Breaking News
Home / খবর / সংসদ বহির্ভূত বামপন্থী আন্দোলনে গুরুত্ব দিতে হবে

সংসদ বহির্ভূত বামপন্থী আন্দোলনে গুরুত্ব দিতে হবে

২৫–২৯ এপ্রিল কেরালার কোল্লামে অনুষ্ঠিত সিপিআই–এর পার্টি কংগ্রেসে আমন্ত্রিত এসইউসিআই (সি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড শঙ্কর সাহার বক্তব্য৷

সোস্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অফ ইন্ডিয়া (কমিউনিস্ট)–এর কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে আমি আপনাদের দলের ২৩তম পার্টি কংগ্রেসে উপস্থিত সকলকে আমার উষ্ণ ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছি৷ সেই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমাদের দলের দৃষ্টিভঙ্গি সংক্ষেপে রাখবার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি আপনাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি৷

এমন একটা সময়ে আপনাদের দলের এই কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন পুঁজিবাদী–সাম্রাজ্যবাদ দুনিয়া জুড়ে শ্রমজীবী মানুষ শুধু অর্থনৈতিক–রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, নীতি–নৈতিকতা–সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এক অভূতপূর্ব ও সর্বগ্রাসী সংকটের সম্মুখীন৷ নারী ও শিশুর উপর অপরাধ যে কেবল ভয়ানক আকার নিয়েছে তাই নয়, ক্ষমতাসীনদের হীন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও তা ব্যবহৃত হচ্ছে৷

শ্রমজীবী মানুষের এক বিশাল অংশের জীবন হয়ে উঠেছে অতীব দুঃখ–দুর্দশাময়, ভীষণ অসহনীয় ও শ্বাসরোধী৷ সমগ্র বিশ্বের লক্ষ লক্ষ শোষিত জনগণ বিশেষত ইউরোপ ও আরব দেশগুলিতে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ আন্দোলনে ফেটে পড়ছে৷ এমনকী বিশ্বপুঁজিবাদের দুর্গ বলে পরিচিত আমেরিকাকেও তা কাঁপিয়ে দিচ্ছে৷ বিশ্ববাজারের উপর দখলদারি আরও বাড়ানোর উদ্দেশ্যে যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি একের পর এক দেশের উপর ব্যাপক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে৷ সিরিয়ার জনগণের উপর ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সহায়তায় আমেরিকার আক্রমণ তার সাম্প্রতিকতম নজির৷

বলা বাহুল্য আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়৷ বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় পুঁজিবাদ তার  লগ্নি পুঁজির অবস্থানকে আরও সংহত ও শক্তিশালী করে নিচ্ছে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে৷ সমাজতান্ত্রিক শিবিরের দুঃখজনক ভাঙনের পর পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতের জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির বিশ্ববাজারের অংশীদার হওয়ার আকাঙক্ষা পূর্ণতা পায় কেন্দ্রের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের দ্বারা ডব্লু টি ও–তে অংশ নেওয়ার মধ্যে৷

এর ফলে পেট্রোপণ্য সহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, প্রচণ্ড দারিদ্র, অনাহারে মৃত্যু, গরিব চাষিদের উৎপন্ন কৃষিদ্রব্যের অভাবী বিক্রি, সারা দেশ জুড়ে লক্ষ লক্ষ কৃষকের ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যা, বেকারি, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধির ঘটনা মানুষকে ঠেলে দিয়েছে সম্পূর্ণ দিশাহীনতা ও সর্বগ্রাসী হতাশার অন্ধকারে৷

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমান বিজেপি পরিচালিত এনডিএ সরকার ও পূর্বতন কংগ্রেস পরিচালিত ইউপিএ সরকারের মধ্যে বাস্তবে যে কোনও ফারাকই নেই তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট৷

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে তীব্র আক্রমণ, মানুষের বিজ্ঞানভিত্তিক মনন ও বিশ্বাসের উপর আঘাত গভীর উদ্বেগের বিষয়৷ উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি আরএসএস–এর রাজনৈতিক শাখা বিজেপি একদিকে যেমন বাতিল, বিজ্ঞানবিরোধী, আধ্যাত্মিক চিন্তায় উৎসাহ জুগিয়ে এগুলির পুনরুজ্জীবন ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে জাত–পাত ও সাম্প্রদায়িকতায় উস্কানি দিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের ঐক্যে ফাটল ধরাতে চাইছে৷ অতীতে কংগ্রেস সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার আলখাল্লা পরে ভোটব্যাঙ্ক বাড়াতে এই অপরাধ করেছে৷ আর বিজেপি ‘হিন্দুত্বে’র নামে ফ্যাসিস্টসুলভ আদর্শ কাজে লাগিয়ে আরও উগ্রতার সাথে, নগ্নভাবে, উন্মত্তের মতো একই ধরনের জনস্বার্থ বিরোধী চক্রান্ত করে চলেছে ভারতের জাতীয় বুর্জোয়া ও তাদের কর্পোরেট হাউসের স্বার্থে৷

শাসক শ্রেণি ও তার তল্পিবাহক সরকারের আক্রমণ রুখতে দেশব্যাপী গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ গণআন্দোলন ও শ্রেণি সংগ্রাম গড়ে তোলাটাই বর্তমান সময়ের জরুরি প্রয়োজন৷ আর এজন্য ‘ঐক্য–সংগ্রাম–ঐক্যে’র ভিত্তিতে একটি লড়াইয়ের মঞ্চ গড়ে তোলবার দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে বর্তায় দেশের বামপন্থী দলগুলির উপর৷

মার্কসবাদ–লেনিনব শিক্ষা ও দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ৭০ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে সরকার বদলালেও শোষক বুর্জোয়া রাষ্ট্রের নীতিগত কোনও ফারাক হয় না, যে নীতি পর্দার আড়াল থেকে বুর্জোয়া শ্রেণিই তৈরি করে দেয়৷ সেজন্য যুক্ত বাম আন্দোলনের কর্তব্য হল সংসদ বহির্ভূত আন্দোলন গড়ে তুলতে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা এবং এই পথে– বুর্জোয়া গণতন্ত্র যে আসলে সর্বহারা শ্রেণির উপর বুর্জোয়া শ্রেণির একনায়কত্ব– এটা দেখিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের মোহ থেকে জনসাধারণকে মুক্ত করা৷ মার্কসবাদ–লেনিনবাদের মহান আদর্শে বলীয়ান হয়ে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করাটাই বামপন্থী আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য৷

আপনাদের পার্টি কংগ্রেসের সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করছি এবং এই আহ্বান জানিয়ে শেষ করছি

বাম ঐক্য জিন্দাবাদ

মার্কসবাদ–লেনিনব জিন্দাবাদ

সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ জিন্দাবাদ

(৭০ বর্ষ ৩৯ সংখ্যা ১৮ মে, ২০১৮)