অশনিসঙ্কেত

স্বাধীনতার সাতাত্তর বছর পার করে এসে আমাদের সমাজ থেকে হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ বিলুপ্ত হয়েছে, এ কথা বলা গেলে খুব ভাল হত। কিন্তু চারপাশের বাস্তব তেমন নয়। আজকের ভারতে ধর্মের নামে মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়, ধর্মের নামে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা হয়, ধর্মকে ঘৃণ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। সাধারণ মানুষ এ জিনিস চান না। এ সব দেখলে, শুনলে বেশিরভাগ মানুষ শিউরে উঠে ভাবেন, ‘এই আগুন যেন আমার ঘরকে, পরিবারকে স্পর্শ না করে। আমার সন্তান যেন এই ধর্মীয় বিদ্বেষের থেকে মুক্ত থাকে।’

কিন্তু শুধু চাওয়াটুকুই কি যথেষ্ট? পহেলগাঁও এর ঘটনার পর প্রাইমারি স্কুলের এক ছাত্রী শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছে, ‘আমাদের কি তাড়িয়ে দেবে স্যার’? আরেকটি স্কুলে শোনা গেল, ক্লাস ফাইভের দুই একরত্তি মেয়ের ঝগড়া। একজন বলছে, ‘তোরা খারাপ, তোরা মানুষ মারিস।’ অন্য জন উত্তর দিচ্ছে, ‘হ্যাঁ আমাদের ধর্ম তো খারাপ, আমাদের টিফিন খাস না।’ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ জিগিরের উত্তাপের মাঝে এমন আরও তিক্ত অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন অনেকেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ সব ঘটনা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হস্তক্ষেপে বেশিদূর গড়ায় না ঠিকই, কিন্তু এই বিভেদের বীজ ফুলের মতো মনগুলোয় বাসা বাঁধছে কোথা থেকে? ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’ এই সার কথাটুকু কি শিশুমনে সঞ্চারিত করতে পারছে পরিবার, পরিজন, সমাজপরিবেশ?

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে জানা গেল, পশ্চিমবঙ্গের পূর্বস্থলীর একটি প্রাথমিক স্কুলে প্রায় দুই দশক ধরে হিন্দু আর মুসলমান ধর্মের ছাত্রছাত্রীদের জন্য মিড-ডে মিলের রান্না হয়ে আসছে দুটি আলাদা হেঁসেলে, রাঁধুনিও আলাদা। এই ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করাও কষ্টকর যে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এতদিন ধরে জাতধর্মের ছোঁওয়াছুঁয়ি, কুসংস্কার, ধর্মীয় বিভেদ টিকিয়ে রাখা হয়েছে সরকারি প্রকল্পের মধ্যেই।

স্কুলের গুরুত্ব শিশুর জীবনে, দেশের ভবিষ্যত নাগরিকদের গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অপরিসীম। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী-ধর্মীয় সম্প্রদায় থেকে পড়তে আসা শিশুরা একই প্রাঙ্গণে আনন্দে বেড়ে উঠবে, শিখবে, পড়বে, পরস্পরের সাথে নানা আদানপ্রদানে সমৃদ্ধ হবে, এই ভাবনাই তো স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। যে কারণে স্কুলকে বলা হয় ‘সমাজের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ’। স্কুলে শিক্ষার্থী শুধু পাঠ্যবই থেকে শেখে না, সহপাঠীদের সাথে গল্প, খেলা, টিফিন ভাগ করে খাওয়া, একসাথে নানা সৃজনশীল কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, সবটা মিলিয়েই স্কুলজীবন যৌথতার বোধ, সামাজিক মনন গড়ে তোলার একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। অথচ সেই স্কুলেই এত বড় অন্যায় কাণ্ডটি বছরের পর বছর চলল, কেউ বাধা দিলেন না! নিশ্চয়ই সরকারি পরিদর্শন কখনও না কখনও হয়েছে সেখানে, মিড ডে মিল নিয়ে মিটিং, আলোচনা ইত্যাদিও হয়েছে। অথচ শিক্ষক-শিক্ষিকা, সরকারি কর্তাব্যক্তি, অভিভাবক-অভিভাবিকা কেউই এই আলাদা রান্নার বিষয়টি নিয়ে তেমন করে ভাবলেন না, এ নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ করার বা সংবাদমাধ্যমে আনার প্রয়োজন মনে করলেন না! স্কুলে পড়তে আসা সমীর আর সইফুল, রুমা আর রুকসানা দিনের পর দিন টিফিনবেলায় আলাদা হেঁসেলে আলাদা রাঁধুনির তৈরি করা খাবার খেল। বড় হয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় ওরা শিখল, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা এমনই পাকাপোক্ত জিনিস যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিসরেও তাকে জিইয়ে রাখতে হয়। এক বন্ধু, আরেক বন্ধুর হাঁড়ি থেকে খেতে পারে না, কারণ এ হিন্দু ও মুসলমান।

হায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, নেতাজির বাংলা! হায় স্বাধীন ভারত, যার জন্য একসাথে ফাঁসির রজ্জু বরণ করেছিলেন রামপ্রসাদ বিসমিল আর আসফাকউল্লা খান! নেতাজি তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজে হেঁসেল বা থালার ভেদ রাখতে দেননি। বিভিন্ন ধর্মের সেনারা একই রান্নাঘরে রান্না হওয়া খাবার একসাথে বসে খেত। ধর্ম-বর্ণ-জাতির ঊর্ধ্বে দেশাত্মবোধের ভিত্তিতে সেনাদের ঐক্যবদ্ধ করতে তাঁর এই উদ্যোগ ছিল সে দিনের ভারতবর্ষে বিপ্লবাত্মক। রবীন্দ্রনাথ ‘কালান্তর’ বইতে লিখেছিলেন, ‘ধর্ম যখন বলে, মুসলমানের সঙ্গে মৈত্রী করো, তখন কোনও তর্ক না করেই মেনে নেব। … কিন্তু ধর্ম যখন বলে ‘মুসলমানের ছোঁয়া অন্ন গ্রহণ করবে না’ তখন আমাকে প্রশ্ন করতেই হবে, কেন করব না’? নজরুল ইসলাম লিখে গেছেন – ‘হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান’, ‘তাই তো বেকুব করলি তোরা এক জাতিকে একশো খান’। অথচ আজ এতো সময় পেরিয়ে এসেও, মানবতার এই বুনিয়াদি কথাগুলো সমাজের সর্বত্র সব মানুষের কথা হয়ে উঠতে পারল না কেন? কেন এই বাংলার মাটিতে একটিও স্কুলে হিন্দু-মুসলমানের হাঁড়ি আলাদা করার মতো মানসিকতা প্রশ্রয় পায়? কেন একজন দলিত মহিলা মিড-ডে মিল রাঁধবেন শুনে কর্ণাটকের একটি স্কুলে অনেক মা-বাবা সন্তানকে স্কুল ছাড়িয়ে দেন?

আসলে, একটি যথার্থ বিপ্লবী বামপন্থী দলের অনুপস্থিতিতে আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব মূলত কুক্ষিগত ছিল দক্ষিণপন্থী আপসকামী বুর্জোয়াদের হাতে। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা এল ঠিকই, কিন্তু ব্রিটিশের বদলে জাতীয় বুর্জোয়ারা ক্ষমতা দখল করল এবং এটা হল এমন একটা সময়ে, যখন বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদ চরম প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়েছে, নিজের বাজার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সে নবজাগরণের সমস্ত পার্থিব মানবতাবাদী মূল্যবোধকে, যুক্তিবাদকে পদদলিত করছে এবং পুরনো সামন্ততান্ত্রিক চিন্তা, ধর্মীয় সংস্কার, অন্ধতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তাই দেশটা খাতায় কলমে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হলেও স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের আচার-আচরণে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল না, তার পরের এই দীর্ঘ সাতাত্তর বছরেও যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চায় সংসদীয় দলগুলির গুরুত্ব দেয়নি। ধর্মকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় রেখে সমাজজীবন, শিক্ষা, প্রশাসন, রাজনীতিকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করা, সমাজের স্তরে স্তরে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার ঘটানোর মতো যে কাজগুলো একটা সমাজের গণতন্ত্রীকরণের আবশ্যিক শর্ত, তার একটিও কেন্দ্র বা বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতায় আসা দলগুলো করেনি। আজ তো কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় থাকা দলটি দেশ জুড়ে অপবিজ্ঞান, কুসংস্কার, সংখ্যালঘু বিদ্বেষের প্রচার ও প্রসারে সরাসরি মদত দিচ্ছে। ফলে, একটি দুটি স্কুলের যে খবর সামনে এসেছে, দেশের প্রান্তে প্রত্যন্তে আরও স্কুলে এমন জিনিস চলছে না, এ কথা জোর দিয়ে বলার জায়গা নেই। সমাজ মানসিকতার গভীরে থেকে যাওয়া এই ধর্মীয় গোঁড়ামিকে সত্যিই দূর করতে চাইলে, ভবিষ্যত প্রজন্মকে বাঁচাতে চাইলে, প্রতিটি সচেতন মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনই দরকার রাজ্যে রাজ্যে, দেশ জুড়ে প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন। পূর্বস্থলীর ঘটনা অশনিসঙ্কেতের মতো এ কথা নতুন করে জানিয়ে দিচ্ছে।