
আরাবল্লী পর্বতমালাকে পরিকল্পিত ভাবে ধবংস করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ও ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী জনগণের বিক্ষোভ-আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে ২৪ ডিসেম্বর এস ইউ সি আই (সি)-র সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ এক বিবৃতিতে বলেন,
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রকের নেতৃত্বাধীন এক কমিটির প্রস্তাব অনুসারে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে ৬৯২ কিলোমিটার বিস্তৃত আরাবল্লী পর্বতমালার সংজ্ঞা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে নতুন এই সংজ্ঞা অনুযায়ী স্থানীয় জমি থেকে ১০০ মিটার বা তার থেকে উঁচু পাহাড়গুলিই কেবলমাত্র সুরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে সরকারি ভাবে স্বীকৃত হবে। এর মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যেই বিপদগ্রস্ত এই পর্বতমালা বিপর্যয়ের সামনে পড়বে। রাজস্থান জুড়ে বিস্তৃত কম উচ্চতার পাহাড়গুলি আরাবল্লী থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় তা খনি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের শিকার হবে। আরাবল্লী পর্বতমালা ঘিরে বিস্তৃত যে বনভূমি আছে তা গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা ও দিল্লি জুড়ে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি ও খরা প্রতিরোধে সাহায্য করে। আরাবল্লীর বনাঞ্চলের আচ্ছাদন পরিবেশে আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহের গতি ও বৃষ্টিপাতের ধরন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। নতুন সংকীর্ণ সংজ্ঞাকে হাতিয়ার করে বেপরোয়া খনন চলতে থাকলে ধবংস হবে ভূগর্ভস্থ জলের প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ অঞ্চল, ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হবে এবং অনিয়ন্ত্রিত জলপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে হ্রদ, নদী ইত্যাদিতে জলসরবরাহ করে ভূগর্ভস্থ যে সিক্ত শিলাস্তর, তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে জলসংকট দেখা দেবে। বিলুপ্ত হবে ভূপৃষ্ঠের জলাশয়গুলি। উত্তর-পশ্চিম ভারতে দেখা দেবে তীব্র জলসংকট এবং তার ফলে কৃষিজ উৎপাদন ব্যাহত হবে। এই প্রবণতা আরাবল্লীর দক্ষিণ অঞ্চলে ইতিমধ্যেই বর্তমান। এক দিকে অত্যধিক খনন কাজের জন্য জল সংকট, অন্য দিকে পাথর ভাঙা ধূলাস্তর শস্যের উপর আস্তরণ তৈরি করে কৃষিজ উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ধবংস করেছে। আরাবল্লীর নতুন আইনি সংজ্ঞা বেশিরভাগ পাহাড়গুলিকে যে ভাবে খনন কাজের অনুমতি দেয় তাতে অদূর ভবিষ্যতে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কৃষিজ উৎপাদন প্রক্রিয়া যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা বলাই বাহুল্য।
অবশিষ্ট অরণ্য অঞ্চল সংকুচিত হতে হতে জীববৈচিত্র্য ধবংস হবে, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়তে থাকবে। আরাবল্লীর পাহাড়গুলি, যা থর মরুভূমির বিস্তৃতির পথে এক প্রাকৃতিক বাধা হিসাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেগুলির ধ্বংসসাধন মরুভূমির বিস্তৃতিতেই সাহায্য করবে। বোঝা যাচ্ছে এ দেশের শাসককুল দেশ বা দেশবাসীর ভবিষ্যত নিয়ে আদৌও ভাবে না।
রাজস্থানের দক্ষিণাঞ্চলের দরিদ্র আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষুব্ধ ও জীবন-জীবিকা বাসস্থান সংস্কৃতি থেকে উৎখাত হওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন। অনিয়ন্ত্রিত খনন যে ইতিমধ্যে নানা পরিবেশজনিত ক্ষতি করেছে, দিল্লি ও ন্যাশনাল ক্যাপিটাল অঞ্চলে ব্যাপক বায়ু দূষণের কারণ হিসেবে কাজ করছে, প্রতিবাদী জনগণ তা সঠিক ভাবেই সামনে এনেছেন এবং এ সব ক্ষেত্রে যদি আর কোনও নরম মনোভাব নেওয়া হয়, তবে তা বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের বাসস্থানের উপর একটা বিরাট বিপর্যয় নামিয়ে আনবে, এ সর্তকবার্তাও তাঁরা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আরাবল্লীর ৯০ শতাংশেরও বেশি নিচু ঝোপযুক্ত পাহাড়ের সারি, তৃণভূমি, শৈলশিরা ইত্যাদিকে বৃহৎ পুঁজিপতিদের বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র, আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ করছি এবং ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী মানুষদের ন্যায়সঙ্গল আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। কর্পোরেট হাঙরদের স্বার্থে মানব সভ্যতাকে বিপন্ন করার এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী, জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ, অরণ্যরক্ষক ও অরণ্যবাসী নাগরিকদের কাছে আমরা ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ধবনিত করার আহ্বান রাখছি।