Breaking News
Home / খবর / সাম্যবাদের মূল নীতি (৩) : ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস

সাম্যবাদের মূল নীতি (৩) : ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস

১৮৪৭ সালে কমিউনিস্ট লিগের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে একটি কর্মসূচি তৈরির সিদ্ধান্ত হয়৷ রচনার দায়িত্ব নেন লিগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস৷ প্রথম খসড়াটির নাম রাখা হয়েছিল, ‘ড্রাফট অফ এ কমিউনিস্ট কনফেশন অফ ফেথ’৷ এই খসড়াটির কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি৷ প্রশ্নোত্তরে লেখা বর্তমান রচনাটি দ্বিতীয় খসড়া রূপে এঙ্গেলস তৈরি করেন৷ কমিউনিজমের আদর্শকে সহজ ভাষায় বোঝাবার জন্য প্রশ্নোত্তর রূপে লিখলেও, এঙ্গেলস এতে সন্তুষ্ট ছিলেন না৷ ১৮৪৭–এর ২৩ নভেম্বর মার্কসকে এক চিঠিতে তিনি লেখেন– প্রশ্নোত্তরে লেখাটার উপর একটু ভাবনা–চিন্তা কোরো৷ আমার মনে হয়, এভাবে চলবে না৷ ইতিহাসের ঘটনাবলি কিছু যুক্ত করেই এটা দাঁড় করাতে হবে এবং নামও হওয়া উচিত ‘কমিউনিস্ট ইস্তাহার’৷ ১৮৪৮ সালেই প্রকাশিত হয় মার্কস–এঙ্গেলস রচিত সেই কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো বা ইস্তাহার৷ সুতরাং বর্তমান প্রশ্নোত্তরের লেখাটিকে কমিউনিস্ট ইস্তাহারের খসড়া হিসাবেই দেখতে হবে৷ এঙ্গেলসের ২০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা লেখাটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছি৷ এবার শেষ কিস্তি৷

প্রশ্ন : শান্তিপূর্ণ উপায়ে কি ব্যক্তিগত মালিকানার বিলোপ সম্ভব?

উত্তর : এমনটা হলে ভালই হত, কমিউনিস্টরা তাতে বাধাও দিত না৷ কমিডনিস্টরা খুব ভাল করেই জানে, যে কোনও ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ যে শুধু অকার্যকরী তাই নয়, ক্ষতিকারকও বটে৷ তারা খুব ভালভাবেই জানে, চাইলেই কারও মর্জিমাফিক বিপ্লব ঘটানো যায় না৷ সবক্ষেত্রে এবং সব সময়ই বিপ্লব হল পরিস্থিতির অনিবার্য পরিণতি, যা বিশেষ কয়েকটি পার্টি বা শ্রেণির নেতৃত্ব বা ইচ্ছার উপর একেবারেই নির্ভরশীল নয়৷

কিন্তু কমিউনিস্টরা এটাও লক্ষ করছে যে, প্রায় সব ডন্নত দেশেই সর্বহারাদের বিকাশ গায়ের জোরে দমন করা হচ্ছে এবং তার মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট বিরোধীরা সর্বশক্তি দিয়ে বিপ্লবের পক্ষেই কাজ করে যাচ্ছে৷ নিপীড়িত সর্বহারা শ্রেণিকে শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের দিকে ঠেলে দেওয়া হলে, আমরা কমিডনিস্টরা সক্রিয় ভূমিকায় নেমে সর্বহারার স্বার্থ রক্ষা করব, যে কাজটা এখন আমরা করছি তাদের দাবি ও বক্তব্যকে ভাষা দিয়ে৷

প্রশ্ন : ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান কি এক–ধাক্কায় ঘটানো সম্ভব?

উত্তর : না, সম্পদের উপর যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ যতটা প্রয়োজন, বর্তমান উৎপাদিকা শক্তিগুলিকে এক ধাক্কায় সেই মাত্রায় বৃদ্ধি করা যেমন অসম্ভব, এটাও তেমনই অসম্ভব৷ সে কারণে সর্বহারা বিপ্লব, সমস্ত সম্ভাবনাই বলছে যা অবশ্যম্ভাবী, তা পুরনো সমাজকে পাল্টাবে ক্রমে ক্রমে এবং একমাত্র তখনই ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান ঘটানো সম্ভব হবে যখন তা প্রয়োজনীয় পরিমাণে উৎপাদনের উপকরণ সৃষ্টি করতে পারবে৷

প্রশ্ন : এই বিপ্লবের গতিপথ কী হবে?

উত্তর : প্রথমেই এই বিপ্লব সূচনা করবে একটা গণতান্ত্রিক সংবিধানের এবং তার মাধ্যমে চালু হবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সর্বহারা শ্রেণির রাজনৈতিক শাসন৷ ইংল্যান্ডের মতো দেশে, যেখানে ইতিমধ্যে জনগণের অধিকাংশই সর্বহারা, সেখানে এই শাসন হবে প্রত্যক্ষ৷ ফ্রান্স আর জার্মানির মতো দেশে তা হবে পরোক্ষ শাসন৷ এই দুই দেশে জনগণের বেশিরভাগ অংশে সর্বহারার সাথে মিশে আছে ক্ষুদ্র কৃষক আর শহুরে পেটি বুর্জোয়ারা৷ এরা ক্রমাগত সর্বহারায় পরিণত হচ্ছে, এবং রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে ক্রমাগত প্রলেতারিয়েতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে৷ সেইজন্য সর্বহারার দাবিগুলি তাদেরও দাবি হয়ে উঠবে৷ এর জন্য হয়ত প্রয়োজন হবে দ্বিতীয় একটা লড়াই, কিন্তু সে–লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটবে শুধু সর্বহারার বিজয়ে৷

সর্বহারার কাছে গণতন্ত্র একেবারেই মূল্যহীন, যদি না তা সাথে সাথে  ব্যক্তিগত মালিকানার উপর নতুন করে সরাসরি আক্রমণের কাজে লাগে এবং সর্বহারার জীবনধারণের উপায় সুনিশ্চিত করার প্রয়োজনে কাজ দেয়৷ বর্তমান পরিস্থিতিতে যে প্রধান পদক্ষেপগুলি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে :

১) ব্যক্তিগত মালিকানার পরিধি কমাতে তার উপর বর্ধিত হারেকর, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির উপর চড়া হারে কর, জ্ঞাতিসূত্রে (ভাই, ভাইপো ইত্যাদি) সম্পত্তি–প্রাপ্তির অবসান, ধনীদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ঋণ (কর) আদায় ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ৷

২) ভূস্বামী, শিল্পপতি, রেলওয়ে এবং জাহাজ ব্যবসার রাঘববোয়ালদের হাত থেকে ধাপে ধাপে মালিকানা কেড়ে নিতে অংশত সাহায্য নিতে হবে রাষ্ট্রীয় শিল্পের সাথে তাদের প্রতিযোগিতার, আর অংশত করতে হবে সরাসরি বন্ডের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দিয়ে৷

৩) সমস্ত দেশত্যাগী ব্যক্তি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা৷

৪) শ্রমিকেরশ্রমকে সংগঠিতভাবে রাষ্ট্রীয় কৃষিক্ষেত্র, রাষ্ট্রীয় শিল্প আর কর্মশালায় নিয়োগ করা৷ তার মাধ্যমে শ্রমিকদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার অবসান ঘটানো৷ যতদিন কারখানায় ব্যক্তিমালিকানা টিকে থাকবে তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের মতো বর্ধিত হারে মজুরি দিতে বাধ্য করা৷

৫) ব্যক্তিগত মালিকানা সম্পূর্ণ লুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সমাজের সমস্ত সদস্যের কাজ করার সমান বাধ্যতা৷ শিল্প শ্রমিক বাহিনী গঠন, বিশেষভাবে কৃষির জন্য৷

৬) রাষ্ট্রীয় পুঁজির মাধ্যমে গঠিত জাতীয় ব্যাঙ্কের সাহায্যে আর্থিক লেনদেন  আর ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করা এবং সমস্ত বেসরকারি ব্যাঙ্ক আর ব্যাঙ্কারদের দমন করা৷

৭) রাষ্ট্রের আয়ত্তাধীন পুঁজি এবং শ্রমিক যে হারে বাড়ে সেই হারে কল–কারখানা, কর্মশালা, রেলওয়ে এবং নৌপরিবহণ শিল্পের বৃদ্ধি, সমস্ত অনাবাদী জমিতে আবাদ এবং ইতিমধ্যেই ব্যবহূত কৃষিজমির উন্নতি ঘটানো৷

৮) মায়ের কোল ছাড়ার মতো বয়সে এলেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে, রাষ্ট্রীয় খরচে সমস্ত শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করা৷ শিক্ষাকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা৷

৯) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জমিতে বিশাল বিশাল ভবন নির্মাণ, যেগুলি হবে শিল্পে এবং কৃষিকাজে নিযুক্ত নাগরিকদের যৌথ বসবাসের স্থান৷ সেগুলিতে শহর ও গ্রামীণ উভয় জীবনের সুযোগ–সুবিধাগুলোকে যুক্ত করতে হবে, যাতে কোনওটার একপেশে প্রভাব কিংবা অসুবিধা নাগরিকদের ভোগ করতে না হয়৷

১০) শহর গ্রামের সমস্ত অস্বাস্থ্যকর এবং বাসের অযোগ্য বাড়ি ও বসতি ভেঙে ফেলা৷

১১) বিবাহিত বা অবিবাহিত পিতা–মাতার সন্তান নির্বিশেষে সমস্ত শিশুর উত্তরাধিকারের সমান সুযোগ৷

১২) পরিবহণের সমস্ত উপায়–উপকরণ রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীকরণ৷

এ কথা ঠিক, এই সমস্ত পদক্ষেপ একসঙ্গে নেওয়া যায় না৷ কিন্তু একটি শুরু করলেহ পরপর অন্যগুলি নেওয়া সহজ হয়ে যায়৷ ব্যক্তিগত মালিকানার ভিত্তিমূলে প্রথম বৈপ্লবিক আঘাতটি হানলেই সামগ্রিকভাবে পুঁজি,  কৃষিউৎপাদন, শিল্প, পরিবহণ, ব্যবসা–বাণিজ্য পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কেন্দ্রীভূতকরার কাজে সর্বহারা শ্রেণি নিজেই আরও এগিয়ে চলার আবশ্যকতা বুঝতে পারবে৷ উপরোক্ত পদক্ষেপগুলি যত বাস্তবায়িত হতে থাকে সামাজিক কেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়াও তত বাড়ে৷ সর্বহারা শ্রেণি তার শ্রমের দ্বারা দেশের উৎপাদিকা শক্তিকে যে হারে বাড়িয়ে চলে, সে হারেই বাড়ে এই কেন্দ্রীকরণের গতি৷ শেষ পর্যন্ত যখন পুঁজি, উৎপাদন, আর বন্টন ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে জাতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়বে, ব্যক্তিগত মালিকানা আপনা থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে, টাকা হয়ে পড়বে অকার্যকরী৷ উৎপাদন এতটাই বাড়বে এবং মানুষ এমনভাবে বদলে যাবে, যাতে পুরনো সামাজিক সম্পর্কের শেষ চিহ্ণটুকুও ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যাবে৷

প্রশ্ন : শুধুমাত্র একটি দেশে এই বিপ্লব হতে পারে কি?

উত্তর : না৷ বৃহদায়তন শিল্প বিশ্ব–বাজার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যেই পৃথিবীর সমস্তজাতি, বিশেষত সভ্য জাতিগুলিকেএমনভাবে সংযুক্ত করেছে যাতে একটি জাতির জীবনে যা ঘটছে তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে অন্যান্য জাতি৷ তা ছাড়া, বৃহদায়তন শিল্প সকল সভ্য দেশের সামাজিক বিকাশের ধারাকে একসাথে এমন এক স্তরে নিয়ে গেছে, যাতে এই দেশগুলির প্রত্যেকটিতে বুর্জোয়া আর সর্বহারা শ্রেণি হয়ে উঠেছে সমাজের দুই নির্ণায়ক শ্রেণি৷ আর তাদের মধ্যে সংগ্রামটা হয়ে উঠেছে এখনকার দিনের মুখ্য সংগ্রাম৷ কাজেই, কমিউনিস্ট  বিপ্লবটা এখন শুধু একটা জাতীয় বিপ্লবের আকারে হবে না, এই বিপ্লব একই সাথে ঘটবে সমস্ত সভ্য দেশে, অন্তত ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স আর জার্মানিতে হবে একই সাথে৷ কোন দেশে শিল্পের বিকাশ, সম্পদ এবং উৎপাদিকা–শক্তির পরিমাণ কীভাবে বেড়েছে, তার উপর নির্ভর করবে সে দেশে এই বিপ্লবের বিকাশ হবে দ্রুত হারে, নাকি এর গতি হবে ধীর৷ জার্মানিতে এই বিপ্লবের গতিবেগ হবে সবচেয়ে কম এবং সাফল্য অর্জন করাও হবে সবচেয়ে কঠিন৷ ইংল্যান্ডে হবে সবচেয়ে দ্রুত এবং সবচেয়ে সহজ৷ বিশ্বজুড়ে অন্যান্য সকল দেশের উপর এর একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে, তাদের বিকাশের বর্তমান ধারাকে এই বিপ্লব পুরোপুরি বদলে দিয়ে তাকে ত্বরাণ্বিত করবে দ্রুত হারে৷ এই বিপ্লব বিশ্বব্যাপী, তাই তার সম্ভাবনাও বিশ্বব্যাপী৷

প্রশ্ন : ব্যক্তিগত মালিকানার চূড়ান্ত অবলুপ্তির ফল কী হতে পারে?

উত্তর : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ব্যক্তি মালিকের হাত থেকে সমস্ত উৎপাদিকা শক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থার সাথে ব্যবসা–বাণিজ্য এবং বন্টন ব্যবস্থা ব্যবহারের অধিকার কেড়ে নেওয়া৷ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় হাতিয়ার ও সামগ্রী যতটা পাওয়া যাচ্ছে সেই অনুযায়ী সমাজের সকলের প্রয়োজনের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে উৎপাদিকা শক্তিকে কাজে লাগানো৷ এর মধ্য দিয়েই বৃহদায়তন শিল্পের বর্তমান কুপ্রভাবগুলি সমাজ থেকে মুছে যাবে৷ সেদিন সংকটের অবসান ঘটবে৷ উৎপাদন আরও বাড়বে, যদিও আজকের সমাজব্যবস্থায় বর্ধিত উৎপাদন মানেই অতিউৎপাদন, যা জনগণের চরম দুর্দশার কারণ হয়ে ওঠে৷ পরবর্তী সমাজে দেখা যাবে এই বর্ধিত উৎপাদনও যথেষ্ট নয়, বরং আরও ক্রমাগত বেশি বেশি করে উৎপাদন বাড়িয়ে চলতে হচ্ছে৷ বর্ধিতউৎপাদন সেদিন আর দুর্দশার জন্ম দেবে না৷ সমাজের আশু প্রয়োজন মেটানোর কাজকে ছাপিয়ে অতিউৎপাদন সকলের সব প্রয়োজন মেটানোর দিকে নজর দেবে৷ এই অগ্রগতি অর্জন করতে গিয়ে জন্ম হবে নতুন নতুন চাহিদা আর তা মেটানোর শক্তির৷ নতুন অগ্রগতির আবশ্যক শর্ত এবং কারণ হয়ে উঠবে এই ক্রমবর্ধমান উৎপাদন৷ তার জন্য, এতদিন যা ঘটে এসেছে তার মতো, সমাজকে বিশৃঙ্খলার পথে ঠেলে দেওয়ার দরকার হবে না৷ ব্যক্তিমালিকানার জোয়াল থেকে মুক্তি পেলেই বৃহদায়তন শিল্প যে স্তরে বৃদ্ধি পাবে তার পাশে আজকের বৃহদায়তন শিল্পের আকার নিতান্ত তুচ্ছ হয়ে পড়বে৷ যেমন পুরনো ক্ষুদ্র শিল্পকে (ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প) আজকের বৃহদায়তন শিল্পের পাশে একেবারেই অকিঞ্চিৎকর দেখায়, বিষয়টা তেমনই ঘটবে৷ শিল্পের এই অগ্রগতি সমাজের হাতে তুলে দেবে প্রত্যেকের প্রয়োজন মেটানোর মতো যথেষ্ট দ্রব্যসামগ্রী৷

একইভাবে কৃষিক্ষেত্রেও এখনই যে উন্নত ব্যবস্থাগুলি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে প্রয়োগ করা যেত, ব্যক্তি মালিকানা এবং ছোট ছোট জোতে জমির বিভাজনের চাপে তা আটকে গেছে৷ এক্ষেত্রেও সামাজিক মালিকানা নিয়ে আসবে নতুন উদ্দীপনা, সমাজের হাতে তুলে দেবে বিপুল পরিমাণ উৎপাদন৷ এভাবেই সমাজের সকল সদস্যের সমস্ত প্রয়োজন মেটানোর মতো যথেষ্ট উৎপাদন এবং তার বন্টন সম্ভব হবে৷ পরস্পর বিরোধী শ্রেণিতে সমাজের বিভাজন এর মধ্য দিয়ে অকার্যকরী হয়ে পড়বে৷ শ্রেণি বিভাজন শুধু অকার্যকরী হবে তাই নয়, নতুন সমাজ ব্যবস্থার সাথে তা কোনওভাবেই খাপ খাবে না৷ শ্রম বিভাজনের ফলস্বরূপ জন্ম নিয়েছিল বিভিন্ন শ্রেণি, সেই শ্রমবিভাগ এতদিন যে আকারে রয়েছে, তা একেবারেই লুপ্ত হয়ে যাবে৷

শিল্প এবং কৃষির যে স্তরে উন্নতির কথা বলা হচ্ছে, তার জন্য শুধু যান্ত্রিক বা রাসায়নিক কুশলতাই যথেষ্ট নয়৷ যে মানুষ এই কুশলতাকে কার্যকর করবে তাদের যোগ্যতাকেও প্রয়োজনীয় উচ্চতায় বিকশিত করা দরকার৷ ঠিক যেমন বিগত শতাব্দীতে কৃষক এবং পুরনো ক্ষুদ্র শিল্পের (ম্যানুফ্যাক্টরি শ্রমিক) শ্রমিকদের বৃহদায়তন শিল্পে টেনে আনার পর তারা নিজেদের জীবনযাত্রার আমূল বদল ঘটিয়ে পুরোপুরি নতুন মানুষে পরিণত হয়েছিল৷ একইভাবে সমগ্র সমাজের যৌথ পরিচালনায় উৎপাদনের নতুন ধরনের অগ্রগতির জন্য সমাজ তার প্রয়োজনীয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মানুষের সৃষ্টি করবে৷ যৌথ পরিচালনায় উৎপাদন আজকের সমাজের এই মানুষ দিয়ে চলবে না৷ তারা আজ উৎপাদনের একটি মাত্র শাখাতেই নিযুক্ত হয়ে তাতেই বাঁধা পড়ে গেছে, তার দ্বারা শোষিত হচ্ছে, তারা নিজেদের সকল যোগ্যতার মূল্যে কেবলমাত্র একটি ক্ষমতার পরিচর্যাতেই ব্যস্ত, তারা গোটা উৎপাদনের কেবল একটি মাত্র শাখা বা কোনও শাখার উপশাখাকেই শুধু জানে, এমনসব মানুষ দিয়ে উৎপাদনের যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়৷ এমনকি আজকের দিনের শিল্পেও এমন মানুষের প্রয়োজন ক্রমাগত কমছে৷

সমাজের সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে যৌথ মালিকানায় চলা শিল্পের আবশ্যিক শর্ত হল সর্বাঙ্গীনভাবে বিকশিত মানুষ, যারা উৎপাদনের পুরো ব্যবস্থাটাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে সক্ষম৷ শ্রম বিভাজনের যে ধাঁচা একজনকে কৃষক, আর একজনকে চর্মকার, তৃতীয় জনকে কারখানা শ্রমিক, চতুর্থজনকে শেয়ার বাজারের দালাল বানায়, যন্ত্রের ধাক্কায় ইতিমধ্যেই ক্ষয়প্রাপ্ত সে ধাঁচা পুরোপুরি অবলুপ্ত হয়ে যাবে৷ শিক্ষা যুবসমাজকে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ব্যবস্থাকে বুঝে নেওয়ার শক্তি দেবে, যাতে তারা সামাজিক প্রয়োজনে বা নিজের আগ্রহের টানে উৎপাদনের এক শাখা থেকে অন্য শাখায় দ্রুত বিচরণ করতে পারে৷ বর্তমান শ্রম বিভাজন প্রত্যেক ব্যক্তির উপর যে একপেশে ভূমিকার তকমা লাগিয়ে দেয় তা থেকে তারা এ পথেই মুক্ত হবে৷ এই ভাবে সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা তার সকল সদস্যকে দেয় তাদের কর্মদক্ষতার সামগ্রিক বিকাশ ও তার পরিপূর্ণ প্রয়োগের সুযোগ৷ এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রকার শ্রেণির অবলুপ্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে৷ নিশ্চিতভাবে সাম্যবাদী সমাজের গঠনের সাথে শ্রেণির অস্তিত্বই খাপ খায় না, অন্যদিকে এই সমাজের প্রতিষ্ঠাই শ্রেণিগত বিভেদকে পুরোপুরি মুছে ফেলার পথ করে দেয়৷

এর থেকে বোঝা যায়, একই ভাবে শহর–গ্রামের বৈপরীত্যও লোপ পাবে৷ একেবারে পুরোপুরি বস্তুগত কারণেই সাম্যবাদী সমাজ সংগঠনের আবশ্যক শর্ত হল, দুটি পৃথক শ্রেণির বদলে একই ধরনের জনগণের দ্বারা কৃষি ও শিল্পের পরিচালনা৷ গ্রামাঞ্চল জুড়ে কৃষিজীবী জনগণের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার পাশাপাশি শিল্পে নিযুক্ত জনগণের বড় শহরে ভিড় জমানোর মধ্যে কৃষি ও শিল্পের অনুন্নত দশাই ফুটে ওঠে৷ এই দশা যে সমাজের আরও অগ্রগতির পথে বাধা ইতিমধ্যেই তা বোঝা যাচ্ছে৷

ব্যক্তি সম্পত্তি অবলুপ্ত হওয়ার প্রধান ফলগুলি হল– সমাজের সকল সদস্যের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে উৎপাদিকা শক্তির পরিকল্পিত এবং যৌথ ব্যবহার৷ সকলের প্রয়োজন মেটানো যাবে এমন মাত্রায় উৎপাদনের বিকাশ৷ যে ব্যবস্থার কারণে সমাজের এক অংশকে বঞ্চিত করার মূল্যে কিছু লোকের সন্তুষ্টি বিধান হয়, তার অবসান৷ শ্রেণি এবং তার বিরোধাত্মক দ্বন্দ্বের পূর্ণ অবলুপ্তি৷ এতদিন প্রচলিত শ্রম বিভাজনকে অবলুপ্ত করার মাধ্যমে সমাজের সকল সদস্যের ক্ষমতার সর্বাঙ্গীন বিকাশ৷ এর জন্য কারিগরী শিক্ষা, কাজের ক্ষেত্র পরিবর্তনের সুযোগ, সকলের প্রচেষ্টায় সকলের সুখ–স্বাচ্ছন্দের আয়োজন, শহর ও গ্রামের সংযুক্তি ঘটানোর ব্যবস্থা৷

প্রশ্ন : পরিবার প্রথার উপরে সাম্যবাদী সমাজের কী প্রভাব পড়বে?

উত্তর : সাম্যবাদী সমাজ নারী–পুরুষের সম্পর্ককে করে দেবে একান্ত নিজস্ব বিষয়, কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপার, তাতে সমাজের কোনও হস্তক্ষেপের আবশ্যকতা থাকবে না৷ কমিউনিস্ট সমাজ এ কাজ করতে পারে, তার কারণ এই সমাজ ব্যক্তিগত মালিকানা লোপ করে, শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা হয় সামাজিক তত্ত্বাবধানে৷ এইভাবে নির্মূল হবে ব্যক্তিসম্পত্তির উপর গড়ে ওঠা এযাবৎ বজায় থাকা বিবাহ প্রথার দুই মূল স্তম্ভ– স্বামীর উপর স্ত্রীর এবং বাপ–মায়ের উপর সন্তানদের নির্ভরশীলতা৷ কমিউনিজমে নারীদের ‘যৌথ সম্পত্তি’ করে তোলার কথা বলে নীতিবাগীশ কূপমণ্ডুকেরা যে শোরগোল করে, এটা হল তার একটা জবাব৷ নারীকে ‘যৌথ সম্পত্তি’তে পরিণত করার বিষয়টি পুরোপুরি বুর্জোয়া সমাজেরই অঙ্গ, এখন সেটা নিখুঁত রূপ পেয়েছে পতিতাবৃত্তিতে৷ যেহেতু পতিতাবৃত্তির মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত মালিকানা, এই মালিকানা লোপ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পতিতাবৃত্তিও লোপ পাবে৷ তাই, সাম্যবাদী সমাজ নারীকে যৌথ সম্পত্তিতে পরিণত তো করবেই না, বরং তার অবসান ঘটাবে৷

প্রশ্ন :  বিদ্যমান জাতিসত্তাগুলির প্রতি সাম্যবাদী সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে?

উত্তর : সম্প্রদায়গত মিলের ভিত্তিতে উদ্ভূত জাতিসত্তাগুলির জনগণ এই সমাজব্যবস্থায় আবশ্যিকভাবেই পরস্পর মিশে যাবে৷ ভূসম্পত্তি কেন্দ্রিক নানা বিরোধ এবং শ্রেণিগত পার্থক্য তারা দূর করবে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলোপের মধ্য দিয়ে৷

(মূল খসড়াতে এই জায়গায় লেখা আছে শুধু ‘রিমেইন্স’ অর্থাৎ ‘রয়েছে’৷ এর উত্তরটি আছে ‘ড্রাফট অফ এ কমিউনিস্ট কনফেশন অফ ফেথ’–এর ২১ নম্বর প্রশ্নে৷ সেটিই এখানে দেওয়া হল৷ সূত্র : কার্ল মার্কস ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কালেক্টেড ওয়ার্কস, ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স নিউইয়র্ক, ১৯৭৬)

প্রশ্ন :  ধর্মের প্রতি কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে?

উত্তর : এতদিন পর্যন্ত প্রচলিত সমস্ত ধর্মই কোনও বিশেষ জাতি অথবা জাতিগোষ্ঠীর অগ্রগতির বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্তরের মূর্ত রূপ৷ কিন্তু সাম্যবাদ হল ঐতিহাসিক অগ্রগতির সেই স্তর, যেখানে প্রচলিত সমস্ত ধর্ম তার কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং তাদের বিলুপ্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে৷

(মূল খসড়াতে এই জায়গাতেও লেখা আছে শুধু ‘রিমেইন্স’ অর্থাৎ ‘রয়েছে’৷ উত্তরটি আছে ‘ড্রাফট অফ এ কমিউনিস্ট কনফেশন অফ ফেথ’–এর ২২ নম্বর প্রশ্নে৷ সেটিই এখানে দেওয়া হল৷ সূত্র : ওই)

প্রশ্ন : কমিউনিস্টদের সঙ্গে সোসালিস্টদের পার্থক্য কী?

উত্তর : তথাকথিত সোসালিস্টদের তিনটি গোষ্ঠীতে ভাগ করা যায়৷

প্রথম গোষ্ঠীটি হল সামন্ততান্ত্রিক এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অনুগামীদের নিয়ে– যে দু’টি সমাজকে প্রতিদিন ভাঙছে তাদেরই সৃষ্ট বুর্জোয়া সমাজ এবং তার বৃহদায়তন শিল্প ও বিশ্ব বাণিজ্য৷ সমকালীন সমাজের অনাচার দেখে এই গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত করে, সামন্ততান্ত্রিক ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজে যেহেতু এই ধরনের অনাচার ছিল না, তাই সামন্ততন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই সমস্ত অনাচার দূর হতে পারে৷ তাদের সমস্ত প্রস্তাবই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই সুরে বাঁধা৷ সর্বহারা শ্রেণির দুঃখ–দুর্দশায় তাদের সহানুভুতি এবং সমবেদনা প্রকাশ পেলেও, এই সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্রীদের বিরোধিতা করতে হবে কমিউনিস্টদের৷ কারণ,

১) তারা অসম্ভবকে সম্ভব করতে চাইছে৷

২) তারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে অভিজাতগোষ্ঠী, গিল্ড–মাস্টার ও কারখানা মালিক, স্বৈরাচারী সামন্তপ্রভু ও তাদের অনুচরবৃন্দ–রাজকর্মচারী, সেনানায়ক আর যাজকদের কর্তৃত্ব৷ তাদের বর্ণিত পুরনো সমাজে একালের অনাচার ছিল না এটা সত্য, কিন্তু সেই সমাজেও তার নিজস্ব ধরনের অনাচার কিছু কম ছিল না৷ আর কিছু না হোক, সেগুলি তারা আমদানি করবে৷ কমিউনিস্ট সমাজ গড়ে তোলার পথে উৎপীড়িত শ্রমিকদের মুক্তির সম্ভাবনাটিও হারিয়ে যাবে৷

৩) সর্বহারা শ্রেণি প্রকৃত বিপ্লবী বা কমিউনিস্ট চরিত্র অর্জন করেছে দেখলেই, এই সমাজতন্ত্রীদের আসল মনোভাব প্রকট হয়ে পড়ে৷ তখনই তারা সর্বহারা শ্রেণির বিরুদ্ধে বুর্জোয়া শ্রেণির সঙ্গে জোট বাঁধে৷

সমাজতন্ত্রীদের দ্বিতীয় গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার সমর্থকদের নিয়ে৷ তাদের দুশ্চিন্তা হল, বর্তমান সমাজব্যবস্থা থেকে সৃষ্ট অনাচারই পাছে এই সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়৷ তাই তাদের লক্ষ্য হল বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাকে অটুট রেখে এর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা অনাচারগুলি দূর করার চেষ্টা করা৷ এই লক্ষ্য নিয়েই তাদের কেউ কেউ চায় কিছু কল্যাণমূলক ব্যবস্থা চালু হোক, আবার কেউ কেউ ব্যাপক ভাবে সমাজ সংস্কারের কথা বলে৷ সমাজকে পুনর্গঠন করার নামে, এই ব্যক্তিরা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক কাঠমোটাকে বজায় রাখতে চায়, যার উদ্দেশ্য হল আসলে এই চলতি সমাজটাকেই অটুট রাখা৷ কমিউনিস্টদের অবিচল ভাবে এই সব বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রীদের বিরোধিতা করতে হবে৷ কারণ এরা সাম্যবাদের শত্রুদের সঙ্গে কাজ করছে এবং কমিউনিস্টরা যে সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চায়, তাকেই রক্ষা করতে চাইছে৷

সর্বশেষ বা তৃতীয় গোষ্ঠী গঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের নিয়ে৷ ইতিপূর্বে আলোচিত ‘এই বিপ্লবের গতিপথ কী হবে’ (এঙ্গেলস এখানে একটু শূন্যস্থান রেখেছিলেন, খসড়ার ১৮ নং প্রশ্ন দ্রষ্টব্য হিসাবে, সূত্র : ওই) প্রশ্নের জবাবে কমিউনিস্টরা যে সমস্ত কর্মসূচির কথা বলেছে, তারা এর অনেকগুলিই মানে৷ কিন্তু এগুলি তাদের কাছে সমাজের সাম্যবাদে উত্তরণের হাতিয়ার নয়৷ তারা মনে করে এই সব কর্মসূচি যদি বর্তমান সমাজের অনাচার ও মানুষের দুঃখ–দুর্দশা দূর করতে পারে সেটাই যথেষ্ট৷ এই সমস্ত গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীরা হয় নিজেরাই সর্বহারা শ্রেণির মানুষ যারা নিজেদের মুক্তির শর্তগুলি সম্পর্কে এখনও যথেষ্ট সচেতন নয়, কিংবা তারা পেটিবুর্জোয়া শ্রেণির অন্তর্গত৷ পেটি বুর্জোয়ারা হল সেই শ্রেণি, গণতন্ত্রের বিজয় অর্জন এবং তার উপর দাঁড়িয়ে সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপ গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত যাদের স্বার্থ অনেকাংশেই সর্বহারা শ্রেণির সাথে মিলে যায়৷ তাই সংগ্রামের সময় কমিউনিস্টদের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে যতদূর সম্ভব বোঝাপড়া করে চলতে হবে এবং সাধারণভাবে অন্তত কিছুকাল তাদের সাথে মিলিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে৷ যতদিননা এই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীরা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির সেবায় নিযুক্ত হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করছে, ততদিন একাজ চলবে৷ এ কথা অবশ্যই স্পষ্ট যে, মিলিত কর্মসূচিগুলি আদর্শগত পার্থক্য নিয়ে আলোচনাকে বাদ দিয়ে চলতে পারে না৷

প্রশ্ন : এ কালের অন্যান্য রাজনৈতিক দল সম্পর্কে কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে?

উত্তর : এ ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতিতে পার্থক্য আছে৷ গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে, বুর্জোয়া শ্রেণি যেখানে শাসন ক্ষমতায়,  সেখানে সাময়িকভাবে কমিউনিস্টদের স্বার্থের সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের স্বার্থ মিলে যায়৷ আজ প্রায় সর্বত্র গণতন্ত্রীরা সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করছেন, তারা যত বেশি একাজ করে তত তাদের সঙ্গে কমিউনিস্টদের লক্ষ্য মিলে যায়৷ তারা যত বেশি করে সর্বহারার স্বার্থকে তুলে ধরবে ততই তারা সর্বহারা শ্রেণির উপর নির্ভরশীল হবে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইংল্যান্ডের চার্টিস্টদের কথা৷ চার্টিস্টরা প্রায় সকলেই শ্রমিক শ্রেণির মানুষ৷ তাই তারা গণতান্ত্রিক পেটি বুর্জোয়া বা তথাকথিত র্যাডিক্যালদের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে কমিউনিস্টদের কাছাকাছি৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে একটা গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রবর্তিত হয়েছে, সেখানে যে দলগুলি এই সংবিধানকে বুর্জোয়া শ্রেণির বিরোধিতায় ও সর্বহারার স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে, কমিউনিস্টরা তাদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে৷ এর অর্থ হল কমিউনিস্টরা সে দেশের জাতীয় কৃষি সংস্কারকদের সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করবে৷ সুইজারল্যান্ডে র্যাডিক্যালদের মধ্যে নানা স্বার্থের মিশ্রণ থাকলেও, একমাত্র তাদের সঙ্গেই কমিউনিস্টরা একত্রে কাজ করতে পারে৷ এদের মধ্যে আবার ভাউড ও জেনেভার রাডিক্যালরাই বেশি অগ্রণী৷

সর্বশেষে, জার্মানিতে বুর্জোয়া শ্রেণি ও চরম স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের মধ্যে চূড়ান্ত সংগ্রাম এখনও শুরু হয়নি৷ যেহেতু বুর্জোয়া শ্রেণি ক্ষমতায় আসীন না হওয়া পর্যন্ত কমিউনিস্টরা তাদের চূড়ান্ত মোকাবিলা করতে পারে না৷ তাই নিজেদের স্বার্থেই কমিউনিস্টদের উচিত বুর্জোয়া শ্রেণিকে যথাসম্ভব দ্রুত ক্ষমতায় আসীন হতে সাহায্য করা, যাতে অতিদ্রুতই তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা যায়৷ সে জন্য রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে উদারনৈতিক বুর্জোয়াদের কমিউনিস্টদের সাহায্য করতে হবে৷ কিন্তু তাদের সচেতন থাকতে হবে যাতে তারা বুর্জোয়া শ্রেণির আত্মপ্রবঞ্চনামূলক প্রচারের শরিক না হয়ে পড়ে৷ বুর্জোয়াদের জয় সর্বহারার কী উপকারে লাগবে সে বিষয়ে মিথ্যা আশ্বাবাণীতে ভুললে চলবে না৷

বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতা দখল থেকে কমিউনিস্টদের কেবল যেটুকু সুবিধা হতে পারে তা হল: ১) কিছু সুবিধা আদায়, যাতে কমিউনিস্টদের নিজেদের আদর্শের সপক্ষে প্রচার চালানো, আলোচনা করা ও নানা আক্রমণের হাত থেকে আদর্শকে রক্ষা করা সহজ হয়৷ তার মধ্য দিয়ে সর্বহারা শ্রেণিকে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ জঙ্গি এবং সুসংগঠিত শ্রেণিতে পরিণত করা যায়৷ ২) এটা নিশ্চিত যে, যেদিন স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ হবে সেদিন থেকেই শুরু হবে বুর্জোয়া এবং সর্বহারার মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ৷ সেই দিন থেকে থেকে জার্মান কমিউনিস্টদের নীতি ও কৌশল হবে যেখানে ইতিমধ্যেই বুর্জোয়ারা শাসকের ভূমিকায় বসেছে, সেই সব দেশের কমিউনিস্টদের অনুসৃত নীতি ও কৌশলের অনুরূপ৷ (সমাপ্ত)

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ১৯ সংখ্যা)