এই দুর্বৃত্তরাজ নীতিহীন রাজনীতিরই পরিণাম

যে গভর্নিং বডি দক্ষিণ কলকাতা ল কলেজে ছাত্রী-ধর্ষণে অভিযুক্ত তৃণমূল ছাত্রনেতা মনোজিৎকে অস্থায়ী কর্মী হিসাবে নিয়োগ করেছিল, সেটাই নাকি অবৈধ! ২৫ জুন কলেজছাত্রীর সেই ভয়ানক ধর্ষণকাণ্ডের পর থেকে মনোজিতের দুষ্কর্মের অসংখ্য ঘটনা যেমন সামনে আসছে, তেমনই রাজ্যের কলেজে কলেজে ছড়িয়ে থাকা এমন অসংখ্য মনোজিতের কথাও উঠে আসছে।

নিজেদের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সর্বত্রই মানুষ দোষীদের শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। কিন্তু কলেজে কলেজে এই দুষ্কৃতীরাজ এমন পাকাপোক্ত ভাবে কায়েম হল কী করে? বাস্তবে এই বিষবৃক্ষের বীজ এ রাজ্যে রোপণ হয়েছিল অনেক আগেই।

প্রথমে কংগ্রেস এবং তারপর সিপিএম জমানায় শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের একচ্ছত্র দাদাগিরি প্রত্যক্ষ করেছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। ছাত্রসংসদ পরিচালনার নামে অবৈধ কার্যকলাপ, ক্যাম্পাসে মদ-জুয়ার ঠেক, ছাত্রী ও মহিলা কর্মচারীদের সাথে অভব্য আচরণ, প্রতিবাদী বিরোধী ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের নোংরা কটূক্তি ও মারধর, এমনকি ছাত্রী-কর্মীদের গায়ে হাত তোলা কিছুই তারা বাদ দেয়নি। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইউনিয়ন দখল করতে মারদাঙ্গা, গুণ্ডাবাজি, বোমা-গুলির রমরমা চালিয়ে গেছে অবাধে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শাসক-ঘনিষ্ঠ এক শ্রেণির অধ্যাপক-শিক্ষাকর্মীর মদতে ইউনিয়ন নির্বাচনে চালিয়েছে চূড়ান্ত দুর্নীতি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্বংস করেছে সার্বিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ। আর এগুলি করার লাইসেন্স তারা পেয়েছে দলের নেতাদের কাছ থেকেই। এ ভাবে বছরের পর বছর এক অংশের অধ্যাপক ও শিক্ষাকর্মীর সহায়তায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের রাজত্ব চলাটাই যেন ট্র্যাডিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজ্যে পালাবদলের পর রাতারাতি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এসএফআই-এর ইউনিয়ন বদলে যায় টিএমসিপি-র ইউনিয়নে। ছাত্র-রাজনীতি থেকে যেহেতু শাসক সিপিএম নীতি-আদর্শকে আগেই ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছিল, তাই এই বদলে কোনও অসুবিধাই হয়নি। টিএমসিপি গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে এড়িয়ে গিয়ে ছাত্রসংসদ দখলের পথে নামে। শিক্ষাঙ্গনগুলিতে একই গুণ্ডাগিরি, ভয়ের পরিবেশ চলতে থাকে। এক সময় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন। নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্ররা তাদের দাবিদাওয়া যতটুকু জানাতে পারত, তা-ও বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষাঙ্গনগুলি হয়ে ওঠে বেপরোয়া দাদাগিরির আর ভর্তি নিয়ে চূড়ান্ত দুর্নীতি এবং বিপুল টাকা লুটের জায়গা। কলেজ প্রশাসনেও দলীয় লোকদের আধিপত্য বাড়তে থাকে। বছরের পর বছর কলেজ ক্যাম্পাসে এই নীতিহীনতার উদ্দাম চর্চা চলেছে।

অনেকে মনে করেন, ছাত্র রাজনীতি-ছাত্র ইউনিয়ন এ সবই যত নষ্টের মূল। ভাবেন, ছাত্রসংসদ না থাকলে দাদাগিরি থাকবে না, ছাত্ররাও বখাটে হবে না। কিন্তু বাস্তবে কী দেখা যাচ্ছে? কসবা ল কলেজে ২০১৭ সালের পর আর নির্বাচন হয়নি, ছাত্র সংসদও নেই। তা হলে সেখানে এই ধরনের ঘটনা বার বার ঘটে চলেছে কেন? আসলে সমস্যার শিকড় ছাত্র-রাজনীতিতে নেই। তা রয়েছে শাসক দলগুলির চরম দুর্নীতিগ্রস্ত নীতিহীন রাজনীতির মধ্যে।

অভিযুক্ত ছাত্রদের দুষ্কর্মে শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের অবাধ প্রশ্রয়ের খবরগুলি প্রকাশ্যে আসছে। তাঁদের অভয়হস্ত মাথায় নিয়েই মনোজিতের মতো দুষ্কৃতীরা বিনা বাধায় বছরের পর বছর ধরে লুট রাজত্ব চালিয়ে যেতে পেরেছে। এই ভাবে তাদের স্পর্ধা আজ এত দূর পৌঁছেছে যে, কলেজের ছাত্রীদের যৌন নির্যাতন, এমনকি ধর্ষণ করতেও তারা পরোয়া করে না। তারা ধরেই নেয় যে, নেতাদের হাত মাথায় থাকায় কেউ তাদের ছুঁতে পারবে না। বাস্তবে হয়েছেও তাই। থানায় এদের বিরুদ্ধে বার বার অভিযোগ করে ফল মেলেনি। নেতাদের নির্দেশে দলদাস পুলিশ-প্রশাসন মনোজিৎদের গুণ্ডামি-দুর্নীতি-টাকা লুট দেখেও চোখ বুজে থেকেছে। নেতারাও এ সব দেখেও না দেখার ভান করে থেকেছেন। কারণ এরাই তাঁদের কাছে নিয়মিত লুটের বখরা পৌঁছে দেয়। এদের মতো দুষ্কৃতীরা শাসক দলের অস্তিত্বের সঙ্গে পুরোপুরি জড়িয়ে গেছে। এদের উপর নির্ভর করেই দলবাজি, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, এলাকা দখল চলে। চলে ভোটের দিনে সন্ত্রাসের আবহ তৈরি করা থেকে বুথ দখল, ছাপ্পা মারা সবই। এই মনোজিতের দলবলই আলিপুর বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে শাসক দলের হয়ে কাজ করেছে। আইনজীবীদের মারধর করে বের করে দিয়ে নিজের দলবলকে ‘কালো কোট’ পরিয়ে ছাপ্পা ভোট দিয়ে বাজিমাত করেছে। এ হেন সম্পদদের প্রশ্রয় না দিলে দুর্নীতি আর দাপটের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা শাসক দলের চলে! তাই দেখা যাচ্ছে, এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর রাজ্যে ব্যাপক শোরগোল শুরু হলেও মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চুপ। এই নীরবতার অর্থ দুষ্কৃতীদের বুঝতে অসুবিধা হয় না।

ল কলেজের ঘটনার পর ঘোলাজলে মাছ ধরতে বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেসের মতো দলগুলির নেতারা নেমে পড়েছেন। সত্যিই কি বিজেপি নেতারা নারী নির্যাতনের অবসান চান? তা হলে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে নারী নির্যাতনের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে তাঁরা নিশ্চুপ থাকেন কেন? সে সব রাজ্যে তো বিজেপিকে দেখা যায় অভিযুক্ত নেতা-বিধায়কদের গলায় মালা পরিয়ে বীরের সর্ম্বধনা দিতে! সিপিএম শাসনে বিরাটি, বানতলা, ধানতলার ঘটনা এবং এ সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ‘এমন তো কতই হয়’– রাজ্যের মানুষ ভোলেননি।

শাসকই যেখানে দুষ্কৃতীদের ত্রাতা, সেখানে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বদল কীভাবে সম্ভব? পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ক্ষমতালোভী বিরোধী দলগুলি সরকার পরিবর্তনের হাওয়া তুলছে। কিন্তু সরকার পাল্টালেই কি পরিবেশ পাল্টাবে? বন্ধ হবে ধর্ষণ-নারী নির্যাতন?

গভীরে ভাবলে বোঝা কঠিন নয় যে, রাজ্য জুড়ে নারী নির্যাতনের এই জঘন্য পরিবেশ তৈরির জন্য আসলে দায়ী নীতিহীন দুষ্কৃতীনির্ভর রাজনীতি। যে বিরোধী দলগুলি আজ ল কলেজের ঘটনা নিয়ে সরকার পাল্টানোর স্লোগানে গলা ফাটাচ্ছে, তারা নিজেরা যে যেখানে ক্ষমতায় ছিল বা আছে, কোথাওই কিন্তু চিত্র ভিন্ন নয়। যতক্ষণ তারা বিরোধী পক্ষ, ততক্ষণই তারা দুর্নীতি-দুষ্কৃতীরাজের বিরুদ্ধে। মানুষ বার বার দেখেছে, সরকারে বসলেই চরিত্র পাল্টেতারা দুষ্কৃতীদের মদতদাতার ভূমিকা নেয়। শাসক দল হয়ে যায় দুষ্কৃতীদের দাপটনির্ভর। রাজ্যের পূর্বতন সিপিএম সরকারের আমলের সেই তিক্ত স্মৃতি আজও মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলি নারীধর্ষণের ঘটনায় দেশের মধ্যে প্রথম সারিতে। ফলে এই জঘন্য পরিস্থিতির পরিবর্তন সত্যিই চাইলে শুধু সরকার পাল্টে তা হবে না। পাল্টাতে হবে নীতি-আদর্শহীন ক্ষমতালোভী ভোটসর্বস্ব রাজনীতিকে, যে রাজনীতি প্রতি মুহূর্তে এমন অজস্র মনোজিতের জন্ম দিয়ে চলেছে। বিপরীতে শক্তিশালী করতে হবে সেই রাজনীতিকে যা নীতি-নির্ভর। সেই নীতি যা শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়তে শেখায়। যে রাজনীতি চরিত্র দেয়, মনুষ্যত্ব জাগায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লাগাতার সংগ্রাম করে।

নীতি-আদর্শ বিবর্জিত অপ-রাজনীতির দাপট রাজ্যের হাসপাতাল থেকে শুরু করে শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে নিরাপত্তাহীনতার যে ভয়ঙ্কর পরিবেশ তৈরি করেছে, তা থেকে এগুলিকে মুক্ত করতে, সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তাই দরকার ছাত্র-অভিভাবক-শিক্ষক নির্বিশেষে সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের জোটবদ্ধ প্রতিবাদ এবং নীতি-আদর্শভিত্তিক সুস্থ রাজনীতির চর্চা। আর জি কর ঘটনায় যে প্রতিবাদী সংস্কৃতি দেখা গেছে তাকে আরও সংগঠিত রূপ দিতে হবে। এলাকায়, প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন কমিটি গড়ে তুলতে হবে। এগুলিই প্রতিরোধের শক্তি হিসাবে কাজ করবে।