
বিজেপি সরকারের ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির অন্তঃসারশূন্যতার আরও এক নিদর্শন প্রত্যক্ষ করল এ রাজ্যের সরকার পোষিত কলেজগুলি তথা উচ্চশিক্ষা মহল। ২১ আগস্ট এক সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে এ রাজ্যের ২৪৭টি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি পদে বসানো হল বিজেপি দলের বিধায়ক, সাংসদ, এমনকি দলের ব্লক সভাপতিদেরও। সভাপতি পদে বসানো হয়েছে অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীদেরও। এই পদক্ষেপ এ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে চলমান অরাজকতাকেই আরও পুষ্ট করবে এবং শিক্ষার সুস্থ পরিবেশের আকাঙক্ষাকে ধূলিসাৎ করবে।
স্বাধিকারের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ
এই ঘটনা এ রাজ্যের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধিকারের ওপর এক চূড়ান্ত হস্তক্ষেপ। একটি কলেজের গভর্নিং বডি বা পরিচালন সমিতি গঠিত হয় অধ্যাপক, কর্মচারী, ছাত্র প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি, শিক্ষা দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে। একটি কলেজের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক বডি হিসেবে গভর্নিং বডির গুরুত্ব যথেষ্ট। তাই পরিচালন সমিতিতে কেবল কলেজের অভ্যন্তরের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদদের নিয়েই এই বডি গঠিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ একটি কলেজের পঠন-পাঠন, মূল্যায়ন, সামগ্রিক উন্নয়ন এবং তার সামাজিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সামগ্রিক ভাবে কলেজের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সেখানে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে, যা আদতে শিক্ষার ক্ষতি করে। স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার পরিবেশ ব্যাপক ভাবে বিঘ্নিত হয়।
অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ
বিজেপি সরকারের এই অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ তৃণমূলের ধারাবাহিকতাকেই রক্ষা করল। তৃণমূল সরকার ২০১৭ সালে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় রেগুলেশন আইন জারি করে কলেজের গভর্নিং বডিগুলিতে নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা কমিয়ে সরকার মনোনীত প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়িয়ে আদতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের রাস্তা তৈরি করেছিল। এর বিরুদ্ধে শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। বিজেপি সরকার সেই আইনকেই হাতিয়ার করে, আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গভর্নিং বডি তৈরি না করেই কেবল দলের নেতা-মন্ত্রীদের সভাপতি পদে বসিয়ে দিল, যাঁদের মধ্যে অনেকে আবার স্কুলের গণ্ডি পার হয়নি। উল্লেখ্য, কলেজের গভর্নিং বডির অন্যান্য সদস্য, যেমন– অধ্যাপক, কর্মচারী, ছাত্রছাত্রী কারওরই নির্বাচন হয়নি। কেবল একজন দলীয় লোককে সভাপতি পদে বসানোর পিছনে বিজেপির উদ্দেশ্য কী? অবশ্যই কলেজগুলিতে দলের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। এই চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক কাজের ফলে শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হবে, নৈরাজ্য বাড়বে। আগের সরকার বছরের পর বছর ছাত্র সংসদের নির্বাচন, গভর্নিং বডির নির্বাচন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সিনেট, সিন্ডিকেট, কোর্ট, কাউন্সিল গঠন বন্ধ রেখেছিল, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যাটুটও তৈরি করেনি। বর্তমান সরকার সেই ধারার পরিবর্তনের কথা মুখে বললেও, কার্যক্ষেত্রে বিগত সরকারের পথ অনুসরণ করেই এগোচ্ছে, যা জনমানসে বিস্ময় ও প্রবল ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।
পূর্বতন সিপিএম সরকারের আমলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর দলীয় হস্তক্ষেপ এতটাই প্রবল ছিল যে শিক্ষাক্ষেত্রে দখলদারির সঙ্গে সমার্থক হয়ে গিয়েছিল সিপিএম-এর তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসের নাম। সেই আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দারোয়ান থেকে উপাচার্য নিয়োগ, কোনও কিছুই শাসকদলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল না। শিক্ষাদরদি মানুষ তা চাননি। বিগত তৃণমূল সরকারের শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, বেতন যেহেতু সরকার দেয় তাই তারা সবকিছুতেই নাক গলাবেন। এমনকি মুখ্যমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য পদে বসানোর আইনও পাশ হয়েছিল বিধানসভায়।
এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে বিজেপি সরকার আদতে পূর্বতন সরকারগুলির অনুসৃত অগণতান্ত্রিক পথই অনুসরণ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার রক্ষা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা, মুক্ত চিন্তার পরিসরকে প্রসারিত করা ইত্যাদি ধ্যানধারণার ওপর নগ্নভাবে দলীয় আধিপত্য কায়েম করতে চাইছে।
কেন চাইছে? জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন ধরনের কমিটি বা পরিচালন বোর্ডে নির্বাচিত শিক্ষক-অধ্যাপক-কর্মচারী-ছাত্র প্রতিনিধির কথা অস্বীকার করেছে। তাই এ রাজ্যের বিজেপি সরকার সভাপতি সহ অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে মনোনীত বডি কলেজগুলিতে চাপিয়ে দিয়ে শিক্ষাঙ্গনে মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। সেই সঙ্গে বিনা বাধায় শিক্ষার বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ করার পথ প্রশস্ত করতে চাইছে।
এই অবস্থায় রাজ্যের শিক্ষানুরাগী জনগণকে বিজেপি সরকারের এই কালা বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।