Home / খবর / শারদীয়া বুক স্টল : যথার্থ বামপন্থাকে আপনারাই বাঁচিয়ে রেখেছেন

শারদীয়া বুক স্টল : যথার্থ বামপন্থাকে আপনারাই বাঁচিয়ে রেখেছেন

হাওড়া

 

সাধারণ মানুষের জীবনে বছরভর অসংখ্য অভাব অভিযোগ দুঃখ কষ্টকে যেন কয়েকটা দিনের জন্য চাপা দিয়ে দেয় শারদোৎসবের জাঁকজমক৷ মানুষও সব কিছুকে সরিয়ে রেখে মেতে উঠতে চায় উৎসবে৷ সে উৎসবের কত আড়ম্বর, কত আলোর রোশনাই জীবনের চাপ চাপ অন্ধকারকে পাশ কাটিয়ে জনস্রোত ভেসে যায় উৎসবের দুর্নিবার আকর্ষণে৷

সমাজেরই আর একদল মানুষ, উৎসবের মধ্যেও যাঁরা ভুলতে পারেন না জন জীবনের কঠিন সংকটকে, তাঁরা এই উৎসবেরই মাঝে দাঁড়িয়ে স্রোতের মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দিয়ে বলেন, উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও কেন আপনার জীবনের সংকট এমন স্থায়ী হয়ে আছে, কেন এত আলোর ঝলকানি আপনার জীবনের অন্ধকার দূর করতে পারে না, তার কারণটা বুঝুন, সমাধানটা খুঁজুন– হাতে ধরিয়ে দেন বই৷ বলেন, আপনার জীবন সংগ্রামে এটাই হাতিয়ার

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) দলের হাজার হাজার কর্মী প্রতি বছর শারদোৎসবের সময়ে বই নিয়ে উপস্থিত হন জনতার মাঝে৷ এ বারেও রাজ্য জুড়ে অজস্র বুক স্টলে কর্মীরা সামিল হয়েছিলেন৷ স্টল হয়েছিল ত্রিপুরা, আসাম, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, বিহার, ওড়িশা, দিল্লির মতো প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতেও৷ সুসজ্জিত স্টলে মণিমুক্তোর মতো সাজানো ছিল বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র নেতাজি ভগৎ সিং সূর্য সেন প্রীতিলতা সহ নবজাগরণের মনীষী ও স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের জীবন–সংগ্রামের তাৎপর্য সংবলিত বই, শোষিত নিপীড়িত মানুষের শোষণমুক্তির সংগ্রামের পথনির্দেশিকা বিশ্বসাম্যবাদী আন্দোলনের মহান নেতা মার্কস এঙ্গেলস লেনিন স্ট্যালিন মাও সে তুং শিবদাস ঘোষের চিন্তা সংবলিত বই৷ জীবনসংগ্রামে যে মানুষ অন্য সময়ে খুবই ব্যস্ত থাকেন, তিনিই এই সময়ে থাকেন উৎসবের মেজাজে৷ কর্মীদের অনুরোধে স্টলের সামনে দুমিনিট দাঁড়ান৷ বই পছন্দ করে কিনে নিয়ে যান৷ বলেন, গণআন্দোলনে আপনাদের দেখি, এবার পড়ে দেখি তার অনুপ্রেরণা আপনারা কোথা থেকে পান৷ একজন একগুচ্ছ বই পছন্দ করে দাম মেটানোর পর বললেন, আপনাদের বইয়ের দাম এত কম কেন? উপস্থিত কর্মীটি উত্তর দিলেন, আমারা তো লাভের জন্য বই বিক্রি করছি না, মানুষের কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য৷ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বলে ওঠেন, বুঝেছি, সত্যিকারের কমিউনিস্ট দলের তো এমনটাই হওয়ার কথা৷

শুধু দলের অসংখ্য ছাত্র–যুব কর্মীরাই নন, কর্মী–সমর্থকদের পরিবারের শিশু–কিশোররাও প্রবল উৎসাহে করে বই বিক্রি করে এই ক’দিন৷ সাধারণজনের বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে প্রশ্ন ফুটে ওঠে, ‘এত বই নিয়ে এরা দাঁড়িয়ে আছে, এদের হাত ব্যথা করে না? এদের ঘুরতে ইচ্ছা করে না?’ কলকাতার এসপ্লানেডে যে শিশুটি এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিল অষ্টমীর সন্ধ্যায়, তাকে এর উত্তর দিতে হয়নি৷ পাশে কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মী এগিয়ে এসে বললেন, ‘জানেন, পুজোর সময় প্রতি বছর এরা এভাবে বই বিক্রি করে৷ আমার ডিউটি অন্য জায়গায় পড়লে এদের খুব মিস করি৷ এদের দেখলে মনে আশা জাগে– সব এখনও শেষ হয়ে যায়নি৷ আমার নিজের সন্তান এমন হয়নি৷ কিন্তু এদের মধ্যেই আমি নিজের ছেলেমেয়েদের খুঁজি৷ যদি তারা এমন হত’ শেষ দিন সকলের জন্য কেক–লজেন্স কিনে দিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, আবার দেখা হবে৷ এবার তরুণ ছাত্র–যুবকদের মধ্যে মার্কসবাদী বই কেনার একটা বিশেষ আগ্রহ লক্ষ করা গেছে৷ তাঁরা স্টলে এসে বেছে বেছে মার্কসবাদের নানা বইয়ের সাথে কমরেড শিবদাস ঘোষের এবং কমরেড প্রভাস ঘোষের সমাজ–বিপ্লব সংক্রান্ত বইগুলি নিয়েছেন৷ কর্মীদের নানা প্রশ্ন করে বহু জিনিস বুঝে নিতে চেয়েছেন৷ এমনই এক বাবা তাঁর কিশোরী মেয়েকে নিয়ে এসে মনীষীদের সম্পর্কে স্টলের প্রতিটি বই কিনে নিয়ে বললেন, যদি সত্যিই মানুষ হতে হয়, এঁদের জীবনকে জানতে হবে৷

নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতির স্রোতে জীবন–যৌবন পার করে এসে তীব্র হতাশা যখন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, সে সময়ে বামপন্থী মনোভাবাপন্ন বহু মানুষ এস ইউ সি আই (সি)–র স্টলে এসে খুঁজে পেয়েছেন আশার আলো৷ এমনই একজন কলকাতার একটি স্টলে এসে বললেন, ছাত্রাবস্থায় ডিএসও–র অনেক বিরোধিতা করেছি৷ তখন যদি শুনতাম ওরা কী বলতে চায়, তবে আজ এমন আফশোস করতে হত না৷ বাঁকুড়ায় বাম মনোভাবাপন্ন একজন শিক্ষক বেশ কয়েকটি ঠোঙায় নানা ধরনের খাবার নিয়ে স্টলে পৌঁছে বললেন, এখানকার এক প্রসিদ্ধ দোকানের খাবার, খেয়ে নিন৷ তারপর সদ্য প্রকাশিত নীহার মুখার্জী নির্বাচিত রচনাবলি সহ প্রায় দুশো টাকার বেশি বই নিলেন৷ বললেন, একজন নেতৃস্থানীয় বাম কর্মকর্তা বলছেন, এখন ডানপন্থীদের রমরমা৷ ফলে আমাদের নরম পথ নিয়ে চলতে হবে৷ কিন্তু আপনাদের দেখে আমি অভিভূত৷ আপনারা যথার্থ বামপন্থী হিসাবে প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও মিলিট্যান্ট আছেন৷ জনসাধারণকে সজাগ সচেতন, আন্দোলনমুখী করতে লেগে আছেন৷ আপনাদের মতাদর্শ প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতেও পৌঁছে দিন, আমার একান্ত অনুরোধ৷

যে কোনও মূল্যে এনআরসি চালুর চক্রান্তকে প্রতিহত করুন, স্টলে এই ঘোষণা সংবলিত ফ্লেক্স দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছেন পথচলতি বহু মানুষ৷ আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এসে খোঁজ করেছেন এনআরসি নিয়ে কী কী বই রয়েছে৷ সেগুলি সংগ্রহ করতে করতে তাঁদের উদ্বেগ এবং এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁদের তীব্র ক্ষোভ এবং ঘৃণা উগরে দিয়েছেন৷ কর্মীরা ১৩ নভেম্বর এনআরসির প্রতিবাদে রাজভবন অভিযানে সামিল হওয়ার অনুরোধ জানালে সাগ্রহে সম্মতি জানিয়েছেন৷

এক প্রবাসী ভারতীয় হাওড়ার স্টলে এসে বলেছেন, ‘আমি শিবদাস ঘোষের কিছু বই পড়েছি৷ মার্কসবাদের সর্বোন্নত উপলব্ধির প্রকাশ তাঁর লেখায় পেয়েছি৷’ বন্ধুদের দেবেন বলে বেশ কিছু বইয়ের অনেকগুলি কপি কিনে নিয়ে গেলেন৷ অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে স্টেশনে স্টলে এসে এক মহিলা ৩০ টাকা চাঁদা দিয়ে বললেন, ‘তোমাদের সর্বস্ব উজাড় করে দিতে মন চায়৷ কিন্তু এর বেশি আজ আর দিতে পারব না৷’ আরও বেশি দিতে না পারার বেদনায় চিকচিক করে ওঠে তাঁর চোখের কোণ৷ এ–সময় অন্যান্য রাজ্যের বহু মানুষ কলকাতায় আসেন৷ বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড ইত্যাদি রাজ্যের বেশ কয়েকজন ছাত্র–যুবক বড় বাজার স্টল থেকে নানা হিন্দি–উর্দু বই নিয়েছেন৷ হায়দরাবাদের সরকারি স্কুলের এক তরুণ শিক্ষক বললেন, আমার যে কোনও সাহায্য লাগলে বলবেন৷ হাটে বাজারে গঞ্জে স্টেশনে সব জায়গাতেই স্টলের আশেপাশের দোকানদার, হকাররা বারবার এসে খোঁজ নিয়েছেন, খাওয়া হয়েছে কি না, কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না৷

এমন সব অসংখ্য উজ্জ্বল খণ্ডচিত্রের সমাহার এবারের এস ইউ সি আই (সি)–র বুকস্টলগুলি৷ দৈনন্দিন জীবন–যন্ত্রণার উপশমের পথ খুঁজে পেতে বুকভরা ভালবাসা আর গভীর প্রত্যাশা ও ভরসা নিয়ে সাগর থেকে পাহাড় সর্বত্র এগিয়ে এসেছেন অগণিত মানুষ৷

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ১০ সংখ্যা)