যে আইন বাঁচার অধিকার কেড়ে নেয় তাকে ভাঙো

বেলদা

২৯ জুন গণ আইন অমান্য

ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, শাসকদলের নেতা-মন্ত্রী-আমলাদের দুর্নীতি মানুষের জীবন জেরবার করে তুলছে। তিতিবিরক্ত মানুষ এ সবের হাত থেকে মুক্তি চাইছে। সর্বত্র মানুষ দলের কর্মীদের বলছেন, একটা কিছু করুন। আর তো পারা যায় না। আর কোনও দল তো কিছু করবে না, করলে আপনারাই করবেন। মানুষের এই আকুতিকে ভাষা দিতে উদ্যোগী হয়েছে এস ইউ সি আই (সি)। জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি সমাধানের দাবি নিয়ে এস ইউ সি আই (সি), কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সেই আন্দোলনেরই এক পর্যায়ে জনসাধারণের দাবি মতো আন্দোলনকে আরও তীব্র করতে, দল ডাক দিয়েছে ২৯ জুন গণ আইন-অমান্যের।

তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বিতীয় দফার সরকারের এক বছর পার না হতেই তার গা থেকে দুর্নীতি দলবাজি স্বজনপোষণের পচা দুর্গন্ধ বেরোতে শুরু করেছে। একের পর এক নেতা-মন্ত্রীর নাম জড়াচ্ছে দুর্নীতির সাথে। শিক্ষক নিয়োগ কিংবা নার্সিং, নিয়োগের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বজনপোষণ, জালিয়াতি, কোটি কোটি টাকার ঘুষ দুর্নীতি প্রকাশ হয়ে পড়ছে। মানুষ সিপিএমকে সরিয়ে তৃণমূলকে এনেছিল কি এসবের জন্য? পূর্বতন সিপিএম সরকারের দলবাজি, দুর্নীতি, স্বজনপোষণে তিতিবিরক্ত হয়েই মানুষ তৃণমূল সরকারকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল। মানুষের সে আশার সঙ্গে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আজ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যে দল যেখানে ক্ষমতায় বসছে, কংগ্রেস, বিজেপি, সিপিএম, তৃণমূল বা অন্য কোনও দল, দুর্নীতির পাঁকে সবার মাথা পর্যন্ত ডুবছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন আজ ভেবেই পাচ্ছেন না, তাদের সংসার চলবে কী করে, ছেলেমেয়েকে মানুষ করবেন কী করে, তাদের পড়াশুনা হবে কী করে, পরিবারের চিকিৎসা হবে কী করে, তখন দেখছেন একদল সরকারি নেতা-মন্ত্রী-আমলা, তাদের পারিষদবর্গ জনগণের সম্পত্তি লুঠের টাকায় কী ভাবে বিলাস-বৈভবের জীবনযাপন করছে, তাঁদের দোতলার উপর তিনতলা, তিনতলার উপর চারতলা উঠছে, ব্যাঙ্কে জমা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

কেন্দ্রে বিজেপি সরকারকে দেশের মানুষ ক্ষমতায় বসিয়েছিল কংগ্রেস সরকারের দুর্নীতি এবং অপদার্থতার হাত থেকে রেহাই পেতে। অথচ বিজেপি সরকারও ক্ষমতায় বসেই একের পর এক জনবিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। তারা প্রথম যে কাজটি করেছে তা হল, রাষ্ট্রায়ত্ত সমস্ত শিল্প-কারখানা-সম্পদ-সম্পত্তি দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিয়েছে– রেল তেল গ্যাস ব্যাঙ্ক বিমা বন্দর প্রভৃতি সব কিছু। ভোজ্য তেল, ওষুধ, রান্নার গ্যাস, জ্বালানি তেল সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়িয়েছে অবাধে। পুঁজিপতিরা জনগণের সম্পত্তি নির্বিচারে লুঠ করে চলেছে। ব্যাঙ্কগুলি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুঠ করছে পুঁজিপতিরা, যা দেশের জনগণের কষ্টার্জিত টাকা। ধনী-দরিদ্রে বৈষম্য সমস্ত সীমা ছাড়িছে। করোনা অতিমারির সময়ে যখন হাজার হাজার মানুষ সামান্য অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে তখন দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের মুনাফা আকাশ ছুঁয়েছে। দেশের মানুষ অবাক হয়ে দেখছে, তারা যখন করোনায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, লকডাউনে কোটি কোটি মানুষের কাজ চলে গেছে, তেমন এক সঙ্কটপূর্ণ সময়েও পুঁজিপতিরা এমন বিপুল মুনাফা করতে পারল কী করে? কাদের দৌলতে? সরকারের ভূমিকা ছাড়া এটা সম্ভব? তা হলে এ কেমন সরকার? কার সরকার? সাধারণ মানুষের? না শুধুই পুঁজিপতি শ্রেণির? যদি এই সরকার সাধারণ মানুষের সরকার হত, তবে প্রধানমন্ত্রীর তো বলা উচিত ছিল যে, দেশের এমন এক দুঃসময়ে এত বিপুল মুনাফা অমানবিক, কুৎসিত, অন্যায়। এটা কাউকে করতে দেওয়া যায় না। অবিলম্বে এটা বন্ধ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের কথা ভাবলে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে, তাদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে এই সব অতি ধনীদের উপর তৎক্ষণাৎ বাড়তি কর চাপাতে পারতেন। কিন্তু চাপাননি! অথচ খাদ্যে, ওষুধে, ভোজ্য তেলে, জ্বালানি তেলের উপর, অর্থাৎ ইতিমধ্যেই মূল্যবৃদ্ধির ভারে ন্যূব্জ, কুব্জ সাধারণ মানুষের উপর করের বোঝা ক্রমাগত চাপিয়ে চলেছে বিজেপি সরকার। আর মানুষের জীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি থেকে নজর ঘোরাতে ধর্মের জিগিরে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ফাঁসিয়ে দিচ্ছে মানুষকে। এ এক ভয়ঙ্কর দুষ্টচক্র।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম–সব সরকারের আমলেই সেই একই অপশাসন, একই রকম লুঠতরাজ, একই রকম দুর্নীতি। তবে কি এই অপশাসন-দুর্নীতি চলতেই থাকবে? বাস্তবে দলগুলির নাম আলাদা হলেও, পতাকার রঙ আলাদা হলেও নীতি তাদের একই– জনগণকে শোষণ কর, জনগণের সম্পত্তি লুঠ কর, আর পুঁজিপতিদের সেবা কর। এই ভোটসর্বস্ব দলগুলির নেতাদের লক্ষ্য বত্তৃতার ভোজবাজিতে মানুষকে ভুলিয়ে, তাদের অসহায়তাকে সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো। শোষিত বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষকে তারা ভুলিয়ে দিতে চায় তাদেরও মানুষের মতো মাথা উঁচু করে স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে ও সেই অধিকারটা ন্যায়সঙ্গত।

আজ শোষিত-নিপীড়িত প্রতিটি মানুষকে এ কথা উপলব্ধি করতে হবে, যে সরকার তাদের খাদ্য দিতে পারে না, চিকিৎসা দিতে পারে না, শিক্ষা দিতে পারে না, মাথার উপর একটা ছাদ দিতে পারে না, অথচ মদের ঢালাও ব্যবস্থা করে দেয়, ধর্মে ধর্মে বিরোধ বাধায়, দাঙ্গায় ফাঁসিয়ে দেয়, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে সেই সরকার কখনও সাধারণ মানুষের সরকার নয়, সেই সরকার কখনও মানুষের কল্যাণ করতে পারে না। যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থা শ্রমিকের পরিশ্রমের ন্যায্য মজুরি দেয় না, কৃষকের ফসলের ন্যায় দাম দেয় না, সেই ব্যবস্থা কখনও মেহনতি জনতার ব্যবস্থা হতে পারে না।

সারা দেশ জুড়ে শাসক দলগুলো আজ দেশের মানুষকে ভিখারি বানিয়ে দিতে চাইছে। অধিকার অর্জনের বদলে শাসকদের দয়ার উপর বাঁচতে শেখাচ্ছে। এটা কি বাঁচ? মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ বলছেন, যদি বাঁচতে হয় তবে মানুষের মতো বাঁচবো, মাথা উঁচু করে বাঁচবো। কুকুর বিড়ালের মতো বাঁচবো না, ভিক্ষাবৃত্তি করে বাঁচবো না। যখন মরব তখনও মাথা উঁচু করে মরব এবং সেই ভাবে বাঁচা ও মরার একটাই উপায়, তা হল, সমাজের আমূল পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে জনসাধারণের যে বিপ্লবী সংগ্রাম তাতে নিজেকে সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত করা।

তাই শুধু ভোট দিয়ে একের পর এক সরকার বদলে এই দুঃসহ পরিস্থিতির বদল ঘটানো যাবে না। তার কারণ, এই গোটা ব্যবস্থাটাই আজ পচে গেছে। অন্যায়ের উপর গড়ে ওঠা ব্যবস্থার রক্ষাকর্তা নেতারা পচেছে, নীতি পচেছে। একমাত্র এই সমাজব্যবস্থাটাকে পুরোপুরি বদলে ফেলা ছাড়া মানুষের মুক্তির আর কোনও রাস্তা নেই। আর সেই মুক্তির রাস্তাটা চুপচাপ মেনে নেওয়ার মধ্যে নেই, পড়ে পড়ে মার খাওয়ার মধ্যেও নেই, রয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্যে, রুখে দাঁড়ানোর মধ্যে এবং সে মুক্তি ততক্ষণ আসবে না যতক্ষণ মুক্তিকামী মানুষ নিজে মুক্তির সংগ্রামে সামিল না হচ্ছে।

রুশ সাহিত্যিক টলস্টয় বলেছিলেন, শাসকদের আসল শক্তি নিহিত রয়েছে মানুষের অজ্ঞতার মধ্যে। তাই শোষিত মানুষকে তার নিজের স্বার্থেই অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হতে হবে। কিন্তু তা কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দ্বারা হতে পারে না, পারে শুধুমাত্র গণআন্দোলনে, মানুষের মুক্তির আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের দ্বারা।

আগামী ২৯ জুন প্রমাণ করবে মানুষ আর পড়ে পড়ে মার খেতে চায় না, মার খাওয়ার দিন শেষ। অতিমারির সময়েও যে ব্যবস্থা মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির আকাশছোঁয়া মুনাফার সুযোগ করে দিতে পারে, যে আইন সেই অন্যায় মুানাফা-লুঠকে ন্যায়সঙ্গত হিসাবে দেখায়, আইনসঙ্গত হিসাবে দেখায় সে ব্যবস্থায় মানুষের কল্যাণ হতে পারে না, সে আইন সাধারণ মানুষের আইন নয়, সেই আইন সভ্যতার আইন নয়, সেই আইন শাসকদের স্বার্থ রক্ষার আইন। সেই আইনকে ভাঙতে হবে। সেই আইন ভাঙারই ডাক দিয়েছে এসইউসিআই(সি)। আসুন ছাত্র-যুবক, আসুন শ্রমিক, আসুন কৃষক, আসুন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মেহনতি জনতা হাজারে হাজারে–২৯ জুন আমরা সেই আইনকে ভাঙি। অন্যায় আইন না ভাঙলে যে ন্যায়ের আইন প্রতিষ্ঠা করা যায় না!

গণদাবী ৭৪ বর্ষ ৪৩ সংখ্যা ১৭ জুন ২০২২