Home / খবর / মিথ্যাচার আর প্রতারণাই ভোটবাজ দলগুলির হাতিয়ার

মিথ্যাচার আর প্রতারণাই ভোটবাজ দলগুলির হাতিয়ার

 

 

বিধানসভার ভোট যত এগিয়ে আসছে, রাজ্যে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাকাঙক্ষী দুই প্রধান প্রতিপক্ষের মধ্যে চাপান-উতোর ও কাদা ছোঁড়াছুড়ি ততই বাড়ছে। সেই সঙ্গে চলছে প্রতিশ্রুতির বন্যা আর দল ভাঙানোর নোংরা খেলা। রাজ্যের মানুষ দেখছেন এই বিচিত্র খেলায় বিজেপি তার প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে। রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে বিজেপি যোগদান মেলার আয়োজন করছে। সভা-পাল্টা সভা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, পেশিশক্তির আস্ফালন, খুন-সন্ত্রাস– সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বলা বাহুল্য, এই উত্তাপের সঙ্গে জনস্বার্থের সম্পর্ক বিশেষ নেই।

তৃণমূল আসরে নেমেছে ‘দুয়ারে সরকার’ কর্মসুচি নিয়ে। তাদের প্রচার হল, আপনার সমস্যা নিয়ে আপনাকে আর সরকারি অফিসে ছুটতে হবে না। সরকারই হাজির হবে আপনার দুয়ারে। শুধু আপনার প্রয়োজনটুকু বলার অপেক্ষা। তারপর সব নিমেষে সমাধান। ঠিক আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্যের মতো। এরপর আবার আনা হয়েছে ‘পাড়ায় সমাধান’ কর্মসূচি। সমাধান কী হবে সে পরের কথা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ঠিক ভোটের মুখে এরকম নানা প্রতিশ্রুতির ঝুলি নিয়ে তৃণমূল সরকারকে দুয়রে দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে কেন? তারা তো দাবি করছে, তারা পশ্চিমবাংলাকে নানা ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এই দাবি যদি সত্য হয়ে থাকে তবে তো তাদের ভয় পাওয়ার কথা নয়। নাকি এ সবই নেহাত কথার কথা!

একটু খোলা চোখে প্রকৃত চিত্রটা দেখার চেষ্টা করলে এ সত্য ধরা পড়তে বাধ্য যে, সরকারের দাবির সঙ্গে বাস্তবের কোনও সম্পর্ক নেই। সেখানে সমস্যার পাহাড় দিন দিন বাড়ছে। ঘরে ঘরে হাহাকার। ভিক্ষের মতো কিছু সাহায্য আর ভাতা মানুষের হাতে ধরিয়ে দিলেও তার দ্বারা সাধারণ মানুষের জীবনের মূল সমস্যাগুলি বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং বেড়েছে দুর্নীতি, তোলাবাজি আর কাটমানির দৌরাত্ম্য। পাড়ায় পাড়ায় দাদাগিরি আর সিন্ডিকেট রাজ। সুবিধা পাওয়া ও না-পাওয়াদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। তাই তো আজ ভোটের মুখে সরকারকে দরজায় দরজায় যেতে হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীকে জেলায় জেলায় ছুটতে হচ্ছে। এমনকি ছোট-মাঝারি মাপের বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে হচ্ছে।

তৃণমূলের পাল্টা হিসাবে বিজেপি স্লোগান তুলেছে–‘আর নয় অন্যায়’। অর্থাৎ, ভোটের মুখে বিজেপি বাংলার মানুষের সামনে ন্যায়ের প্রতীক সাজতে চাইছে। বিজেপির মতো একটি পুঁজিপতি শ্রেণির সেবক দলের কাছে ‘ন্যায়ের’ স্লোগানের মূল্য কতটুকু, দেশের মানুষ তা বারবার প্রত্যক্ষ করেছেন। এখনও দেশের মানুষ ভুলে যাননি, এই বিজেপি ২০১৪ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল– ভোটে জিতে ক্ষমতায় এলে বিদেশের ব্যাঙ্কে সঞ্চিত কালো টাকা উদ্ধার করে দেশের প্রতিটি মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে ভরে দেবে। কালো টাকা উদ্ধার তো দূরের কথা, কালো টাকার মালিকদের নামের তালিকা বিজেপি সরকার প্রকাশ পর্যন্ত করেনি। তাদের আর একটি প্রতিশ্রুতি ছিল– বছরে ২ কোটি চাকরি দেওয়া হবে। পাঁচ বছরে কত লোককে তারা চাকরি দিয়ছে? সংখ্যাটা নামমাত্র। অন্যদিকে কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। বিজেপির তৎকালীন সভাপতি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই একে ‘জুমলা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অর্থাৎ সোজা কথায় তা ছিল ধাপ্পা, যা ভোটের পর হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। এ রাজ্যে যুব বিজেপি আবার রীতিমতো প্রতিশ্রুতি কার্ড ছাপিয়ে বাড়ি বাড়ি বিলি করেছে। ভাঁওতা ধরা পড়ায় নানা স্তরের মানুষ যখন প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন, তখন রাজ্য বিজেপি এই প্রতিশ্রুতি থেকে পিছয়ে আসে। একে কোন ধরনের ‘ন্যায়’ বলে আখ্যা দেওয়া যায়?

লকডাউন ঘোষণা করার আগে কোটি কোটি খেটে খাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকরা এতগুলি দিন কী খাবেন, কোথায় থাকবেন, ‘ন্যায়ের প্রতীক’ বিজেপি তা ভাবারই সময় পায়নি। অতিমারির ভয়াবহতার মধ্যে কাজ হারানো দেশের অগণিত গরিব অসহায় মানুষদের হাতে নামমাত্র কিছু চাল-গম ছাড়া তারা আর কিছু তুলে দেওয়ার কথা ভাবতে পারেনি। কিন্তু ‘ন্যায়’ প্রতিষ্ঠার এক বিরল নজির স্থাপন করেছে আদানি-আম্বানিদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক-ঋণ মকুব করে দিয়ে। শুধু তাই নয়, অতিমারির সুযোগে জনগণের টাকায় গড়ে ওঠা রেল-বিদ্যুৎ-এয়ার ইন্ডিয়া-বিএসএনএল সহ সরকারি ক্ষেত্রকে তারা কর্পোরেট মালিকদের হাতে একে একে তুলে দিচ্ছে। ন্যায় প্রতিষ্ঠার এসবই এক একটা অভিনব নমুনা সন্দেহ নেই!

এই মুহূর্তে দিল্লির বুকে হাজার হাজার কৃষক প্রবল শৈত্যপ্রবাহ উপেক্ষা করে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন কালা কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে। দিল্লির প্রচণ্ড শৈত্য প্রবাহ ইতিমধ্যেই প্রায় ৭০ জন প্রতিবাদী কৃষকের জীবন কেড়ে নিয়েছে। আত্মহত্যা করেছন আরও কয়েকজন। কিন্তু ন্যায়ের ধ্বজাধারী বিজেপি সরকার নির্বিকার। তারা একচেটিয়া মালিকদের হাতে কৃষিকে তুলে দিতে বদ্ধপরিকর। এই তাদের ন্যায়! রাজ্যের ভোটে বিজেপির প্রচারের মূল কথা– তারা ভোটে জিতলে বাংলাকে ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলবে। জনসাধারণ তাদের কাছে জানতে চাইতে পারেন, এখানে তারা না হয় এখনও ক্ষমতায় আসেনি। কিন্তু যেখানে তারা ক্ষমতায়, সেই উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, বিহারের মতো রাজ্যে কোন সোনার রাজত্ব তারা প্রতিষ্ঠা করেছে? তথ্য তো বলছে, সেখানে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। বিজেপি নেতারা বাংলায় এসে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ সুভাষচন্দে্রর কথা আওড়াচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথের গান শোনাচ্ছেন। যেন কতবড় সংস্কৃতিপ্রেমী! অথচ এদেরই নানা রাজ্য-নেতার মুখে ‘গুজরাট বানিয়ে দেব’, ‘বদলা নেব’ , ‘সব লেখা থাকছে, কেউ বাদ যাবে না’–এরকম নানা হুমকি অহরহ শোনা যাচ্ছে। এ-ও বিজেপির ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠার’ আর এক নমুনা!

মালিকদের টাকা, পেশি শক্তি, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সর্বোপরি মিডিয়ার প্রচারই আজ দেশে ভোটের ফলাফল নির্ধারণ করে। জনসাধারণ এখানে অসহায়। কর্পোরেট মালিকানাধীন সংবাদপত্র ও প্রচার মাধ্যমগুলির প্রচারের বন্যায় জনগণ ভেসে যায়। মিডিয়া যেভাবে তাদের মতামতকে প্রভাবতি করতে চায়, সেই সুরে তারাও ভাবতে থাকে সরকার থেকে অমুককে হটিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু যেটা মানুষ খেয়াল করে না, সেটা হল– এর পিছনে কাজ করছে পুঁজিপতি শ্রেণির একটা গভীর পরিকল্পনা। ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে মানুষের বিক্ষোভ যাতে দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের দিকে চলে না যায়, যাতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত না বিপন্ন হয়ে পড়ে, তার জন্য তারা মানুষের বিক্ষোভকে ভেটের বাক্সে  ঘুরিয়ে দিতে চায়। ভোটে যতই সরকার পাল্টাক আগামী দিনে পুঁজিবাদের সংকট যত আরও বাড়বে, জনজীবনের সমস্যাও ততই বাড়তে থাকবে। কারণ পুঁজিবাদ তার সংকটের সমস্ত বোঝাটাই চাপিয়ে দিচ্ছে জনসাধারণের ঘাড়ে। এদের হয়ে সেই কাজটাই করছে ভোটবাজ দলগুলি। দুঃখের হলেও সত্য, এরকম একটা কঠিন পরিস্থিতিতে যারা পথ দেখাতে পারত, সেই বাম ও গণতান্ত্রিক দলগুলির একটা বড় অংশ লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে কিছু আসন জেতার আশায় কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে এবং মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।

এই পরিস্থিতি জনসাধারণকে ভাবতে হবে, তার কি পুঁজিপতি শ্রেণির ফাঁদে পা দিয়ে বারবারই প্রতারিত হবে, কর্পোরেট মালিকদের সেবাদাস এক দলের জায়গায তাদেরই আর এক দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে আবার হতাশায় কপাল চাপড়াবেন, নাকি পুঁজিপতিদের ছকের বাইরে বেরিয়ে এসে বিকল্প পথের সন্ধান করবেন? তাদের বুঝতে হবে, যে পথ লড়াইয়ের পথ, আত্মদানের পথ, যে পথে আজ দেশের কৃষকরা হাঁটছেন, একসময় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম হেঁটেছেন, সেটাই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ। তাদের নিজস্ব সংঘবদ্ধতা এবং সংগ্রামের মধ্যেই রয়েছে তাদের আসল শক্তি।

(গণদাবী-৭৩ বর্ষ ১৮ সংখ্যা_২২ জানুয়ারি, ২০২১)