Home / খবর / স্কুলে ইন্টার্ন শিক্ষক সর্বনাশের অশনিসংকেত

স্কুলে ইন্টার্ন শিক্ষক সর্বনাশের অশনিসংকেত

মুখ্যমন্ত্রী ১৪ জানুয়ারি নবান্নে উচ্চশিক্ষা সম্পর্কিত একটি সভায় ঘোষণা করেছেন, বিদ্যালয় স্তরে নতুন পাস করা স্নাতকদের ইন্টার্ন হিসাবে কাজে লাগানোর কথা তাঁরা ভাবছেন৷ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে৷ ইন্টার্র্ন শিক্ষক নিয়োগ করতে পারলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে৷

রাজ্য জুড়ে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক–উচ্চমাধ্যমিক স্তরে যে তীব্র শিক্ষক–সংকট তৈরি হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী কি সত্যিই তা মেটাতে চান? চাইলে ইন্টার্ন শিক্ষক নিয়োগের দ্বারা কি তা সম্ভব? কেন তিনি স্কুল সার্ভিস কমিশনের দ্বারা প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের কথা বলছেন না? যে লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক যুবতী লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বি এড ট্রেনিং নিয়ে চাকরির আশায় বসে আছেন তাঁদের কথা কেন মুখ্যমন্ত্রী ভাবলেন না? ইন্টার্ন শিক্ষক নিয়োগ কি তাঁদের প্রতি সরকারের চূড়ান্ত বঞ্চনা নয়?

রাজ্যের অধিকাংশ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে হাজার হাজার শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে থাকায় সেগুলিতে পড়াশোনার মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে৷ রাজ্যের শিক্ষাপ্রেমী মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার নানা দাবি নিয়ে আন্দোলন করে চলেছেন৷ সিপিএম সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরেজি ও পাশফেল তুলে দিলে প্রতিবাদে যে ঐতিহাসিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল সেখানেও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ছিল অন্যতম দাবি৷

তৃণমূল শাসনে ২০১২ সালের পর স্কুল সার্ভিস কমিশন মারফত শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা না হওয়ায় শূন্যপদের সংখ্যা মারাত্মক আকার নিয়েছে৷ গত সাত বছরে যত শিক্ষক অবসর নিয়েছেন তার কতটুকু পূরণ করেছে সরকার? সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে বিশেষত উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগে শিক্ষকের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হতে বসেছে৷ অতীতে সিপিএম কিংবা বর্তমানের তৃণমূল দুই সরকারই স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের পথে না হেঁটে কন্ট্রাকচুয়াল টিচার, প্যারা টিচার নিয়োগ করে ভেঙে পড়া শিক্ষার কাঠামোটাকে কোনও ক্রমে খাড়া রাখার চেষ্টা করেছে৷ ফলে রাজ্যে শিক্ষার মানের অবনমন ঘটেই চলেছে৷

ছাত্র–ছাত্রীদের স্বার্থের কথা ভেবে কোথাও কোথাও স্কুল কর্তৃপক্ষ আংশিক সময়ের শিক্ষক নিজেদের খরচে রাখতে বাধ্য হয়েছে৷ বহুক্ষেত্রে এই শিক্ষকদের বেতন দিতে ছাত্রদের থেকে স্পেশাল ফি আদায় করছে কর্তৃপক্ষ৷ কিন্তু এর দ্বারা সমস্যার সমাধান তো হয়নি বরং এতে নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে৷ একই পরিমাণ কাজ করেও প্যারাটিচাররা পূর্ণসময়ের শিক্ষকদের এক–চতুর্থাংশ বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন৷ আর আংশিক সময়ের শিক্ষকদের নামমাত্র টাকায় খাটিয়ে নেওয়া হচ্ছে৷ শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত নানা মহল থেকে বারবার দাবি উঠেছে, স্কুলে কর্মরত এইসব প্যারাটিচার ও আংশিক সময়ের শিক্ষকদের উপযুক্ত মর্যাদা ও বেতন সরকার থেকে দেওয়া হোক৷ কিন্তু কোনও সরকারই তাতে কর্ণপাত করেনি৷ তা হলে জেনেশুনেই সরকার এই বৈষম্য চলতে দিচ্ছে নাকি? উপরন্তু তৃণমূল সরকার এখন দুই–আড়াই হাজার টাকায় ইন্টার্ন নামক প্রায় বেগার তথা ঠিকা শিক্ষক নিয়োগ করার কথা ঘোষণা করেছে৷ এই ভিক্ষাতুল্য টাকা শিক্ষকদের প্রতি চূড়ান্ত অবমাননা৷

আসলে সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে আর্থিক দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতে চাইছে৷ এমনিতেই সরকারি শিক্ষানীতির প্রভাবে রাজ্যে গরিব ও সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে৷ অতি সাধারণ মানুষও ঘটিবাটি বিক্রি করে তাদের সন্তানদের ব্যয়বহুল বেসরকারি স্কুলগুলিতে ভর্তি করতে বাধ্য হচ্ছে৷ এরই মাঝে সরকারি যে স্কুলগুলি টিকে আছে ইন্টার্র্ন শিক্ষক নিয়োগের মধ্য দিয়ে সেগুলিকেও শেষ করে দেওয়া হবে৷ প্রাথমিকে দু’হাজার টাকা ও মাধ্যমিক–উচ্চমাধ্যমিকে আড়াই হাজার টাকা বেতনে যে শিক্ষকের জীবন অভাবে জর্জরিত হয়ে থাকবে তিনি কী করে উন্নত মানের শিক্ষা দেবেন? পশ্চিমবঙ্গের ন্যূনতম মজুরি আইনানুযায়ী সরকারিভাবে ২২৭ টাকা দৈনিক মজুরি অদক্ষদের জন্য বরাদ্দ৷ যদি ধরে নেওয়া হয় তাঁরা অদক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবেন তা হলে মাসে বেতন হওয়া উচিত ৬৮১০ টাকা৷ কী হিসাবে তাঁদের বেতন মাসে ২০০০ টাকা হয়? আসলে বিদ্যালয় স্তরে ইন্টার্ন নিয়োগ করার কথা বলে শিক্ষিত বেকারদের সামনে ‘ভাল পড়ালে আগামী দিনে পূর্ণ সময়ের শিক্ষক হওয়া যাবে’ খুড়োর কলের মতো প্রতিশ্রুতি ঝুলিয়ে রেখে সামান্য অর্থ দিয়ে খাটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার৷ অথচ ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন এবং রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ অসম্ভব৷ এই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজ্য সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে৷ অথচ প্রথম শ্রেণি থেকে পাশ–ফেল ফিরিয়ে আনার দাবিতে জনমত প্রবল হলেও এই সরকারই অজুহাত দিচ্ছে রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী কেন্দ্রের নির্দেশ ছাড়া রাজ্য পাশ–ফেল ফিরিয়ে আনতে পারে না৷ একই আইনের দু’রকম ব্যাখ্যা কি রাজ্য সরকারের চরম দ্বিচারিতাকেই প্রকট করছে না

এমনিতেই সাত বছর স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা হয়নি৷ এখন ইন্টার্ন নিয়োগের দ্বারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পূর্ণ সময়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটাকেই তুলে দেওয়া হবে, যাতে পরবর্তীকালে পূর্ণ সময়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্ন না ওঠে৷ রাজ্যে প্রায় ১ কোটি বেকার৷ গত ৮ বছরে কর্মসংস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রী কিছুদিন আগে বেকার যুবকদের চাকরির প্রতীক্ষায় না থেকে তেলেভাজা বিক্রির পরামর্শ দিয়েছিলেন৷ মাত্র দু–তিন হাজার গ্রুপ ডি পদের জন্য ২৫–৩০ লক্ষ শিক্ষিত বেকার ফর্ম ফিল আপ করে৷ যার মধ্যে কেউ পিএইচডি, কেউ এমএ, এমএসসি সহ উচ্চ ডিগ্রিধারী৷ এখন স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে সামনে রেখে কলেজ ছাত্রদের ইন্টার্নশিপের লোভ দেখিয়ে দলদাস তৈরির পাকা বন্দোবস্ত করতে চাইছে সরকার৷ এর দ্বারা শিক্ষায় তৃণমূলের নগ্ন দলতন্ত্র কায়েম হবে৷ স্কুলশিক্ষার মান যতটুকু টিকে আছে তাও ভেঙে পড়বে৷ শিক্ষার মান আরও নামবে৷ শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ লুপ্ত হবে৷ কারণ একই স্কুলে কিছু শিক্ষক সরকারি বেতন আর অধিকাংশ সামান্য অর্থের বিনিময়ে কাজ করবে৷ শিক্ষিত বেকারের দল ভিক্ষুক শিক্ষক হিসাবে চিহ্ণিত হবে৷ শিক্ষাঙ্গনে উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ থাকবে না, শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্কে ফাটল ধরবে, যা স্কুলের পরিবেশকে নষ্ট করবে৷ সব মিলিয়ে স্কুল–শিক্ষার আরও সর্বনাশ ঘটবে৷

এর ফলে অভিভাবকরা আরও বেশি করে তাঁদের সন্তানদের ব্যয়বহুল বেসরকারি বিদ্যালয়ে পাঠাতে বাধ্য হবেন৷ বেসরকারি স্কুলের ব্যবসা এই সুযোগে পুরোপুরি ফুলেফেঁপে উঠবে এবং শিক্ষা ক্রমশ পণ্যে পরিণত হবে ও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাবে৷ তৈরি হবে দু’ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা৷ যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ গরিব–নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা৷

রাজ্যের শিক্ষক শিক্ষাবিদ বুদ্ধিজীবী অভিভাবক সহ শিক্ষাপ্রেমী সাধারণ মানুষ শিক্ষাক্ষেত্রে তৃণমূল সরকারের চরম নৈরাজ্য তৈরির এই প্রচেষ্টাকে মেনে নিতে পারেন না৷ তাঁরা অতি অবশ্যই প্রতিবাদে মুখর হবেন, প্রতিরোধে এগিয়ে আসবেন৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ২৪ সংখ্যা)