Breaking News

আইএসআরঃ শুধু ভোটের লোভে মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ঠেলে দিল বিজেপি সরকার

দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে গেছে ওপিকুল ইসলাম, জগদীশ মণ্ডলদের। নয়ডার বস্তি থেকে সস্ত্রীক ওপিকুলের কোচবিহারে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে শুধু ট্রেনের তৎকাল টিকিট কাটতেই লাগবে ৬,৪০০ টাকা। এ দিকে জোগাড় হয়েছে মাত্র ৪ হাজার। তা হলে কী করে এসআইআর-এর এনুমারেশন ফর্ম ভরবেন তাঁরা! ফর্ম জমা না দিলে নাগরিকত্ব থাকবে তো! ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে ডিটেনশন ক্যাম্পে কিংবা বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেবে না তো! উদ্বেগ তাড়া করছে ওপিকুল ও তাঁর স্ত্রীকে। জগদীশ মণ্ডল, গৌরব হালদারদেরও। নয়ডার ঝুপড়ি ঘর থেকে নদিয়ায় গ্রামের বাড়িতে ফেরার মতো টাকা নেই হাতে। কোনওক্রমে যদি বা যেতে পারেন, ফিরতে দেরি হলে ছাঁটাইয়ের হুমকি দিয়ে রেখেছে মালিক। এই অবস্থায় কী হবে, কেমন করে এসআইআর-এর কাগজ ঠিকঠাক জমা দেবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁরা।

পেটের দায়ে দুটো টাকা বেশি রোজগারের আশায় গ্রাম ছেড়ে নয়ডায় পাড়ি দিয়েছিলেন ওপিকুল ইসলাম, জগদীশ মণ্ডলরা, কয়েক বছর আগে। সেখানে কেউ ভ্যানরিকশা চালান, কেউ ছোট কারখানার শ্রমিক, কেউ বা পরিচারিকার কাজ করেন বা আবর্জনা থেকে প্লাস্টিক কুড়ান। বেশির ভাগেরই লেখাপড়া শেখার সুযোগ মেলেনি। অনলাইনে কী করে ফর্ম ভরবেন, আদৌ ভরতে পারবেন কি না, জানা নেই। নাগরিক হিসাবে দেশে থাকতে পারবেন কি না, জানা নেই সে কথাও। কারণ ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এসআইআর চালু করে দেশের মানুষের নাগরিকত্বকেই এ বার প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার।

অথচ ওপিকুল ইসলাম, জগদীশ মণ্ডলদের মতো পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকেরই নিজের নাম, না হলে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনের নাম ২০০২-এর ভোটার তালিকায় আছে। অবশ্য সোনালি বিবির বাবা-মায়ের নামও তো ২০০২-এর তালিকায় রয়েছে! তা সত্ত্বেও দিল্লিতে কাজ করতে যাওয়া বীরভূমের অন্তঃস্বত্ত্বা সোনালিকে বিনা বিচারে তাঁর স্বামী-সন্তান সহ ‘অনুপ্রবেশকারী’ দেগে দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছে বিজেপি সরকারের অনুগত দিল্লি পুলিশ আর সীমান্তরক্ষী বাহিনী– কীসের ভিত্তিতে তারাই জানে! সোনালির পরিবারের দায়ের করা মামলায় হাইকোর্ট চার সপ্তাহের মধ্যে সোনালি সহ ছ’জনকে দেশে ফেরানোর আদেশ দিলেও কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সেই উদ্যোগ নেয়নি। উল্টে পুড়ে যাওয়া মুখ বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় বিজেপি সরকার হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে। এখন দুই দেশের সরকার, বিচারবিভাগ ও প্রশাসনের দড়ি-টানাটানিতে বাংলাদেশে জেলবন্দি সোনালিদের দুর্গতির শেষ নেই। আসন্নপ্রসবা সোনালি ও তার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে শুধু সোনালির পরিজনরাই নন, আজ উদ্বিগ® গোটা রাজ্যের মানুষ।

সোনালি বিবি একা নন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাবেই অনুপ্রবেশকারী তকমা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে ১৮৩ জনকে, যাঁদের অধিকাংশই জন্মসূত্রে ভারতীয়। এসআইআর চালুর বেশ কয়েক মাস আগে থেকে দেশ জুড়ে ‘অনুপ্রবেশ’ ‘অনুপ্রবেশ’ রব তুলে দিয়েছিল বিজেপি। সর্বত্র, বিশেষত বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী, বিশেষ করে বাংলাভাষী গরিব মানুষ দেখলেই তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দিয়ে মারধর, পুলিশি নির্যাতন, এমনকি ‘পুশ ব্যাক’ নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হিসাব বলছে, অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দেগে দিয়ে অন্তত ২৪০০ জনের উপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়েছে বিজেপি সরকারের পুলিশ। এই নির্যাতিতদের একজন রাজস্থানে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কর্মরত মালদা জেলার কালিয়াচকের বাসিন্দা আমির। লক আপে নিয়ে গিয়ে রাজস্থানের পুলিশ আমিরের বুকে বুট পরা পা চাপিয়ে দিয়ে, বেধড়ক লাঠিপেটা করে তাঁকে দিয়ে বলিয়ে নিতে চেয়েছিল যে তিনি ‘বাংলাদেশি’। তাঁকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাকও করা হয়েছিল। যদিও নাগরিকত্বের সমস্ত প্রমাণ থাকায় হাইকোর্টের রায়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন আমির।

এ বার ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এসআইআর চালু করে নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ‘অনুপ্রবেশ তত্ত্ব’কেই জোরালো করতে চাইছে বিজেপি। এবং এই এসআইআর-এর জেরে আপাতত পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৮ কোটি ভোটারের হিমশিম খাওয়ার দশা। ২০০২-এর ভোটার তালিকায় নাম না থাকা নাগরিকদের একটি বড় অংশ যাঁদের নিয়মিত আয় নেই, নিজস্ব বাসস্থান নেই তাঁরা কোথা থেকে নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া নথিপত্র জোগাড় করবেন, সে কথা ভেবে আকুল হচ্ছেন। দরিদ্র আদিবাসী, বনবাসী মানুষ কোথা থেকে পাবেন প্রয়োজনীয় শংসাপত্র! বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাঁদের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে, জীবন গুছিয়ে নিতে অপারগ সেই সব মানুষের পক্ষে কি নথিপত্র গুছিয়ে রাখা সম্ভব? যাঁরা রুজি-রোজগারের তাড়নায় ভিন রাজ্যে বাস করেন, তাঁরাই বা কী করবেন? সর্বোপরি, যাঁদের নাম ২০০২-এর তালিকায় আছে, নথিপত্র জমা দেওয়ার দায় না থাকলেও পাছে এসআইআর করতে বিএলও এসে দরজা বন্ধ দেখে ফিরে যান, সেই আশঙ্কায় জরুরি কাজ বন্ধ করে ঘর পাহারা দিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে তাঁদের। সব মিলিয়ে রাজ্যের সর্বত্র– পাড়ার মোড়ে জটলায়, দোকানে, বাজারে, পথে-ঘাটে মানুষের মুখে শুধুই এসআইআর নিয়ে উদ্বেগ, আশঙ্কা আর বিরক্তির কথা।

তা হলে রাজ্যের মানুষ কি নির্ভুল ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা চান না? দেশের প্রতিটি নাগরিক অবশ্যই তা চান। সেই লক্ষ্যে প্রতি বছরই নিয়মমাফিক তালিকা সংশোধনের কাজও চলে। সংক্ষিপ্ত সংশোধন, চলমান সংশোধন ও নিবিড় সংশোধন– এই তিন ধরনের সংশোধন স্বাধীনতার পর থেকে বার বারই হয়েছে। গত ২০০২ সালে ৮ মাস ধরে চলেছে নিবিড় সংশোধন। কোনও দিনই তা নিয়ে এত হই চই হয়নি। প্রতিবারই সর্বশেষ ভোটার তালিকায় নাম থাকলেই জীবিত ভোটারের নাম নতুন তালিকায় যুক্ত হয়ে গেছে। কোনও বারেই তালিকায় নাম তোলার জন্য পুরনো ভোটারদের ফর্ম পূরণ করতে হয়নি। এ বারই প্রথম ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ তথা এসআইআর চালু করে বিজেপি সরকার নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে নাগরিকত্ব নির্ধারণের কাজ করিয়ে নিচ্ছে, যা তাদের এক্তিয়ারেই পড়ে না। তা না হলে, ২০০২ ও ২০২৫ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও, প্রত্যেককে কেন এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করতে হচ্ছে? আসলে ২০০৩ সালে বাজপেয়ী নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের আনা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কাজে লাগিয়ে কয়েক বছর আগে দেশ জুড়ে এনআরসি চালু করতে চেয়েছিল বিজেপি সরকার। প্রবল নাগরিক আন্দোলনে সেই অপচেষ্টা সফল হতে পারেনি।

এ বার নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের নাম করে ঘুরিয়ে সেই এনআরসি-র কাজ করারই অপচেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি সরকার, যে এনআরসি-র মূল উদ্দেশ্য দেশের মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা। বিজেপি-কর্তাদের ধারণা এতে তাদের ‘অনুপ্রবেশ তত্ত্ব’ জল-হাওয়া পাবে, কিছু মুসলিম অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে দেশের যাবতীয় সমস্যার মূলে যে তারাই, ঢাক পিটিয়ে তা আবারও প্রচার করা যাবে এবং নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়া যাবে এবং এর ফলে পশ্চিমবঙ্গ সহ কয়েকটি রাজ্যের আসন্ন ভোটে বিজেপি বিরাট সুবিধা পেয়ে যাবে। সেই লক্ষে্যই প্রবল উদ্যমে দেশ জুড়ে এসআইআর চালু করে দিয়েছে বিজেপি সরকার।

অথচ অভিজ্ঞতা ঠিক উল্টো কথাই বলছে। সবেমাত্র বিহারে হয়ে গেল এসআইআর। রিপোর্ট অনুযায়ী সে রাজ্যে মোট ৩১৩ জন বিদেশির নাম পাওয়া গেছে, যার মধ্যে মুসলিম রয়েছেন মাত্র ৭৮ জন। বাকি ২৩৫ জনই হিন্দু। এর আগে ওই বিশেষ ধর্মের অনুপ্রবেশকারীদের দেশছাড়া করার কথা ঘোষণা করে বিজেপি সরকার আসামে এনআরসি চালু করেছিল। সেখানেও দেখা গেছে মোট ১৯ লক্ষ চিহ্নিত অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে ১৪ লক্ষই হিন্দু ধর্মের। এ রাজ্যেও এখনও পর্যন্ত এসআইআর-এ নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় যতজন আত্মহত্যা করেছেন, তার অধিকাংশই হিন্দু ধর্মের মানুষ।

আসলে হিন্দু-মুসলমান বিভেদ খুঁচিয়ে তুলে এক পক্ষকে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে এক দলের ত্রাতা সেজে অন্য দলকে সন্ত্রস্ত করে রেখে ভোটবা’ ভরানোর চেষ্টা করা ছাড়া বিজেপির সামনে অন্য রাস্তা খোলা নেই। এসআইআর চালু করার পিছনে বিজেপির এই মূল উদ্দেশ্যটিই কাজ করছে। সঠিক ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা নেহাত নেতাদের কথার কথা। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেছে আরএসএস ও বিজেপি-র একাধিক নেতার ভোটার তালিকায় কারচুপির কথা। জানা গেছে, বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ, আরএসএস নেতা রাকেশ সিনহা গত ফেব্রুয়ারিতে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েই আবার নভেম্বরে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, শাসক দলের নেতা বলেই কি যখন যে রাজ্যে ভোট, তখন সে রাজ্যের ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারলেন তিনি! দিল্লির আরও দুই বিজেপি নেতা সন্তোষ ওঝা ও নগেন্দ্র কুমারও একই পথে হেঁটে এক বছরের মধ্যেই দুই রাজ্যের ভোটার তালিকায় নাম তুলে ফেলেছেন। এঁদের একজন আবার দিল্লিরই বাসিন্দা! স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি যে বিজেপির কাছে নিছক একটা অজুহাত, এর পরেও তা বুঝতে অসুবিধা হয় কি?

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরকে কেন্দ্র করে নাগরিকত্ব হারানোর যে আতঙ্ক বিজেপি তৈরি করতে চাইছে, রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও তা প্রশমনের চেষ্টার বদলে আতঙ্ক জিইয়ে রেখে আতঙ্কিত মানুষের ত্রাতা সেজে ভোটবাক্স ভরানোর খেলা খুব দক্ষতার সঙ্গেই খেলে চলেছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

রাজ্যে রাজ্যে এসআইআর চালু করার পিছনে বিজেপি সরকারের একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে। অনুপ্রবেশ তত্ত্বের আগুনে ঘি ঢেলে গরিবি, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধির মতো জনগণের মূল সমস্যাগুলি থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া, নথি জোগাড় করার কাজে তাদের ব্যস্ত রাখা আর মানুষের মধ্যে নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্ক সৃষ্টি করাই তাদের লক্ষ্য। এ ছাড়া ভোটযুদ্ধে লড়ার অন্য হাতিয়ার নেই বিজেপি নেতাদের। তাই বিহারে ৭ কোটির বেশি মানুষকে এসআইআর-এ নাকানি-চোবানি খাইয়ে মাত্র ৭৮ জন মুসলিমকে অনুপ্রবেশকারী বলতে পারার পরেও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিহারে ভোট-প্রচারে গিয়ে সেই অনুপ্রবেশই যে দেশের মূল সমস্যা তা নিয়ে গলার শির ফুলিয়ে ভাষণ দিয়ে এসেছেন। অনুপ্রবেশকারীদের কারণেই সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে জনবিন্যাস পাল্টে যাচ্ছে– বিহারের সভায় এ হেন ডাহা মিথ্যে প্রচারও করেছেন তাঁরা। শুধুমাত্র ভোটে ফয়দা লোটার হীন মতলবে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টিকারী শাসক বিজেপি ও তার কর্তাদের এসআইআর চালু সহ প্রতিটি জঘন্য কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এবং তাকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূলের ত্রাতা সাজার বিরুদ্ধে দেশবাসীর সচেতন হওয়া আজ অত্যন্ত প্রয়োজন।