Breaking News

‘আপনাদের লড়াইয়ের পাশে আছি’ আশাকর্মীদের আন্দোলনের সমর্থনে ঘোষণা নাগরিক সমাজের

আশাকর্মীদের সমর্থনে কলকাতা প্রেস ক্লাবের লনে নাগরিক সম্মেলনে বিশিষ্টজনেরা। ৩০ জানুয়ারি

আশাকর্মী এবং পৌর স্বাস্থ্যকর্মীদের ন্যায্য দাবির প্রতি দীর্ঘ সরকারি অবহেলার প্রতিবাদে কলকাতা প্রেসক্লাবের লনে নাগরিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল ৩০ জানুয়ারি। এ দিন ছিল আশাকর্মীদের কর্মবিরতির ৩৯তম দিন। সম্মেলন পরিচালনা করেন নার্সেস ইউনিটির সম্পাদিকা ভাস্বতী মুখার্জী ও মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা অধ্যাপক সৌম্য সেন। নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে নাগরিক সম্মেলন শুরু হয়। অধ্যাপিকা মীরাতুন নাহার বলেন, আশাকর্মীরা স্বাস্থ্য পরিষেবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সরকার এদের দিয়ে কাজ করায় অথচ সরকারি কর্মীর স্বীকৃতি দেয় না। এ অত্যন্ত অন্যায়। এঁদের আন্দোলনের পাশে অবশ্যই থাকব।

আর জি কর আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা ডাঃ অনিকেত মাহাতো বলেন, কোভিডের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আশাকর্মীরা স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে গেছেন। সরকারি অবহেলায় যখন গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি ধুঁকছে, তখন আশাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগীদের খোঁজ করা, হাসপাতালমুখী করা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তাঁদের লড়াইকে সমর্থন করে তিনি বলেন, এ আন্দোলন শুধু আশাকর্মীদের নয়, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা টিকিয়ে রাখার আন্দোলন।

বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ অনিতা রায় বলেন, মাসিক পাঁচ হাজার টাকায় সংসার চলা সম্ভব? কী সাংঘাতিক শোষণ! আমরা সকলেই আপনাদের পাশে আছি।

বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী তাঁর বার্তায় বলেন, আশাকর্মীরা স্বাস্থ্য পরিষেবার শিরদাঁড়া। তাঁদের ন্যায্য দাবি সরকার মেনে নিক। আমার কণ্ঠ সরকারি দমননীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। গায়ক পল্লব কীর্তনীয়া তাঁর বার্তায় বলেন, এই আন্দোলনের পাশে আছি।

অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষ বলেন, কেরালা হোক বা পশ্চিমবঙ্গ– কোনও সরকারই আশাকর্মীদের দাবিগুলি মানতে চাইছে না। আপনাদের আন্দোলন নাগরিকদের চোখ খুলে দিয়েছে। আপনারা জয়ী হওয়া মানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জয়, নাগরিকদের জয়। বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী শুভেন্দু মাইতি বলেন, আশাকর্মীদের চিৎকার যাতে আরও উচ্চকণ্ঠ হয় তাই এসেছি। এই চিৎকারে সামিল হতে বলব সকলকেই। অধ্যাপক অশোক সরকার বলেন, স্বাস্থ্য সূচক যে কিছুটা উন্নত হয়েছে, তা আশাদের কল্যাণে। সরকারের অবশ্যই উচিত এঁদের স্বাস্থ্যকর্মীর স্বীকৃতি দেওয়া। চিকিৎসক আন্দোলনের নেতা ডাঃ বিপ্লব চন্দ্র বলেন, ২৪ ঘণ্টাই আশাকর্মীদের ডিউটির জন্য রেডি থাকতে হয়। এই শ্রমের মূল্য সরকার দেবে না কেন? আন্তর্জাতিক নানা মঞ্চে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য সরকার প্রশংসিত হচ্ছে আশাকর্মীদের শ্রমের বিনিময়ে। অথচ মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের দাবি মানেন না, এটা চরম লজ্জার। শহরে আশা প্রকল্পের কাজ করেন পৌর স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাঁদের পক্ষে পৌর স্বাস্থ্যকর্মী কর্মী কন্ট্রাকচুয়াল ইউনিয়নের যুদ্ম সম্পাদিকা কেকা পাল বলেন, ২১ জানুয়ারি ভোর সাড়ে পাঁচটায় দুজন পুরুষ পুলিশ আমাকে আটকাল। টেনে তুলল ভ্যানে। বললাম, আমি স্বাস্থ্যকর্মী, আমাকে আমার কাজে যেতে দিন। ওরা থানায় নিয়ে আমাকে একটা অন্ধকার ঘরে আটকে রাখল ছ’ঘণ্টা। ফোন কেড়ে নিল। ফোন থেকে ভুয়ো মেসেজ কল করল শিলিগুড়ি গ্রুপে যে, কর্মসূচি বাতিল হয়ে গেছে। তোমার এসো না। এখন হুমকি দেওয়া হচ্ছে, কাজে যোগ দাও। না হলে তোমাদের জায়গায় অন্য লোক নেব। কিন্তু হুমকির সামনে আমরা মাথা নত করব না। নাগরিকরা পাশে আসায় আমরা আরও উদ্দীপ্ত। আমাদের আন্দোলন বন্ধ হবে না।

কয়েক মাস আগে ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের ব্যাপক অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ছাত্রী সুশ্রীতা সরেন। তিনি আশাকর্মী আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রসমাজ আপনাদের আন্দোলনের পাশে আছে। আইনজীবী দেবযানী সেনগুপ্ত বলেন, কাজ অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাওয়া মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। এই অধিকারটুকুও থাকবে না! সরকার স্বাস্থ্য ভবনে আন্দোলনকারীদের ডেকে পাঠিয়ে পুলিশ দিয়ে রাস্তায় আটকাল! এই স্বৈরাচার চলতে পারে না।

প্রাক্তন অধ্যক্ষা মৈত্রেয়ী বর্ধন রায় আশাকর্মীদের আন্দোলনে পুলিশি হামলা প্রসঙ্গে বলেন, আমরা কি সত্যিই সভ্য সমাজে বেঁচে আছি! এটা কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র! আপনাদের কোনও দাবি অন্যায্য নয়। আমি আপনাদের পাশে আছি। সার্ভিস ডক্টর ফোরামের সভাপতি ডাঃ দুর্গাপ্রসাদ চক্রবর্তী বলেন, আশাকর্মীদের ভাতা বাড়ালে মাত্র ৮২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে সরকারকে। এটুকু সরকার বরাদ্দ করতে পারে না! শিল্পী-সাংস্কৃতিক কর্মী-বুদ্ধিজীবী মঞ্চের পক্ষ থেকে সাংবাদিক দিলীপ চক্রবর্তী আশাকর্মীদের আন্দোলনকে সর্বান্তকরণে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। প্রাক্তন বিচারপতি অনন্ত বর্ধন বলেন, যা দেখেছি, যা শুনলাম, তাতে বলা উচিত, আন্দোলন আরও জোরদার করুন। আমরা পাশে আছি। অধ্যাপক মনোজ গুহ বলেন, আপনারা গণআন্দোলনের উল্লেখযোগ্য নজির সৃষ্টি করেছেন। গোটা রাজ্য জুড়ে বেগুনি ঝড় তুলেছেন আপনারা। এগিয়ে যান। আপনাদের সাথে আমরা আছি।

পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়নের রাজ্য সম্পাদক ইসমত আরা খাতুন বলেন, নাগরিকরা যে বক্তব্য রাখলেন তাতে আমরা অনুপ্রাণিত। ভারতে নানা প্রকল্পে কয়েক কোটি মহিলা শ্রমিক নিয়োজিত। কিন্তু শ্রমের মূল্য দাবি করলেই, সম কাজে সম মজুরি দাবি করলেই সরকার এড়িয়ে যায়। মা ও শিশুর সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত যে আশাকর্মীরা, তাঁদের ন্যূনতম মজুরি দিতে হবে, এটা আমাদের দাবি। এ দাবি কি অন্যায়, বেআইনি? আমরা লক্ষ রাখছি, আসন্ন বাজেটে এই দাবির প্রতি যদি সুবিচার করা না হয়,আন্দোলন নতুন মোড় নেবে।