ভর্তি নিয়ে টিএমসিপি–র তোলাবাজি, ছাত্রদের পাশে একমাত্র ডিএসও

দাদা, কলেজের অফিসটা কোন দিকে? ভর্তির ব্যাপারে খোঁজ নেব!

– কোন সাবজেক্ট?

–ভূগোল অনার্স৷

– এদিকে আসুন, ৩০ হাজার লাগবে, ভর্তি হয়ে যাবে৷

কলেজে ভর্তি হতে এসে এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছেন অনেকেই৷ সাবজেক্ট অনুযায়ী টাকা দিলেই ভর্তি করিয়ে দেওয়ার এই অভিযোগ শুধু এ বছর নয়, প্রতি বছরই ওঠে৷ মেধা তালিকায় নাম না থাকলেও শুধু অর্থের বিনিময়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মেলে, আবার নাম থাকলেও টাকা দিতে না পারায় ভর্তি আটকে যায়৷ শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বা তাদের মদতপুষ্ট দালালদের টাকা না দিলে ভর্তির সুযোগ মেলে না৷ ভর্তির ক্ষেত্রে এই দুর্নীতি ও হাজার হাজার টাকা নেওয়ার ঘটনা এবারেও ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে৷ এর মধ্যে হঠাৎ মুখ্যমন্ত্রী নাকি আশুতোষ কলেজে গিয়ে জানতে পেরেছেন যে তোলা না দিলে ভর্তি হচ্ছে না এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দলের নেতাদের এই কারবার জানতেন না?

৮ জুন উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর দিন থেকে স্নাতকস্তরে ভর্তির জন্য রাজ্যের কয়েক লাখ ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকেরা হন্যে হয়ে ঘুরছেন কলেজে–কলেজে৷ পছন্দের বিষয় নিয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য শুধু একটি কলেজে নয়, একই সঙ্গে ৭–৮টি কলেজে ফর্ম পূরণ করতে হচ্ছে সকলকেই৷ অন লাইনে ফর্ম পূরণ করতে প্রত্যেকটির জন্য কোথাও ২০০–৩০০–৪০০ টাকা দিতে হচ্ছে৷ ফলে শুধু ফর্ম জমা দিতেই খরচ হচ্ছে কয়েক হাজার টাকা৷ এরপর তালিকায় নাম উঠলে কলেজে জমা করতে হয় সরকার নির্ধারিত বিপুল পরিমাণ ফি যা প্রতি বছর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে৷ পাশ কোর্সে পড়ার জন্য ৪০০০ থেকে ৭০০০ টাকা পর্যন্ত ফি দিতে হয়৷ অনার্সে তা অনেক বেশি৷ তার উপর কলেজগুলিতে চালু হয়েছে প্রচুর সেল্ফ ফিনান্সিং কোর্স, অর্থাৎ শিক্ষার সমস্ত ব্যয়ভার ছাত্রকেই বহন করতে হয়৷ যেগুলিতে ভর্তি হওয়ার জন্য ৫০ হাজার থেকে লক্ষ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়৷ ফলে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা থেকে সাধারণ নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা মূলত বঞ্চিত হচ্ছেন৷

সরকারের নজর নেই কলেজ–বিশ্ববিদ্যাল‍‍‍‍‍য়ের পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে৷ পর্যাপ্ত সংখ্যক আসন নেই, স্থায়ী শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে বহু কলেজ৷ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যত সংখ্যক কলেজ আছে তাদের সকলেরই পরিকাঠামো এক নয়, ফলে তুলনায় একটু ভাল পরিকাঠামো যুক্ত কলেজগুলিতেই পড়ার চাহিদা থাকে বেশি৷ এর ফলে অনেককেই তার প্রথম পছন্দের কলেজ ছেড়ে দিয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দের কলেজে বা বিষয়ে বাধ্য হয়ে ভর্তি হতে হয়৷

পরে প্রথম পছন্দের কলেজে নাম উঠলে বা ভর্তি হতে চাইলে গুনতে হয় দ্বিতীয়বারের ভর্তি ফি৷ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলির মধ্যে এই সমস্যা সমাধানের কোনও পরিকল্পনা নেই৷ সরকার সত্যি সত্যি ছাত্রদরদি হলে ছাত্রদের এই অধিক ফি–এর বোঝা বইতে হত না৷ কলেজগুলিও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করে৷ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে– যখন কলেজ কাউন্টারে এই লুণ্ঠনের পর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো নেমে আসে শাসক দলের ছাত্রসংগঠনের মাতব্বর ও দালালদের হাজার হাজার টাকার দাবি৷

এ বছর এই টাকা তোলার অভিযোগ ভর্তি শুরু থেকেই সামনে আসছে৷ তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও ভর্তি হতে পারেছ না অনেকেই৷ অসহায় ছাত্র–অভিভাবকদের সামনে ত্রাতার বেশে হাজির হচ্ছে শাসক তৃণমূলের ছাত্রসংগঠন টিএমসিপি–র নেতা ও তাদের মদতপুষ্ট দালালরা৷ কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ, বঙ্গবাসী, বিদ্যাসাগর, সিটি, আশুতোষ, শ্যামাপ্রসাদ, বেহালা কলেজ সহ রাজ্যের বহু কলেজে এই টাকা নেওয়ার অভিযোগ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে৷ ভর্তি হতে এসে কোথাও ২০ হাজার টাকা, আবার কোথাও ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা চাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে৷ টাকা না দিলে বহু ক্ষেত্রে অরিজিনাল মার্কশিট নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না নেতারা৷ ২ বছর আগে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হতে এসে সোনারপুরের ছাত্রী সোনিয়া মণ্ডল এমনই দালালদের হাতে পড়ে শেষে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ প্রকাশিত হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগণার একটি হাইস্কুল থেকে আমহার্স্ট স্ট্রিটের একটি কলেজে পড়তে আসা তিন ছাত্রের থেকে টিএমসিপি নেতারা বিএ জেনারেলে ভর্তির জন্য সাড়ে আট হাজার টাকা দাবি করেছে, যার ফলে এই তিন হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা ছাত্রের পড়াশোনার স্বপ্ন‍র সলিল সমাধি হতে বসেছিল৷ এই অসাধু চক্রে পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন৷ কিন্তু একে রোধ করার ব্যবস্থা কোথায়? শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন দুর্নীতির ঘটনা ঘটলে তার খবর জানান গোপনে৷ কিছুদিন অগে মুখ্যমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘এসব বরদাস্ত করা হবে না’– কিন্তু ওই হুঁশিয়ারিই সার৷ শাসকদলের মদতপুষ্ট দালাল, লোকাল কাউন্সিলর ও ছোট–বড়–মাঝারি মাপের নেতা এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের একাংশের যোগসাজশেই এই লুঠ চলছে৷ দুর্নীতি বন্ধ নয়, সরকার চায় জনগণের চোখে ধুলো দিতে৷ এই ধরনের হুঁশিয়ারি বা সতর্কবার্তা দিয়ে পিছনে এদের অপকর্মকেই মদত দেওয়া না হলে, এ জিনিস চলছে কী করে? কলেজে কলেজে এ ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তরা কেউ অচেনা বা অজানা নয়৷ পুলিশ–প্রশাসন গোয়েন্দা বিভাগ থাকা সত্ত্বেও সরকার ঠুঁটো জগন্নাথ৷ সবার চোখের সামনেই এই লুঠ চলছে৷ অথচ এদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দেওয়ার কোনও নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না৷ অভিযোগ সামনে এলে তাকে ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব দিয়ে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা চলছে৷ এতে অপরাধীরা আরও প্রশ্রয়ই পাচ্ছে৷ শাসকদলের ছত্রছায়ায় থেকে নীতিহীন, দুষ্ট রাজনীতিকেই  ছাত্র রাজনীতি বলে দেখানোর চেষ্টা চলছে৷ আসলে এটা শাসকদলের নীতিহীন রাজনীতি, তোলাবাজির রাজনীতি, অন্যায়ভাবে টাকা রোজগারের অপকৌশলই শুধু নয়, এর মাধ্যমে দেশের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে কিশোর বয়স থেকেই অমানুষে পরিণত করার ষড়যন্ত্র৷

(৭০ বর্ষ ৪৬ সংখ্যা ৬ জুলাই, ২০১৮)