Breaking News
Home / অন্য রাজ্যের খবর / সেতু দুর্ঘটনায় বেরিয়ে পড়ল ভাইব্র্যান্ট গুজরাটের আসল চেহারা

সেতু দুর্ঘটনায় বেরিয়ে পড়ল ভাইব্র্যান্ট গুজরাটের আসল চেহারা

গুজরাটের ভদোদরাতে নাগরিকদের শোকজ্ঞাপন । ৩১ অক্টোবর

৩০ অক্টোবর গুজরাতের মোরবীতে মাচ্ছু নদীর উপর হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল ব্রিটিশ আমলের ঝুলন্ত কেবল ব্রিজ৷ সরকারি হিসাবে ১৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৪৮ জনই শিশু৷ আহতের সংখ্যা অন্তত ১৮০ জন৷ আশঙ্কা যে, এখনও মাচ্ছু নদীর জল–কাদায় আরও বহু দেহ আটকে রয়েছে৷

ব্রিজ মেরামতির ঠিকাদার সংস্থার ম্যানেজার আদালতে জানিয়েছেন, ‘ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই ব্রিজ ভেঙেছে’৷ সরকারের কর্তারা অভিযুক্ত ঠিকাদার সংস্থার মালিকদের বিরুদ্ধে কোনও এফআইআর দায়ের না করে কার্যত এই বক্তব্যেই সীলমোহর দিয়ে দায় সারছেন৷ মোরবীর বাতাস আজও ভারী হয়ে আছে স্বজন হারানো মানুষের কান্নায়৷ প্রশ্ণ ডঠেছে, এটা কি নিছক দুর্ঘটনা?

বেসরকারি কোম্পানিকে বরাত

বিজেপি শাসিত গুজরাটের মোরবীর মিডনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের শীর্ষকর্তারা এহেন পুরনো সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের বরাত দেয় ‘ওরেভা’ নামে এক বেসরকারি সংস্থাকে৷ যারা মূলত ঘড়ি, সিএফএল বাল্ব, ই–বাইক, ক্যালকুলেটর বা মশা মারার র্যাকেট তৈরির কোম্পানি৷ ব্রিজ তৈরি বা মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করার মতো অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না৷ এর জন্য কোনও সরকারি টেন্ডারও ডাকা  হয়নি৷ কেন, কার স্বার্থে এই বেনিয়ম?

ওরেভা কোম্পানি আবার দেবপ্রকাশ সলিডশন নামে এক সংস্থাকে সাব কন্ট্রাক্ট দেয়৷ ঠিক ছিল, আট থেকে বারো মাস সেতুটি বন্ধ থাকবে৷ কিন্তু সাত মাসের মাথায় ২৪ অক্টোবর গুজরাটি নববর্ষের দিন সেতুটি জনগণের পারাপারের জন্য খুলে দেওয়া হয়৷ তার দু’দিন আগে সাংবাদিক বৈঠক করে ‘ওরেভা’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর জয়সুখভাই পটেল জানিয়েছিলেন, সেতু মেরামতে খরচ হয়েছে ২ কোটি টাকা৷ প্রশ্ণ ডঠছে, প্রায় দেড়শো বছর আগে যে সেতু নির্মাণে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছিল, সেই সেতুর আমূল সংস্কার মাত্র ২ কোটি টাকায় হল কী করে? এখন সরকারি আমলারাও বলছেন, মেরামতির পরও দেখা গেছে ব্রিজটাকে ঝুলন্ত রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুরনো জং ধরা তারগুলি পাল্টানোর পরিবর্তে তাতে রং করেই কাজ সেরেছে ঠিকাদার সংস্থা৷ শুধু তাই নয়, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, ২ কোটির বদলে প্রকৃত খরচ হয়েছে খুব বেশি হলে ১২ লক্ষ টাকা৷ স্বাভাবিক ভাবেই  সন্দেহ দানা বাঁধছে, তবে সরকারি কর্তা এবং শাসকদলের নেতাদের সাথে কাটমানির ব্যবস্থা ছাড়া এমন কাজ সম্ভব? ‘ইডি’, ‘সিবিআই’ কি তবে এক্ষেত্রেও আসরে নামবে? না কি খাঁচার তোতার ভূমিকাতেই থাকবে?

প্রশ্ণ উঠছে, নির্ধারিত সময়ের আগে কেন তড়িঘড়ি সেতু খুলে দেওয়া হল? নববর্ষ উপলক্ষে ভিড় হলে বেশি টিকিট বিক্রি হবে, আর বিধানসভা নির্বাচনে ব্রিজ মেরামতির কৃতিত্ব ছড়িয়ে ভোটে ফায়দা তোলা যাবে– এই হিসাব করেই কি নিয়ম–নীতির তোয়াক্কা না করে সেতু খুলে দেওয়া হয়েছে? ফিটনেস সার্টিফিকেট  ছাড়াই এই সেতুটি জনগণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছি ল৷ স্থানীয় পুর কর্পোরেশনের চিফ এজিকিডটিভ সন্দীপ সিং জালা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ওরেভা কোম্পানি ব্রিজটি নতুন করে খোলার কথা পৌরসভাকে জানায়নি পর্যন্ত৷ এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে সরকারি বরাত পাওয়া একটা বেসরকারি ঠিকাদারি সংস্থার পক্ষে সরকারি নিয়ম কানুনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এত বড় ক্ষমতা হয় কী করে? দ্বিতীয়ত, সেতুটি বেআইনি ভাবে উদ্বোধনের ৫ দিন পরে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে৷ এত বড় বিপজ্জনক ও বেআইনি কাজ ঘটে যাওয়ার পর ৫ দিন ধরে পৌর কর্তৃপক্ষ ও সরকার কী করছিল? তারা কেন ওরেভা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিল না?

এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর বিজেপির নেতা–কর্মী ও তাদের আশীর্বাদপুষ্ট মিডিয়া আবার ঠারে ঠোরে বলছে, এর জন্য দায়ী সাধারণ মানুষই কারণ, সেতুর বহন ক্ষমতা ১২৫ জন হলেও দুর্ঘটনার সময় তাতে প্রায় ৫০০ জন ডঠেছিলেন এবং কিছু লোক ক্রমাগত ঝুলন্ত সেতুটি ঝাঁকানোর চেষ্টা করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেতু৷ এর সমর্থনে কিছু ভিডিয়োও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়৷ পরে অবশ্য দেখা গেছে ওই ভিডিয়োগুলি পুরনো৷ তা ছাড়া, যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, ওভারলোডের কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে, তা হলে তা দেখভালের দায়িত্ব কার ছিল? কেন ওই সেতুতে বাড়তি পর্যটককে ডঠতে দেওয়া হল? বেসরকারি ঠিকাদারের ডপর দায় চাপিয়ে সরকার হাত ধুয়ে ফেলতে পারে না৷ খবরে প্রকাশ, সেতু মেরামতের চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ে হাজির ছিলেন মোরবীর জেলাশাসক জিটি পাণ্ড্য৷ এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোম্পানি টিকিটের হার বাড়াতে পারবে, সেতুটি বাণিজ্যিক ভাবে ব্যবহার করতে পারবে এবং সরকারি সংস্থার কোনও হস্তক্ষেপ থাকবে না৷ কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে দায় কার, সে বিষয়টি ওই চুক্তিতে উল্লেখ নেই৷ জনসাধারণের জীবনের দামটা সরকারের কাছে সস্তা!

আসল দোষীদের আড়ালের চেষ্টা

গুজরাটের সরকারের পুলিশ যে এফআইআর করেছে, তাতে ‘ওরেভা’ সংস্থার নামই নেই৷ নাম নেই সেতুর তদারকির দায়িত্বে থাকা মোরবী পুরসভার সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদেরও৷ স্থানীয় ওরেভা’র দু’জন ম্যানেজার, দু’জন শ্রমিক, তিনজন নিরাপত্তাকর্মী এবং দু’জন টিকিট বিক্রেতাকে গ্রেফতার করে তাদেরই মূল অভিযুক্ত করা হয়েছে৷ এর দ্বারা বিজেপি সরকার দুর্নীতি ও কাটমানি চক্রকে যে আড়াল করছে তা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট৷

২০২০ সালে ‘ওরেভা’ সংস্থার কর্ণধার জয়সুখভাই পটেলকে ‘নব নক্ষত্র’ সম্মান দেন আমেদাবাদ পশ্চিম কেন্দ্রের বিজেপি সাংসদ কিরীট সোলাঙ্কি৷ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গেও জয়সুখের সুসম্পর্ক৷ কচ্ছের রণ অঞ্চলে একটি জল প্রকল্প নিয়ে গত বছর অক্টোবরে শাহের সঙ্গে বৈঠক করেন জয়সুখভাই৷ শাসকদলের শীর্ষনেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই কি সেতু বিপর্যয়ের এফআইআরে ‘ওরেভা’ সংস্থার ডল্লেখ নেই?

বাস্তবে বিজেপি পরিচালিত মোরবীর পৌরবোর্ডের কর্তা, সরকারি কর্তা ও শাসক দলের নেতাদের সাথে ওরেভা গোষ্ঠীর মালিকের অশুভ আঁতাতের পরিণাম হল এই মর্মান্তিক মৃত্যুযজ্ঞ৷ গুজরাট নাকি ভাইব্র্যান্ট মানে উন্নয়ন এখনে চকচক করছে৷ সে উন্নয়নের চেহারা কী? ব্রিজ উদ্বোধনের পাঁচ দিনের মাথায় তার কঙ্কাল চেহারা বেরিয়ে পড়ল৷ আর এই যে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’–তার প্রহসনও এই ঘটনায় আবারও দেখা গেল৷

উন্নয়ন ভেঙে পড়ার এমন ঘটনা পরপর ঘটছে৷ এই বছরেই এপ্রিল মাসে ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে রোপওয়ে দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছিল তিনটি প্রাণ৷ প্রায় দু’দিন মাঝ আকাশে ঝুলে ছিলেন বহু পর্যটক৷ তাঁদের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, সারা দেশের মানুষের শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়েছিল৷ সেখানেও সামনে এসেছে রোপওয়ে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সংস্থার চূড়ান্ত গাফিলতি এবং তাদের সাথে সরকারি কর্তাদের আঁতাতের ফলে সমস্ত নিয়মকে তুড়ি মেরে ডড়িয়ে দেওয়ার কথা৷

গত অক্টোবর মাসে কেদারনাথে মর্মান্তিক হেলিকপ্ঢার বিপর্যয়ে পাইলট সহ সাতজন তীর্থযাত্রীর মৃত্যু ঘটল৷ কেদারনাথ ও বদ্রীনাথে ভক্ত সমাগম বাড়াতে বেসরকারি হেলিকপ্ঢার সংস্থাগুলি এই লোভনীয় ব্যবসায় নেমে কোনও নিয়মের তোয়াক্কা করে না৷ স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা হল তারা হেলিকপ্টার পরিষেবাকে প্রায় অটোরিক্সার পরিষেবায় নামিয়ে এনেছে৷ সরকারি কর্তা ও উত্তরাখণ্ডের বিজেপি নেতাদের সৌজন্যে বেসরকারি সংস্থাগুলি অতি মুনাফার লালসায় ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রপাতের মধ্যেও ডজন ডজন হেলিকপ্টার উড়িয়ে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তীর্থযাত্রীদের নিয়ে যাতায়াত করলেও বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় যথাযথ গুরুত্ব নেই৷ শাসক দলের নেতা ও সরকারি কর্তাদের টেবিলে পঁৌছে দেওয়া নজরানাই সব নিয়মভাঙার ছাড়পত্র৷ সব পরিষেবার বেসরকারিকরণের জয়গান না করে জলগ্রহণ করেন না যারা মোরবীর মৃত্যু মিছিল তাদের দেখিয়ে দিল, বেসরকারিকরণ মানেই উন্নত পরিষেবা নয়৷ অন্ধ মোদি সরকার সবকিছু বেসরকারি করে দেওয়ার যে তোড়জোর চালাচ্ছে তার পরিণাম কী হতে পারে মোরবী তা দেখিয়ে গেল৷