Breaking News
Home / খবর / মূল্যবৃদ্ধির আগুনে পুড়ছে মানুষ–সরকার জনগণের, নাকি ফাটকাবাজদের

মূল্যবৃদ্ধির আগুনে পুড়ছে মানুষ–সরকার জনগণের, নাকি ফাটকাবাজদের

 

ফাইল চিত্র

গরিব মানুষের বাঁচবার আর কোনও উপায় নেই। একে তো লকডাউনের একটানা ধকল সামলে ওঠার ক্ষমতা কোনও ভাবেই কোনও সাধারণ পরিবারের সামনে খোলা নেই, তার উপরে বাজার থেকে সামান্য কিছু কেনা এবং রান্নার হাঁড়িতে চাপানোর কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছে না অগণিত পরিবার। চাল ডাল তেল নুন সবজি থেকে শুরু করে জামা কাপড় প্রভৃতি প্রতিটি দ্রব্য, যাকে বলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, তার দাম অগ্নিমূল্য বললেও পুরোটা বোঝানো যায় না।

কেন সব জিনিসের দাম বেশি? সরকারের উত্তর লকডাউন! লকডাউনে ব্যবসায়ীরা তাদের মুনাফার জন্য দাম বাড়িয়ে দেবে, তাদের কিছু বলা যাবে না, তাদের গাঁটের কড়ি বাড়বে– এটাই তো দস্তুর! এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলা মূর্খামির সমতুল্য– এই হল দেশের কর্তাব্যক্তিদের হাবভাব। অন্যদিকে গরিব নিম্নবিত্তদের চিন্তা– জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এভাবে তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনবে কী করে? প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় এটাও মহামূর্খের প্রশ্ন ছাড়া আর কিছু নয়! এর অতি সাধারণ দুটি উত্তর আছে। হয় তারা কিনবে না, আর নয় তো কিনতে গেলে কড়ি ফেলতে হবে বাবা – সোজা কথা। কড়ি কোথা থেকে আসবে? এর উত্তর হল– এটা মহা বোকার প্রশ্ন! খাটতে হবে কষ্ট না করলে কখনও কেষ্ট পাওয়া যায়? এটাই হল সমাজে প্রচলিত ‘জ্ঞানের’ কথা। বেঁচে থাকতে হলে কষ্ট করতে হবে। এ তো সহজ-সরল বিষয়! এইটা বুঝতে চাও না কেন বাবা তোমরা গরিব দিনমজুর, খেতমজুরেরা? কিন্তু খাটবে কোথায় মানুষ?

এ প্রশ্নের উত্তর বড় জটিল। সদ্য প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় এক প্রকাশ্য সভায় বলেছিলেন ভারতবর্ষের ৭৭ কোটি যুবক-যুবতী কর্মহীন। সারা দেশের এখনকার জনসংখ্যা ১৩০ কোটির কিছু বেশি। একেবারেই অপারগ শিশু এবং বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সংখ্যা অন্তত ৩০ কোটি। তা হলে কর্মক্ষম যুবক-যুবতী প্রতিদিন গায়ে-গতরে এবং বুদ্ধিবৃত্তির জোরে কাজের সুযোগ পায় কত? সাধারণ পাটিগণিতের অঙ্ক বলছে ২৩ কোটি মাত্র। পাশাপাশি অর্জুন সেনগুপ্তের রিপোর্ট পার্লামেন্টে পেশ করে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছিলেন, ভারতবর্ষের ৭৩ শতাংশ মানুষের প্রতিদিনের আয় ২০ টাকাও নয়। অবশিষ্ট ২৭ শতাংশ মানুষ কুড়ি টাকা এবং তার বেশি আয়ের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, এই চিত্র আমাদের এই মহান ভারতের বর্তমান সরকার একবারও উচ্চারণ করে না। ছাপ্পান্ন ইঞ্চির ছাতি দেখিয়ে এই সরকার বাহাদুর দুনিয়াজুড়ে ঢাক পিটিয়ে যাচ্ছে, দেশের ভেতরে আমরা কত সুখে আছি– তার পরাকাষ্ঠা। করোনা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আচমকা লকডাউন ঘোষণা করে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ঘাড়ের উপর যে ভয়ঙ্কর সংকট নামিয়ে দিয়েছে তার পরিণতি এই ৫ মাসে দেশবাসী ভোগ করছে হাড়ে হাড়ে। শুধু পরিযায়ী শ্রমিক অন্তত আড়াই কোটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসহায় হয়ে কর্মহীন অবস্থায় চরম সংকটে পড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজ্যে রাজ্যে এবং এ রাজ্যেও গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষুদ্র শিল্প, সড়ক ও নির্মাণ শিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে কর্মরত যারা ছিল তারা আজ বাস্তবে কর্মহীন। কী অবস্থায় তারা বেঁচে আছে এবং বাঁচার জন্য সংসার পরিজনকে নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে। কে তার খবর রাখে? পিএম কেয়ারের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা কার কাজে লাগছে তার উত্তর নেই। অথচ সামান্য ত্রাণটুকু দেওয়ার জন্য অসহায় অবস্থায় পতিত দেশবাসী, বিভিন্ন রাজ্য সরকার ও কল্যাণমূলক সংস্থার পক্ষ থেকে হা-হুতাশ করার পরেও মহামান্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাক, নিস্পন্দ। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড বুরো ২০১৯ এর রিপোর্টে বলেছে, অন্ততপক্ষে ৪৩০০০ কৃষক ও দিনমজুর এক বছরে আত্মঘাতী হয়েছে দেশে। যদিও পশ্চিমবাংলা সহ কয়েকটি রাজ্যের তথ্য এর মধ্যে নেই। তা হলে বাস্তবে সংখ্যা কত ভয়ানক। আর ২০২০, অর্থাৎ এবছর মার্চ মাস থেকে লকডাউন এর পরিণতিতে পরিযায়ী শ্রমিক থেকে শুরু করে কৃষক খেতমজুর দিনমজুর অসহায় ঝুপড়ি বস্তিবাসী মানুষের আত্মহত্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা কত এ সংবাদ কোনও দিন প্রকাশিত হবে না। এই মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জন্য সরকারের কোনও ভাবনা না থাকলেও ধনকুবের কর্পোরেটদের জন্য তাদের ঘুম নেই এটা প্রমাণিত। বণিকসভা সিআইআই আর্থিক ত্রাণের দাবি জানিয়ে চিঠি লিখেছে প্রধানমন্ত্রীকে। সেখানে তাদের প্রস্তাব, অর্থনীতিকে সঙ্কট থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে দু লক্ষ কোটি টাকার প্রকল্প আনার কথা বিবেচনা করে দেখুন সরকার। (আনন্দবাজার-২১মার্চ, ২০২০)। আশ্চর্য হল, এই দাবি বণিকসভা তুলেছে ২০ মার্চ, তখনও এহেন লকডাউন যে ঘোষণা হতে যাচ্ছে তা ঘুণাক্ষরেও দেশবাসী জানে না। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে ধনকুবেররা এবং প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার উভয়েই খুব ঘনিষ্ঠতার ভেতর দিয়ে কি হতে যাচ্ছে তা স্পষ্ট করে জানত। এই ধনকুবেররাই লকডাউনে বিপর্যস্ত মানুষের রক্ত ঘাম শুষে নিয়ে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা আরও মুনাফা বাড়িয়ে চলেছে। আর ছিবড়ে হয়ে যাচ্ছে নিরুপায় দেশবাসী।

এমতাবস্থায় মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা দেশের আপামর সাধারণ মানুষের ওপর কীভাবে আসছে তা কল্পনা ও আতঙ্কের। এই ধাক্কা কত বড় তা কয়েকটা বিষয় লক্ষ করলেই স্পষ্ট হবে। ২০১৪ সালে যখন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে ঠিক এই সময়ে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে গড়পড়তা চালের দাম ছিল ২২ টাকা কিলো, গত বছর অর্থাৎ ২০১৯-এর সেপ্টেম্বরে সেই চালের দাম হয় ৪০ টাকা, এ বছর তার দাম ৪৮ টাকা কিলো। ঠিক একইভাবে মসুর ডালের দাম ২০১৪ তে ছিল ৭০ টাকা, ২০১৯-এ ১০০ টাকা, আর এখন একশো ১২০ টাকা। আলু ২০১৪ তে এই সময় ছিল ৮ টাকা, ২০১৯ শে ছিল ২২ টাকা, এখন তা কমপক্ষে ৩৫ টাকা, কোথাও বা তারও বেশি। দুধ যার দাম সরকারিভাবে ঘোষিত হয়, ২০১৪ তে এই সময় ছিল ২৫ টাকা লিটার, ২০১৯শে হয়েছিল ৪০ টাকা, এখন দাঁড়িয়েছে ৪৪ টাকা। এইভাবে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আমাদের নাগালের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে মাঝ থেকে লুটবার সুযোগ করে দিচ্ছে ধনকুবেরদের এই সরকার। কালোবাজারি ও ফাটকাবাজদের শাস্তি দেওয়ার নাম করে অন্ততপক্ষে লোকদেখানো যে আইন ছিল যাকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন বলা হয় তাকে এই লকডাউন এর সুযোগ নিয়ে সম্পূর্ণ লোপাট করে দিয়েছে বর্তমান মোদি সরকার। এই ফাটকা কারবারের স্বর্গরাজ্য গড়ে তোলার জন্যই খুচরো বাজারে আগুন জ্বলছে। সাধারণ আলু ৩৪-৩৫ টাকা কিলো, চন্দ্রমুখী আলু ৪০ টাকা, পটল ৭০-৮০ টাকা, টম্যাটো ৮০-১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৬০ টাকা, কুদরি ৫০ টাকা, বেগুন ৬০ টাকা। অন্যান্য সব জিনিসের দাম একই হারে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কেন এত দাম তার উত্তর কোথাও স্পষ্ট নয়। এ বছর আলু চাষি দাম পেয়েছে ৭ থেকে ৮ টাকা কিলো প্রতি। এখন সেই চাষিকেই কিনতে হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কিলোতে। কেন এত বড় ফারাক? এটা কি ন্যায্য? চাষির কাছ থেকে আলু কিনে নিয়ে বড় ব্যবসায়ী এবং কোল্ড স্টোরেজের মালিকরা লক্ষ লক্ষ কুইন্টাল আলু স্টোরে রেখে পরে বিক্রি করে বাজার অনুযায়ী সারা বছর। কত খরচ তাদের হয়? আলু কিনতে খরচ সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা কুইন্টাল, প্যাকেজিং এবং কোল্ডস্টোরেজে পৌঁছানো আবার স্টোর থেকে এক সাধারণ গড়পড়তা বাজারে পৌঁছানোর জন্য খরচ ২৫০ টাকা কুইন্টাল, কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া ১৪০ টাকা কুইন্টাল। সব মিলিয়ে মোটামুটি খরচ দাঁড়ায় ১২০০ টাকা কুইন্টাল। এর উপরে মুনাফা ধরলে বাজার দর কোনোভাবেই ১৫০০ টাকা কুইন্টালের উপরে হতে পারে না। অথচ দাম চলছে প্রায় তিনগুণ এর কাছাকাছি। সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যেই ফড়ে-রাজের কথা ব্যাপকভাবে এসেছে। কিন্তু সরকার? কাকস্য পরিবেদনা! কেন্দ্রীয় সরকার অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন তুলে দিয়ে ফাটকাবাজ এবং ফড়েদের হাতে বাজার তুলে দিয়েছে। রাজ্য সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেই দায় খালাস। টাস্কফোর্সের তিনবার বৈঠক হয়েছে ইতিমধ্যে। কিন্তু পর্বতের মূষিক প্রসব ছাড়া অন্য কোনও ফল ক্রেতারা পায়নি। উল্টে ক্রেতাদের দিতে হচ্ছে প্রতিদিন অগ্নিমূল্য গুনে গুনে। রাজ্য সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য সরাসরি অনেক অঙ্ক কষে ২২ টাকা কিলো আলুর দর বেঁধে বিক্রির ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দিল টাস্ক ফোর্সকে। কোথায় টাস্ক ফোর্স তাদের হদিশ কেউ কোথাও পেয়েছেন? টাস্ক ফোর্সের ফোর্সটা কি তা হলে মুনাফাখোর ফাটকাবাজদের হয়ে কাজ করবার জন্যই ব্যস্ত? এ বিষয়ে কি কারও কোনও সন্দেহ থাকতে পারে?

আসল কথা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ধনকুবের ও ফাটকাবাজদের জন্য পরিকল্পিতভাবে এই বিপুল পরিমাণ লুঠের ব্যবস্থা করে তার একটা বড় অংশ আসন্ন নির্বাচনে পারের কড়ি সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। করোনায় দেশময় ভয়ঙ্কর চেহারা নিক, হাজার হাজার মানুষ মরে যাক, লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মচ্যুত হোক, গরিব নিম্নবিত্ত পরিবার সব ছারখার হয়ে যাক, মুনাফাখোর ধনকুবেরদের স্বার্থরক্ষাই আসলে এদের কাছে দেশরক্ষার বাহানা। সেই কারণে লকডাউনের সাথে সাথেই সিআইআই-এর আবেদনে কালবিলম্ব না করে ৬৬ হাজার কোটি টাকা তাদের হাতে অনুদান তুলে দিয়েছে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার। পিএম কেয়ারের টাকা কোথায় যাচ্ছে তার কোনও হদিস তারা দিচ্ছে না। এই টাকার কিয়দংশ হাত ঘুরে এসে নির্বাচনে কাজে লাগবে এই চর্চা সর্বত্র। ভোটের ঘন্টা বেজে গেছে যে! সরকার ব্যস্ত ভোট নিয়ে। না হলে প্রতিদিন প্রায় ১ লক্ষ মানুষ করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন এখন, তা যতই বাড়ুক ট্রেন চলবে, বাস চলবে ঘোষণা করে দিচ্ছে সরকার। স্বাভাবিক পরিস্থিতি না দেখাতে পারলে ভোট হবে কী করে? আর তা হলে আগামী পাঁচটি বছরের জন্য লুটপাটের ব্যবস্থা পাকাপাকি হবে কী করে?

(ডিজিটাল গণদাবী-৭৩ বর্ষ ৫ সংখ্যা_১০ সেপ্টেম্বর, ২০২০)