আর্থিক সমীক্ষাঃ সমীক্ষা না বুজরুকি!

দেশের মানুষের আর্থিক পরিস্থিতি শোচনীয় হওয়ার কারণ খুঁজে পেয়ে গেছেন নরেন্দ্র মোদি সরকারের আর্থিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্করা! দেশে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সংকট কেন, মানুষের হাতে রোজগার নেই কেন, কেনই বা টাকার দাম নিজেই নিজের সর্বকালীন কম হওয়ার রেকর্ড প্রায় প্রতিদিন ভেঙে ফেলছে? ৩০ জানুয়ারি সংসদে পেশ হওয়া আর্থিক সমীক্ষার রিপোর্টে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী এবং সরকারের প্রধান আর্থিক উপদেষ্টা একযোগে বলে দিয়েছেন, এ সবে জন্য বিদেশের সংকটই দায়ী! অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁরা সাধারণত দেশের যত কিছু দুর্দশার দায় আগের সরকারগুলির ওপর চাপিয়ে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেন। এ বার আর্থিক ক্ষেত্রে তাঁরা বিদেশের ধুয়ো ধরেছেন!

এই সমীক্ষা বলেছে বিশ্বের আর্থিক পরিস্থিতি যত খারাপই থাকুক না কেন, দেশের আর্থিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং আর্থিক বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.২ শতাংশ হতে পারে। যদিও একই সাথে সমীক্ষা বলে দিয়েছে আগামী আর্থিক বছরে দুনিয়ার আর্থিক পরিস্থিতি যদি কিছুটা ভালর দিকেও যায় তা কখনওই পুরোপুরি নিরাপদ অবস্থায় যাবে না। আশ্চর্যের বিষয়, ভারতের আর্থিক পরিস্থিতির প্রশংসা করতে গিয়ে তাঁরা তিনটি সম্ভাবনার কথা বলে দিয়েছেন। বলেছেন, প্রায় সমান সমান সম্ভাবনা আছে– বিশ্ব পরিস্থিতি একেবারে স্থিতিশীল থাকার, না হয় মাঝারি ধরনের আর্থিক বিপর্যয়, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির। আবার একই সাথে বলেছেন, ২০০৮-এর থেকেও খারাপ আর্থিক পরিস্থিতিতে বিশ্ব যেতে পারে, তেমন সম্ভাবনা কম হলেও আছে। প্রশ্নটা হল, এই রকম সব সম্ভাবনা এক নিঃশ্বাসে বলে লোকঠকানো জ্যোতিষীর ভূমিকা নেওয়ার জন্যই কি আর্থিক উপদেষ্টা থেকে শুরু করে অর্থ দফতরের কর্তাদের দেশের গরিব মানুষের করের টাকায় বিপুল ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাখা হয়! এই রকম অস্বচ্ছ, গোলানো আর্থিক সমীক্ষার ভিত্তিতেই নাকি দেশের আর্থিক বাজেট তৈরি করে সরকার! সেই বাজেট কেমন হতে পারে, কতটা সাধারণ মানুষের খোঁজ রাখতে পারে তা এই সমীক্ষা পেশের দু’দিন বাদে অর্থমন্ত্রীর পেশ করা বাজেটেই আবার প্রমাণ হয়ে গেছে।

আর্থিক সমীক্ষকরা অবশ্য দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে সংকটের কথাটা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারেননি। তাঁরা বিদেশে পরিষেবা রপ্তানির বদলে পণ্য উৎপাদন ও তা রপ্তানির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। ভারতের বিপুল শ্রমশক্তি এবং সম্পদকে পুঁজি হিসাবে উৎপাদনে কাজে লাগানোর জন্য আর্থিক সমীক্ষা নিদান দিয়েছে এই দুই সম্পদকে ‘দক্ষ পরিচালনায়’ উৎপাদনের কাজে লাগালেই সমস্যার সমাধান হবে! ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে শিল্প উৎপাদনের সমস্যা কি নিছক দক্ষ পরিচালনার অভাব? নাকি আসল সমস্যা হল দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারের তীব্র সংকট?

কিন্তু এই সত্যটা স্বীকার করার উপায় আর্থিক উপদেষ্টা থেকে শুরু করে মন্ত্রী-আমলা কারও নেই। এই তথাকথিত দক্ষ পরিচালনার জন্য তাঁরা আর কয়েকটা নিদান দিয়েছেন– প্রথমত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সংজ্ঞা বদলে দিয়ে এই সমস্ত সংস্থায় সরকারি শেয়ার ২৬ শতাংশের নিচে নিয়ে যাওয়া এবং যে সংস্থাগুলি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত হয়েই গেছে সেগুলি থেকে সরকারের পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়া। তাঁরা এমনও বলেছেন, শ্রম আইন সংশোধন করে ‘শ্রম কোড’ চালু হওয়ার ফলে উৎপাদনের পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে। এবার তাকে কাজে লাগাতে হবে। অর্থাৎ, বলতে চাইছেন, শ্রমিককে যথেচ্ছ খাটানো এবং কোনও সুযোগ সুবিধা না দিতে হলেই উৎপাদন একেবারে চড়চড় করে বাড়বে!

আর একটা নিদান হচ্ছে, গ্রামীণ বা শহরের রোজগার গ্যারান্টি স্কিমগুলিকে মানুষকে কাজ দেওয়ার স্কিমের বদলে উৎপাদনের প্রয়োজনের ভিত্তিতে কাজের স্কিমে পরিণত করা। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার ‘ভিবিজি রামজি’ বিল এনে গ্রামীণ মানুষের রোজগার যোজনায় গ্যারান্টি তুলে দেওয়ার যে কাজটি করতে চেয়েছে আর্থিক সমীক্ষার সুপারিশ সেই দিকেই। সরকার এখন শহরের পরিকাঠামো শুধু নয়, গ্রামীণ পরিকাঠামো, পানীয় জল, সেচ সমস্ত কিছুই ধীরে ধীরে বেসরকারি পুঁজির হাতে তুলে দিতে চাইছে।

গ্রামীণ মানুষের কাজের বিষয়টা এই পুঁজিপতিদের মুনাফার সাথে যুক্ত করে দেওয়ার সুপারিশই করল আর্থিক সমীক্ষা। মনে করিয়ে দেওয়া ভাল ইতিমধ্যে মার্কিন শুল্ক আক্রমণের চাপে ভারতের বস্ত্র, জুতো, চামড়ার নানা দ্রব্য, রত্ন ও গয়না ইত্যাদি শ্রমনিবিড় শিল্প সংকটে। এই পরিস্থিতিতে এই ক্ষেত্রে লগ্নি করা পুঁজি মালিকদের বাঁচাতে এবং দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যাকে সামাল দিতে সম্প্রতি এই ক্ষেত্রগুলোর জন্য ইউরোপীয় বাজারের বরাত পাওয়ার চেষ্টা করছে মোদি সরকার। এই বরাত যদি শেষ পর্যন্ত জোটেও তীব্র বাজার সংকট এবং আরও তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোপ পড়বে শ্রমিকের সংখ্যা এবং তার মজুরিতেই। ফলে শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থানের আশা নেই, রয়েছে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা।

কেন্দ্রীয় সরকারের নিযুক্ত এই আর্থিক সমীক্ষকরা স্কুলছুট নিয়ে দুঃখে কাতর হয়ে সুপারিশ করেছেন, একেবারে নিচু ক্লাস থেকে স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের কারিগরি শিক্ষা দিয়ে শিল্প জগতের উপযোগী করে তুলতে পারলে তারা রোজগার করবে, ফলে আর স্কুলছুট হবে না। অপূর্ব প্রজ্ঞা! ছাত্র-ছাত্রীরা বেশিরভাগই মাঝ পথে পড়া বন্ধ করে কেন? কোথায় যায় তারা? হয় কোনও কাজে ঢোকে, না হয় মা-বাবা-দাদা-ভাই-বোন সকলে কাজে যায় বলে তাকে ঘরের দায়িত্ব আগলাতে হয়। এবার এই ছাত্র-ছাত্রীদের কারিগরি বিদ্যা শিখিয়ে দিলেই তারা কাজে না গিয়ে সব স্কুলে ভিড় করবে? না কি যেটুকু পড়াশোনা করছিল তাও ছেড়ে কাজের সন্ধানে দেশ বিদেশে ছুটবে? দারিদ্রটাই যেখানে আসল রোগ, সেখানে পরিবারের দারিদ্র মোচনের চেষ্টা না করে, বাবা মায়ের উপযুক্ত রোজগারের ব্যবস্থা না করে এই নিদান আসলে কী জন্য? পুঁজি মালিকদের জন্য সস্তার মজুর সরবরাহই নয় কি? তাহলে মহা আড়ম্বরে শিক্ষার অধিকার নিয়ে প্রচারের মানে কী? বরং শুধু সন্তানের পড়াশোনার জন্যই তো সরকার দরিদ্র পরিবারগুলোকে অর্থ সাহায্য করতে পারত! যথার্থ শিক্ষাপ্রাপ্ত শ্রমবাহিনী যদি সত্যিই মোদি সরকারের লক্ষ্য হত তাদের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানো এই সমীক্ষকদের তারা তো এই সুপারিশটা করতে বলতে পারত!

সব মিলিয়ে আর্থিক সমীক্ষা আসলে মোদি সরকাকেও কোনও দিশা দেখাতে ব্যর্থ। কারণ তীব্র যে সংকটে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা জর্জরিত তার থেকে মুক্তির কোনও উপায় কোনও নিদানে নেই। এই ব্যবস্থার সর্ব অঙ্গে ঘা, পুলটিশ বাঁধবে কোথায়? কিন্তু পুঁজিপতিদের সেবকদের তো এ কথা মানলে চলে না। ফলে হুকুম-বরদার আর্থিক উপদেষ্টাদের পণ্ডিতপ্রবর সেজে এমন বিড়ম্বনা না সয়ে উপায় থাকে না।