Home / খবর / ৭৫ লক্ষ চাকরি! ভোটের পরে কেন,  এখনই দিতে অসুবিধা কোথায়

৭৫ লক্ষ চাকরি! ভোটের পরে কেন,  এখনই দিতে অসুবিধা কোথায়

রাজভবন অভিযান ৩০.৮.১৮

৭৫ লক্ষ চাকরি হাতের মুঠোয় নিয়ে বসে আছেন বিজেপি নেতারা, শুধু পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার অপেক্ষা! তাঁরা এমনকি বেকারদের কাছে চাকরির কার্ড বিলি করতে শুরু করেছেন। ভোট মিটে গেলেই কার্ড দেখে দেখে তাঁরা লাইন দিয়ে চাকরি দেবেন। এমন প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন অধুনা বিজেপি নেতা ও সাংসদ তথা এক সময় তৃণমূলের একসময়ের দাপুটে দুই নেতা, যৌথভাবে।

কিন্তু চাকরিই যদি দেবেন, ভোটের পরে কেন? এখনই শুরু করলে হয় না? বিজেপি তো কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে। সারা দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের যে ২৪ লক্ষের বেশি পদ খালি পড়ে আছে সেগুলিতে নিয়োগ শুরু করলেই তো পশ্চিমবঙ্গের ভাগে অন্তত কয়েক লক্ষ পড়ত! এই কাজটা তাঁরা শুরু করলেন না কেন? বরং উল্টো পথে হেঁটে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ৫ বছর ধরে খালি থাকা পদগুলি বিলোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংবাদে প্রকাশ, এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের সরকারি হাসপাতালে ৩৩ শতাংশ ডাক্তার, ৪৫ শতাংশ নার্স, বিহারের ৫৯ শতাংশ ডাক্তারের পদ খালি পড়ে আছে (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২৭-১০-২০)। বিজেপি সরকার কি তাহলে চাকরি দেওয়ার লোক পায়নি? যদি তাই হয়, তা হলে পশ্চিমবঙ্গের সদ্য পাশ করা ডাক্তার নার্সদের নিয়ে গিয়ে চাকরি দেওয়া শুরু করতে পারতেন! কার্ডটি হাতে নিয়ে তা হলে ভোট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত না।

অবশ্য ভোট এলে চাকরির লোভ দেখানো বেকারত্বে জর্জরিত ভারতে খুব সহজ এবং পরিচিত ঘটনা। ভোটের ঢাকে কাঠি পড়া মাত্র চাকরির প্রতিশ্রুতির যেন বান ডেকে যায়। বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে বসার আগে ২০১৪ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরি হবে। সিপিএম পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকার সময়ও কম কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি শোনায়নি। একবার হলদিয়া পেট্রোকেম প্রকল্পে কয়েক লক্ষ কর্মসংস্থানের গল্প শুনিয়ে শেষে সর্বসাকুল্যে তা দাঁড়িয়েছিল ৯০০ তে। সিঙ্গুরের লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থানের হিসাব চাইতে টাটা কোম্পানির সিইও বলে ফেলেছিলেন, ন্যানো কারখানায় খুব জোর শ’তিনেক লোকের কাজ হতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেস তো গত বিধানসভা ভোটের আগে একেবারে ‘এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক’ই খুলে ফেলেছেলি। যে এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নাম লিখিয়ে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী বছরের পর বছর বসে আছেন, চাকরির দেখা নেই। চাকরি বলতে তারা দিয়েছে কিছু সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি। যার না আছে স্থায়িত্ব না উপযুক্ত বেতন। বিহারের সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটের আগে লালুপ্রসাদ যাদবের পুত্র তেজস্বী যাদব ১০ লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি দিতেই বিজেপির জোটসঙ্গী মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার বলে ফেললেন, আমি ১৫ বছর মুখ্যমন্ত্রীত্বে খুব বেশি হলে ৬ লক্ষ চাকরি দিতে পেরেছি। বিজেপি দেখল, ঝুলির বেড়াল বেরিয়ে পড়ছে! তাই জোর গলায় প্রচার শুরু করল– তেজস্বী ১০ লক্ষ চাকরি দিলে আমরা দেব ১৯ লক্ষ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিদেশ থেকে কালো টাকা ধরে এনে সব ভারতবাসীর অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা ভরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা দেশবাসীর মনে গেঁথে গেছে। কিন্তু আরও দৃঢ় হয়ে গেঁথে গেছে তাঁর অন্যতম সুহৃদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপির প্রধান মুখ অমিত শাহের এ প্রসঙ্গের ব্যাখ্যাটি। অমিত শাহ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এগুলো সব ভোটের বাজারে বলা হাওয়ায় ভাসানো কথা। তাঁর ভাষায়– স্রেফ ‘জুমলা’।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দেওয়া চাকরির প্রতিশ্রুতির কী হাল হয়েছে? ২০১৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) জানাচ্ছে তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বে প্রথম চার বছরে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৮ লক্ষ ২৩ হাজার। ভুলে যাবেন না, এটা সারা ভারতের হিসাব। ফলে তথাকথিত সিভিক ভলান্টিয়ার, সামান্য ভাতা পাওয়া আশাকর্মী, স্কুল কলেজের ২/৩ হাজার টাকার পার্শ্বশিক্ষক, রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ ইত্যাদি সব হিসাব ধরা আছে। আর পরের দফায়? ২০১৯ সালের সরকারি সংস্থা ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অর্গানাইজেশন (এনএসএসও) বলেছিল ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বেকারির হার উপহার দিয়েছে বিজেপির বিকাশ পুরুষ নরেন্দ্র মোদী জমানা। ২০১৯-এর ভোটের আগে সেই তথ্য জনসমক্ষে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় এনএসএসও প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। ২০১৮-র সেপ্টেম্বর এবং ডিসেম্বরে আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর সাসটেইনেবল এমপ্লয়মেন্ট’ এবং সিএমআইই-র সমীক্ষা জানিয়েছিল, ওই বছর কমপক্ষে ১ কোটি ১১ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছিলেন।

২০২০-র এপ্রিল থেকে জুন মাসে সরকারি হিসাবেই ১২ কোটি ২০ লক্ষের বেশি মানুষ নতুন করে কাজ হারিয়েছেন। বিজেপি শাসিত ঝাড়খণ্ডে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ। বিজেপি জোটের সোনার রাজত্বে বিহারে বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশের উপরে। হরিয়ানার মতো শিল্প এবং কৃষিতে উন্নত রাজ্যেও বেকারত্ব ৯ শতাংশর উপরে (টাইমস নিউজ নেটওয়ার্ক, ২ জুন ২০২০ এবং সিইআইসিডাটা.কম)। সরকার বলতে পারে আপাতত করোনা পরিস্থিতির জন্য অনেক কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি কাটলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু কোন জাদুবলে তা হবে! করোনার় আগে পরিস্থিতি কী ছিল? প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, দেশে চাকরির অভাব নেই, কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবেই যুবকরা সেই চাকরির সন্ধান পায় না। কত কাজ আছে? সেন্টার ফর ইকনমিক ইনফরমেশন অ্যান্ড সেন্সাস (সিইআইসি) সরকারি তথ্য দিয়ে দেখাচ্ছে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ভারতে কর্মক্ষম (১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী) প্রায় ৭৭ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ৩৮.৫ কোটি কিছু কাজ পেয়েছেন, বাকিরা কর্মহীন। এরা কি তথ্যের অভাবে কাজ পাচ্ছে না? তাহলে তথ্যই দেখা যাক। আন্তর্জাতিক সমীক্ষা সংস্থাগুলি দেখিয়েছে ভারতে ২০১৯ সালে নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে আগের বছরের তুলনায় মাত্র ২.৮ শতাংশ। কোর ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ঋণাত্মক হারে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ চাকরি হয়নি, বদলে ছাঁটাই হয়েছে বেশি। রেল, বিএসএনএল, তেল কোম্পানি, সরকারি দপ্তরে নতুন নিয়োগ বন্ধ। লক্ষ লক্ষ কর্মচারীকে সরাসরি ছাঁটাই করা হচ্ছে। ইস্পাত, খনি, সার, সিমেন্ট শিল্পে চলছে ছাঁটাই (ইকনমিক টাইমস, ১৯.১১.২০১৯)। সরকার বেকারত্বের হিসাবে অনেক কারিকুরি করে। মূলত নথিভুক্ত বেকারদের যত শতাংশ কাজ পেল না, সেই সংখ্যাটাকেই দেখানো হয় বেকার হিসাবে। বাস্তবে যে কোটি কোটি মানুষ সামান্য মজুরিতেও যে কোনও একটা কাজের আশায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায় তাদের কোনও হিসাব সরকারের খাতায় নেই।

বিজেপি শাসিত রাজ্যেই বেকারত্ব সর্বোচ্চ

বিজেপি একক ভাবে বা কোনও শরিকের সঙ্গে জোট করে সরকারে থেকে যে সব ‘সোনার রাজ্য’ গড়েছে– সেগুলি বেকারত্বের হারে দেশে ‘ফার্স্ট’ হওয়ার তকমা পেয়েছে। ২০১৯ সালের শেষে যে ১০টি রাজ্যে বেকারির হার সর্বোচ্চ ছিল তার মধ্যে ৬টি বিজেপি ‘সোনার শাসনে’-র তত্ত্বাবধানে ছিল। ওই সময় সরকারি হিসাবে বেকারির জাতীয় হার ছিল ৭.২ শতাংশ। সেই সময় সিএমআইই- তথ্য অনুযায়ী বেকারত্বের হারে সর্বোচ্চ ত্রিপুরা ৩১.২ শতাংশ, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিল্লি ও হরিয়ানায় বেকার যথাক্রমে ২০.৪ এবং ২০.৩ শতাংশ। হিমাচলপ্রদেশ ১৫.৬, পাঞ্জাব ১১.৮, ঝাড়খণ্ড ১০.৯, বিহার ১০.৩, ছত্তিশগড় ৮.৬ এবং উত্তরপ্রদেশ ৮.২ শতাংশ। গুজরাটে যেখানে প্রায় ২০ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় আছে বিজেপি, সেখানে কী পরিস্থিতি? গুজরাটে বেকারত্বের হার গত জুন মাসে ছিল ১৩.৬ শতাংশ। ২০১৯-এর নভেম্বরেও তা ছিল জাতীয় গড়ের থেকে বেশি (দ্য মিন্ট, ১.০৬.২০)। এই হিসাব যদিও বেকারত্বের আসল চেহারাটা দেখায় না। সরকারের শ্রম দপ্তর দেখাচ্ছে, ২০১৯ সালে দেশে জনসংখ্যা বাড়লেও কর্মরত মানুষের সংখ্যা কমেছে ৪ কোটি ৭০ লক্ষ। কর্মক্ষম মানুষের কাজের বাজারে আসার হারই (লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট) কমেছে ১০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ কাজ চাইবার মতো সুযোগও মানুষ পাচ্ছে না (বিজনেসটুডে.ইন, ৮.১০.২০১৯)।

সারা দেশে শিল্পে সংকট, চাকরি কোথায় হবে?

ভারতে গত ছ’মাসে জিডিপি-র (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন) সংকোচন ঘটেছে। প্রথম তিন মাসে সংকোচনের পরিমাণ ছিল ২৪ শতাংশ। সরকারের স্বীকারোক্তিই বলছে দেশ মন্দার কবলে। শিল্প, খনি, বাড়ি-ঘর নির্মাণ, রাস্তাঘাট-ব্রিজ ইত্যাদি পরিকাঠামো নির্মাণ শিল্পে প্রায় কোনও নতুন কাজ নেই। উৎপাদন বাড়া দূরে থাক তা ক্রমাগত কমছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে যারা বলে– ‘আমরা এলেই চাকরি দিয়ে দেব’ তাদের থেকে বড় মিথ্যাবাদী কেউ আছে? কান পাতলেই শোনা যায় একটা প্রচার– গুজরাটে নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিজেপি সুকৌশলে দেখায় শুধু তারা ক্ষমতায় নেই বলেই বাংলার এই হাল! গুজরাটের বেকার সমস্যার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তা দেখলেই বোঝা যায় কর্পোরেট পুঁজিমালিকদের ডেকে নিয়ে গিয়ে সেখানে কতই না শিল্পায়ন ঘটিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী! আজও একদল ধুরন্ধর সিঙ্গুরের শিল্পায়ন সম্ভাবনা নিয়ে কতই না কুম্ভীরাশ্রু ফেলেন! যে সময় সিঙ্গুর থেকে টাটাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী, তার ৫ বছর পরেও গুজরাটের বেশিরভাগ শ্রমিক অস্থায়ী হয়েই থেকেছেন।

গুজরাটে কর্পোরেটরা বড় বড় কারখানা, বন্দর তৈরি করেছে, কিন্তু তাতে সাধারণ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে কোথায়? যত গড় আয়ের বৃদ্ধি দেখিয়েছে সরকার, তত সাধারণ শ্রমিকের মজুরির হার কমেছে। সে রাজ্যের মাত্র ৩.১ শতাংশ শ্রমিক মাসে ২৫ দিন কাজ পেয়ে ৫ জনের সংসার চালানোর মতো নূ্যনতম রোজগার করতে পারেন (দ্য ওয়্যার,২৭.১১.২০১৭)। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ শ্রমিকেরই সংসার চালানোর মতো রোজগার নেই। আজ পরিস্থিতি আরও সংকটময়। এই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে চাকরির বান ডাকিয়ে দেবে? মিথ্যাচারই কি বিজেপি কথিত ‘সোনার বাংলা’র ভিত্তি?

(ডিজিটাল গণদাবী-৭৩ বর্ষ ১৪ সংখ্যা_২৫ ডিসেম্বর, ২০২০)