Breaking News
Home / খবর / মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে বলিষ্ঠভাবে আমাদের দাঁড়াতে হবে, ২৪ এপ্রিল কমরেড প্রভাস ঘোষের আহ্বান

মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে বলিষ্ঠভাবে আমাদের দাঁড়াতে হবে, ২৪ এপ্রিল কমরেড প্রভাস ঘোষের আহ্বান

২৪ এপ্রিল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)–এর ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে কলকাতায় কেন্দ্রীয় অফিস ৪৮ লেনিন সরণিতে রক্তপতাকা উত্তোলন ও সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ৷ কমরেড শিবদাস ঘোষের উপর রচিত সঙ্গীতের পর কমরেড প্রভাস ঘোষ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন৷ আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়৷ উপস্থিত ছিলেন পলিটব্যুরোর প্রবীণ সদস্য কমরেড রণজিৎ ধর এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড গোপাল কুণ্ডু সহ রাজ্য নেতৃবৃন্দ৷ অনুষ্ঠানে প্রায় শতাধিক কর্মী–সমর্থক উপস্থিত ছিলেন৷ উল্লেখ্য, পঞ্চায়েত নির্বাচনের কারণে এই বছর পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সমাবেশ হয়নি৷ জেলায় জেলায় বহু স্থানে এবং রাজধানী দিল্লি সহ দেশের প্রায় সমস্ত রাজ্য রাজধানী ও অনেকগুলি বড় শহরে ২৪ এপ্রিলের সমাবেশ হয়৷ কেন্দ্রীয় অফিসে কমরেড প্রভাস ঘোষ বলেন,

২৪ এপ্রিলের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী, গুরুত্ব কী তা কমরেডরা সকলেই জানেন৷ এ–ও কমরেডরা জানেন, কী কঠিন কঠোর প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে মহান মার্কস–এঙ্গেলস–লেনিন-স্ট্যালিন-মাও-সে-তুং এর সুযোগ্য উত্তরসাধক মহান শিক্ষক মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷ কোটি কোটি অত্যাচারিত, নিপীড়িত মানুষের চোখের জল ব্যথা–বেদনাকে বুকে বহন করে আন্তর্জাতিক বিপ্লব এবং এদেশের বুকে পুঁজিবাদবিরোধী মহান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্নকে সামনে রেখে এই দল তিনি গড়ে তুলেছিলেন৷

আজ আমরা কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি ? সমগ্র বিশ্বে এবং আমাদের দেশে মানবজাতি, মানবসভ্যতা ভয়ঙ্কর সংকটের সম্মুখীন৷ এই সংকট যে ঘটবে তা মহান মার্কস–এঙ্গেলস–লেনিন-মাও-সে-তুং বলে গেছেন৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ এই সংকটের খানিকটা দেখে গেছেন৷ একটা সমাজব্যবস্থার কৈশোর থাকে, যৌবন থাকে, প্রৌঢ়ত্ব থাকে, বার্ধক্যও আসে৷ আজকের পুঁজিবাদ–সাম্রাজ্যবাদ মৃত্যুশয্যায় শায়িত একটা পচাগলা শবদেহের মতো৷ প্রাণীজগতের প্রাণের নিয়মেই যেমন করে জন্ম এবং মৃত্যু ঘটে সমাজের ক্ষেত্রে তেমন ঘটে না৷ কারণ মানবসমাজের ক্ষেত্রে মানুষের চেতনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ৷ শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শোষক শ্রেণি প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণির চেতনা এবং মুক্তিকামী শোষিত জনগণের প্রগতিশীল চেতনার সংঘাত থাকে৷ যতক্ষণ পর্যন্ত অত্যাচারিত মুক্তিকামী জনগণ সঠিক বৈপ্লবিক আদর্শের সন্ধান না পায়, বৈপ্লবিক সংস্কৃতির হদিশ না পায় এবং বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে না পারে ততক্ষণ যতই সমাজের অধঃপতন ঘটুক, অবক্ষয় ঘটুক সেই সমাজের মৃত্যু ঘটে না৷ এটাই ইতিহাসের নিয়ম৷ অর্থনৈতিক–রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমস্ত দিক থেকে বিশ্ব পুঁজিবাদের, আমাদের দেশের পুঁজিবাদের আর দেওয়ার কিছু নেই৷ একমাত্র দেওয়ার আছে আরও ধ্বংস, আরও অবক্ষয়৷ এরকম একটা ভয়ঙ্কর অবস্থার সম্মুখীন আমরা হয়েছি৷ On the one hand there is extreme concentration of wealth in the hands of few, on the other there is extreme evergrowing poverty, hunger, starvation and death. অর্থাৎ একদিকে অতি মুষ্টিমেয়র হাতে বিপুল সম্পদ চূড়ান্তভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, অন্যদিকে চূড়ান্তভাবে ক্রমবর্ধমান হারে দারিদ্র, ক্ষুধা, অনাহারে মৃত্যু বাড়ছে৷ পুঁজিপতির হাতে সম্পদের চূড়ান্ত কেন্দ্রীভবন, আর অন্য দিকে নিচুতলায় সীমাহীন ক্ষুধা এবং মৃত্যু৷  On the one hand there is maximisation of profit, on the other there is maximisation of unemployment, retrenchment. অর্থাৎ একদিকে অত্যধিক হারে মুনাফা অর্জন, অন্যদিকে অত্যধিক হারে বেকারত্ব ও ছাঁটাই বৃদ্ধি৷ সাম্রাজ্যবাদের চূড়ামণি আমেরিকা থেকে শুরু করে ভারতবর্ষ, আফ্রিকা, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই সঙ্কট আজ চূড়ান্তভাবে দেখা দিয়েছে৷ আজ ভয়ংকর বাজার সংকটে জর্জরিত সাম্রজ্যবাদী–পুঁজিবাদী অর্থনীতি হাবু ডুবু খাচ্ছে৷ সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার শিরোমনি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছু দিন আগে বিশ্বের বাজার গ্রাস করার জন্য গ্লোবালাইজেশনের স্কিম চালুর প্রধান হোতা ছিল৷ আজ সে দেখছে এই স্কিমের ফলে তার হোম মার্কেটই অন্য সাম্রাজ্যবাদী–পুঁজিবাদীরা অনেকটা গ্রাস করেছে৷ তার শিল্পে সংকট, ছাঁটাই বাড়ছে, বেকার বাড়ছে, তাই সে আওয়াজ তুলেছে গ্লোবালাইজেশন চাই না, বিদেশী পণ্য আটকাতে শুল্ক বাড়িয়ে প্রোটেকশনের প্রাচীর খাড়া করেছে৷ অন্যেরাও একই পথ নিচ্ছে৷ এখন বাণিজ্য যুদ্ধ প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে৷ কে বলতে পারে এরপর হয়ত সশস্ত্র যুদ্ধও বাধতে পারে৷ সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদ মানেই লুণ্ঠনের বাজার নিয়ে কাড়াকাড়ি মারামারি৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে লেনিন বলেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদী যুগে পুঁজিবাদ জরাগ্রস্ত হয়েছে৷ আজ সেই পুঁজিবাদ পচা–গলা শবদেহের মতো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে৷ অর্থনৈতিক–রাজনৈতিক-সামাজিক-পারিবারিক-সাংস্কৃতিক–নৈতিক জীবন সবকিছুকে ধ্বংস করছে৷

বিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদের ক্ষয়িষ্ণু যুগেও মানবতার ঝান্ডা নিয়ে রম্যাঁ রল্যাঁ, বার্নার্ড শ, আইনস্টাইনরা দাঁড়িয়েছিলেন৷ আর পরে ছিলেন রাসেল, সার্ত্রে৷ আর সাম্যবাদের ঝান্ডা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মহান লেনিন–স্ট্যালিন–মাও–সে-তুং, আমাদের দেশে কমরেড শিবদাস ঘোষ৷ এ দেশে মানবতাবাদের ঝান্ডা নিয়ে রামমোহন–বিদ্যাসাগ থেকে যাত্রা শুরু, তারপর একে একে রবীন্দ্রনাথ–শরৎচন্দ্র-নজরুল-প্রেমচাঁদ, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুভাষচন্দ্র, চিত্তরঞ্জন দাস, ভগৎ সিং সহ অন্যান্য বিপ্লবীরা ছিলেন৷ আজ ভারতবর্ষ শুধু নয়, গোটা বিশ্বের কোনও পুঁজিবাদী দেশেই মানবতাবাদী মূল্যবোধেরও চিহ্ণ নেই৷ আমরা দেখছি সব পুঁজিবাদী রাষ্ট্রনায়করা ভণ্ড, প্রতারক, মিথ্যাবাদী, এমনকী কেউ কেউ লম্পট৷ মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিদিন একটা না একটা মহিলাঘটিত কেলেঙ্কারি প্রকাশ পাচ্ছে৷ আমাদের দেশেও রাষ্ট্রনায়ক যারা তারা হল মিথ্যাবাদী, ভণ্ড৷ জনগণকে তারা প্রতারণা করছে, ঠকাচ্ছে, মিথ্যাচার করছে৷গণতন্ত্র কথাটা শুধু কথাতেই আছে৷ মনুষ্যত্বের ওপর আক্রমণ করছে৷ পশুর সাথে মানুষের পার্থক্য যেখানে, তা হল মানুষের চিন্তার ক্ষমতা, যার ভিত্তিতে সভ্যতার সৃষ্টি এবং সভ্যতার শ্রেষ্ঠ অবদান ছিল মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়নীতিবোধ, কর্তব্যবোধ৷ যেদিন থেকে সমাজ সভ্য হতে শুরু করল সেদিন থেকে প্রত্যেকটি সমাজের মধ্যে এগুলিই ছিল মূল্যবান সম্পদ৷ আজ সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবা এই মনুষ্যত্বকে হত্যা করছে৷ সমস্ত দিক থেকে, ন্যায়নীতিবোধ, মূল্যবোধ বলে কোনও কিছুর অবশিষ্ট আর নেই৷ যারা নবজাগরণের পথপ্রদর্শক আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারা কেউই এই পরিস্থিতি দেখে যাননি৷ আজ স্নেহ, মায়া, মমতা,  কর্তব্যবোধ, ব্যক্তিজীবনে পারস্পরিক প্রীতির সম্পর্ক– সমস্ত কিছু শাসকরা ধ্বংস করে দিচ্ছে৷ ৭০ বছরের বৃদ্ধা থেকে ৭ মাসের শিশুকন্যা পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন ধর্ষিতা হচ্ছে, জন্মদাতা পিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে মেয়ে– ধর্ষিতা হিসাবে৷ এইসব জিনিস পূর্ববর্তী যুগের বড় মানুষেরা কেউ প্রত্যক্ষ করে যাননি৷ আজ এ সব আমরা প্রতিদিন দেখছি৷ এই হচ্ছে পুঁজিবাদের সৃষ্টি৷ পুঁজিবাদ মানুষকে মনুষ্যত্বহীন করছে৷ মনুষ্যদেহধারী কিন্তু মনুষ্যত্ববর্জিত একটা নতুন প্রজাতি, যা বর্বর যুগেও ছিল না, এমনকী বন্য যুগেও ছিল না, যা প্রাণীজগতেও দেখা যায় না, এরকম একটা অবস্থার সৃষ্টি করেছে৷ যুক্তি–চিন্তাভাবনা–দায়িত্ববোধ-কর্তব্যবোধ-বিচারবুদ্ধি এগুলোকে ধ্বংস করে দাও৷ মানুষকে অমানুষ করে দাও৷ মানুষের মধ্যে কোনও মানবিক মূল্যবোধ যেন না থাকে৷ কোনও প্রতিবাদ করার মন যেন না থাকে৷ এই শোষণমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য গোটা যুব সম্প্রদায়, ছাত্র সম্প্রদায়কে সমস্ত দিক থেকে বিপথে চালিত করছে, নোংরা যৌনতা ও ক্রিমিনাল কার্যকলাপের স্রোতে নিমজ্জিত করছে৷ এইরকম অবস্থার আমরা সম্মুখীন৷

আমরা কমরেড শিবদাস ঘোষের ছাত্র৷ আমরা সকলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, আমরা সকলে স্বেচ্ছায় দলে যুক্ত হয়েছি৷ আমরা জানি কমরেড শিবদাস ঘোষ মার্কসবাদ–লেনিনবাদকে এ দেশের বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে প্রয়োগ করে শুধু উন্নত করেছেন তাই নয়, তিনি লেনিন পরবর্তীকালে দর্শনগত দিক থেকে উদ্ভূত প্রশ্ন, বিজ্ঞানজগতে উদ্ভূত প্রশ্নের সমাধান করেছেন এবং অন্য দিকে একটা সর্বহারা বিপ্লবী দল আজকের দিনে কীভাবে গড়ে তুলতে হয়, সর্বহারা গণতন্ত্র কাকে বলে, সর্বহারা সংস্কৃতি কাকে বলে, সাম্যবাদী আন্দোলনের সমস্যা কোথায়, কী কী কারণে সমাজতন্ত্রের মধ্যে সংশোধনবাদের পথে পুঁজিবাদ আবার মাথা তুলছে এবং ফিরে আসার বিপদ রয়েছে –এই সমস্ত প্রশ্নেই তিনি মার্কসবাদ–লেনিনবাদের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছেন৷ আজকের দিনে বিভিন্ন দেশে অত্যাচারিত নির্যাতিত মানুষ বিক্ষোভ করছে, লড়াই করছে, আন্দোলন করছে৷ বিক্ষোভ–আন্দোলন জোয়ারের মতো আসছে, আবার ভাটা এসে যাচ্ছে, স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে৷ কারণ, তার নেতৃত্ব নেই, সঠিক পথ জানা নেই৷ সেই বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও বিশ্ব–কমিউনিস্ট আন্দোলন আজ আর নেই৷ দেশে দেশে সেই ধরনের কমিউনিস্ট নেতৃত্বও নেই৷ বিভিন্ন দেশে বিক্ষিপ্ত চেষ্টা হচ্ছে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার৷ কিন্তু আমরা জানি আজকের দিনে উন্নততর মার্কসবাদ কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে হাতিয়ার না করলে কোনও দেশে যথার্থ মার্কসবাদী দল গড়ে উঠতে পারবে না৷ সেইজন্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে আমাদের পৌঁছে দিতে হবে৷ পৌঁছে দিতে হলে আমাদের দলের শক্তি আরও বাড়াতে হবে৷ এই শক্তি নিয়ে আমরা এই শিক্ষাকে সর্বত্র পৌঁছে দিতে পারব না৷ যতক্ষণ পর্যন্ত তা পৌঁছে দিতে না পারছি, ততক্ষণ বারবার বিক্ষোভ হবে, বারবার ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন হবে, ‘আরব বসন্তে’র মতো আন্দোলন হবে, ইউরোপে ধর্মঘটের বন্যা বয়ে যাবে, কিন্তু পুঁজিবাদ–সাম্রাজ্যবাদ টিকে থাকবে৷ সংকট আরও বাড়বে৷

আমাদের দেশেও বিক্ষোভ হচ্ছে, পুঞ্জীভূত বিক্ষোভ মাঝে মাঝে ফেটেও পড়ছে৷ আমাদের দল শক্তি সঞ্চয় করছে এ কথা ঠিক, কিন্তু দলের যে শক্তি থাকলে এই বিক্ষোভগুলিকে আমরা সংগঠিত লাগাতার গণআন্দোলনে পর্যবসিত করতে পারি সেই শক্তি আজও আমরা অর্জন করতে পারিনি৷ একথা ঠিক আমাদের দেশে বিজেপি শাসন একটা নগ্ন ফ্যাসিবাদী রূপ নিয়েছে৷ আবার একথাও ঠিক নয় বিজেপিই প্রথম ফ্যাসিবাদ এনেছে৷ এদেশে ফ্যাসিবাদের প্রবর্তক জাতীয় কংগ্রেস৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ একথা বহুদিন আগেই বলেছেন৷ আজকের বিশ্ব পুঁজিবাদ, উন্নত অনুন্নত সব দেশেই ফ্যাসিবাদের পথ গ্রহণ করেছে৷ ফ্যাসিবাদ কাকে বলে, তার অর্থনৈতিক চরিত্র কী, রাজনৈতিক চরিত্র কী, সাংস্কৃতিক চরিত্র কী, এ কথা তিনি বিশ্বব্যাপী মানবসমাজের সামনে উপস্থিত করেছেন৷ এই যে আজ বিজেপি মাথা তুলতে পারল এরও জমি তৈরি করে গেছে জাতীয় কংগ্রেস৷ জাতীয় কংগ্রেস রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থে শুধু সুভাষচন্দ্র–ভগৎ সিং–ক্ষুদিরামদের রাজনৈতিক বিপ্লববাদকেই বিরোধিতা করেনি, অন্যদিকে যে অধ্যাত্মবাদের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর লড়াই করেছিলেন,  শরৎচন্দ্র যে ঝান্ডা বহন করেছিলেন, ভগৎ সিং যে ঝান্ডা বহন করেছিলেন, তারও বিরোধিতা করেছিল৷ জাতীয় কংগ্রেস ধর্মের সাথে আপস করেছে, অধ্যাত্মবাদের সাথে আপস করেছে এবং তার বিষময় ফলও আমরা দেখেছি– সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ৷ অধ্যাত্মবাদের চিন্তা, ধর্মবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, এগুলি জাতীয় কংগ্রেসের আপসমুখী ধারার জন্যই এ দেশের মাটিতে সৃষ্টি হয়েছে, গড়ে উঠেছে, জমি পেয়েছে৷ অন্যদিকে তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টি, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি যা কোনও দিনই মার্কসবাদী দল ছিল না, তারা কোনও দিনই অধ্যাত্মবাদের বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেনি৷ ওরা বিশ্ব–সাম্যবাদী আন্দোলনের যে গৌরব তাকে আত্মসাৎ করে শক্তি বাড়িয়েছে আর এ দেশে নেতাজি–ভগৎ সিং–সূর্য সেনদের বিপ্লবী আন্দোলনের গৌরবকে আত্মসাৎ করে শুধু শক্তি বাড়িয়েছে৷ এরা কোনও দিন মার্কসবাদের চর্চা তো করেইনি, কোনও উন্নত সংস্কৃতির চর্চাও করেনি৷ অধ্যাত্মবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিদ্বেষ দূর করার লড়াইতে এদের কোনও সংগ্রাম নেই, কোনও ঐতিহ্য নেই৷ না হলে, যে পশ্চিমবাংলা একসময় বামপন্থার ঘাঁটি ছিল, সেই পশ্চিমবাংলায় আজকে বিজেপি এভাবে মাথা তুলতে পারত না৷ যারা একদিন সিপিএম করেছে, তাহলে তাদের নেতা–কর্মীরা কী করে বিজেপিতে যুক্ত হচ্ছে? যদি কারও মধ্যে এতটুকু বামপন্থার ঐতিহ্য থাকতো, এটা কি হওয়ার ছিল? আসলে বামপন্থার স্লোগান ছিল, বামপন্থার সংস্কৃতি ছিল না, বামপন্থী আদর্শের চর্চা ছিল না৷ বিজেপি এই জায়গায় আসতে পারত না৷ শুধু কি তাই? বিজেপি মাথা তুলল কখন? সিপিএম মোরারজি দেশাইয়ের সিন্ডিকেট কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ইন্দিরা কংগ্রেসকে প্রগতিশীল বানিয়েছিল ১৯৬৭–’৬৯ সালে৷ যারা বয়স্ক লোক তাঁরা জানেন, পরবর্তীকালে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যখন ভারতবর্ষে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে গণআন্দোলনের জোয়ার চলছে, গোটা হিন্দি বলয়ে বিরাট আন্দোলন হচ্ছে, আমাদের দল চেয়েছিল, কমরেড শিবদাস ঘোষ চেয়েছিলেন, বামপন্থীরাই এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিক৷ সিপিআই তখন ইন্দিরার বন্ধু, সিপিএম–এর সাথে ইন্দিরা গান্ধীর সখ্যতা, তারা এই আন্দোলনে নামল না৷ সেই আন্দোলনকে আত্মসাৎ করেই জনসংঘ–আরএসএস শক্তি বাড়াল৷ না হলে জনসংঘ–আরএসএস এই জায়গায় আসতে পারত না৷ এটা আপনাদের মনে রাখতে হবে৷ আবার এটাও আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এরপর যখন ভোট হল ১৯৭৭ সালে, এই জনসংঘ–আরএসএস ও অন্য দক্ষিণপন্থী দলগুলি নিয়ে জনতা পার্টি গঠিত হল৷ সেই জনতা পার্টিকে সমর্থন করেছিল সিপিএম, ভোটের স্বার্থে৷ মোরারজি দেশাই কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী, এখানে জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী, ক্ষমতায় এল হাত ধরাধরি করে এবং সেই মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন বাজপেয়ী–আদবানি, তৎকালীন জনসংঘ ও পরবর্তীকালে বিজেপি নেতা, যে সরকারকে বন্ধু সরকার বলেছিল সিপিএম৷ এই হল ইতিহাস৷ আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ভি পি সিং সরকারকে একদিকে সমর্থন করেছে বিজেপি আর একদিকে সমর্থন করেছিল সিপিএম৷ এই কলকাতার ময়দানে বাজপেয়ী এবং জ্যোতি বসু মিটিং করে গেছেন৷ ফলে বিজেপির ক্ষমতাবৃদ্ধিতে, বিজেপির সামাজিক গ্রহণয্যেগ্যতা বৃদ্ধিতে সিপিএমের অবদান কোনও অংশে কম নয়৷ পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসন বামপন্থার ঐতিহ্যকে নষ্ট করেছে, জনগণকে বামপন্থার বিরোধী করেছে৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ বহুদিন আগেই ওয়ার্নিং দিয়েছিলেন যে, তোমরা বামপন্থার সর্বনাশ করছ৷ তার সুযোগ নেবে জনসংঘ৷ তখন ছিল জনসংঘ, আজ তার নাম বিজেপি৷ ঘটেছেও তাই৷ আজ তৃণমূল যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে, সরকারে থাকাকালে তারও জমি তৈরি করে গেছে সিপিএম৷ যার জন্য পাবলিক বলছে, সিপিএমও করেছে, আজ তৃণমূলও করছে৷ বরং হিসাব করছে, কে বেশি করেছে, কে কম করছে৷ এখন সিপিএম বিজেপির বিরোধিতার নামে কংগ্রেসের সাথে ঐক্য করছে, এতো সুবিধাবাদ৷ এই কংগ্রেস কি সেকুলার? কংগ্রেস কোনও দিনই সেকুলার নয়৷ সেকুলার কথার অর্থ হচ্ছে দর্শনগত ক্ষেত্রে অধ্যাত্মবাদ থাকবে না, এই পার্থিব জগৎই একমাত্র সত্য৷ যার প্রতিনিধি ছিলেন বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র, ভগৎ সিং৷ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেকুলারিজম হচ্ছে রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, শিক্ষায়, সামাজিক ক্ষেত্রে ধর্মের কোনও ভূমিকা থাকবে না৷ ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসাবে থাকবে৷ সুভাষচন্দ্রের বক্তব্য তাই ছিল৷ কংগ্রেস এই রাজনীতির চর্চা কোনও দিনই করেনি৷ কংগ্রেসও তো বহুবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছে৷ সর্বশেষ হচ্ছে, দিল্লিতে শিখদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা৷ কংগ্রেস কোনও দিনই সেকুলার নয়৷ আজ কংগ্রেস কী করছে ভোটের জন্য? বিজেপির সাথে প্রতিযোগিতা করে মন্দিরে মন্দিরে ধর্না দিচ্ছে, মসজিদে মসজিদে ধর্না দিচ্ছে, গির্জায় গির্জায় ধর্না দিচ্ছে৷  একটা কথাই এসে গেছে– কংগ্রেসের নরম হিন্দুত্ব৷ এই কংগ্রেসকে সিপিএম সেকুলার বানাচ্ছে৷ কতকগুলি প্রাদেশিকতাবাদী, জাতপাতভিত্তিক পার্টি–বিএসপি, এসপি, আরজেডি, ডিএমকে এই সমস্ত পার্টিগুলো, যাদের সাথে সেকুলারিজমের কোনও সম্পর্ক নেই এবং যাদের একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতার গদি– এদেরকে বলছে সেকুলার ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস৷ অথচ বর্তমান অবস্থায় একটা বিরাট সুযোগ ছিল৷ আজ কর্পোরেট সেক্টরের মধ্যেই লড়াই হচ্ছে, একচেটিয়া পুঁজিপতিদের নিজেদের মধ্যে লড়াই চলছে৷ যার ফলে এদের একদল বিজেপিকে, আর একদল কংগ্রেসকে সমর্থন করছে৷ জাতীয় পুঁজির সঙ্গে আঞ্চলিক পুঁজির দ্বন্দ্ব হচ্ছে, রাজনীতি ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন হচ্ছে৷ ফলে শাসকশ্রেণি ও তাদের দলগুলি  যেখানে তীব্র দ্বন্দ্বে লিপ্ত, শত্রুপক্ষের এই দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করে কীভাবে শ্রেণিসংগ্রাম, গণআন্দোলনকে শক্তিশালী করা যায়, সেটাই ছিল সত্যিকারের বামপন্থা৷ সেই পথ তারা বর্জন করে শুধু ভোটের স্বার্থে বিজেপি বিরোধিতার নামে আজকে কংগ্রেস এবং এই সমস্ত প্রাদেশিকতাবাদী জাতিবাদী পার্টির সাথে সিপিএম ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে৷ এর সাথে বামপন্থার কোনও সম্পর্ক নেই৷ এই অবস্থায় আমাদের পার্টি মহান মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারাকে বহন করছে, বামপন্থার ঝান্ডাকে বহন করছে৷ আজ আমাদের উপর অত্যন্ত ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বর্তেছে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ক্ষেত্রে৷

এখানে আরও কয়েকটি কথা কমরেডদের জন্য আমি বলব৷ কথাগুলি হচ্ছে, আমাদের কমরেডরা কমরেড শিবদাস ঘোষের প্রতি সকলেই খুব শ্রদ্ধাশীল৷ আমি জানি নেতা–কর্মীরা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে স্মরণ করবেন এবং তাঁরা দলের স্বার্থে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ৷ কিন্তু যে প্রশ্নগুলো ভাবা দরকার তা হচ্ছে, আমাদের বহু কর্মী–নেতা আছেন যাঁরা এখনও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ত্যাগ করতে পারেননি৷ আবার বেশকিছু নেতা–কর্মী ব্যক্তিগত সম্পত্তি ত্যাগ করেছেন, কিন্তু যেটা তাঁরা ত্যাগ করতে পারেননি, যে ত্যাগটা করা অনেক কঠিন সংগ্রামের বিষয়, যেটা কমরেড শিবদাস ঘোষই প্রথম মার্কসবাদী আন্দোলনে উত্থাপন করেছেন, সেটা হচ্ছে, সর্বহারা সংস্কৃতি অর্জন করতে হলে ব্যক্তিগত সম্পত্তিজাত মানসিকতা, ব্যক্তিবাদ থেকে মুক্ত হতে হবে৷ তিনি বলেছেন, ব্যক্তিবাদ ছিল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে প্রগতিশীল, যা সেকুলার মানবতাবাদ নিয়ে এসেছিল৷ আজ পুঁজিবাদের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের যুগে সেই ব্যক্তিবাদ নিয়ে এসেছে চূড়ান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, নৈতিক মানের চূড়ান্ত অবনমন৷ এরকম একটা অবস্থায় আমরা যে পরিবেশের মধ্যে বাস করছি, এখানে ব্যক্তিবাদ আমাদের মধ্যে ক্রিয়া করে৷ রাজনীতি ক্ষেত্রে আমরা কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে মোটামুটি বুঝি, সেগুলি আমরা চর্চা করি৷ কিন্তু আমাদের অভ্যাসে–আচরণে, আমাদের জীবনযাত্রায়, আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবে বুর্জোয়া ব্যক্তিবাদ যে কাজ করছে, এমনকী প্রতিমুহূর্তে কাজ করছে, এই সম্পর্কে অধিকাংশ নেতা এবং কর্মী সতর্ক নন, অবহিত নন৷

আমরা চিন্তা করি, প্রত্যেকে ভাবি, প্রত্যেকে মনে করি এটা ঠিক, ওটা বেঠিক, কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, এটা ভাল নয়, ওটা ভাল লাগে না, এ এরকম, ও ঐরকম৷ এই ভাবনাটা অর্থাৎ আমরা যে চিন্তাপ্রক্রিয়ায় কাজ করি, সেটা কি মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষ নির্ধারিত চিন্তাপ্রক্রিয়া? আমরা ক’জন কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তাপ্রক্রিয়াকে আয়ত্ত করার সংগ্রামে লিপ্ত আছি? আমরা কনভেনশনাল যে চিন্তা সমাজ থেকে ছোটবেলা থেকে পেয়েছি, যেটা বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি, বুর্জোয়া বিচারধারা– আমাদের মজ্জায় মজ্জায় মিশে আছে, রক্তে–মজ্জায় মিশে আছে– তার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম দরকার৷ এমনকী তার জন্য মার্কসবাদকেই, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকেই দর্শনগত দিক থেকে আমাদের আয়ত্ত করতে হবে৷ এই চলমান জীবন, গতিশীল জীবন প্রতিমুহূর্তে পাল্টাচ্ছে৷ এই গতির চলার নিয়ম কী, এর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কী, বহির্দ্বন্দ্ব কী, কোনটা বহির্দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রধান, কোনটা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রধান, কোনটা সংখ্যাগত পরিবর্তন, কোনটা গুণগত পরিবর্তন, কোনটা ধ্বংস হয়ে আরেকটা সৃষ্টি হচ্ছে– এ সব প্রকৃতি জগতের মতোই সমাজের ক্ষেত্রেও ঘটে, একটা পরিবারের ক্ষেত্রে ঘটে, একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঘটে, একজন কমরেডের ক্ষেত্রে ঘটে, একজন নেতার ক্ষেত্রে ঘটে– এই বিচারের ক্ষেত্রে এই মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে৷ নিজেকে সম্পূর্ণ আবেগবর্জিত ভাবে, বিদ্বেষমুক্ত ভাবে, মনগড়া ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের বিচার করা দরকার৷ এই ক্ষমতা অধিকাংশ নেতা ও কর্মী আজও অর্জন করতে পারেনি৷ এটা অর্জন করতে হলে একই সাথে তত্ত্বগত ও প্রয়োগগত সংগ্রাম দরকার৷ উন্নত সর্বহারা সংস্কৃতি অর্জন করে এই উভয় সংগ্রামের শিক্ষাকে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় আয়ত্ত করতে হবে৷ এটা অর্জন করতে না পারলে দলে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে না৷ দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের পরিবর্তে কিছু কথা ও কাজ চলবে, মতবিনিময় হবে, কিছু তর্ক হবে, বিতর্ক হবে৷ দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে গড়ে ওঠা যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক, উন্নত মান, সাংস্কৃতিক মানের ভিত্তিতে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক এটা দলের অভ্যন্তরে গড়ে উঠবে না৷ এটা না গড়ে উঠলে দলের মধ্যে ডেমোক্রেটিক সেন্ট্রালিজম ঠিক মতো ক্রিয়া করবে না৷ এটা না গড়ে উঠলে হয় নেতৃত্বের প্রতি অন্ধ সমর্থন গড়ে উঠবে, না হলে অন্ধ বিরুদ্ধতা গড়ে উঠবে৷ নেতৃত্ব বুরোক্রেটিক হবে৷ বিভিন্ন স্তরে এসব জিনিস থাকবে৷ নেতা–কর্মীদের মধ্যে নাম করার ঝোঁক, অহঙ্কার, হামবড়া ভাব, নিজেকে জাহির করার মনোভাব, অপরের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ, তিক্ততা– এইসব জিনিস নানানভাবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইবে৷ এগুলির বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম দরকার৷ স্বামী–স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন, প্রেম–প্রীতি–ভালবাস, সন্তানের প্রতি অ্যাপ্রোচ এ সমস্ত ক্ষেত্রেও সর্বহারা সংস্কৃতির যে দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত, সেই দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে না পারলে আমরা কেউই উন্নত কমিউনিস্ট স্তরে উন্নীত হতে পারব না৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, একসময় বুর্জোয়া মানবতাবাদ প্রগতিশীল ছিল, তাকে ভিত্তি করেই বিশ্বে রেনেসাঁসের যুগে, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে উন্নত চরিত্র গড়ে উঠেছিল৷ আমাদের দেশে নবজাগরণের, স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারাও সেই স্তরে ছিলেন৷ আমরা এখন সেই যুগের যা মানবতাবাদী স্তর, সেই স্তর নিয়েও শুরু করিনি৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ যেজন্য আমাদের বলেছিলেন, শরৎ সাহিত্য পড়, এইসব বড় মানুষদের জীবনি পড়, এঁদের জীবনী থেকে শিক্ষা নাও৷ শরৎ সাহিত্যের চরিত্র থেকে শিক্ষা নাও৷ এদের শিক্ষা নিয়ে মানবতাবাদী চরিত্র, মূল্যবোধ অর্জন কর৷ তার মূল কথা হচ্ছে বিপ্লবের স্বার্থ মুখ্য, দলের স্বার্থ মুখ্য, ব্যক্তির স্বার্থ গৌণ৷ এর পরের স্তর হচ্ছে বিপ্লবের স্বার্থই আমার স্বার্থ, দলের স্বার্থই আমার স্বার্থ৷ এখানে ব্যক্তিগত কোনও স্বার্থ থাকবে না৷ এই স্তরে উন্নীত হতে হলে আগে মানবতাবাদী যুগের শ্রেষ্ঠ যে স্তর, সেই স্তর আমাদের অর্জন করতে হবে৷ এখানে আমাদের সংগ্রামের প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ শুধু কমরেড শিবদাস ঘোষের প্রতি আবেগ, দলের প্রতি আবেগ আমাদের রক্ষা করতে পারবে না৷ প্রতিমুহূর্তে যেমন আমাদের শরীরকে রক্ষা করতে হচ্ছে, এই পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে আমাদের শরীরে কোষের ধ্বংস হচ্ছে, জন্ম হচ্ছে, তেমনি আমাদের মধ্যেও পুরনো চরিত্র ধ্বংস হচ্ছে, নতুন চরিত্র গড়ে উঠছে৷ বুর্জোয়া–প্রোলেটারিয়েট দ্বন্দ্ব, বিপ্লবী–অবিপ্লবীর দ্বন্দ্ব, প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে আমাদের মধ্যে কাজ করছে এবং এই লড়াই সচেতনভাবে না হলে আমরা যতবড় দায়িত্বেই থাকি না কেন, অধঃপতন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারব না এবং কমরেড শিবদাস ঘোষের উপযুক্ত ছাত্র হতে পারব না৷

আমার সর্বশেষ বক্তব্য, কমরেড শিবদাস ঘোষ বিপ্লবী আন্দোলনে এসেছেন শোষিত মানুষের প্রতি গভীর ভালবাসা থেকে৷ যদি জনগণের প্রতি গভীর ভালবাসা না থাকে, তবে জনসংযোগটা একটা রুটিন ওয়ার্ক হয়ে যায়৷ জনগণের প্রতি ভালবাসা, গরিব মানুষের প্রতি ভালবাসা, তার থেকে জনসংযোগ– এইটিই হওয়া চাই৷ প্রত্যেকটি নেতা–কর্মী যে যেখানে থাকে, সেখানে প্রত্যেক কে একটা আদর্শ চরিত্র হিসাবে দাঁড়াতে হবে৷ দলের মধ্যে প্রত্যেকটি নেতা হবে কর্মীদের সামনে আদর্শ৷ আপনি আচরি ধর্ম শেখাও অপরে৷ বক্তৃতা নয়, নিজের জীবন দিয়ে শেখাও৷ আমার এলাকায়, আমার পাড়ায়, আমার দায়িত্ব–কর্তব্যে, আমার স্নেহ–প্রেম–প্রীতি–ভালোবাসায়,  আমার ভদ্রতায়–নম্রতায়–সুশোভন  আচরণে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মানুষের বিপদের দিনে উপকারের মাধ্যমে ঘরে ঘরে আমি তাদের আপনজন হয়ে যাব৷ এভাবে আমাদের মানুষের কাছে যেতে হবে৷ তিনি চেয়েছিলেন, নেতৃত্ব কাজ দিক না দিক প্রতিটি কর্মী নিজস্ব উদ্যোগে, সৃজনশীল ভাবে সংগঠন গড়ে তুলুন৷ ক্লাব–লাইব্রেরি–সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলুন এবং মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব–চরিত্রকে বহন করে নিয়ে যান৷ আর যেখানে যা অন্যায় হচ্ছে, অত্যাচার হচ্ছে, একা হলেও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন৷ এই হচ্ছে কমিউনিস্ট চরিত্র৷ আমরা যখন বিক্ষোভের কথা বলি, তা একটা প্রোগ্রাম নয়৷ এই বিক্ষোভের মাধ্যমে আমাদের অন্তরে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে যে ঘৃণা ও প্রতিবাদ, আর অত্যাচারিত মানুষের প্রতি যে দরদবোধ তা ফুটে ওঠে৷ এ না হলে এটা আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রাম মাত্র৷ আমাদের দল বাড়ছে, আরও বাড়বে৷ কিন্তু শুধু সংখ্যা দিয়ে হবে না, কোয়ালিটি চাই, চরিত্র চাই৷ নেতারা কর্মীদের দায়িত্ব দিন, নতুনদের দায়িত্ব দিন৷ নতুনদের বিকাশকে সাহায্য করুন৷ নেতাদের আচরণে কোথাও যেন বুরোক্রেসি বাধা হয়ে না দাঁড়ায়৷ কর্মীরা যেন খোলা মনে নেতাদের বলতে পারে, মুখ খুলে বলতে পারে, সমালোচনা করতে পারে৷ আমাকে বলতে না পারাটাই হচ্ছে আমাকে অসম্মান করা– এরকম একটা পরিবেশ– যেটা কমরেড শিবদাস ঘোষ নিজের জীবনে যাপন করেছিলেন, সেই পরিবেশ দলে গড়ে তুলতে হবে৷

এদেশের বুকে আমরা যেখানে যখন সম্ভব অন্যান্য বামপন্থী দল যতটুকু আন্দোলনে আসবে, তাদের নেব৷ কিন্তু আমরা জানি তারা আজকে লড়াইয়ের পথ পরিত্যাগ করেছে৷ আন্দোলনে যদি তারা আসে একমাত্র ভোটের জন্যই আসবে৷ এ ছাড়া তাদের কোনও আন্দোলন নেই৷ অন্যান্য বুর্জোয়া পার্টির যা চরিত্র, এদের চরিত্র ঠিক তাই– ভোটসর্বস্ব রাজনীতি৷ ফলে আমাদের নিজেদের শ্রমিক–কৃষক–ছাত্র-যুব-মহিলা সমস্ত ক্ষেত্রে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে৷ এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই, সামাজিক–সাংস্কৃতিক কাজকর্মের মধ্য দিয়েই ধর্মান্ধতাকে ফাইট করতে হবে, সাম্প্রদায়িকতাকে ফাইট করতে হবে৷ অন্যদিকে মতবাদিক সংগ্রাম, আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে এগুলিকে ফাইট করতে হবে৷ লেনিন বলেছিলেন, অনেস্ট প্রিস্ট ইজ ডেনজারাস দেন ডিজনেস্ট প্রিস্ট৷ সৎ ধর্মযাজক বিপজ্জনক৷ কারণ, তিনি যে ধর্ম প্রচার করেন সেটা ক্ষতিকারক৷ আর তিনি সৎ বলে লোকে বিভ্রান্ত হয়৷ কিন্তু ধর্মপ্রচারক যদি অসৎ হয়, তত বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারবে না৷ আর আজ বিজেপি–আরএসএস অসৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতালোভী এবং সমস্ত রকম অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে৷ তারা ধর্মীয় সততার ভেক ধারণ করে মানুষকে বিভ্রান্ত বিশেষ করতে পারবে না৷ আবার যেভাবে কংগ্রেস বিরোধিতাকে পুঁজি করে বিজেপি ভোটে জিতেছে, তেমনই বিজেপি বিরোধিতাকে পুঁজি করে কংগ্রেস ও অন্যরা জোট করে হয়ত আগামীবার গদি দখলের লড়াইয়ে জিততে পারে৷ কিন্তু বিজেপি যেভাবে মননশীলতা, যুক্তিবাদী মন, বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাকে ধ্বংস করছে, অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্ম–জাতপাত–সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়েছে, তার কুফল বহুদিন ভুগতে হবে৷ এই সর্বনাশকে একমাত্র আমরাই সর্বহারা বিপ্লবী দল হিসাবে রুখতে পারব – যদি আমরা মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার ভিত্তিতে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়াই এবং শ্রেণি সংগ্রাম ও গণআন্দোলনগুলো গড়ে তুলি, গণসংগঠনগুলো গড়ে তুলি এবং আমাদের দায়িত্ব পালন করি৷ এই দায়িত্ব যাতে সকলে পালন করেন, সেই উদ্দেশ্যে আমি এই কথাগুলো বলে গেলাম৷

ইনকিলাব জিন্দাবাদ

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) জিন্দাবাদ

সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ লাল সেলাম

(৭০ বর্ষ ৩৬ সংখ্যা ২৭ এপ্রিল, ২০১৮)