নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর (৬)

ভারতীয় নবজাগরণের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী আগতপ্রায়৷ সেই উপলক্ষে এই মহান মানবতাবাদীর জীবন ও সংগ্রাম পাঠকদের কাছে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে শিক্ষাগ্রহণের জন্য৷

(৬)

পরোপকার করতে পারলে বিদ্যাসাগরের আনন্দের সীমা থাকত না

ঈশ্বরচন্দ্র তখন ছাত্র, জগদ্দুর্লভ সিংহের বাড়িতে থাকতেন তিনি৷ একদিন জগদ্দুর্লভ সিংহের একজন পরিচিত লোক এসে বলল, তার চেনা এক পরিবারের সকলের কলেরা হয়েছে৷ তারা খুবই গরিব৷ চিকিৎসা করার কোনও উপায় নেই৷ বালক ঈশ্বরচন্দ্র সেখানে দাঁড়িয়ে ঘটনাটি শুনলেন, মনে মনে ভীষণ কষ্ট হল তাঁর৷ কাউকে কিছু না বলে সন্ধ্যায় একাই সেই বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলেন৷ দেখলেন বাড়ির পাঁচজনেই শয্যাশায়ী৷ জল পিপাসায় খুবই কাতর, জল দেওয়ারও কেউ নেই৷ মাঝে মাঝে বমি ও মলত্যাগ করছে৷ সেগুলো পরিষ্কার করারও কেউ নেই৷ বাড়ি ফেরার কথা ভুলে গেলেন বালক ঈশ্বরচন্দ্র৷ অন্য একটি বাড়ি থেকে এক কলসি জল আনলেন৷ চকমকি ঠুকে প্রদীপ জ্বাললেন৷ সকলকে জল খাইয়ে ডাক্তার ডাকতে গেলেন৷ রাস্তায় ডাক্তার রূপচাঁদবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল৷ ডাক্তারের পরামর্শে ও সাহায্যে ময়লা পরিষ্কারের জন্য সরকারের নিযুক্ত মহিলাকে ডেকে এনে বমি ও মল পরিষ্কার করিয়ে সারা রাত জেগে বসে থেকে, রোগীদের বারে বারে জল দিতে লাগলেন৷ ক্রমে তিনটি শিশু কথা বলল৷ অত্যন্ত আনন্দ হল তাঁর৷ পরিশ্রম সার্থক বলে মনে হল৷ রাত্রি শেষ হলে স্ত্রীলোকটি বললেন– ‘বাবা, তুমি সমস্ত রাত জেগে বড় কষ্ট পেয়েছ, একবার বাবুদের বৈঠকখানায় শুয়ে পড়৷ বাবুরা খুব ভদ্রলোক৷’

স্ত্রীলোকটি ভাবলেন, এমন দয়াময় বালক না ঘুমিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁদেরকে আর কে দেখবে?

সকালে ঈশ্বরচন্দ্র মিছরি ও বেদানা পথ্য দিয়ে ফিরে এলেন৷ বাড়িতে ফেরার পথে গঙ্গার ঘাটে স্নান করে নিলেন৷ ঈশ্বরচন্দ্র বয়সে ছোট হলেও জানতেন গৃহস্থ জগদ্দুর্লভবাবু যদি শোনেন যে তিনি কলেরা রোগীর সেবা করে এসেছেন তা হলে রাগ করবেন৷ কলেরা মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ৷ সেকালে এ রোগের তেমন ওষুধও ছিল না৷ একবার একজনকে ধরলে গোটা এলাকায় মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ত৷ অনেকেই মারা যেত৷ তাই নিকট আত্মীয়ের কলেরা হলেও ভয়ে কেউ তার ধারে কাছে যেত না৷ তাকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যেত৷ সারারাত ধরে এরকম মারাত্মক কলেরা রোগীর সেবা করে, স্নান সেরে বাজার করে ঈশ্বরচন্দ্র বাড়ি ফিরলেন৷

এদিকে তাঁকে বাসায় না পেয়ে বাবা ও ভাইয়েরা খোঁজ করছেন৷ ফিরে এলে বাবা জিজ্ঞেস করলেন–‘কাউকে কিছু না বলে কাল রাত্তিরে কোথায় ছিলি? বেলা হল দেখে আমি মধুসূদনের বাসায় খুঁজতে গিয়েছিলাম৷ সে বলল, কাল তুই তাঁর সাথে দেখা করিসনি৷ সে আরও বলল, এ অঞ্চলে কলেরা রোগ ছড়িয়েছে৷ হয়তো কারও অসুখের খবর পেয়ে তুই তার সেবা শুশ্রূষার জন্য গিয়েছিস৷ বলল, ঈশ্বরের মন দয়ায় খুবই আচ্ছন্ন৷ পরোপকার করতে পারলে তার আনন্দের সীমা থাকে না৷ এ কথা শুনে আমি ফিরে এলাম৷ কী ব্যাপার বল দেখি?’

ঈশ্বরচন্দ্র চুপ করে থাকলেন৷ ঠাকুরদাসও ছেলেকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না৷ রান্না খাওয়া শেষ হলে ভাই দীনবন্ধুকে ঈশ্বরচন্দ্র বললেন– ‘কলেজে গিয়ে আমাদের শ্রেণির অধ্যাপককে বলবি, দাদা আজ এক স্থানে অসুখের খবর পেয়ে তাঁদের সেবা শুশ্রূষার জন্য গিয়েছেন৷ তাঁরা খুবই গরিব, তাই দাদা আসতে পারেননি৷’ এই কথা বলে আবার ঈশ্বরচন্দ্র সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, রোগীরা অনেকটা সুস্থ৷

মানুষের প্রতি বিদ্যাসাগরের ছিল এমনি গভীর ভালবাসা৷ কোনও বাছবিচার না করেই দুঃস্থ, অসহায় মানুষকে সাহায্য করতেন৷ এ জন্যই ছেলেবেলায় তাঁকে সকলে ডাকত ‘দয়াময়’ বলে৷ পরবর্তী জীবনে তাঁর ‘করুণাসাগর’ নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে৷

বিদ্যাসাগর যখন বউবাজারের বাসায় থাকতেন, তখন বাসার পাশে থাকতেন মোক্তার বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়৷ তাঁর এক ভৃত্যের কলেরা হয়৷ মোক্তারবাবু ভয়ে চাকরের হাত ধরে রাস্তায় শুইয়ে দেন৷ খবরটা কানে গেল বিদ্যাসাগরের, চোখের জল ফেলতে ফেলতে ছুটে গেলেন তিনি৷ ভৃত্যটিকে কোলে তুলে এনে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিলেন৷ নিজে গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনলেন৷ মল ও বমি পরিষ্কার করে সারাক্ষণ বসে থেকে শুশ্রূষা করলেন৷ তাঁর পরিচর্যায় ৫–৭ দিন পরে সেরে উঠল৷

বিহারীলাল সরকার লিখেছেন– ‘স্বদেশি হউক, বিদেশি হউক, ব্রাহ্ম হউক, খ্রিস্টান হউক, মুসলমান হউক, সাহসী, সদালাপী, সরল সত্যসন্ধ ব্যক্তিমাত্রেই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের হূদয় অধিকার করিতেন, কিন্তু পরের জন্য তিনি রোদন না করিয়া থাকিতে পারিতেন না৷ দরিদ্রের দুঃখ দর্শনে তাঁহার হৃদয় টলিত, বান্ধবের মরণশোক তাঁহার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাইত৷’

এত বড় মানবদরদি মন ছিল বলেই বর্ধমান জেলায় যখন একবার ম্যালেরিয়া মহামারী রূপে দেখা দিয়েছিল তখন তিনি চুপ করে থাকতে পারেননি৷ খবর পেলেন অসংখ্য মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে৷ বিদ্যাসাগর অবিলম্বে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান৷ ম্যালেরিয়া কবলিত এলাকায় অস্থায়ী দাতব্য চিকিৎসালয় খুললেন৷ নিজেই গরিব রোগীদের চিকিৎসা, পথ্যের তদারকি করতেন৷ এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ধর্ম বর্ণ ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে৷ এলাকার অধিকাংশ মানুষই ছিল মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত৷ সে সময় হিন্দুধর্মের মধ্যে জাতপাতের ছোঁয়াছুঁয়ির বাছবিচার ছিল প্রবল৷ তখন ব্রাহ্মণ হয়েও বিদ্যাসাগর মুসলমান পরিবারের অসুস্থ মরণাপন্ন একটি শিশুকে পরম যত্নে কোলে তুলে নিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন, এমনই মায়ের মতো কোমল মন ছিল তাঁর৷

নিম্ন শ্রেণির লোক, কম বেতনের কর্মচারী, ভৃত্য বা পরিচারক শ্রেণির কেউ, পদমর্যাদায় তাঁর চেয়ে অনেক নিচের কোনও মানুষকে তিনি কখনওই অমর্যাদা করেননি৷ সকলকেই মর্যাদা দিয়েছেন মানুষ হিসেবে৷

একবার গ্রীষ্মকালের দুপুরে একজন ধনী মানুষের ঘরে কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তির সঙ্গে জাজিমে, টানা পাখার নিচে বসে তিনি আলোচনা করছিলেন৷ একজন দারোয়ান বিদ্যাসাগরের জন্য চিঠি নিয়ে সেখানে এসেছে৷ প্রখর রোদে হেঁটে এসেছে, শরীর ঘামে ভেজা৷ বিদ্যাসাগর দারোয়ানকে টানা পাখার নিচে জাজিমে নিজের পাশে বসতে বললেন৷ বড় মানুষদের পাশে দারোয়ানের বসার সাহস হল না৷ দাঁড়িয়েই থাকল৷ বিদ্যাসাগর তখন দারোয়ানকে হাত ধরে জাজিমে বসিয়ে দিলেন৷ খানিক ঠাণ্ডা হয়ে দারোয়ান চলে গেল৷ যাঁরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা বিদ্যাসাগরকে বললেন–‘আমরা যে আসনে বসে আছি সেখানে একজন দারোয়ানকে বসিয়ে আপনি ভাল করেননি৷ এতে আমাদের মান থাকে না৷’

বিদ্যাসাগর বললেন–‘আগে বিচার হোক, পরে আমাকে দোষী ক’রো৷ বিচার কী মতে হবে? হিন্দুমতে না অন্য মতে? হিন্দু মতে বিচার শোন– এই দারোয়ান একজন কনৌজি ব্রাহ্মণ, ওরা আমাদের জল স্পর্শ করে না৷ তোমার বাপ–ঠাকুর্দা আজ এখানে থাকলে ওর পায়ের ধূলো এই জাজিমে না পড়ে তাঁদের মাথায় উঠত৷ অন্য মতে বিচার শোন, আমরা সকলে পাঁচশো, সাতশো, হাজার টাকা মাইনে পাই, ওই দারোয়ান পাঁচ টাকা মাইনে পায়৷ এ অবস্থায় আমি ওকে অবজ্ঞা করতে পারি না, কারণ আমার বাবা বড়বাজারে এক দোকনে পাঁচ টাকা মাইনের কাজ করতেন৷ ওকে অবজ্ঞা করার আগে আমার বাবাকে অবজ্ঞা করতে হয়৷ হয়তো এখন আমাদের মধ্যে এখানে কেউ কেউ আছেন যাঁদের বাবা কিংবা ঠাকুর্দা পাঁচ টাকা মাইনের কাজ করতেন৷’

বিদ্যাসাগর ছিলেন অসহায় বিপদগ্রস্ত মানুষের বন্ধু৷ যে কেউ বিপদে পড়লেই তাঁর কাছে সাহায্যের আবেদন নিয়ে আসত৷ তিনি কাউকে ফেরাতেন না৷ দান করার ক্ষেত্রে ধর্মকে, জাতকে তিনি বিচারের মধ্যে ধরতেন না৷ সে সময় হিন্দুধর্ম পরিত্যাগ করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত খ্রিস্টান হয়েছিলেন৷ তাই আত্মীয়স্বজন, বন্ধু–বান্ধব সবাই তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন৷ তিনি বিলাতে গিয়েছিলেন ব্যারিস্টারি পড়তে৷ সেখানে তিনি প্রচণ্ড আর্থিক সংকটে পড়েন৷ বিদেশে টাকার জন্য তাঁকে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়৷ নিরুপায় হয়ে মাইকেল বিদ্যাসাগরকে নিজের অবস্থার কথা জানিয়ে সাহায্যের আবদেন করেন৷ বিদ্যাসাগরের কাছে তখন এত টাকা নেই৷ কিন্তু মাইকেলকে তো বাঁচাতে হবে৷ ছ’হাজার টাকা ধার করে পাঠিয়ে দিলেন মাইকেলকে৷ এই পরিমাণ টাকা তখনকার দিনে বহু বড় জমিদারররাও দেওয়ার কথা ভাবতে পারতেন না৷

মাইকেল বেহিসেবি খরচ করতেন৷ শোনা যায়, হাতে টাকা আসা সত্ত্বেও পরে বিদ্যাসাগরের ঋণ শোধ করেননি৷ এ জন্য বিদ্যাসাগরকে বিপদে পড়তে হয়েছে৷ তবু রাগ করেননি৷

কেউ যদি বলতেন, ‘মাইকেল তো আপনার ঋণ শোধ করল না?’

তিনি হেসে উত্তর দিতেন, ‘মাইকেল কাব্য–সাহিত্যে জন্মভূমির অনেক ঋণ শোধ করেছেন– আমার ঋণ আর কতটা৷’

কেউ কেউ এসে বলতেন, ‘মাইকেলের মতো কোনও মাতাল সাহায্য চাইতে এলে আপনি সাহায্য করবেন তো?’

তিনি উত্তর দিতেন– ‘না’৷

কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেন–‘সে যদি মাইকেলের মতো একটা মেঘনাদবধ কাব্য লিখে আনতে পারে তা হলে সাহায্য করব৷’ বলতেন– ‘আমি বাংলার কবিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মাইকেলকে সাহায্য করেছি৷’

এরকম কত লোককে যে তিনি সাহায্য করতেন তার ইয়ত্তা নেই৷ বহু দরিদ্র, অসহায় মানুষ তাঁর কাছ থেকে মাঝে মাঝে সাহায্য পেতেন৷ বহু দরিদ্র ছাত্র তাঁর সাহায্যে পড়াশোনা করে জীবনে বড় হয়েছেন৷

জলধর সেন গ্রামের ছেলে৷ বৃত্তি পেয়ে পাশ করেছে৷ কিন্তু কলকাতায় থেকে লেখাপড়া করার সাধ্য নেই৷ খুবই গরিব৷ সবাই পরামর্শ দিল, সে যদি একবার বিদ্যাসাগরকে গিয়ে বলে তা হলে তাঁর লেখাপড়ার ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে৷ জলধর সেন বিদ্যাসাগরের কাছে এলেন৷

ব্যিদাসাগর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে, কী চাস তুই?’

জলধর বললেন– ‘আমি স্কলারশিপ নিয়ে পাশ করেছি৷ আমরা খুব গরিব৷ কলকাতায় পড়ার পয়সা নেই৷ তাই আপনার কাছে এসেছি কলেজে বিনা বেতনে পড়তে পারব বলে৷’

মেট্রোপলিটন কলেজ বিদ্যাসাগরের নিজস্ব কলেজ৷ সে কলেজে তখন জায়গা নেই৷ তিনি নিজে খরচ দিয়ে অন্য জায়গায় ভর্তির ব্যবস্থা করে দিলেন জলধরকে৷ পরবর্তীকালে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন জলধর৷ সারা জীবন বিদ্যাসাগরের অবদান ভুলতে পারনেনি৷

একবার শীতের রাতের বিদ্যাসাগর কলকাতার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন৷ শীতের ঠাণ্ডা রাত৷ দেখলেন, সেই সময় কয়েকটি মেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছেন৷ এই মেয়েরা যে অভাবের জ্বালায় রোজগারের আশায় এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে তা তিনি জানতেন৷ এই পতিতাদের অসহায় দুঃখময় জীবনের প্রতি তাঁর ছিল অসীম করুণা৷

তিনি তাঁদের কাছে গিয়ে বললেন–‘মায়েরা, এই টাকা নাও, তোমাদের নিজের নিজের ঘরে যাও৷ এই ঠাণ্ডায় আর এখানে অপেক্ষা কোর না৷’

কৃতজ্ঞতায় মেয়েগুলির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল৷ একজন তাঁর পায়ের ধূলো নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল– ‘আপনি দেবতা৷ আমরা পাপী, তবু আমাদের উপর আপনার এত দয়া কখনও ভুলতে পারব না৷’  

(চলবে)

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ৩ সংখ্যা)