়ে যায়। ফলে এলাকার সাধারণ মানুষ বিশেষ করে আদিবাসী কৃষক ও খেতমজুরদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভের সঞ্চার হয়। তাঁরা শপথ গ্রহণ করেন, এই পরিকল্পনাকে কোনও মতেই বাস্তবায়িত হতে দেওয়া যাবে না। কারণ বাস্তবায়িত হলে ১৮টি গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে পথের ভিখারিতে পরিণত হবে।

পশ্চিমবঙ্গে যখন সিঙ্গুর আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেই ২০০৬ সালে এই এলাকাতেই তখনকার ওড়িশা সরকার মিত্তাল কোম্পানিকে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এআইকেকেএমএস-এর নেতৃত্বে কৃষক ও কৃষিমজুররা বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম পরিচালনা করেছিল। সেই সংগ্রাম চলেছিল দীর্ঘ ৭ বছর। কৃষকদের অনমনীয় প্রবল প্রতিরোধের ফলে শেষ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিয়েছিল মিত্তাল কোম্পানি ও তৎকালীন ওড়িশা সরকার। ২০১৩ সালে ওরা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল এই জমি অধিগ্রহণ করা হবে না। আন্দোলন বিজয় অর্জন করেছিল। সেই একই জমি আবার বিজেপি সরকার জিন্দাল-পসকোর মতো বহুজাতিক কোম্পানিকে দিতে চাইছে।

বিজেপি সরকার ও বহুজাতিক কোম্পানির যুক্তি হল নতুন ইস্পাত কারখানা হবে, কর্মসংস্থান হবে। এই যুক্তির অন্তঃসারশূন্যতা দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার। পুঁজিবাদী বাজার সংকট ও সরকারগুলোর বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থবাহী নীতির ফলে বিজেপি শাসনে গত এগারো বছরে দুই লক্ষের বেশি কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ধুঁকতে ধুঁকতে যে সব কারখানা চলছে সেখানেও শ্রমিক ছাঁটাই চলছে নির্বিচারে। খোদ ওড়িশায় রাউরকেল্লা ইস্পাত কারখানায় আগে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার, বর্তমানে শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ হাজার। বাকি শ্রমিকদের ছাঁটাই করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ওড়িশায় বন্ধ কারখানার সংখ্যা অগুনতি। ফলে সরকার যে শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান নিয়ে সত্যিই উদ্যোগী, বাস্তব ও পরিসংখ্যান তা বলছে না।

সরকার বা মালিকরা বলবে, শিল্প বন্ধ হয়েছে বলে কি নতুন শিল্প হবে না? আমরা বলি, অবশ্যই করা উচিত। কিন্তু সেই উদ্যোগ উর্বর কৃষিজমিতেই নিতে হবে কেন? কেওনঝড় জেলায় প্রচুর অনুর্বর জমি রয়েছে। সেখানে শিল্প স্থাপনে অসুবিধা কোথায়? পাটানা ব্লকের এই জায়গার কী এমন গুণ আছে যে, একবার মিত্তাল আর একবার জিন্দাল-পসকো ঘুরে ফিরে এখানেই আসছে তথাকথিত শিল্প স্থাপন করার জন্য? এখানে তারা আসছে তার কারণ, এই জমি জাতীয় সড়কের গায়ে, রেল স্টেশনের পাশে। ফলে অন্য প্রয়োজনে একে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ লাভের কড়ি ঘরে তোলা যাবে। আবাসন নির্মাণ বা রিয়েল স্টেটের ব্যবসা করা যাবে। অর্থাৎ কর্মসংস্থান উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য বিপুল পরিমাণ লাভের কড়ি পকেটস্থ করা। তাতে সাধারণ আদিবাসী কৃষক ও কৃষিমজুররা ভিখারিতে পরিণত হলেও ওদের কিছু যায় আসে না।

এর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ নিজেদের সংগঠিত করেছেন, তৈরি করেছেন জিন্দাল-পসকো প্রতিরোধ মঞ্চ (জেপিপিএম)। এই সংগঠনের নেতৃত্বে হাজার হাজার গ্রামবাসী বিডিও অফিস, কালেকটরেটের অফিসে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, ধরনা দিয়েছেন, লিখিত ভাবে জানিয়েছেন যে তাঁরা জমি দেবেন না। ফলে এই এলাকার সাধারণ মানুষের মনোভাব পরিষ্কার।

কিন্তু শাসকরা তো মালিক শ্রেণির সেবাদাস। তাই বহুজাতিক কোম্পানির মালিকদের স্বার্থ তাদেরও স্বার্থ। জিন্দাল আবার বিজেপির সাথে যুক্ত এবং পসকো এসেছে বহুদূর–কোরিয়া থেকে। ফলে এদের সাধ-আহ্লাদ পূরণ না করলে চলে? ফলে বিজেপি সরকার তার সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে গ্রামবাসীদের উপর। অর্থের জোরে এলাকায় কিছু দালাল তৈরি করা হয়েছে, সাথে বিজেপি, আরএসএস কর্মীরা তো আছেই। পুলিশের প্রত্যক্ষ মদতে তারা হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এতেও কাজ না হওয়ায় আসরে নামানো হয়েছে পুলিশ বাহিনীকে।

গত ২৬ নভেম্বর– রাত তখন একটা। ২৯ গাড়ি সশস্ত্র পুলিশ সব গ্রামগুলোকে ঘিরে ফেললো। বাড়ির দরজা জানালা ভেঙে গ্রেপ্তার করল আন্দোলনের নেতা জিন্দাল-পসকো প্রতিরোধ মঞ্চের সম্পাদক বেণুধর সরদারকে। তাঁর ভাইকেও গ্রেপ্তার করা হল। ভিন্ন গ্রাম থেকে আরও চার জন আন্দোলনের নেতাকে গ্রেপ্তার করা হল। হত্যার চেষ্টার অভিযোগ, ডাকাতি ইত্যাদি মিথ্যা অভিযোগে দায়ের করে তাঁদের জেলে পুরে দেওয়া হল। আরও ৩৪ জনের বিরুদ্ধে এফ আই আর করা হল। গ্রামগুলোতে লাগাতার পুলিশ হামলা চলতে থাকল। উদ্দেশ্য হল, গ্রামবাসীদের সন্ত্রস্ত করে তাদের দুর্বল করে দেওয়া, আন্দোলনের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া। সাথে সাথে দালাল মারফৎ নানা প্রলোভন দেখানোর কাজও চলতে থাকল সমান গতিতে।

ওরা ভেবেছিল, এতেই কাজ হবে। গ্রামবাসীরা নতজানু হয়ে জমি দেওয়ার সম্মতিপত্র স্বাক্ষর করে দেবে। কিন্তু ওরা জানে না এই অনাহারক্লিষ্ট মানুষগুলো বুকে কী অসীম সাহস ধারণ করে। তাই দেখা গেল সমস্ত ভয় ও প্রলোভনকে অগ্রাহ্য করে গ্রেপ্তারের পরদিন, ২৭ নভেম্বর হাজার হাজার মানুষ থানা ঘেরাও করল।

আন্দোলনের নেতারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন এই আন্দোলনকে সর্বভারতীয় কৃষক আন্দোলনের অংশ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। তাঁরা সংযুক্ত কিসান মোর্চার (এসকেএম) নেতৃত্বের সাহায্য চাইলেন। গত ৯ ডিসেম্বর সংযুক্ত কিসান মোর্চার প্রতিনিধি হিসাবে এ আই কে কে এম এস-এর সর্বভারতীয় সভাপতি কমরেড সত্যবান সহ অন্যান্য কৃষক নেতারা এলাকা পরিদর্শন করেন, গ্রামবাসীদের সাথে আলাপ আলোচনা করেন এবং তাঁদের আন্দোলনকে সব ধরনের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। কমরেড সত্যবান গ্রামবাসীদের বলেন, আপনাদের সংগ্রাম সমস্ত ভারতের কৃষক মজুরদের সংগ্রাম। এই সংগ্রামে আমরা সবাই আপনাদের পাশে আছি। তিনি আরও বলেন, শুধু এই এলাকাতেই নয়, ওরা সমস্ত দেশ জুড়ে কৃষক উচ্ছেদের পরিকল্পনা নিয়েছে। ওরা অন্ধ্রপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক ইত্যাদি সব রাজ্যে জোর করে কৃষকদের জমি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সেখানকার কৃষকরাও আপনাদের মতো এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছেন। রক্ত ঝরাচ্ছেন। তাঁরা আওয়াজ তুলছেন– হাম লড়েঙ্গে, হাম জিতেঙ্গে। কমরেড সত্যবান ও অন্যান্য কৃষক নেতাদের এই কর্মসূচি এলাকায় বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।

গ্রামবাসীদের সাথে আলাপ আলোচনা করে যখন কমরেড সত্যবান সহ অন্যান্য কৃষক নেতারা ফিরে আসছিলেন তখন পুলিশের মদতে আর এস এস-এর সমাজবিরোধীরা তাঁদের গাড়ি ঘিরে ফেলে, শারীরিক ভাবে নিগ্রহ করে এবং জোর করে নিকটবর্তী তুরুমুংগা থানায় নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশ বেআইনি ভাবে তাঁদের দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রাখে। সমাজবিরোধীরা সেখানেও কৃষক নেতাদের মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশের ভূমিকা ছিল কার্যত সমাজবিরোধীদের সাহায্যকারীর।

কমরেড সত্যবান ও অন্যান্য কৃষক-নেতাদের উপর এই আক্রমণের খবর গ্রামে গিয়ে পৌছালে শত শত মানুষ এসে থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। বাধ্য হয়ে পুলিশ কৃষক-নেতাদের ছেড়ে দেয়।

এই ঘটনার নিন্দা করে এবং দোষীদের শাস্তি দাবি করে এ আই কে কে এম এস-এর সর্বভারতীয় কমিটি, এসকেএম, এআইকেএস সহ চোদ্দটি কৃষক সংগঠন ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বিবৃতি দেয় এবং আরও বৃহত্তর সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য গ্রামবাসীদের প্রতি আহ্বান জানায়।