
দেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, তা সে যে ভাবেই হোক না কেন। স্বাধীনতা ‘কম্প্রোমাইজ’ (আপস) করে এসেছে, তার কী কুফল– এর বিস্তারিত আলোচনায় আমি যেতে চাই না। শুধু দেশবিভক্তির ফলে যে মারাত্মক ক্ষতি এই দেশে ঘটেছে সে সম্পর্কে এইটুকুই আমি বলতে চাই যে, একটা ভৌগোলিক সীমার মধ্যে একটা বিরাট জাতি, একটা ঐক্যবদ্ধ জনতা, একটা জনসমুদ্র, একটা জনসংখ্যা– তাকে জোর করে দুটো ভাগে ভাগ করে দেওয়া হল, দুটো জাতিতে পরিণত করে দেওয়া হল, দুটো দেশে পরিণত করে দেওয়া হল। ফলে রাজনৈতিক দিক থেকে দুটো রাষ্টে্রর মধ্যে, দু’দেশের জনসাধারণের মধ্যে চিরকালের জন্য একটা শত্রুতার মনোভাব এবং নিজেদের দেশের মধ্যে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যে বীজ সাম্রাজ্যবাদীরা বপন করে গিয়েছিল তাকেও পাকাপাকিভাবে স্থায়ী করে রাখা হল। এ তো গেল আপসের মারফত স্বাধীনতা আদায় করতেই যে পরিমাণে ক্ষতি দেশের জনসাধারণকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বীকার করতে হয়েছে তার একটা দিক। এত ক্ষতি স্বীকার করেও সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপস করে যে স্বাধীনতা এসেছে এবং তার মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা জনস্বার্থকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মালিকদের, পুঁজিপতিদের স্বার্থে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কাজেই পুঁজিপতি শ্রেণিই হচ্ছে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্টে্রর প্রকৃত ‘ডিক্টেটর’ (একচ্ছত্র ক্ষমতাধিকারী)। অথচ আমাদের দেশে স্বাধীনতা সংগ্রামে লড়েছিল সাধারণ মানুষ। …
এখানে পার্লামেন্টারি ইলেকশনের মধ্য দিয়ে গভর্নমেন্টের পরিবর্তন সাধন সম্পর্কে একটি কথা মনে রাখা দরকার। একটা গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে যখন জনসাধারণ বীতশ্রদ্ধ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে তখন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আর একটা গভর্নমেন্ট আসে। সাধারণ মানুষ কতকগুলো লোককে অসৎ মনে করে। ভাবে সেই লোকগুলোকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় অন্য কতকগুলো সৎ লোক এসে বসলেই তাদের মঙ্গল হবে। যে কোনও ‘নীতি’ বা ‘আদর্শে’র আড়ালে জনতাকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের প্রচার বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি রাজনীতিবিদরা করে থাকে। কাজেই আমি শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষকে বলছি– তাঁরা যেন এ ধরনের ভাঁওতায় না ভোলেন। কারণ, শুধুমাত্র গভর্নমেন্টের পরিবর্তন হলেই সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান হয় না, হতে পারে না। গণতান্ত্রিক অধিকার, নিয়মকানুন পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় যতই হোক, যতই রিলিফ দেওয়ার পরিকল্পনা তারা জনসাধারণের জন্য গ্রহণ করুক, মুক্তি তার দ্বারা জনসাধারণের মিলবে না। বরং জনসাধারণের অবস্থা দিনের পর দিন এর দ্বারা আরও খারাপ হবে।
আর, রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ব্যতিরেকে এই ভাবে সরকারের পরিবর্তনে কী হয়? না, যদি সৎ লোক আসে আরও মুশকিল হয়। কারণ, সাধারণ মানুষের তাদের প্রতি বিশ্বাস থাকে। সৎ হয়েও যদি তারা বিভ্রান্ত হয় এবং যদি তারা বিপ্লবের পথে পা বাড়াতে না পারে, তা হলে তাদের পক্ষে কার্যত পুঁজিপতি শ্রেণির দালালি করা ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প থাকে না। তাদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই সংশোধিত, আরও সংহত করতে হয়। অথচ, তাদের প্রতি বিশ্বাসের ফলে অন্তত কিছু দিনের জন্য হলেও জনগণের বিক্ষোভ স্তিমিত হয়ে পড়ে।
ফলে বুর্জোয়া শাসন, পুঁজিবাদী শাসন এই সব তথাকথিত সৎ ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’-এর (প্রশাসকের) আমলে আরও সংহত ও পাকা বুনিয়াদ তৈরি করার সুযোগ পায় মাত্র। জহরলালের নেতৃত্বে ভারতীয় পুঁজিবাদও তাই আরও পাকাপোক্ত, আরও সুসংহত হয়েছে। তাই লেনিন বলেছিলেন, সৎ ধর্মযাজক ও অসৎ ধর্মযাজকের মধ্যে অসৎ ধর্মযাজকও ভাল এক অর্থে। সে অসৎ বলে ভাল, এই অর্থে নয়। এই জন্যই ভাল যে লোকে সহজেই তাকে চিনতে পারে।
কিন্তু যদি সৎ অথচ বিভ্রান্ত ধর্মযাজক বিপ্লবের রাস্তা থেকে জনসাধারণকে সরিয়ে রাখবার উদ্দেশ্যে তাদের দুঃখদুর্দশার কারণ হিসাবে অদৃষ্টবাদ বোঝাতে থাকে, তা হলে ক্ষতিটা বেশি হয়। কেন? কারণ মানুষ তাকে বিশ্বাস করে, আর মানুষের মুক্তি যে লড়াইতে, সমস্ত রকম শোষণের বিরুদ্ধে সেই লড়াইকে এড়িয়ে যাওয়ার শিক্ষাই তিনি জনতাকে দিয়ে থাকেন।
(১৫ই আগস্টের স্বাধীনতা ও গণমুক্তির সমস্যা)