Home / খবর / সরকারি ব্যর্থতা ঢাকতে প্রতিশ্রুতির ফোয়ারা : কেন্দ্রীয় বাজেট

সরকারি ব্যর্থতা ঢাকতে প্রতিশ্রুতির ফোয়ারা : কেন্দ্রীয় বাজেট

কেন্দ্রীয় বাজেটে নির্লজ্জ প্রতারণা

এস ইউ সি আই (সি)–র  সাধারণ  সম্পাদক  কমরেড   প্রভাস   ঘোষ  ১ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস বিবৃতিতে বলেন,

কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী যে অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করেছেন, তাকে শাসকদলের ‘নির্বাচনী ইস্তাহার’ বলাই ভাল৷ বিরক্তিকর আত্মপ্রশংসা, অবাস্তব স্বপ্ন ফেরি করা এবং বানানো কিছু পরিসংখ্যানে পরিপূর্ণ এই বাজেট৷ সবচেয়ে বড় কথা, এই বাজেটে জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যা সমাধানের কোনও কথা নেই, আছে ভেজাল তথ্য ও অবাস্তব দাবির সাহায্যে বাস্তব পরিস্থিতির বিকৃত ছবি তুলে ধরার অপচেষ্টা৷ এ ব্যাপারে মাত্র দু’টি উদাহরণই যথেষ্ট৷ কর্মসংস্থান সম্পর্কে বলতে গিয়ে অন্তবর্তী অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর পূর্বকথিত মিথ্যা ভাষণকেই পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, প্রভিডেন্ট ফান্ড অ্যাকাউন্টের সংখ্যাবৃদ্ধির দ্বারাই বোঝা যায়, কর্মসংস্থান বেড়েছে৷ কিন্তু সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে যে, ২০ জন বা তার বেশি শ্রমিক আছে এমন কোম্পানিগুলিকেও প্রভিডেন্ট ফান্ডের আওতায় আনার ফলেই পি এফ অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে, কর্মসংস্থান বাড়েনি৷ এমনকী খোদ এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড সংস্থাই দেখিয়েছে, মোট সংখ্যা ৪১ লক্ষ থেকে কমে হয়েছে ৩৭ লক্ষ৷ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে যাঁরাই বাজারে যান, তাঁরা প্রত্যেকেই অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনুভব করেন৷ কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় দাবি করা হয়েছে যে, মূল্যবৃদ্ধি কমেছে ৪.৪ শতাংশ এবং জীবন হয়েছে সুসহ৷ অনুরূপভাবে, ট্রেনের ভাড়াবৃদ্ধি, সময়ানুবর্তিতা বা নিরাপত্তা সমস্যা সমাধানের কোনও উল্লেখ বাজেটে নেই৷ কৃষি–সরঞ্জামের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি ও ফসলের লাভজনক দাম না পাওয়ার ফলে কৃষকরা যখন যন্ত্রণায় বিদ্ধ হচ্ছে, তখন ফসলের নূ্যনতম সহায়ক মূল্যের গালভরা প্রতিশ্রুতির সাথে অর্থমন্ত্রী তাঁর দায়িত্ব শেষ করেছেন কৃষকদের বছরে ৬০০০ টাকা, অর্থাৎ দিনপ্রতি মাত্র ১৬ টাকা অনুদানের ঘোষণা করে– যা পুরোপুরি একটা প্রহসন৷

আমাদের দল বাজেটের নামে এই তামাশাকে তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছে৷ ধিক্কার জানাচ্ছে, পার্লামেন্টকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ছলচাতুরি প্রচারের মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে৷ সাধারণ মানুষকে ঠকানোর মতলবে তৈরি এই বুর্জোয়া প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য আমরা জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি৷

লোকসভা নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে ২০১৯–এর কেন্দ্রীয় বাজেটে এবার গত পাঁচ বছরে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সকল ক্ষেত্রে সরকারি ব্যর্থতা চাপা দিতে বিজেপি সরকার নতুন করে ফাঁপা প্রতিশ্রুতির ফোয়ারা ছুটিয়েছে৷

প্রথমত, দুই হেক্টরের কম জমিসম্পন্ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য তিন কিস্তিতে বছরে ছ’হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করা হয়েছে, যেটা বাস্তবে দাঁড়ায় দিনে ১৬ টাকা৷ গরিব চাষির দুরবস্থা নিয়ে নির্মম পরিহাস ছাড়া একে আর কী বলা যায় ভারতের চাষিরা দীর্ঘকাল ধরেই ক্রমাগত উৎপাদন মার খাওয়া এবং ফসলের উপযুক্ত দাম না পাওয়ার সমস্যায় ভুগছে৷ যার ফলে উৎপাদন মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে তারা ফসল বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়, যাকে বলে অভাবি বিক্রি৷ এ তো গেল যাদের সামান্য জমি আছে তাদের কথা৷ যাদের কোনও জমিই নেই, তাদের জন্য বাজেটে কী আছে? গত সাড়ে চার বছরে আমাদের দেশে গরিব ও প্রান্তিক আত্মঘাতী চাষির সংখ্যা এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ হয়েছে৷ ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকারে বসে তারা ফসলের উৎপাদন মূল্যের দেড়গুণ বেশি সহায়ক মূল্য দেবে চাষিদের৷ এই সরকারই গত বছর সুপ্রিম কোর্টে এফিডেবিট দাখিল করে বলে, তারা ১.৫ গুণ সহায়ক মূল্য দিতে পারবে না৷ আশ্চর্যজনক ভাবে এবারও তারা বাজেটে একই ভাবে চাষিদের আয় দ্বিগুণ করার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে৷ ফসল মার খেলে চাষিদের রিলিফ দেওয়া ও রক্ষা করার জন্য শস্যবিমার যে প্রকল্প চালু করা হয়েছিল, তা বাস্তবে রিলায়েন্স বিমা কোম্পানির মতো বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলির মুনাফার ভাণ্ডার ভরার প্রকল্প৷ যা চাষিদের দেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকায় ফুলে ফেঁপে উঠেছে৷ কিন্তু চাষিদের বিমার টাকা দেওয়ার প্রশ্ণ উঠলেই এই কোম্পানিগুলো নানা অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গেছে, চাষিরা টাকা পায়নি৷

দ্বিতীয়ত, এবার বাজেটে আরেকটা নতুন স্কিম ঘোষণা করা হয়েছে৷ অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, যারা মাসে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন, তাঁদের পেনশনের নামে৷ বলা হয়েছে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা যদি প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে দেয়, তাহলে ৬০ বছর বয়সের পর তারা ৩০০০ টাকা পেনশন পাবে৷ ধরা যাক, যে শ্রমিকের বয়স এখন ২৯ বছর, সে প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত দিয়ে যাবে৷ তারপর ২০৫০ সালের পর থেকে সে পেনশন পাবে৷ যে শ্রমিকের বয়স এখন ১৮ বছর, তাকে মাসে মাসে ৫৫টাকা দিতে হবে৷ অসংগঠিত শ্রমিকদের বোকা বানাবার এ এক নয়া কৌশল, যার পরিণতি ওই শস্যবিমার মতোই হবে৷ অসংগঠিত শ্রমিকদের কাজ যেহেতু স্থায়ী নয়, সেজন্য তাদের কাজের খোঁজে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হয়, স্থায়ী ঠিকানা থাকে না৷ এইসব শ্রমিকদের ক্ষেত্রে পেনশন দূরের কথা, তাদের জমা দেওয়া টাকাগুলোই লুট হয়ে যাবে৷ কীভাবে এই লুট রোখা হবে, তার কোনও ব্যবস্থার কথা বাজেটে বলা নেই৷ ফলে এও সরকারের এক প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়৷

‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’য়, ৮ কোটি পরিবারকে বিনা মূল্যে রান্নার গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬ কোটি ইতিমধ্যে দেওয়া হয়ে গেছে বলে দাবি৷ রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির পেট্রল পাম্পগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে এই যোজনার বিরাট বিজ্ঞাপন দেওয়া রয়েছে৷ কিন্তু বাস্তব তথ্য বলছে, এইভাবে সংযোগ যারা পেয়েছে, সেই গরিব মানুষরা গ্যাস ফুরিয়ে গেলে নতুন গ্যাসের সিলিন্ডার নিতে পারছেন না৷ কারণ, নতুন গ্যাসের যা দাম, তাঁরা সেটুকুও আয় করেন না৷ ফলে অধিকাংশ গরিব মানুষই আবার বন থেকে সংগৃহীত জ্বালানি কাঠে ফিরে গেছেন৷ উজ্জ্বলা যোজনার উজ্জ্বলতা ফিকে হয়ে গেছে অনেকদিন৷ এখন তা আছে শুধু সরকারি প্রচারে৷

সামাজিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও সবুজ ভারতের স্লোগান এবারও দেওয়া হয়েছে৷ যুক্ত করা হয়েছে মেক ইন ইন্ডিয়া, স্মার্ট সিটি, ডিজিটাল ভিলেজ, স্বচ্ছ নদী ইত্যাদি স্লোগান৷ দাবি করা হয়েছে, ৫.৪৫ লক্ষ গ্রামে আর খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করা হয় না৷ স্বচ্ছ নদীর দাবির ক্ষেত্রে বলা যায়, শুধুমাত্র গঙ্গা নদী পরিষ্কার করার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, কিন্তু সেই গঙ্গার হাল কি বদলেছে? টিভি চ্যানেলগুলিতে প্রচারিত সংবাদ অনুযায়ী, গ্রামে গ্রামে শৌচালয় তৈরির ঘোষণা কাগজেই রয়েছে, বাস্তবে নেই৷ এমনকী গ্রামাঞ্চলের সুক্লগুলিতেও সরকারি শৌচালয় নেই৷ ছাত্রছাত্রীদের খোলা জায়গাতেই শৌচকর্ম করতে হয়৷

সরকার স্মার্ট সিটির কথা বলছে৷ আগামী পাঁচ বছরে ১ লক্ষ ডিজিটাল গ্রাম তৈরি করবে ও সমস্ত গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবে বলে ঘোষণা করেছে৷ বাস্তব চিত্র হল, অধিকাংশ গ্রামেই ২৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে না৷ মোবাইল ফোন পৌঁছে গেছে, ফলে তাতে চার্জ দেওয়ার জন্য গ্রামের মানুষকে ছুটতে হয় গঞ্জে বা কাছাকাছি শহরে৷ সরকার গত পাঁচ বছরে ১৪টি নতুন এইমস (এআইআইএমএস) খুলেছে বলে ঘোষণা করেছে৷ কিন্তু সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন খোলা এইমসগুলিতে ৫৩ শতাংশ চিকিৎসক এবং ৭৫ শতাংশ সহকারি কর্মচারীর পদ খালি পড়ে আছে৷ বাস্তবে পূর্বেকার ও বর্তমান সরকার তাদের নীতির দ্বারা সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে কার্যত হত্যা করে এবং ক্রমাগত বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে কমিয়ে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রকে বেসরকারি মালিকদের হাতে তুলে দিয়েছে৷ এবারও বাজেটে সরকার সামরিক খাতে ৩ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্র সম্পর্কে নীরব৷

সরকার দাবি করেছে, ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি কালো টাকা উদ্ধার হয়েছে৷ কিন্তু ২০১৪–র নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি ছিল যে দেশের বাইরে পাচার হওয়া সমস্ত কালো টাকা তারা ফিরিয়ে আনবে এবং প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ করে টাকা দিয়ে দেবে৷ কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র দেশের সরকারি ব্যাঙ্কগুলিতেই দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের ১০ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ অনাদায়ী হয়ে রয়েছে৷ এবং এ সরকার এমনই, কারা ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না, সেই নামগুলি পর্যন্ত প্রকাশ করতে রাজি নয়

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে মোদিজি বলেছিলেন, সরকারে এলে প্রতি বছর ২ কোটি চাকরির ব্যবস্থা করবেন৷ চার বছরে এই প্রতিশ্রুতি নির্জলা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে৷ সর্বশেষ তথ্য বলছে, ভারতে বেকারত্বের হার গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে বিজেপি শাসনে৷ ২০১৭–তে বেকারত্বের  যা হার ছিল, ২০১৮–তে তার দ্বিগুণ হয়েছে৷ বিজেপি সরকার জনসাধারণের কাছ থেকে সত্য লুকোবার জন্য শ্রম মন্ত্রকের যে দপ্তর কর্মসংস্থানের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করত, সেই দপ্তরই তুলে দিয়েছে সরকারি তথ্যেই প্রকাশ ২০১৮–র জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ২৪ লক্ষ পদ ফাঁকা রয়েছে৷ এই অবস্থায় সরকার যখন বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.২ শতাংশ বলে দেখায়, কর্মসংস্থানের এই ছবির পরিপ্রেক্ষিতে এই দাবি হাস্যকর ছাড়া কিছু হতে পারে না৷

শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য– এই দুটি ক্ষেত্র সম্পর্কে এই বাজেট পরিপূর্ণ নীরব৷ যা কিছু সরকারি অনুদান ঘোষণা করা হয়েছে, সবই সামনে নির্বাচনকে লক্ষ রেখে ফাঁপা প্রতিশ্রুতি৷ সরকার দাবি করেছে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৬  লক্ষ ১৯ হাজার ৬৩০ লক্ষ (৬১৯৬৩ মিলিয়ন) ডলার হয়েছে৷ কিন্তু অধিকাংশ টাকাই খরচ হয়েছে পুরনো ব্যবসা কিনতে, নতুন কারখানা এর দ্বারা খোলেনি, ফলে নতুন চাকরিও সৃষ্টি হয়নি৷ মোদি সরকার ব্যাঙ্কঋণে সুদের পরিমাণ কমিয়েছে, কিন্তু তার দ্বারা শিল্পে বিনিয়োগ বাড়েনি যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বাজার সংকটকেই পরিষ্কার করে দেখায়৷ সব মিলিয়ে এবারের বাজেটকে সরকার যতই গরিবমুখী, উন্নয়নমুখী, চাষি ও মধ্যবিত্ত স্বার্থের পরিপূরক বলে দেখাক না কেন, বাস্তবে সবই জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার নির্বাচনী কৌশল ছাড়া কিছু নয়৷