Home / খবর / হর ঘর তিরঙ্গাঃ আজ যাঁরা জাতীয়তাবাদের পাঠ দিচ্ছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁদের কী ভূমিকা ছিল?

হর ঘর তিরঙ্গাঃ আজ যাঁরা জাতীয়তাবাদের পাঠ দিচ্ছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁদের কী ভূমিকা ছিল?

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ বছর ১৩ থেকে ১৫ আগস্ট দেশের প্রতিটি ঘরে জাতীয় পতাকা তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই পরিকল্পনার নাম দিয়েছেন ‘হর ঘর তিরঙ্গা’।

এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এই কর্মসূচি আমাদের জাতীয় পতাকার সঙ্গে একাত্মতাকে আরও মজবুত করবে। বলেছেন, পরাধীন ভারতে বসে যাঁরা স্বাধীন ভারতের পতাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, আমরা তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করতে এবং তাঁরা যে স্বপ্নের ভারতের ছবি দেখেছিলেন, তা গড়তে বদ্ধপরিকর।

প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণায় স্বাভাবিক ভাবেই দেশবাসীর মনে প্রশ্ন উঠছে যে, হঠাৎ ঘটা করে জাতীয় পতাকা তোলার কর্মসূচি নেওয়া কেন? জাতীয় পতাকার সাথে দেশবাসীর একাত্মতায় কি কোনও ঘাটতি চোখে পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর? নাকি নাগরিকদের দেশাত্মবোধের পরীক্ষা নিতে চাইছেন তিনি? নাকি অন্য কিছু চাপা দেওয়ার জন্যই হঠাৎ এই দেশপ্রেমের ঢক্কানিনাদ?

গত আট বছরের বিজেপি শাসনে প্রধানমন্ত্রীর ‘বিকাশ পুরুষ’-এর অতিকায় ছবি বাস্তবের কঠিন মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ‘সবকা বিকাশ’-এর স্লোগান এখন দেশবাসীর নিজেদের প্রতি বিদ্রুপ বলে মনে হয়। মূল্যবৃদ্ধি আকাশ ছুঁয়েছে। বেকারত্ব অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বছরে ২ কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দেশবাসীর সাথে বিরাট প্রতারণা বলে প্রমাণিত হয়েছে। দেশের মানুষ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, তাদের কঠোর পরিশ্রমের সমস্ত ফসল সরকারি মদতে মুষ্টিমেয় একচেটিয়া পুঁজিপতির ভাণ্ডারে গিয়ে জমা হচ্ছে। করোনা অতিমারির সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন চিকিৎসার অভাবে পোকামাকড়ের মতো মরেছে, পরিকল্পনাহীন লকডাউনে কোটি কোটি মানুষের কাজ চলে গিয়েছে, মাইনে কমে গিয়েছে, ঠিক তখনই দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের মুনাফা অবিশ্বাস্য হারে বেড়েছে। এই ভয়ঙ্কর সামাজিক ও আর্থিক সঙ্কটের সময়েও এই সরকার দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা, রেল, ব্যাঙ্ক, বিমা, খনি, বন্দর সব কিছু, যা জনগণের সম্পত্তি, সেগুলি একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

এই অবস্থায় রান্নার গ্যাস, ভোজ্য ও জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে দেশ জুড়ে ক্ষোভে ফুঁসছে মানুষ। হিন্দুত্বের জিগির তুলেও সরকারের প্রতি দেশবাসীর সমর্থন যে ধরে রাখা যাচ্ছে না, তা বিজেপি নেতাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী কৃষিনীতির বিরুদ্ধে দেশজোড়া, বিশেষত গোটা উত্তর ভারতের কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতা এবং সরকারকে নতিস্বীকারে বাধ্য করার ঘটনা বিজেপি নেতাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এই অবস্থায় ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচি কি তা হলে প্রতারণার নুতন ফাঁদ?

বিজেপি শাসনে দেশের মানুষের অভিজ্ঞতা, মানুষের জীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি এড়িয়ে গিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ উস্কে মানুষের সমর্থন আদায় করাই প্রধানমন্ত্রী তথা বিজেপি সরকারের কৌশল। এ বারও এই কর্মসূচির লক্ষ্য মানুষের জাতীয়তাবাদী আবেগ উস্কে দিয়ে তার তলায় সরকারের সমস্ত ব্যর্থতাকে চাপা দেওয়া এবং আগামী লোকসভা ভোট এবং তার আগে কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা ভোটে এই আবেগে সওয়ার হয়ে ক্ষমতার দখল নেওয়া।

জাতীয়তাবাদী আবেগ উস্কে তোলা আজ প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ জাতীয়তাবাদ আজ আর প্রগতির কোনও আদর্শ নয়। অনেকে দেশপ্রেমের সাথে জাতীয়তাবাদকে গুলিয়ে ফেলেন। মূলত শাসকরাই এই দুটিকে এক করে দেখাতে চান এবং মানুষের দেশপ্রেমের আবেগকে আত্মসাৎ করে তাকে মানুষের উপর তাদের আধিপত্য কায়েমের কাজে লাগান। যে কোনও আদর্শের মতোই জাতীয়তাবাদী আদর্শও একটি বিশেষ যুগের সৃষ্টি। বিশেষ যুগের প্রয়োজনে যেমন তার সৃষ্টি হয় তেমনই সেই প্রয়োজন মিটে গেলে তার কার্যকারিতাও শেষ হয়ে যায়। স্বাধীনতা আন্দোলনে বিদেশি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ-প্রদেশ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে দেশের সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে একজাতি গঠনের প্রয়োজনেই জাতীয়তাবাদী আদর্শের জন্ম হয়েছিল। যদিও স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়েও আমরা এক জাতি ছিলাম না। সেদিনও মালিক এবং মজুর, শোষক এবং শোষিত এই দুই শ্রেণিতে জাতি বিভক্ত ছিল। তবুও উভয়ের একটা সাধারণ লক্ষ্য ছিল– স্বাধীনতা। লক্ষ্য এক হলেও উভয়ের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। শোষিত মানুষ, সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল সর্বপ্রকার শোষণ থেকে মুক্তি। মালিক শ্রেণির লক্ষ্য তা ছিল না। মালিক শ্রেণি স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশপ্রেমিক সেজে এসেছিল। সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই দেশপ্রেমিক। মালিক শ্রেণির দরকার ছিল শুধু ব্রিটিশের তৈরি শোষণমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রটি ব্রিটিশের হাত থেকে নেওয়া। তারা জানত, স্বাধীনতা এলে দেশের শাসনক্ষমতা তাদের কর্তৃত্বাধীনে আসবে। ফলে সেই সময়ে তেতাল্লিশ কোটি লোকের বাজারে তাদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে দেশে পুঁজিবাদকে আরও সংহত করবে এবং মানুষের বুকে জগদ্দল পাথরের মতো পুঁজিবাদী শাসন ও শোষণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং এ সবই তারা করবে স্বাধীনতার জয়ডঙ্কা বাজিয়ে দেশের উন্নয়নের পরিকল্পনার নামে। স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করেছে, তাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে যে গণমুক্তির লক্ষ্য ছিল তা সফল হয়নি এবং সফল যে হয়নি তা-ও স্বাধীনতার ৭৫ বছরের ইতিহাসে শাসক শ্রেণির প্রতিটি পদক্ষেপে স্পষ্ট।

ইংরেজ চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই স্বাধীন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ভারতে জাতীয়তাবাদের আজ আর কোনও কার্যকারিতাই নেই। দেশের শোষিত মানুষ তথা সাধারণ মানুষের কাছে তা আজ আর প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু শাসক শ্রেণি জাতীয়তাবাদের জিগিরটি তুলে ধরে রাখতে চায় শুধুমাত্র তাদের শোষণের স্বার্থে, দেশের সম্পদ অবাধে লুঠের স্বার্থে। এই স্লোগানের আড়ালে সমাজ যে শোষক এবং শোষিত বিভক্ত, এই সত্যিটিকেই ভুলিয়ে দিতে চায়। যা আসলে শুধুমাত্র মালিক শ্রেণির স্বার্থ, তাকেই দেশের স্বার্থ, মানুষের স্বার্থ, সবার স্বার্থ বলে দেখাতে চায়। স্বাধীন ভারতে উভয় শ্রেণির স্বার্থ যে এক নয় একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রমাগত বাড়তে থাকা দুর্দশা এবং মালিক শ্রেণির আকাশচুম্বী সম্পদ বৃদ্ধিতে তা স্পষ্ট। রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট বলছে, স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও ভারতের ৯৭ কোটি মানুষের সুষম আহার জোটে না। প্রায় ২০ কোটি মানুষের কোনও বাসস্থানই নেই। অথচ মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির ভাণ্ডার উপচে পড়ছে। জনগণের উপর মালিক শ্রেণির এই অবাধ লুঠতরাজ পুঁজিবাদী আইনে ন্যায়সঙ্গত, আইনসিদ্ধ। ভারতীয়রা যদি একটি অবিভাজ্য জাতি হত তবে কি এই ভয়ঙ্কর বৈষম্য ঘটতে পারত?

স্বাধীন ভারতে যে দলই ক্ষমতায় বসেছে মালিক শ্রেণির তাঁবেদার হিসাবে তাদের স্বার্থই তারা রক্ষা করে এসেছে। তাদের স্বার্থেই একের পর এক আইন তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের কৃষি আইন হোক, শ্রম আইন হোক, ব্যাঙ্ক কিংবা অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তির বেসরকারিকরণের আইনই হোক– সবগুলিই হয়েছে মালিক শ্রেণির স্বার্থে। প্রতিটি আইন দেশের সাধারণ মানুষকে, শোষিত মানুষকে প্রতারিত করেছে, বঞ্চিত করেছে। এ সবই তারা করেছে জাতীয়তাবাদের বুলি আওড়ে। জাতীয়তাবাদ আজ তাই শুধুমাত্র চোর, লুটেরাদেরই আশ্রয়স্থল। শোষিত মানুষের এই স্লোগানে ভুললে চলবে না। স্বাধীনতা দিবসে তাদের গণমুক্তির লড়াইকে জোরদার করার শপথ নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে আজকের দিনে জাতীয়তাবাদ মানেই দেশের জনগণের উপর মালিক শ্রেণির একাধিপত্য, যা একটি স্বাধীন দেশে ফ্যাসিবাদকেই সূচিত করে। যার অর্থ জাতির স্বার্থের নামে আসলে মালিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা। আজও বিজেপি কথায় কথায় যে জাতীয়তাবাদের কথা বলে তা আসলে মানুষের দেশপ্রেমের আবেগকে কাজে লাগিয়ে মালিক শ্রেণির সেবা করা। একদিকে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার দেশের মানুষের দুবেলা খাওয়ার স্বাধীনতা, রোজগারের স্বাধীনতা, শিক্ষার স্বাধীনতা, চিকিৎসার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রতিবাদের স্বাধীনতার মতো সমস্ত রকমের স্বাধীনতাকে কেড়ে নিচ্ছে, ঠিক তখনই স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিকে ‘অমৃত মহোৎসব’ নাম দিয়ে, স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ স্লোগান তুলে প্রধানমন্ত্রী আজ আবার সেই পুরনো জাতীয়তার আবেগকেই উস্কে তুলতে চাইছেন এবং মানুষের সব রকমের বিক্ষোভকে তার তলায় চাপা দিয়ে এ দেশের একচেটিয়া পুঁজির যে নির্লজ্জ সেবা তাঁরা করে চলেছেন তাকে আড়াল করতে চাইছেন।

মনে রাখতে হবে, আজ যে বিজেপি দেশের মানুষকে জাতীয়তাবাদ শেখাচ্ছে, তাদেরই পূর্বসূরিরা, হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, আরএসএসের নেতারা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলন বলেই মানতে চাননি। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁরা অংশগ্রহণ করেননি। উল্টে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতায় ব্রিটিশকে সহযোগিতা করেছেন। তাঁরাই আজ স্বাধীন ভারতে দেশপ্রেমিক সেজেছেন এবং দেশের মানুষকে দেশপ্রেমের পাঠ দিচ্ছেন! তাঁদের দেশপ্রেম আসলে দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের সেবা করা, তাদের জন্য দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের ব্যবস্থা করে দেওয়া। উল্টো দিকে যারা আজ তাদের পুঁজিপতি-সেবার বিরোধিতা করছে, তাদের স্বৈরাচারের বিরোধিতা করছে তাদের ব্রিটিশের তৈরি আইনেই জেলে ভরছে। স্বাধীনতার লড়াইয়ে দেশের মানুষ জাতীয়তাবাদের কথা বলে জেলে গেছে, ব্রিটিশের অত্যাচার সহ্য করেছে, দ্বীপান্তরে গেছে, ফাঁসিতে প্রাণ দিয়েছে। আর আজ বিজেপি নেতারা জাতীয়তাবাদের কথা বলতে বলতেই দেশের মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে, বিপরীতে নিজেরা ক্ষমতার গদিতে গিয়ে বসছে এবং সমস্ত ক্ষমতাকে নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করছে। যে প্রধানমন্ত্রী আজ দেশের মানুষকে জাতীয় পতাকার সাথে একাত্ম হওয়ার পাঠ দিতে চাইছেন, সেই তিনি তো নিজেকে একজন স্বয়ংসেবক বলতে গর্ব বোধ করেন! সকলেরই জানা, তাঁর প্রিয় সেই স্বয়ংসেবক সংঘ বিজেপি ক্ষমতায় বসার আগে পর্যন্ত জাতীয় পতাকাকে স্বীকার পর্যন্ত করেনি। আজ জাতীয় পতাকার প্রতি প্রেম দেখিয়ে অতীতের সেই কলঙ্কিত ইতিহাসকে ভোলাতে চায় বিজেপি। আজও আরএসএস নেতা এবং বিজেপির মন্ত্রীরা জাতীয় পতাকার পরিবর্তে গেরুয়া পতাকা ‘ভগওয়া ধ্বজ’ই একদিন লালকেল্লায় উড়ানোর কথা বলে বেড়াচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তথা বিজেপির প্রচারিত জাতীয়তা কত বড় প্রতারণা, এর পরেও তা বুঝতে কারও বাকি থাকে কি!