ঐতিহ্যশালী মুক্ত চিন্তার পীঠস্থান বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সংকটে

আমেরিকার আইভি লিগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এবং সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটিগুলিসহ বিশ্বের ঐতিহ্যমণ্ডিত যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এক সময় নানা নতুন চিন্তা ও তর্ক-বিতর্কের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল, মানুষের সমাজ ও জীবনকে পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন উন্নততর আঙ্গিকে দাঁড় করিয়েছিল সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাধীন চিন্তার পরিসর আজ সংকুচিত হতে চলেছে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ইহুদিবাদ বিরোধী প্রচার চলছে, এই অজুহাতে সরকার গবেষণার জন্য বরাদ্দ দুই বিলিয়ন ডলার ছাঁটাই করেছে। এই নিয়ে মার্কিন ফেডারেল কোর্টে মামলা হয়। গত ২১ জুলাই বোস্টনের জনাকীর্ণ কোর্টরুমে বিচারক ট্রাম্পের আইনজীবীকে প্রশ্ন করেন, ক্যান্সার চিকিৎসার গবেষণার জন্য বরাদ্দ টাকা বাতিল করে কী ভাবে ক্যাম্পাসে ইহুদি বিরোধিতা বন্ধ হতে পারে?

উত্তরে ট্রাম্পের আইনজীবী বলেন যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই ক্ষমতা আছে। ইহুদিবাদ বিরোধিতার শাস্তি দিতে এটা প্রয়োজন।

বিচারক প্রশ্ন করেন, আপনারা কিসের ভিত্তিতে বলছেন, প্রতিটি গবেষক এর সাথে যুক্ত? আপনারা কি এর স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ দাখিল করেছেন? এটা তো কষ্টকল্পিত! হার্ভার্ডের আইনজীবী বলেন, আমেরিকার প্রশাসনের সাথে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সম্পর্ক দীর্ঘ আট দশকের। চিকিৎসা থেকে মহাকাশ বিজ্ঞান তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণার জন্য বরাদ্দের ছাঁটাই ইহুদিবাদ বিরোধিতায় কী ভাবে প্রভাব ফেলবে?

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে কোর্টে কোনও সদর্থক রায়ের সম্ভাবনা না দেখে ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোসালে’ পোস্ট করেন, বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট এবং প্রয়োজনে তিনি উচ্চ আদালতে যাবার প্রস্তুতি নেবেন। এ ভাবেই মার্কিন কংগ্রেসের চাপে ২০২৪ সালে হার্ভার্ডের প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়ান গেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। একই ভাবে কলম্বিয়া সহ আমেরিকার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, যারা গবেষণার জন্য সরকারি, বাজেটের উপর নির্ভরশীল, তাদের এই হুমকির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শুধু বাজেট ছাঁটাই নয়, যে বিদেশি ছাত্রদের গবেষণা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার জ্ঞানচর্চা এবং অর্থনীতিকে পরিপুষ্ট করেছে, প্যালেস্টাইনের উপর ইজরায়েলের হামলার বিরোধিতা করায়, তাদের ভিসার ব্যাপারে সরকার কড়াকড়ি করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিগুলিতে জাত, লিঙ্গ বৈষম্য বা বিদেশনীতি নিয়ে দক্ষিণপন্থী প্রশাসনের সমালোচনামূলক যে কোনও বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার হুমকি দেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু সক্রিয়তা বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তথা উপনিবেশ মুক্তির বিষয় নিয়ে গবেষণা জাতীয় স্বার্থের বিরোধী বলে ভেটো দিয়ে সরকার বন্ধ করে দেয়। এই সমস্ত প্রশ্ন তুললে আইন ফ্যাকাল্টির অধ্যাপকদের ‘ব্ল্যাক লেটার ল’ (প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রথা) ভঙ্গ করার নামে সমালোচনা করা হয়।

বর্তমানে ভারতীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও মুক্তচিন্তার ধারকদের নিশানা করে শাসকবিরোধী চিন্তাকে দমন করার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পুলিশ হানা দেয়। জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, যা এক সময় স্বাধীন চিন্তার কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হত, এখন প্রায়শই তার উপর দেশদ্রোহীর তকমা দেওয়া হয়।

২০২৩-এ ইউজিসির মাধ্যমে ‘ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম’-এর নামে কিছু অবৈজ্ঞানিক বিষয় সিলেবাসে অবশ্যপাঠ্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে, যা শাসক বিজেপির হিন্দুধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী অ্যাজেন্ডা— যা বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী মনকে মেরে দিয়ে অন্ধতা-গোঁড়ামির প্রসার ঘটাবে।

সার্ক প্রতিষ্ঠিত ‘দি সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি’তে একজন ফ্যাকাল্টি সদস্যকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। তাঁর গাইডেন্সে একজন গবেষক ছাত্র গবেষণাপত্রে বিশ্ববিখ্যাত ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি মোদি সরকারের সমালোচনায় কী বলেছিলেন তার উল্লেখ ছিল। একই জিনিস দেখা যাবে ইউরোপে হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বাহরিন পর্যন্ত। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণপন্থী নেতা ভিক্টর আরবান ঐতিহ্যমণ্ডিত ‘সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি’র মূল ক্যাম্পাসটি রাজধানী বুদাপেস্ট থেকে ভিয়েনায় পাঠিয়ে দেয়। ২০১৬ সালে সন্ত্রাস দমনের নামে কুর্দিশদের উপরে তুর্কি সরকারের দমন-পীড়নের প্রতিবাদে হাজার হাজার শিক্ষাবিদ পিস পিটিশনে স্বাক্ষর করলে সরকার তাঁদের কর্মচ্যুত করে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলিতে ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং মহিলাদের সামাজিক স্বাধীনতার অভাব যথার্থ শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ তো দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর সরাসরি বাধা। তার সাথে আপাত শান্ত অথচ পরিপূর্ণ ধবংসাত্মক বাজারি অর্থনীতি শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেতর থেকে আক্রমণ করে শিক্ষার মর্মবস্তুকে নষ্ট করে ফেলছে। উচ্চশিক্ষায় ‘মূল্যায়ন পদ্ধতি’, ‘পেটেন্ট তৈরি’, ‘বাজারি চাহিদা মেটানো’ আজ বিশ্ববিদ্যালয়কে কর্পোরেট সত্তায় পরিণত করেছে। এখানে ছাত্র হচ্ছে ক্রেতা, ফ্যাকাল্টি সদস্যরা পরিষেবা প্রদানকারী— যাদের প্রয়োজনমতো সরিয়ে দেওয়া যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা বাজারের প্রয়োজনকে গুরুত্ব বেশি দেয়।

সামন্ততন্ত্র-রাজতন্ত্রের অন্ধকার যুগকে ভেঙে একসময় রেনেসাঁর আলোকে আধুনিক সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল। তার ধারাবাহিকতায় সপ্তদশ শতক থেকে বিশ্বজুড়ে আধুনিক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে এই ঐতিহ্যশালী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সৃষ্টি। তারা শুধু প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে আধুনিক সভ্যতা ও সমাজকে তোলার কাজ করেনি, প্রতিনিয়ত উন্নত চিন্তার সংঘর্ষে সভ্যতাকে আরও বিকশিত ও সমৃদ্ধ করেছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদের মুনাফালিপ্সা সমগ্র মানব সভ্যতার অগ্রগতির সামনে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তাই যে বিজ্ঞান আধুনিক সভ্যতাকে গড়ে তুলেছে ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ আজ সেই বিজ্ঞানের গলা টিপে ধরছে। তাই বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি আজ চরম সংকটে। তাদের গবেষণার কাজে প্রয়োজনীয় অর্থের, জন্য তাদের দ্বারস্থ হতে হয় সরকারি প্রশাসনের। আর সেখানেই কর্পোরেট স্বার্থবাহী সরকারি প্রশাসন শর্ত আরোপ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তচিন্তার পরিসরে লাগাম পরাতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু আশার কথা, বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্র, গবেষক, অধ্যাপকরা সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। আর তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন বিশ্বের সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ।