দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের পথে সুন্দরবন

ট্যাংরা চর, কুলপি

ঘূর্ণি ঝড় ইয়াসের তাণ্ডবে দক্ষিণ ২৪ পরগণার সাগর নামখানা পাথরপ্রতিমা গোসাবা ব্লকের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে অসংখ্য জায়গা, কাকদ্বীপ কুলতলি মথুরাপুর-২ (রায়দিঘি) বাসন্তী ব্লকের অনেক অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং জয়নগর-২, ক্যানিং-১, কুল্পী, মথুরাপুর-১, ডায়মন্ডহারবার-১, ডায়মন্ডহারবার-২ ব্লকের কিছু অংশ মিলিয়ে দুই শতাধিক স্থানে নদী বাঁধের ভাঙন অথবা বাঁধ নিচু থাকায় জলোচ্ছাসে ৩০ লক্ষাধিক মানুষ ভয়ানক ভাবে বিপদগ্রস্ত। হাজার হাজার বিঘা চাষ জমি, পান বরজ সহ বাগান-বাগিচা, পুকুর খাল বিল, ঘর-বাড়ি, দোকানপাট ও ঘরে রাখা খাদ্য সহ নানা সম্পদ নোনা জলে প্লাবিত হওয়ায় দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতির সীমা পরিসীমা নেই। পূর্ণিমার ভরা কোটালে একই এলাকা বার বার প্লাবিত হয়েছে। দলের অসংখ্য কর্মী সহ এলাকার হাজার হাজার মানুষের সাহস ও উদ্যোগের প্রশংসনীয় ভূমিকা না থাকলে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বাড়ত। এমনিতেই সামান্য ঝড়ে বা কোটালে বাঁধ ভেঙে বা উপচে পড়া নোনা জলে নানা সময়ে সুন্দরবন এলাকায় সর্বনাশ হয়েই থাকে। সর্বত্র করোনা অতিমারির প্রকোপে লকডাউনের ফলে সুন্দরবনের লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক কর্মহীন, চিকিৎসার বিপুল ব্যয়, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু, আতঙ্ক, মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে ত্রাহি ত্রাহি রব। ঠিক তখনই বিগত কয়েক বছরের সুনামি, আয়লা, ফনি, বুলবুল, আমফান প্রভৃতির বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এই দুর্যোগ। চারিদিকে মানুষের বাঁচার আর্তি, হাহাকার।

দুলকি, গোসাব

একই আর্তনাদ ইছামতীর তীর ধরে হিঙ্গলগঞ্জ-সন্দেশখালি সহ উত্তর ২৪ পরগণার বিরাট এলাকা জুড়ে। দুই মেদিনীপুর বিশেষত পূর্ব মেদিনীপুরের সর্বনাশ যে কত বড় তা সকলে জানেন।

সামনেই অমাবস্যার কোটাল। তার পরেই আসন্ন পূর্ণিমার কোটাল। তাই আশঙ্কিত বিপর্যস্ত এলাকার মানুষ। তার আগেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বাঁধের ভাঙা অংশগুলি মেরামত, নিচু যে জায়গাগুলি টপকে নদী ও সমুদ্রের জল ঢুকেছে তা যে-কোনও ভাবে উঁচু করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। তার সাথে আছে পানীয় জলের প্রচণ্ড সঙ্কট। আছে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান ও মেরামতের জরুরিকালীন ত্রাণের প্রয়োজন। ইতিমধ্যে মাছ-আগাছা সহ নানা কিছুর পচনে দূষিত পরিবেশ। ফলে নানা ব্যাধি শিয়রে দাঁড়িয়ে। ইতিমধ্যে শুরুও হয়েছে। বেড়েছে সাপ-পোকামাকড়ের উপদ্রব। জরুরি স্যানিটাইজেশন। দলের ডাকে কর্মীরা ত্রাণসংগ্রহ ও বণ্টনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সহৃদয় শুভবুদ্ধির মানুষ, নানা ক্লাব, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।

এ প্রচেষ্টা যত মহৎই হোক এগুলো তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্র ব্যবস্থা। তাতে সুন্দরবনবাসীর সমস্যা মেটে না। তাই তারা এবারে সোচ্চারে, বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রশ্ন তুলেছেন, বছরের পর বছর শুধু ক্ষুদ-কুঁড়োর মতো ভিক্ষাস্বরূপ ত্রাণ নিয়ে আমাদের ধুঁকে ধুঁকে চলতে হবে? বারবার এই দুর্ভোগই কি আমাদের ভবিতব্য? কেন্দ্রের ও রাজ্যে যারাই যখন ক্ষমতাসীন হয়েছে, তারা কেন স্থায়ী প্রতিকার কিছুই করেন না?

এসইউসিআই (সি) দলের উদ্যোগে সাধারণ মানুষকে নিয়ে বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের নানা স্তরে কতবার যে দাবি জানিয়ে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বর্তমান বিপর্যয়ের কয়েকদিন আগে এবং বিপর্যয়ের পরে দলের জেলা কমিটির সদস্য জয়নগরের প্রাক্তন বিধায়ক তরুণ নস্কর ও কুলতলির প্রাক্তন বিধায়ক জয়কৃষ্ণ হালদার চিঠি লিখে সেই দাবি জানিয়েছিলেন। নানা সময়ে নানা নাগরিক কমিটিও এ দাবি জানিয়েছে। সম্প্রতি ‘সুন্দরবন নদীবাঁধ ও জীবন-জীবিকা রক্ষা কমিটি’ শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছে স্থায়ী বাঁধের দাবিতে। ইয়াসের অনেক আগে থেকেই সরকারের নানা দপ্তরে স্থায়ী বাঁধের দাবিতে দরবার চালিয়ে আসছিল। ফেব্রুয়ারিতে উপকূল এলাকার শতাধিক জায়গায় হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে নদী বাঁধে প্যারেড কর্মসূচির মাধ্যমে দাবিকে জোরালো করে তোলা হয়। তবুও বিপর্যয় রোখা যায়নি। বানভাসি এলাকার মানুষ জলমগ্ন ঘরবাড়ি ছেড়ে অশেষ দুর্গতির মধ্যেও অভুক্ত-তৃষiরার্ত অবস্থায় এক গলা জলে দাঁড়িয়ে ত্রাণ সংগ্রহে হাত বাড়ানোর সাথে সাথে দাবি জানিয়ে বলেছেন, আমাদের কেবলমাত্র ত্রাণ নয়, স্থায়ী বাঁধ চাই। আশ্রয় শিবিরগুলোও সেই দাবিতে সোচ্চার। রাজ্যে নেতা-মন্ত্রী-আধিকারিকদের, এমনকি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল যেখানেই গিয়েছেন তাঁদের কাছে সেই আবেদনই জানিয়েছেন। ৫ মে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে ইছামতী থেকে সাগর পর্যন্ত ভেঙে যাওয়া নদীবাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণের দাবিতে হওয়া অবস্থানে কোলে শিশু সন্তান সহ হাজার হাজার মানুষ অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে দাবি জানিয়েছেন। সুন্দরবন এলাকার এক একটি ব্লকে গড়ে চার লক্ষ মানুষের বসবাস। তারা ব্লক পিছু প্রতিটি বছরে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ শত কোটি টাকা সরকারের ঘরে ট্যা’ দিয়ে থাকেন। তা ছাড়া এখানকার মধু, সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, মোম প্রভৃতি রপ্তানি করে অর্জিত হয় প্রচুর বিদেশি মুদ্রা। তবুও কেন সমস্যার স্থায়ী প্রতিকার হয় না? –এ ভাবনায় উত্তাল সুন্দরবন। বাড়ছে আন্দোলনের গতিবেগ। যুক্ত হচ্ছেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের নানা স্তরের মানুষ।

এ জেলার সুমতি নগরের বাসিন্দা দেবাশীষ জানা। বাঁধ ভেঙে জল ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তার ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সহ সব ডকুমেন্ট। ‘দুয়ারে ত্রাণে’র আবেদনের সুযোগ কেড়ে নিয়েছে দুয়ারে জল। এমনিতেই ত্রাণ শিবিরগুলোর অপ্রতুল ব্যবস্থা। শিবিরে রাতে জুটেছে মুড়ি-বাতাসা। একরাশ ক্ষোভ উগরে লোকজনকে নিয়ে নদীবাঁধে আন্দোলনে সামিল দেবাশীষ। ধবলাটে নদীর ধারে বাড়ি বাপী মাঝির। জলের তোড়ে বাড়ি সহ সর্বস্ব ভেসে গেছে। রুদ্রনগরে তার শশুরবাড়ির আশ্রয়ে তিনি যেতে পারেন। কিন্তু বাপীর প্রশ্ন, পরিযায়ী শ্রমিক ছিলাম, লকডাউনে কাজ গেছে। নদীর ধারে বসবাস হওয়ায় নদীতে মাছ ধরে তবু জীবিকা নির্বাহ হয়। তাও গেলে, আশ্রয় জুটলেও সংসার চলবে কী করে? নদীবাঁধের সঙ্গে জীবিকা জড়িয়ে। তাই বাঁধ রক্ষা করতে আন্দোলনে সামিল তিনিও। তাঁরাই গড়ে তুলছেন ‘সুন্দরবন নদীবাঁধ ও জীবন-জীবিকা রক্ষা কমিটি’।

এ ভাবেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। গঠিত হচ্ছে এলাকা ভিত্তিক কমিটি। বিস্তৃত হচ্ছে আন্দোলন। ওই কমিটি নদী-সমুদ্র বিজ্ঞানী, গবেষক, ভূতত্ববিদ, এলাকার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে পরামর্শ নিচ্ছে স্থায়ী বাঁধের রূপ কী হবে তা নিয়ে। কিন্তু তারা জানেন, মতামত স্থির হলেও তাকে কার্যকরী করতে চাই লাগাতার-দুর্বার আন্দোলন। তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের কর্মসূচির শেষে ঐ কমিটির সম্পাদক অশোক শাসমল বলেছেন, এখনও বহু জায়গায় মেরামত না হওয়ায় জল ঢুকবে। চলছে কোনও মতে জোড়তালি দেওয়ার কাজ। সরকার দ্রুত সমাধানের কাজ শেষ না করলে, স্থায়ী বাঁধের, জীবন-জীবিকা রক্ষার ব্যবস্থা না করলে কমিটির পক্ষ থেকে প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও, বিক্ষোভ, সুন্দরবন জুড়ে অরন্ধন পালন ইত্যাদি কর্মসূচির মাধমে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। উত্তর ২৪ পরগণার বসিরহাট, হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি সহ দক্ষিণ ২৪ পরগণার সর্বত্রই তার প্রস্তুতি চলছে।

এলাকার মানুষের মধ্যে শোনা যাচ্ছে, সুন্দরবনে পরমানুচুল্লি স্থাপনকে এবং সুন্দরবনের ৯০০০ বর্গ কিলোমিটিার এলাকা ইকোটুরিজমের নামে এখানকার বন-জঙ্গল, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সুন্দরবনের কৃষ্টি-ঐতিহ্য ধবংসের ষড়যন্ত্র জনগণকে নিয়ে কমিটি গড়ে তুলে যেভাবে রুখে দেওয়া সম্ভব করেছিলেন, স্থায়ী বাঁধ প্রতিকারে তারা তেমনই সফল হবেন।

বসিরহাট
দেউলবাড়ি, কুলতলি
গোসাবা, কুমিরমারি
নামখানা