Breaking News
Home / খবর / সরকারি রিপোর্টেই প্রমাণিত প্রাথমিক শিক্ষা গভীর সংকটে

সরকারি রিপোর্টেই প্রমাণিত প্রাথমিক শিক্ষা গভীর সংকটে

১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে অ্যানুয়াল স্টেটাস অফ এডুকেশন রিপোর্ট– ২০১৯৷ সংস্থার সমীক্ষকরা দেশের ২৪টি রাজ্যের ২৬টি গ্রামীণ জেলার ৩৭ হাজার শিশুর উপর সমীক্ষা চালিয়ে এই রিপোর্ট তৈরি করেছেন৷

রিপোর্ট বলছে, প্রথম শ্রেণির মাত্র ১৬ শতাংশ শিশু ঠিকমতো পড়তে পারে৷ শব্দ পড়তে পারে মাত্র ১৪ শতাংশ৷ ওই একই শ্রেণির ৪০ শতাংশ শিশু অক্ষরই ঠিকমতো চিনতে পারে না৷ ওই শ্রেণির ৪১ শতাংশ শিশু ২ অঙ্কের সংখ্যা বুঝতে পারে৷ মাত্র ১৯ শতাংশ এক অঙ্কের যোগ করতে পারে৷ এই তথ্য শাসক শ্রেণির পক্ষে যত অস্বস্তিকরই হোক, এই হল দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গড়পড়তা হাল৷

একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হল প্রাথমিক শিক্ষা৷ একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বিকাশ সম্পূর্ণ নির্ভর করে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উপর৷ এই রিপোর্ট আরও বলেছে শিশুটির আর্থ সামাজিক অবস্থা, মা বা মাতৃস্থানীয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা, স্কুলের পরিকাঠামোর উপর নির্ভর করে কোনও শিশু গুণগত শিক্ষা পাবে কি না কিন্তু তা কি আদৌ নিশ্চিত করা যাচ্ছে? যাচ্ছে না– সে তো তথ্য পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট৷

‘শিক্ষা বলতে শুধু রিডিং, রাইটিং, অ্যারিথমেটিক নয়, যথার্থ ও পূর্ণ শিক্ষা দাও’– বলেছিলেন এ দেশের শিক্ষা আন্দোলনের পুরোধা মহান মানবতাবাদী বিদ্যাসাগর৷ গ্রামে গ্রামে স্কুল স্থাপন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় বই ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া– এসবই তিনি আন্দোলনের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন৷ সার্বজনীন শিক্ষা অর্থাৎ সকলের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার ভার নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন৷ স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সরকারে আসীন শাসক দলগুলি এই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিল৷ চালু হল ‘টাকা যার শিক্ষা তার নীতি’ অর্থাৎ শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করা শুরু হল৷ ফলে শিক্ষাকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে দেখার ফলে তার সার্বজনীন চরিত্রও আজ হারিয়ে গেছে৷

স্কুলগুলিতে পরিকাঠামোগত সমস্যা দূরীকরণের সরকারি প্রয়াসও অবহেলিত৷ বিল্ডিং আছে, শিক্ষক নেই, শিক্ষক আছে, স্কুল বিল্ডিং নেই, বই নেই৷ রাজ্যে বহু স্কুলে একজন বা দু’জন শিক্ষক৷ তারা চারটি ক্লাস নেবেন কী করে? ফলে কোনও এক ক্লাসে পাঠদান চললে বাকিদের চলে খেলা৷ একে সরকারি স্কুলের এই হাল, তাতেও গরিব শিশুদের অন্যতম আকর্ষণ মিড–ডে মিলে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ অঙ্গনওয়াড়ি, আইসিডিএস পরিচালন–ভারও তুলে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি সংস্থার হাতে৷ স্কুলগুলিতে অভুক্ত শিশুদের খাবার, তাদের দেখভাল এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে হয়৷ সেগুলি বেসরকারি সংস্থার হাতে গেলে তারা ব্যবসায়িক মুনাফার স্বার্থে বরাদ্দের কতটা খরচ করবে, তাতে শিশুদের প্রয়োজন কতটা মিটবে সেই আশঙ্কা থেকে যায়৷ অভিভাবকেরা স্বাভাবিক ভাবেই আশঙ্কিত৷ যাদের কিছুমাত্র উপায় আছে, তারা ঘটি বাটি বিক্রি করে হলেও বেসরকারি স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হচ্ছেন৷ আর যাদের সেই উপায় নেই, তাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের শিক্ষাজীবন সেখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে৷ অঙ্কুরেই বিপর্যস্ত হচ্ছে ছোট ছোট শিশুদের শিক্ষাজীবন৷

এ বছর শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯ এর দশম বছর পূর্তি৷ আইন পাশের দশ বছর পরেও এই হল শিক্ষার হাল৷ এই আইন প্রণয়নের সময় তৎকালীন কংগ্রেস সরকার বলেছিল ৬ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের সকলের বিনা পয়সায় আবশ্যিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হবে৷ কিন্তু বাস্তবে সবস্তরেই শিক্ষার খরচ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে৷ বিজেপি সরকার একদিকে ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’–এর স্লোগান তুলছে, অন্যদিকে শিক্ষায় ফি বাড়িয়েই চলেছে৷ শিক্ষার চূড়ান্ত পণ্যায়ন করে ধনী ঘরের ছেলেমেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট করেছে৷ শিক্ষার অধিকার সকল ছাত্রছাত্রীর মৌলিক অধিকার৷ শাসক দল এবং পুঁজিমালিকদের অশুভ আঁতাতে সেই অধিকার প্রতি পদে পদে বিঘ্ণিত হচ্ছে৷ অধিকার আদায়ে দরকার সংঘবদ্ধ আন্দোলন৷

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ২ সংখ্যা)