
নির্বাচন কমিশন বিহারে সম্প্রতি ভোটার তালিকায় ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিউ’(SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন করেছে। এর মাধ্যমে গত জানুয়ারি মাসে তাদেরই প্রকাশিত ভোটার তালিকার ৭ কোটি ৭৩ লক্ষের মধ্য থেকে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই নতুন তালিকার ভিত্তিতেই আগামী নভেম্বর মাসে বিহারে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে। যাদের নাম বাদ যাবে, তারা কেউ ভোট দিতে পারবেন না। তাদের ভোট দেওয়ার যে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু ছিল, তাও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অভূতপূর্ব ও নানা অভাবিত ছলচাতুরি করে তথাকথিত নির্বাচন কমিশন যা করছে, তাতে লক্ষ লক্ষ ভূমিপুত্র ও তাদের পরিজনদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ‘বিদেশি’ বলে দেগে দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সূচি অনুযায়ী যেখানে আগামী নভেম্বর মাসেই ভোট হতে চলেছে, সেখানে ঠিক তার আগেই হঠাৎ এক দিনের নোটিশে কাজ শুরু করে অফিসারদের ট্রেনিং থেকে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের মতো কাজ তারা ৯৭ দিনে সেরে ফেলেছে! এইটুকু সময়ে ৭ কোটি ৭৩ লক্ষ ভোটারের তালিকা নিবিড় সংশোধন করা কি আদৌ সম্ভব? কিন্তু নির্বাচন কমিশন ঠিক সেই কাজটিই করেছে। প্রসঙ্গত, ২০০২-এর নিবিড় সংশোধনের জন্য ৮ মাস সময় লেগেছিল। তাহলে এবার কেন এত তাড়াহুড়ো? কমিশন বলেছে, বিদেশিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া তাদের ‘সাংবিধানিক দায়িত্ব’।
এ ছাড়া পরিযায়ী হিসেবে বা নানা কারণে অন্য রাজ্যে গিয়ে যারা সেখানে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে, তাদের নামও দু’জায়গায় থাকা উচিত নয়। তাই, অন্য রাজ্যের ভোটার ও মৃত ব্যক্তিদের নামও বাদ দিতে এই সংশোধন জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। গত ২৪ জুন বিহারের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে এক চিঠিতে কমিশন নির্দেশ দিয়েছে, (১) যাদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে, তাদের নিজেদের জন্মতারিখ ও জন্মস্থানের প্রমাণপত্র দিতে হবে। (২) যাদের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০০৪ সালের ২ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের শুধু নিজের পরিচিতি দিলে হবে না, বাবা অথবা মায়ের জন্মতারিখ ও জন্মস্থানের প্রমাণপত্র দিতে হবে। (৩) আর ২০০৪-এর ২ ডিসেম্বরের পর জন্ম হলে নিজের এবং বাবা ও মা উভয়ের জন্ম তারিখ ও জন্মস্থানের প্রমাণপত্র দিতে হবে। এর সাথে সকলকে দিতে হবে কমিশন নির্ধারিত ১১টি পরিচিতি পত্রের যে কোনও একটি।
এই নির্দেশের ফলে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ‘পেছনের দরজা দিয়ে’ এনআরসি চালু করার গভীর আশঙ্কা জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে। উপরন্তু, কমিশন নথি হিসাবে আধার কার্ড রেশন কার্ড, এবং আশ্চর্যজনক ভাবে নিজেদের দেওয়া ভোটার আইডি কার্ড প্রামাণ্য নথি হিসাবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। উল্লেখ্য যে, নাগরিকত্বের নির্ণায়ক মানদণ্ড ঠিক করাটা নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। তার কাজ হল আধার কার্ড, রেশন কার্ড ও সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র সহ নির্ধারিত ১১টি নথির যে কোনওটির দ্বারা ভোটারের পরিচিতি যাচাই, নির্ভুল তালিকা তৈরি ও সেই তালিকার ভিত্তিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা। কিন্তু কমিশন নিবিড় সংশোধনের নামে ঠিক উল্টো কাজটিই করেছে। এটাও উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনে কাবচুপি করে লক্ষ লক্ষ ভুয়ো ভোটারের নাম ঢোকানো, ডুপ্লিকেট ভোট, ভুয়া ঠিকানা, বিরোধী দলগুলিকে ডিজিটাল ভোটার তালিকা না দেওয়া, সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে অস্বীকার করা ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ কমিশনের বিরুদ্ধে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন এ সব প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি।
নাগরিক পরিচিতির নথি নির্বাচন কমিশন ঠিক করে দেওয়ার পরিণাম হতে চলেছে ভয়াবহ। যাঁদের কখনও চাকরি ছিল না তাঁরা কী ভাবে চাকরির পরিচয়পত্র বা পেনশনের কাগজ দেখাবেন? ১৯৮৭ সালের আগে বেশিরভাগ মানুষের ব্যাঙ্ক বা ডাকঘর অ্যাকাউন্ট, এলআইসি পলিসি ছিল না বললেই চলে। ওই সময় জন্ম সার্টিফিকেটও অনেকের ছিল না। শিক্ষার সুযোগ যাঁরা পাননি, তাঁরা শিক্ষাগত কোনও সার্টিফিকেট দেখাতে পারবেন না। তাঁরা বেশিরভাগই গরিব মানুষ। যা তাঁদের ছিল না বা নেই, সেই সব ডকুমেন্টই কমিশনের তালিকাভুক্ত। সেগুলি কোনও একটা না থাকলে ভোটার তালিকা থেকেও বাদ!
এর ভয়াবহ অন্যায়ের শিকার হবেন শিক্ষার সুযোগহীন আদিবাসী, অন্যান্য পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের গরিব মানুষ। এসআইআরে ২২.৩ লক্ষ মৃত, ৩৬.৩ লক্ষ স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত, ৭ লক্ষ জনের নাম একাধিক জায়গায় থাকার কারণে বাদ গেছে। কিন্তু একজনও বিদেশি বলে চিহ্নিত হননি। এই খসড়া তালিকায় ১৮ থেকে ৪০ বছরের ভোটার বাদ গেছে সব থেকে বেশি সংখ্যায়। মোট বাদ যাওয়া ভোটারের ৫৫ শতাংশ মহিলা এবং বড় অংশ মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের। আসামে এনআরসি-র নাম করে সরকার যেমন হিন্দু মুসলিম, ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে ১৯ লক্ষ নিরপরাধ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। একই ভাবে বিহারে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের নামে প্রথম পর্যায়ে ৬৫ লক্ষ মানুষ ও তাদের পরিবারের শিশু-কিশোরদের জীবনকে বিপর্যস্ত করার গভীর ষড়যন্ত্র রচনা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এটাও ঘোষণা করেছে যে, এরপর বিহারের মতো সারা দেশেই ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন করা হবে। অর্থাৎ সারা দেশের জনগণকে ত্রস্ত করে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট আধার কার্ডকে নাগরিক পরিচিতির নথি হিসাবে গ্রহণ করার নির্দেশ দিলেও নাম-বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের হয়রানি কমছে না। নানা আশঙ্কাও দূর হচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কেন এ সব করা হচ্ছে? কারণটা গভীর ষড়যন্ত্রমূলক। দেশে জনজীবনের সর্বক্ষেত্র আজ সংকটে জর্জরিত। বেকারদের চাকরির সুযোগ নেই, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ, কলকারখানায় চলছে ব্যাপক ছাঁটাই ও মজুরি হ্র্রাস, চাষির ফসলের ন্যায্য দাম নেই অথচ বাড়ছে সার বীজ কীটনাশকের দাম, ঋণগ্রস্ত চাষির আত্মহত্যা বাড়ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। নারীর উপর আক্রমণ নিত্যদিনের ঘটনা। দুর্নীতির মাত্রা সীমাহীন। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয়, শাসকশ্রেণি পরিকল্পিতভাবে মানুষকে অমানুষে পরিণত করতে নীতি-নৈতিকতাহীন, মূল্যবোধহীন যুবসমাজ তৈরি করে মদ ও ড্রাগের নেশায় এবং যৌনতা সর্বস্ব অপসংস্কৃতিতে নিমজ্জিত করতে চাইছে। তরুণ সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে মদ, যৌনতা ও মাদকাসক্তির দিকে। স্বাধীনতা সংগ্রামী, শহিদ ও বিশ্ববরেণ্য মনীষীদের নাম ভুলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে।
এরই পাশাপাশি আন্দোলনের ভয়েই শাসকশ্রেণি জনগণকে নানা ভাবে বিভক্ত করে রাখতে চাইছে। নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্ক তৈরি করে, নাগরিক পরিচয় নিয়েই আশঙ্কা তৈরি করে এক ভয়াবহ দমনমূলক শাসন চাপিয়ে দিচ্ছে যাতে তাদের পুঁজিবাদী শোষণ নির্বিঘ্নে চলতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সংসদীয় বিরোধী দলগুলির, বিশেষ করে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ভূমিকা অত্যন্ত হতাশাজনক। তাদের প্রতিবাদ শুধুমাত্র নির্বাচনী স্বার্থে সীমাবদ্ধ। তারাও জাতপাতের রাজনীতি ও ‘নরম হিন্দুত্ব’-র লাইনে থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে বলছে।
এটাও সকলে লক্ষ করেছেন যে, প্রচারের ঢক্কানিনাদ যতই থাকুক, বিজেপি দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। কারণ, তারা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কোনও সমস্যারই সমাধান করতে পারেনি। ক্ষমতায় থাকার জন্য তারা শুধু সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্বকেই ব্যবহার করছে না, বরং নির্বাচন কমিশন ও দেশের ভোট প্রক্রিয়াকেই নিয়ন্ত্রণ ও বিকৃত করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে।
শ্রমজীবী মানুষ সহ সকলকেই বুঝতে হবে এই পচে যাওয়া পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এ ধরনের আক্রমণ একের পর এক আসতেই থাকবে। বিজেপি সরকারের উত্থানের পর থেকে এই আক্রমণ আরও তীব্র হয়েছে। সংখ্যালঘুরা আজ বিশেষভাবে আক্রমণের শিকার এ কথা যেমন সত্য, তেমনি হিন্দু মুসলিম ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে সকলের উপরই আক্রমণ নেমে এসেছে। তাকে প্রতিরোধ করতে হলে প্রয়োজন সচেতন সঙ্ঘবদ্ধ সংগ্রাম। প্রয়োজন শাসক দলগুলির জনবিরোধী চরিত্রকে চেনা। এই সচেতনতা গড়ে তুলে ব্যাপক জনগণকে সামিল করে আন্দোলনের গণকমিটি গড়ে তোলা আজ সাধারণ মানুষের কর্তব্য। তাই আজ ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের নামে সর্বনাশা প্রক্রিয়াকে বাতিল করা এবং অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচন সুনিশ্চিত করার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সামিল হতে এসইউসিআই (কমিউনিস্ট) আহ্বান জানাচ্ছে।