Breaking News
Home / অন্য রাজ্যের খবর / নতুন মুখ, পুরনো কৌশল

নতুন মুখ, পুরনো কৌশল

হঠাৎ করেই প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর রাজনৈতিক অভিষেক সম্পন্ন হল৷ অভিষেকের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি চলে এলেন দলের অন্যতম শীর্ষপদে৷ সভাপতি রাহুল গান্ধীর পরেই– দলের সাধারণ সম্পাদক রূপে৷

দল হিসাবে কংগ্রেস কাকে নেতৃত্বে আনবে সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার৷ আবার রাজনীতিতে আসা বা না আসাও ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব অধিকার৷ কিন্তু সেই ব্যক্তি যখন জনপরিসরে আসছেন, জনগণকে নেতৃত্ব দিতে চাইছেন, তখন জনগণ তো বিচার করে দেখবেই নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা যোগ্যতা তাঁর কতখানি, তিনি কোন পথে জনগণকে, দেশকে পরিচালিত করতে চাইছেন৷

এ দেশের মানুষ অনেক রাজনৈতিক নেতাকে দেখেছে৷ স্বাধীনতা আন্দোলনে আপসহীন ধারার নেতাদের দেখেছে, তাঁদের জীবনব্যাপী সংগ্রাম, ত্যাগ–তিতিক্ষা–আত্মবলিদান দেখেছে৷ জনগণের মুক্তির জন্য তাঁরা সর্বস্ব পণ করেছেন৷ এমনকী কংগ্রেসের গান্ধীবাদী আপসমুখী ধারার অনেক নেতা–কর্মীর ত্যাগ–স্বীকারও স্মরণীয়৷ পরবর্তীকালে বামপন্থী ও কমিউনিস্ট নেতা–কর্মীদের বহু অনুসরণীয় চরিত্র দেখেছে দেশের মানুষ৷ সমাজের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে পরিচালিত জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই নেতাদের আবির্ভাব ঘটেছে৷

কিন্তু প্রিয়াঙ্কা গান্ধী? তাঁর নেতা হওয়ার যোগ্যতা কী? তিনি কী উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে আসছেন? তিনি কি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষকে ভালবেসে, তাদের পাশে থেকে তাদের মুক্তির জন্য লড়াই করার উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন, নাকি আর পাঁচজন নামকরা নেতার মতোই চলতি ধারার নেতা হয়ে পুঁজিপতিদের বিশ্বস্ত ম্যানেজার হিসাবে কাজ করাই তাঁর লক্ষ্য? জনমনে এ প্রশ্ন উঠছে এবং ওঠা স্বাভাবিক৷ কারণ যে দলটির নেতা হিসাবে তিনি আসছেন, স্বাধীন ভারতের সাত দশকের ইতিহাস বলে, যে পুঁজিপতি শ্রেণির নির্বিচার শোষণ–লুণ্ঠনে সমগ্র দেশবাসী আজ চরম দুরবস্থায়, সেই পুঁজিবাদী শাসন কায়েম রাখার কাজটিই সমস্ত শক্তি দিয়ে করেছে সেই দল– কংগ্রেস৷

প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে সংবাদমাধ্যম জুড়ে চলছে নির্লজ্জ মাতামাতি৷ মিডিয়া এমন ভাবে তাঁর প্রচার দিচ্ছে যেন তাঁর রাজনীতিতে আসা দেশের মানুষের কাছে এক বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার৷ বলা হচ্ছে, এটা কংগ্রেসের একটা মাস্টারস্ট্রোক৷ প্রচার করা হচ্ছে, প্রিয়াঙ্কাকে মোকাবিলা কীভাবে করবে বিজেপি ভেবে পাচ্ছে না৷ সব মিলিয়ে রীতিমতো হই হই ব্যাপার রাজনীতিতে যোগ দিয়েই একেবারে ‘জাতীয় নেতা’!

কিন্তু প্রচার মাধ্যমের এই বেআব্রু তৎপরতা কেন? বুর্জোয়া পরিষদীয় ব্যবস্থায় প্রচারমাধ্যম একটা অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার৷ একচেটিয়া পুঁজি পরিচালিত সংবাদ মাধ্যম তাদের শ্রেণিস্বার্থে একেবারে ‘এলেবেলে’ একজন লোককেও প্রচার দিয়ে দিয়ে হিরো বানিয়ে দেয়৷ মানুষের কাছে তার এমন ভাবমূর্তি গড়ে দেয় যেন তিনি সর্বশক্তিমান, জনগণের সর্বইচ্ছা পূরনের অবতার৷ মানুষ নিশ্চয় ভুলে যায়নি, ঠিক এভাবেই বুর্জোয়া মিডিয়া ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদিকে হিরো বানিয়েছিল৷ তাকে ঘিরে এমন একটা ‘মিথ’ তৈরি করেছিল যা মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকে গুলিয়ে দিয়েছিল৷ বাস্তবের কঠিন আঘাতে মোদিকে ঘিরে সেই মিথ আজ চুপসে যাওয়া বেলুন– তাঁকেই ব্যঙ্গ করছে৷

স্বাধীনতার পর বেশিরভাগ সময়টাই দেশকে শাসন করেছে কংগ্রেস৷ এর পুরো সময়টা ধরেই তারা দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত পলিটিক্যাল ম্যানেজার হিসাবে কাজ করেছে৷ তারই ফলে একদিকে পুঁজিপতিদের মুনাফা আকাশ ছুঁয়েছে, আর দেশের সাধারণ মানুষের দুর্দশা চরম আকার নিয়েছে৷ দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ যখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে পাঁচ বছর আগে কংগ্রেসকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, তখন একচেটিয়া পুঁজিপতিরা, যারাই আসলে শাসক দলের আড়ালে থেকে এই রাষ্ট্র তথা দেশকে পরিচালনা করে, তারা তাদেরই আর একটি বিশ্বস্ত দল বিজেপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে৷ কিন্তু বুর্জোয়াদের স্বার্থবাহী একই নীতি অনুসরণ করায় বিজেপি রাজত্বের পরিণামও জনজীবনে একই রকম দুর্ভোগ নামিয়ে এনেছে৷ ফলে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে আজ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে৷ এই অবস্থায় ভারতের একচেটিয়া পুঁজিপতিরা, যাদের লক্ষ্য ব্রিটেন আমেরিকার মতো এ দেশেও বুর্জোয়া দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করা, অর্থাৎ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাদেরই বিশ্বস্ত সেবাদাস দুটি দলকে ক্ষমতায় বসানো, তারা জনসাধারণের সামনে বিজেপির বিকল্প হিসাবে কংগ্রেসকে তুলে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে৷ কিন্তু ভারতের জনগণ কংগ্রেসের জনবিরোধী চরিত্র, আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ততা, নেতৃত্বহীনতার কথা আজও ভোলেনি৷ তাই পুঁজিপতি শ্রেণি কংগ্রেসকে ‘নতুন কংগ্রেস’ হিসাবে তুলে ধরে দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করাতে চায়৷ পুঁজিপতিরা এতদিন রাহুল গান্ধীকে প্রচার দিয়ে দিয়ে নেতা বানাচ্ছিল, কিন্তু শুধু তাঁর উপরই তারা পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না৷ তাই এখন সাথে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে যুক্ত করে চেষ্টা হচ্ছে মানুষকে চমকে দেওয়ার৷ তাদের পরিচালিত সংবাদমাধ্যম নেতা–নেত্রী হিসাবে এঁদের প্রতিটি বিষয়কে এমন করে মানুষের সামনে তুলে ধরছে যাতে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়, চিন্তা গুলিয়ে যায়, ভাবে এঁরাই দেশের ত্রাতা৷

প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর বহু গুণ রয়েছে বলে প্রচার করছে মিডিয়া৷ এর দ্বারা ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন এ দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য পলিটিক্যাল ম্যানেজার৷ তাঁর প্রতিটি নীতি ভারতে পুঁজিবাদকে সংহত হতে, একচেটিয়া পুঁজিপতিদের পুঁজিকে আকাশ ছুঁতে সাহায্য করেছে৷ অন্য দিকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণকে সেই নীতি শুধুই প্রতারিত করেছে৷ ইন্দিরা গান্ধীর তোলা ‘গরিবি হঠাও’ স্লোগান সেই প্রতারণার এক নিকৃষ্ট উদাহরণ৷ যখন তিনি মুখে এই স্লোগান তুলেছেন, তখন তাঁর সরকারের নীতিতেই দেশের মানুষ ক্রমাগত দারিদ্রের গহ্বরে তলিয়ে গেছে৷ ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ইন্দিরা গান্ধী দেশজোড়া প্রবল গণআন্দোলনকে স্তব্ধ করতে জরুরি অবস্থা জারি করে মানুষের সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন, চেপে ধরেছিলেন গণতন্ত্রের টুঁটি৷ পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের নিজেদের স্বার্থে চাইবেই সেই ইন্দিরার ছায়া প্রিয়াঙ্কার মধ্যে দেখতে বা দেখাতে৷ কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক নয় কি? আজ রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস আবার ইন্দিরা গান্ধীর কায়দাতেই ‘সর্বজনীন অনুদানের’ প্রতিশ্রুতি বিলোচ্ছে৷ অর্থাৎ দেশের বেশিরভাগ মানুষকে দারিদ্রের অন্ধকারে ফেলে রাখো, আর তাদের প্রতি দয়া দেখাতে, তাদের ভোট লুঠ করে গদিতে বসে পুঁজিপতিদের সেবা করতে সেই দরিদ্রদের দিকে দুটো অনুদান ছুঁড়ে দাও৷ এই রাজনীতিরই তো আর এক নেত্রী হতে চলেছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী!

এমনি করেই দেশের পুঁজিপতি শ্রেণি নেতার মুখ বদলায়৷ শাসক হিসাবে একজন নেতা যখন পুঁজিপতিদের সেবা করতে করতে সাধারণ মানুষের ধিক্কারের, ঘৃণার পাত্র–পাত্রীতে পরিণত হয়ে যায়, তখন আবার একজনকে সাজিয়ে–গুছিয়ে নতুন নেতা হিসাবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরে৷ এই নতুন নেতাও আবার কিছু দিন পর একই ভাবে জনগণের কাছে ধিক্কৃত হয়৷ তাই এই শোষণমূলক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাটিকে টিকিয়ে রেখে শুধু নেতা পরিবর্তনের মধ্যে দেশের সাধারণ মানুষের কোনও স্বার্থ, কোনও কল্যাণ নেই৷ অথচ পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে দেশের সাধারণ মানুষকে বোঝায়, জনগণই ভোট দিয়ে তাদের মনের মতো নেতা তৈরি করে, সরকার তৈরি করে৷ জনগণের হাতেই সব ক্ষমতা৷ বাস্তবে পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থায় জনগণের হাতে পাঁচ বছর অন্তর একটি ভোট দেওয়া ছাড়া কোনও ক্ষমতাই নেই৷ সব ক্ষমতা পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে৷ তারাই ঠিক করে কে নেতা হবে, কোন দল সরকার তৈরি করবে৷ তারপর তাদেরই পরিচালিত সংবাদমাধ্যম সেই অনুযায়ী প্রচার তোলে৷ রাজনৈকিভাবে অসচেতন জনগণ সেই প্রচারের ফাঁদে পা দেয়৷ ভোটের অধিকারটুকু পেয়েই ভুলে থাকে৷ এই নাটকেরই আর এক প্রস্থ অভিনয় চলছে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে নিয়ে৷

দেশজুড়ে পুঁজিবাদী শোষণে জর্জরিত শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছে৷ এই অবস্থায় বিজেপি বিরোধী ক্ষোভ যাতে সংগঠিত গণআন্দোলনের আকারে ফেটে পড়তে না পারে, সেই বিক্ষোভকে যাতে শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে এনে ফেলা যায় এবং তাদেরই বিশ্বস্ত কংগ্রেসকে ক্ষমতায় বসানো যায় তারই চেষ্টায় প্রিয়াঙ্কার জন্য এত প্রচার৷ দেশের মানুষকে আজ পুঁজিপতিদের এই কৌশলকে বুঝতে হবে৷ বুঝে তাকে পরাস্ত করতে হবে৷  যত দ্রুত তা করা যাবে তত দ্রুত তারা তাদের নিজস্ব শক্তির জন্ম দিতে পারবে৷ যে শক্তিই শেষ পর্যন্ত এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বদল ঘটাবে৷ অবসান ঘটবে তাদের জীবনের স্থায়ী দুর্দশার৷