৮ আগস্ট রাত ৯টা। কলেজ স্কোয়ারের সামনের নিষ্প্রভ স্ট্রিট লাইটগুলোর নিচে জ্বলে উঠল শত শত মশাল। এক বছর আগে শুরু হওয়া অভয়া আন্দোলনের জেগে থাকা উত্তাপ হাজারো বুকে জমে জমে যেন রূপ নিল অগ্নিশিখার। মিছিল যখন কলেজ স্কোয়ার থেকে শুরু হল, মনে হল সবার মনে জেগে উঠল এক বছর পিছনের স্মৃতি। সেই একই আবেগ, সেই একই স্লোগান, ‘অভয়ার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘আমার দিদির বিচার চাই’, ‘বিচার যত পেছোবে, মিছিল তত এগোবে’, ‘পুলিশ তোমার কীসের ভয়, ধর্ষক তোমার কে হয়’। মিছিল জুড়ে সববেত কণ্ঠে ভাসছে ‘আর কবে আর কবে …’। নবীন ও প্রবীণ মানুষের ভিড় তখন রাস্তা ছাপিয়ে ফুটপাতে পৌঁছেছে। হাতে সবার জ্বলন্ত মশাল। সামনে ভিড় করে সংবাদকর্মীরা। মিছিল কলেজ স্কোয়ার থেকে কলেজ স্ট্রিটে পৌঁছতেই লাগল আধঘণ্টা। সাড়ে নটায় শুরু হয়ে শ্যামবাজারে মিছিল পৌঁছল রাত ঠিক ১২টায়।
জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের ডাকে অভয়া ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার এক বছর পূর্তিতে মশাল মিছিলে যোগ দিতে বহু দূর থেকে মানুষ এসে উপস্থিত হয়েছিলেন কলেজ স্কোয়ারে। বেহালা থেকে দক্ষিণেশ্বর, সোনারপুর থেকে দমদম, সন্তান কোলে মা থেকে সত্তরোর্ধ্ব সবাই এসেছেন মিছিলে হেঁটে শ্যামবাজারে রাতের কর্মসূচিতে যোগ দেবেন বলে। ঘটনার এক বছর পরেও এমন এক মিছিলে কেন এসেছেন, প্রশ্ন করায় পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলা দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিলেন, এমন ভয়ঙ্কর একটা মৃত্যুর ঘটনার কোনও বিচার হল না, অথচ একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই চলেছে। কেন্দ্র-রাজ্য সরকার, পুলিশ-সিবিআই-বিচার ব্যবস্থা সবাই দুষ্কৃতীদের আড়াল করে দাঁড়িয়েছে, এখন আমরাও যদি নিজেদের গুটিয়ে নিই তবে তো দুষ্কৃতীরা আরও বেপরোয়া হবে। পাশ থেকে আর এক মহিলা বলে উঠলেন, আমরা যেমন অভয়ার বিচার চাইতে এসেছি, তেমনই আমাদের মেয়েদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও এসেছি।
মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের নেতারা– অনিকেত মাহাতো, দেবাশীষ হালদার, আসফাকুল্লা নাইয়া প্রমুখ। ছিলেন মেডিকেল সার্ভিস সেন্টারের রাজ্য সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্র, নার্সেস ইউনিটির সভাপতি ভাস্বতী মুখোপাধ্যায়, সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সজল বিশ্বাস প্রমুখ। ছিলেন অভয়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে অজস্র নাগরিক সংগঠন এলাকায় এলাকায় গড়ে উঠেছে তার সদস্যরা। ছিলেন চেনা-অচেনা অজস্র মানুষ। ডাঃ অনিকেত মাহাতো বললেন, মানুষ আজও জানতে পারল না অভয়ার ধর্ষণ ও খুনের সঙ্গে কারা জড়িত, আর কেনই বা অভয়াকে খুন হতে হল। কেউই এ কথা বিশ্বাস করে না যে, এত নৃশংস একটা খুনের সঙ্গে শুধুই সঞ্জয় রায় জড়িত। এ প্রশ্নের উত্তর আজও দেশের মানুষ পায়নি, যে সুপ্রিম কোর্ট ঘটনার রিপোর্ট পড়ে শিউরে উঠেছিল, কেন সেই সুপ্রিম কোর্ট চুপ করে গেল, কেন সিবিআই অতিরিক্ত চার্জশিট জমা দেওয়ার কথা বলেও তা জমা দিল না। এই সব প্রশ্নের উত্তর যত দিন না পাওয়া যাচ্ছে তত দিন আন্দোলন চলবে। ডাঃ দেবাশীষ হালদার বলেন, রাজ্য সরকার ভাবছে, বিচারহীন এক বছরে আমরা হয়তো হতাশ হয়ে পড়েছি। আসলে সরকার চায় আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। বাস্তবে বিচারের নামে এই প্রহসন আমাদের জিদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ডাঃ বিপ্লব চন্দ্র বলেন, বিচারের সামনে প্রতিবন্ধক হিসাবে যেহেতু কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারই দাঁড়িয়ে রয়েছে তাই আমাদের আন্দোলনকে আরও তীব্র করতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সিনিয়র চিকিৎসক সহ বাংলার বিশিষ্ট মানুষেরা ১৪ আগস্ট মৌলালি যুব কেন্দ্রে এক কনভেনশনের ডাক দিয়েছেন। সেখান দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
মিছিল যতই এগিয়েছে রাস্তার দু-পাশ থেকে যোগ দেওয়া মানুষের ভিড়ে তার আয়তন ততই বেড়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে থেকে যাঁরা মিছিল দেখেছেন, তাঁরাও সাথে থাকার বার্তা দিয়েছেন। মিছিল শ্যামবাজারে যখন পৌঁছাল তখন নেতাজি মূর্তির চার দিকে থিকথিকে ভিড়। দ্রুত বেঁধে ফেলা অস্থায়ী মঞ্চ থেকে চিকিৎসক নেতারা একে একে বক্তব্য রাখার পর অভয়ার বাবা-মা বক্তব্য রাখেন। তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের অসহযোগিতার কথা তুলে ধরে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী যখন বাংলায় এসেছিলেন তখনও আমরা চেষ্টা করে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। এখন দিল্লি গিয়েও তাঁর দেখা পাইনি। অভয়ার মা বলেন, আজ আমি এখানে শুধু আমার মেয়ের বিচার চাইতে আসিনি, এসেছি সমস্ত অত্যাচারিত মেয়েদের মা হিসাবে বিচার চাইতে।
বাস্তবিক অভয়ার ন্যায়বিচারের দাবিতে জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের নেতৃত্বে যে নাগরিক আন্দোলন রাজ্যে গড়ে উঠেছে তা এক কথায় নজিরবিহীন। যাঁরা কোনও দিন কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা ভাবেননি, কোনও মিছিলে হাঁটার কথা ভাবেননি, সমাজের নানা অংশের সেই সব মানুষ দলে দলে যোগ দিয়েছেন এই আন্দোলনে। দলমত নির্বিশেষে, এমনকি শাসক দলের নেতা-কর্মীদের পরিবারের মহিলারাও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে রাতের পর রাত জেগেছেন। সমাজের বঞ্চিত-নির্যাতিত মানুষ অভয়ার ন্যায়বিচারের দাবির মধ্যে তাঁদের উপর প্রতিনিয়ত ঘটে চলা অজস্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের সন্ধান পেয়েছেন। তাই তাঁরা কোনও কিছুর পরোয়া না করে দলে দলে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। আর মানুষের এই সম্মিলিত প্রতিবাদকেই ভয় পেয়েছে শাসকরা। কারণ মানুষের ঐক্যকেই তাদের ভয়। তাই তারা বিচারকে মাঝপথেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। তারা জানে, এ ভাবে সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন যদি অভয়ার ন্যায়বিচার ছিনিয়ে নিতে পারে তবে তা এমন নজির তৈরি করবে যে ভবিষ্যতে যে কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা এ ভাবেই রাস্তায় নেমে ন্যায় বিচারের দাবি তুলবে। কিন্তু মানুষ যে ন্যায়বিচারের দাবিতে নাছোড় তা ৮ আগস্টের এই মিছিল আবার প্রমাণ করল। এ দিন রাজ্যের অন্যান্য শহরে এবং মেডিকেল কলেজগুলিতেও নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়।
৯ আগস্ট আর জি কর মেডিকেল কলেজে অভয়ার প্রতীকী মূর্তি ‘ক্রাই অফ দি আওয়ার’-এর সামনে এক প্রতিবাদ সভায় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। এ দিন রাজ্য জুড়ে আন্দোলনে গড়ে ওঠা অসংখ্য নাগরিক সংগঠন প্রতিবাদ সভা করেন। সেখানে নাগরিকরা অভয়ার বিচারহীনতার বিরুদ্ধে তাঁদের গভীর ক্ষোভ তুলে ধরেন এবং অভয়ার বিচারের দাবিতে যেমন, তেমনই সমাজের যে কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অঙ্গীকার করেন।