Breaking News

আমার নাম মহম্মদ দীপক কুমার

–      নাম কী?

–      মহম্মদ দীপক কুমার।

–      মহম্মদ দীপক কুমার আবার কারও নাম হয় নাকি?

–      আমার নাম জেনে তোমার কী হবে? এবার কড়া জবাব দীপকের।

২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসেই একদল উগ্র হিন্দুত্ববাদী (বজরং দলের সদস্য) হানা দিয়েছিল উত্তরাখণ্ডের কোটদ্বার শহরে ৭০ বছরের ওয়াকিল আহমেদের দোকানে। কেননা তাঁর দোকানের নাম ‘বাবা স্কুল ড্রেস অ্যান্ড ম্যাচিং সেন্টার’। গেরুয়া বাহিনীর ফরমান, ‘বাবা’ মানে হয় বয়স্ক ব্যক্তি, না হয় ‘সাধু’ বা ‘ধার্মিক পুরুষ’। তাই অনেকে হিন্দু ভেবে ভুল করে একজন মুসলমানের দোকানে চলে আসছে। তাদের মতে সেটা অবৈধ। তাই হুমকি– দোকানের নাম পাল্টাতে হবে, না হলে দোকানিকেই তাঁর ধর্ম পাল্টাতে হবে। ফতোয়া শুনে যখন বৃদ্ধ দোকানি কী করবেন বুঝতে পারছেন না, তখন এগিয়ে এলেন স্থানীয় যুবক দীপক কুমার। সোজাসুজি চ্যালেঞ্জ করলেন গেরুয়া বাহিনীকে। তিরিশ বছরের পুরানো দোকানের নাম বদলাতে হবে কেন? হিন্দুত্ববাদীরা কি নিজেদের বাবার নাম বদলে ফেলবে? ‘বাবা’ শব্দটি হিন্দু শব্দ নয়, মুসলমানরাও ‘বাবা’ শব্দ ব্যবহার করেন। তা হলে কেন দোকানের নামে ‘বাবা’ শব্দ রাখা যাবে না? দীপকের প্রশ্নবাণেই ওয়াকিল আহমেদের দোকান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয় উন্মত্ত বাহিনী। দীপকের এই সাহসী উদ্যোগে সাথে ছিলেন তাঁর বন্ধুরা এবং অন্য দোকানদাররাও। তাঁরাও ধর্মে হিন্দু। দীপকের মতো বিজয় রাওয়াত-ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হুমকির তীব্র বিরোধিতা করেন।

কিন্তু ঘটনার শেষ এখানেই নয়। সেদিন দীপক ও তাঁর সহযোগীদের প্রতিরোধের সামনে ফিরে গেলেও ঠিক পাঁচ দিন পরে উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন জায়গা থেকে শ’ দেড়েক লোক নিয়ে তারা ফিরে আসে। সঙ্গে ছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী। তারা দীপকের জিমের সামনে গিয়ে হুমকি দিতে থাকে। বিজেপি নেতা তথা উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামী ‘হেট স্পিচ’ বা ‘ঘৃণা ভাষণ’ দেওয়ার কাজে ২০২৫ সালে ভারতে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। তাঁর সরকারের পুলিশ হামলাবাজদের ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে দীপককেই থানায় নিয়ে যায়। সেখানে গেরুয়া বাহিনী দীপকের নামে এফআইআর দায়ের করে। সেই অভিযোগপত্রে দীপকের নাম-ঠিকানা সবই আছে। কিন্তু দীপকের দায়ের করা এফআইআর-এ কারও নাম রাখতে দেওয়া হয়নি। কেবল কিছু অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি হিসাবে বজরং দলের সুপরিচিত কর্মীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ ভিডিওতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কারা সেই হামলা করেছে। ওয়াকিল আহমেদের দায়ের করা এফআইআর-এ অবশ্য দুজনের নাম আছে, কিন্তু তাদের সাথে আর যারা এসেছিল তাদের ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ বলে দেখানো হয়েছে। বজরং দলের যে কর্মীরা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে পুলিশের উপর হামলা চালিয়েছিল, তাদেরও ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ বলে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কোটদ্বার শহরে সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের প্রবেশ অঘোষিত ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এসব করেও দীপককে ভয় দেখানো যায়নি। তিনি ইনস্টাগ্রামে লিখেছেনঃ ‘আমি হিন্দু নই, মুসলিম নই, শিখ নই, খ্রিস্টানও নই। আমি একজন মানুষ।’ এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘আমি তোমাদের সকলকে– আমার ভাই, বোন এবং বন্ধুদের এটা বলতে চাই যে আমাদের দেশের প্রয়োজন ঘৃণা নয়, ভালবাসা এবং স্নেহ।

এই উত্তরাখণ্ডেই ‘চারধাম যাত্রা’র সময় জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল মুসলমান দোকানদারদের দোকান। বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে ‘মহা কুম্ভমেলা’র সময় দোকানে দোকানে ধর্মীয় পরিচয় লিখতে বাধ্য করা হয়েছিল। বিজেপি ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে এরকমই ঘৃণার চাষ করে চলেছে। সেই ঘৃণার বিষে আচ্ছন্ন হয়ে অনেক জায়গায় ডেলিভারি বয়দের পরিচয় মুসলিম জেনে অর্ডার বাতিল করতে দেখা গেছে। ড্রাইভার বা যাত্রীর ধর্মীয় পরিচয় জানার পরে হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে। আজ দরকার ‘মহম্মদ দীপক কুমারের’ মতো সাহসী যুবক-যুবতীর, যাঁরা ফ্যাসিস্ট বাহিনীর চোখে চোখ রেখে রুখে দাঁড়াবেন।